Blogger Api

Blogger Api Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Blogger Api, Gazipur.

In the world we have two lives the second one
Starts when we realize that we have
only life and it's previous

☆Life goes on so live on☆

28/03/2026

#হৃদয়ের_স্পন্দন_তুই
#তাসলিমা_তানজুম
#পর্ব-১৪

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]

রাত তখন সাড়ে এগারোটা ছুঁইছুঁই। বাড়ির সবাই যে যার ঘরে চলে গেছে। ফারজানা প্রথম সিঁড়িতে বসে ছিল। হঠাৎ একটা শব্দ পেয়ে ও পিছন ফিরে তাকাল। দেখল, রোদেলা ঋদ্ধর রুম থেকে বেরিয়ে আসছে। রোদেলার হাতে একটা ট্রে, তাতে খালি প্লেট আর গ্লাস রাখা।

ফারজানা মনে মনে ভাবল, —“কী ঢং! ছাদে অতগুলো ফুল ছিঁড়ল, অথচ ঋদ্ধ ভাইয়া কিছুই বলল না। এখন আবার রাতের বেলা খাবার নিয়ে আসা হয়েছে। কত বুদ্ধি মেয়েটার! যাতে ফুল ছেঁড়ার জন্য পরে আর বকা না খেতে হয় — তাই আগেভাগেই মন ভোলানোর চেষ্টা চলছে।”

রোদেলা ফারজানাকে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ফারজানা নিচু স্বরে তাচ্ছিল্য করে বলে উঠল —

— “কী রে, এত রাতে ঋদ্ধ ভাইয়ার ঘরে খুব তো খাতিরদারি চলছে! ফুল ছেঁড়ার অপরাধ ঢাকতে এখন বুঝি খাবার দিয়ে মন ভোলানোর চেষ্টা হচ্ছে?”

ফারজানার কথা শুনে রোদেলা থমকে দাঁড়াল। একপলক ফারজানার দিকে তাকাল। কিন্তু কিছু না বলেই চুপচাপ নিচে নেমে কিচেনের দিকে চলে গেল। রোদেলা ভালো করেই জানে, ফারজানার কথার জবাব দেওয়া মানেই একটা বড়সড় ঝগড়া সৃষ্টি হবে। ফারজানা রোদেলার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রাগে গাল ফুলিয়ে রইল, তারপর উঠে নিজের রুমে চলে গেল।

রোদেলা কিচেনে গিয়ে ট্রে, গ্লাস আর প্লেটগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে রাখল। এরপর আর দেরি না করে সরাসরি নিজের রুমে চলে গেল।
:
রোদেলা নিজের রুমে ঢুকে দেখল রাইসা বিছানা গুছিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। রোদেলা দরজা বন্ধ করে চুপচাপ নিজের বিছানায় গিয়ে ধপ করে বসে পরল। রোদেলাকে ওভাবে বসতে দেখে রাইসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর ওকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

—“তুই এখনও আমার ওপর রেগে আছিস?”

রোদেলা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল— “কই, না তো।”

—“নাহ, সত্যি করে বল।”

—“আরে সত্যি বলছি, রেগে কেন থাকব?”

রাইসা দমল না, ও রোদেলার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল— “আমার সাথে সেদিন অমন কেন করলি?”

—“কোন দিন?” রোদেলা এমন ভান করল
যেন, রাইসার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল।

—“ভুলে গেলি?”

—“আশ্চর্য!”

—“কী আশ্চর্য! সেদিন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার কেন করলি? উত্তরটা দে।” রাইসা এবার একটু জেদ ধরেই বসল।

রোদেলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, —“আচ্ছা বলছি, সেদিন আমার মন-মেজাজ ভালো ছিল না, তাই এমন ব্যবহার করে ফেলেছিলাম। এজন্য এত কষ্ট পাস না তো, আর ভালো লাগছে না। আর আমি খারাপ ব্যবহার করেছি বলেই কি তুই কষ্ট পাবি।”

—“তো খারাপ ব্যবহার পেলে কে না কষ্ট পায়?” রাইসা অভিমানের সুরে বলল।

—“আচ্ছা, সরি। এমন আর কখনো করব না।”

—“তোর সরি তোর কাছেই রাখ। আগে বল, আমার সাথে কেন খারাপ ব্যবহার করেছিলি? আমি এমন কী করেছিলাম?”

রোদেলা এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, —“তুই কিছুই করিস নি। বললাম তো, সেদিন মন-মেজাজ ভালো ছিল না, তাই এমন ব্যবহার করে ফেলেছিলাম।”

—“মেজাজ খারাপ থাকলেও তুই কখনো আমার সাথে এমন ব্যবহার করিস নি, যদি না আমি কোনো ভুল করে থাকি তো।”

রোদেলার আর এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল, —“আচ্ছা থাক, বাদ দে না টপিকটা। যা চলে গেছে, তো গেছে। অতীত টেনে আনিস কেন বারবার? সরি বলেছি, ক্ষমা করে দিবি — ব্যাস! এত কথা কেন বলছিস? অনেক রাত হয়েছে, এবার ঘুমিয়ে পড়।”

—“না, আমি সত্যিটা না জানা পর্যন্ত ঘুমাব না, আর না তোকে ঘুমাতে দেবো।” রাইসা এবার নাছোড়বান্দার মতো জেদ ধরল।

রোদেলা এবার একটু হেসে বলল, —“যাহ্ বাবা! আচ্ছা ঠিক আছে বলছি। সেদিন ওই ঘোড়ার ডিম খবিশটা আমাকে থাপ্পড় মেরেছিল। আর তাই আমি প্রচণ্ড রেগে ছিলাম, যার জন্য তোর সাথে এমন ব্যবহার করেছি। আমি ভাবতেও পারিনি, ওই খবিশটা আমার গায়ে হাত তুলবে।”

রাইসা মুখ বাঁকিয়ে বলল, —“মিথ্যে কথাটাও ভালোভাবে বলতে পারিস না। তুই কিন্তু আমাকে সেদিন সকাল থেকেই ইগনোর করেছিলি।”

—“কী জানি আমি আবার এমন কখন করলাম! আমার কিছু মনে নেই। বাদ দে এখন, ঘুমাবো। অনেক ঘুম পাচ্ছে।” এই বলে রোদেলা চাদর টেনে শুয়ে পড়ল।

রাইসা এবার বিছানা থেকে উঠে রোদেলার কাছে গিয়ে বসল। রোদেলার হাতটা ধরে নরম সুরে বলল,

—“আমার থেকে যদি তুই কোনো বিষয়ে কষ্ট পেয়ে থাকিস, তাহলে আমাকে খোলাখুলি বলে দে। তা না করে এভাবে মনের মধ্যে কষ্ট কেন লুকিয়ে রাখিস, বল তো?”

রোদেলা উঠে বসে রাইসার হাত ধরে আশ্বস্ত করে বলল, —“বোন আমার, আমার মনে কোনো কষ্ট নেই। তুই প্লিজ এসব নিয়ে আর ভাবিস না। আমি আর কখনো এমন করব না, সত্যি।”

—“তার মানে তুই এখনও সত্যিটা বলবি না আমাকে, তাই তো?” রাইসা কিছুটা হতাশ হয়ে বলল।

রোদেলা এবার মিষ্টি হেসে বলল, —“তুই এমন কেন রে? বললাম তো, তোর ওপর আমি রেগে নেই। ওইদিন আমার মন-মেজাজ সত্যিই ভালো ছিল না। তাই এমন ভুল করে ফেলেছিলাম। এখন প্লিজ, ঘুমিয়ে পড় লক্ষীবোন আমার। আমাকে একটু ঘুমাতে দে। সকালে আবার সময়মতো উঠতে না পারলে তো আম্মুর হাতে খুন্তির বাড়ি ফ্রিতে পেতে হবে।”

রাইসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও বুঝতে পারল আজ আর রোদেলার মুখ থেকে কথা বের করা যাবে না। নিজের বিছানায় গিয়ে বসে মনে মনে ভাবল, —“কিছু তো একটা মনের মধ্যে চলছে, যেটা ও আমাকে বলতে চাইছে না।”
:
:
খোলা জানালা দিয়ে আসা ভোরের আলো সরাসরি এসে পড়ল রোদেলার চোখ-মুখে। ঘুমের ঘোরেই ও ভ্রু কুঁচকে বালিশে মুখ গুজল। সারা রাত মশার কামড়ে এক ফোঁটা ঘুমানোর জো ছিল না, তার ওপর মাথায় রাজ্যের চিন্তা ঘুরপাক খেয়েছে। সব মিলিয়ে শরীরটা বেশ ভার হয়ে আছে ওর।

হঠাৎ কী মনে করে রোদেলা ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। আড়মোড়া ভেঙে পাশের বিছানার দিকে তাকাতেই দেখল বিছানা একদম খালি। রাইসা অনেক আগেই উঠে নিচে চলে গেছে। রোদেলা এবার পাশ ফিরে টেবিল ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়ির দিকে তাকাতেই রোদেলার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সাড়ে সাতটা বেজে গেছে!

—“ইশশ, আজকেও দেরি হয়ে গেল! এই মশাগুলোর জন্য তো রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারলাম না। জানালাটা বন্ধ করে রাখলে হয়তো মশাগুলো এমন উৎপাত করত না।” রোদেলা নিজের মনেই বিড়বিড় করে আফসোস করল।

আরও একটু বিরক্ত হয়ে ভাবল, —“আর ঘোড়ার ডিম রাইসা! ও যে কখন উঠে চলে গেল, একবার ডাকারও প্রয়োজন মনে করল না? হয়তো ডেকেছিল, কিন্তু আমার যে ঘোড়ার ডিমের ঘুম! একবার যদি ঘুমিয়ে পড়ি, তবে দুনিয়া উল্টে গেলেও আমি কিচ্ছুটি টের পাই না। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এত গভীর ঘুম কেন দিলে? চোর-ডাকাত এসে যদি আমার কিডনি, লিভার আর হার্ট সব কেটে নিয়ে হাওয়া হয়ে যায়, তবুও হয়তো আমি টের পাব না। আমার যা ঘুম, অপারেশন করার সময় ডাক্তারদের বোধহয় আর আলাদা করে অ্যানেস্থেসিয়া দিতে হবে না!”

রোদেলা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না । এক লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামল। তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ও সরাসরি আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। মুখটা একবার আয়নায় ভালো করে দেখে নিয়ে, উস্কোখুস্কো চুলগুলো কোনোমতে টেনেটুনে একটা খোঁপা বাঁধল। এরপর আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল ও। মনে মনে প্রার্থনা করল, আজ অন্তত মায়ের কাছে যেন বকা শুনতে না হয়।

সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নামতেই রোদেলা দেখল, ডাইনিং টেবিলে সবাই নাস্তা করতে বসে গেছে। অপরাধীর মতো মুখে করে ঝটপট নিজের চেয়ারটার দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে শায়লা বেগম রান্নাঘর থেকে সবজি ভাজির বাটিটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে আসছিলেন। রোদেলা যেই না তাড়াহুড়ো করে নিজের জায়গায় বসতে যাবে, অমনি শায়লা বেগমের সাথে জোরেশোরে একটা ধাক্কা লাগল। ধাক্কার ফলে শায়লা বেগমের হাত থেকে বাটিটা উল্টে সবটুকু গরম ভাজি সরাসরি ঋদ্ধর গায়ের ওপর ছিটকে পড়ল।
ডাইনিং টেবিলের সবাই মুহূর্তেই খাওয়া থামিয়ে থমকে গেল।

শায়লা বেগম আতঙ্কিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, —“একি করলি রোদেলা? দেখে চলতে পারিস না?”

ঋদ্ধ ছিটকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঋদ্ধর শার্টের হাতা আর প্যান্টে গরম ভাজি মাখামাখি হয়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে ডাইনিং টেবিল জুড়ে শুরু হলো হুলস্থুল।
মিলি বেগম মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে কপাল চাপড়ালেন। তিনি তাড়াতাড়ি নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে এসে রোদেলার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। ধমক দিয়ে বললেন,

“সবসময় এমন ছটফট কেন করিস? এখন দেখ তো কী একটা বিশ্রী কাণ্ড করে বসলি!”

সুরাইয়া বেগম নিজের ছেলের এই অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন। তিনি দ্রুত টেবিলের উপর থেকে টিস্যু নিয়ে ঋদ্ধর দিকে এগিয়ে দিলেন,

“ইসস রে! অনেক গরম ছিল তো ভাজিটা, পুড়ল নাকি হাতটা? যা তো বাবা, চট করে বাথরুমে গিয়ে ধুয়ে ফেল।”

জাহিদ শিকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোদেলার দিকে এক পলক তাকালেন। সেই চাহনিতেই যেন রাজ্যের বিরক্তি আর গাম্ভীর্য মিশে আছে। পাশে বসা আসাদ শিকদার আর ফারুক শিকদার বিরক্ত মুখে নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করলেন। তাঁদের চাহনিই বলে দিচ্ছিল — রোদেলার কাছ থেকে এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করা বৃথা।
রাইসা আর ঋতু অস্ফুট স্বরে চিৎকার দিয়ে উঠল, ওদের চোখগুলো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে। ওদিকে সাদমান মুখ টিপে হাসার চেষ্টা করছে, যেন সে রোদেলার এই বিপদে মজাই পেয়েছে।
সবার মাঝখানে ফারজানা শুধু চুপ করে বসে ছিল। সে আড়চোখে একবার ঋদ্ধর দিকে আর একবার রোদেলার দিকে তাকিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছে। তার থমথমে মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই ওর মনে কী চলছে।

রোদেলা তখন অপরাধীর মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সবার কড়া চাহনি, আর অন্যদিকে সবার সামনে ঋদ্ধর এই অবস্থা করে ও যেন কথা বলার শক্তিই হারিয়ে ফেলেছে।

ঋদ্ধ নিজের রুমের দিকে চলে যেতেই জাহিদ শিকদার গম্ভীর কণ্ঠে সবাইকে একপ্রকার হুকুম দিয়ে বললেন,

—“এভাবে মূর্তির মতো চুপচাপ বসে না থেকে সবাই তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে নাও।”

জাহিদ শিকদারের কথা শুনে সবাই আবার নাস্তায় মন দিল। রোদেলাও মাথা নিচু করে চুপচাপ খেতে শুরু করল। নাস্তা শেষ করে একে একে সবাই যার যার গন্তব্যে বেরিয়ে গেল। ওদিকে ঋদ্ধ ফ্রেশ হয়ে ওপর থেকে নিচে নেমে এল।

সুরাইয়া বেগম ছেলের কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, —“আয় বাবা, নাস্তাটা করে নে।”

ঋদ্ধ একবার আড়চোখে রোদেলার দিকে তাকাল। তারপর সুরাইয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“না আম্মু, নাস্তা বাইরেই করে নেব । আসছি।”

ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সুরাইয়া বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওদিকে ডাইনিং টেবিল গোছাতে গোছাতে মিলি বেগম রোদেলাকে তাড়া দিলেন,

—“এখনো বসে আছিস? জলদি নাস্তা শেষ কর। সবার খাওয়া হয়ে গেছে, আর তোর খাওয়া শেষ হওয়ার কোন খবর নেই। প্রতিদিন সবার শেষে তোর খাওয়া শেষ হয়। এমন কেন রে তুই? আমার মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে খাবার গুলো গিল। তোর জন্যই টেবিলটাও পরিষ্কার করতে পারছি না।”

রোদেলা এতক্ষণ রুটির টুকরো হাতে নিয়ে চুপচাপ মিলি বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। মিলি বেগমের বকুনি শুনে রোদেলা আর দেরি করল না। দ্রুত নাস্তা শেষ করল। এরপর নিজের রুমে চলে এল।

রুমে ঢুকে দেখল রাইসা বিছানায় হেলান দিয়ে বসে একমনে ফোন টিপছে। রোদেলাকে রুমে ঢুকতে দেখে রাইসা মুখ তুলে বলল,

—“এত সময় কেন লাগে তোর? তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। আজ যদি তোর জন্য ভার্সিটি যেতে দেরি হয় তবে তোর একদিন কি আর আমার যে- কদিন লাগে জানি না।”

রাইসার কথা শুনে রোদেলা আর পাল্টা জবাব দিল না। চুপচাপ আলমারি থেকে জামাকাপড় বের করে ও দ্রুত বাথরুমের দিকে পা বাড়াল।
তৈরি হওয়ার সময় রোদেলার মাথায় কেবল নাস্তার টেবিলের সেই বিশ্রী ঘটনা আর ঋদ্ধর ওই একপলকের চাহনিই ঘুরছিল। ঋদ্ধর না খেয়ে বেরিয়ে যাওয়াটা ওকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। তবে রাইসার অনবরত তাগাদায় ভাবনাগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে ও মিনিট দশেকের মধ্যেই তৈরি হয়ে নিল। ব্যাগ হাতে নিয়ে রাইসার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“চল, আমি রেডি।”

এরপর রাইসা আর রোদেলা দুজনে মিলে একসাথে নিচে নেমে এল। বসার ঘরের সোফায় বসে তখন তিন জা মিলে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন। রাইসা আর রোদেলা তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।
:
:

ভার্সিটিতে পৌঁছে রাইসা আর রোদেলা দেখল প্রতিদিনের মত আজও তিথি তাদের জন্য গেটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। রাইসা আর রোদেলা তিথির দিকে এগিয়ে গেল। তিথি হাসিমুখে বলল,

—“তোদের জন্যই দাঁড়িয়ে আছি, চল ক্লাসে যাই।”

তিনজনে গল্প করতে করতে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়াল। তিথি রোদেলাকে ফিসফিস করে বলল,

—“রোদেলা, আজ কিন্তু ইকোনমিক্স ক্লাস। দয়া করে আজ অন্তত একটু শান্তিতে বসে ক্লাস করিস, কোনো অঘটন ঘটাস না!”

ক্লাসে ঢুকে ওরা দেখল, ক্লাসরুম প্রায় কানায় কানায় ভরে গেছে। ক্লাস ভর্তি থাকবেই বা না কেন! আজ যে ঋদ্ধর ক্লাস। ভার্সিটির মেয়েরা এই ক্লাসটা কিছুতেই মিস দিতে চায় না। সবাই বেশ সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে বসে আছে, শুধু প্রিয় প্রফেসরকে একপলক দেখবে বলে। রোদেলা একটু জড়সড় হয়ে রাইসা আর তিথির সাথে মাঝামাঝি এক সারিতে গিয়ে বসল।

ঠিক সময়মতো ক্লাসরুমে ঢুকল ঋদ্ধ। সকালের সেই ক্যাজুয়াল শার্ট বদলে এখন সে একদম পরিপাটি ফরমাল লুকে। হাতে লেকচার নোট আর চোখ মুখে সেই পরিচিত গাম্ভীর্য। ক্লাসে ঢুকেই সে একবার পুরো রুমটায় নজর বুলিয়ে নিল। এক মুহূর্তের জন্য তাঁর স্থির দৃষ্টি রোদেলার ওপর থমকে গেল, পরক্ষণেই সে নির্বিকার মুখে নজর সরিয়ে নিল।

ঋদ্ধ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,— “গুড মর্নিং এভরিওয়ান। আজ আমাদের আলোচনার বিষয় Consumer Behaviour।”

বলেই সে লেকচার দেওয়া শুরু করল। ঋদ্ধর লেকচার দেওয়ার ভঙ্গি যেমন চমৎকার, তেমনি তাঁর প্রতিটি শব্দে এক ধরণের গাম্ভীর্য মিশে থাকে। ক্লাসের অন্য মেয়েরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু রোদেলার অবস্থা শোচনীয়। নোটবুক খুলে কলম হাতে ধরে আছে ঠিকই, কিন্তু তার মাথায় ঘুরছে ডাইনিং টেবিলের সেই অপ্রীতিকর ঘটনা আর ঋদ্ধর শান্ত অথচ ধারালো চাহনি।

ঋদ্ধর গম্ভীর কণ্ঠস্বর রোদেলার কানে প্রতিধ্বনি হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ও কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল, ঋদ্ধ যেন লেকচারের ফাঁকে আড়চোখে ওর অস্বস্তিটা পরখ করে নিচ্ছে। রোদেলার কাছে মনে হলো, আজকের এই এক ঘণ্টার ক্লাস যেন কোনোদিনই শেষ হবে না।

অবশেষে ক্লাসের সময় শেষ হলো। ঋদ্ধ নির্বিকার মুখে বললেন, —“আজ এ পর্যন্তই। আগামী ক্লাসে আমরা বাকি অংশ আলোচনা করব।”

ঋদ্ধ ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রোদেলা একটা লম্বা শ্বাস ফেলল। এতক্ষণে যেন ও বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছে। রাইসা রোদেলার কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,

—“চল, এবার বাইরে যাই। অনেকক্ষণ তো মাথা নিচু করে ছিলি, এবার একটু খোলা বাতাসে গিয়ে বসি চল।”

তিনজনে মিলে ক্যাম্পাসের সেই বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে গিয়ে বসল। দুপুরের কড়া রোদে পিচঢালা রাস্তাটা যেন খাঁ খাঁ করছে। তপ্ত পিচ থেকে একটা গরম ভাপ উঠে চারপাশটা আরও অসহ্য করে তুলেছে। চারপাশে বাতাসের ছিটেফোঁটাও নেই, গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। এই প্রচণ্ড গরমে মাথার ওপরের কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো যেন আগুনের মতো টকটকে লাল হয়ে ফুটে আছে।

রাইসা ওড়নার দিয়ে নিজেকে বাতাস করতে করতে বলল, —“উফ, যা গরম! এখানে এক মুহূর্ত বসে থাকাও দায়।”

তিথি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই আট-নয় বছরের একটা পিচ্চি ছেলে হন্তদন্ত হয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলেটার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে, হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ। সে সরাসরি রোদেলার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—“আপা, এইটা লন।”

রোদেলা অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

—“এটা কী? কে দিয়েছে?”

ছেলেটা মাথা চুলকে একটু ইতস্তত করে জবাব দিল, —“আমি চিনি না। এক ভাই আপনারে দিতে কইছে। নেন, ধরেন।”

বলেই সে চিঠিটা প্রায় জোর করেই রোদেলার হাতে ধরিয়ে দিল। রোদেলা কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ছেলেটা উল্টো ঘুরে দৌড়ে চলে গেল। রোদেলা হাতের সেই ভাঁজ করা কাগজটার দিকে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। পিচ্চি ছেলেটা চোখের আড়াল হতেই তিথি রোদেলার হাতের চিঠিটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। তারপর একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,

—“আচ্ছা রোদেলা, এই চিঠিগুলো তোকে আসলে কে দিচ্ছে রে? প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে ঠিকই তোর কাছে একটা করে চিঠি চলে আসছে!”

রাইসা ব্রু কুঁচকে রোদেলার হাতের চিঠিটার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকাল। ও কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
—“এই আপদটা আবার কোত্থেকে এল? প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে তোর হাতে এই চিঠিগুলো কীভাবে পৌঁছায় বল তো!”

তিথিও ভ্রু কুঁচকে পাশ থেকে বলল, —“ব্যাপারটা কিন্তু এখন আর মোটেও স্বাভাবিক ঠেকছে না। এই তো সেদিন তোর ব্যাগের ভেতর একটা চিঠি পাওয়া গেল, তার পরদিন এমন পিচ্চি এক বাচ্চাকে দিয়ে পাঠিয়েছিল। আবার ক্যাফেটেরিয়ায় যাওয়ার সময় ওভাবে ফোনে মেসেজ দিয়ে বসল — আর আজকে ও তো পিচ্চি এক ছেলেকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে তোর হাতে ধরিয়ে দিল!”

তিথি এবার রোদেলার হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে বলল, —“আচ্ছা ঠিক আছে, এখন চিঠি খুলে পড়া শুরু কর তো! চিঠিতে কী লেখা আছে?”

রোদেলা খানিকটা অনিচ্ছা নিয়ে বলল, —“আহা, বাদ দে না! বাসায় গিয়ে পড়ে নেব।”

তিথি এবার বেশ জোর দিয়ে বলল, “বাসায় গিয়ে পড়বি মানে? আমি কি তোর বাসায় থাকব নাকি? এখন আমি এখানে আছি, চুপচাপ চিঠিটা পড়তে শুরু কর। আমি শুনি কী লেখা আছে।”

রোদেলা বিরক্তি নিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে ভাঁজ করা কাগজটা খুলল। রাইসা পাশ থেকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।

মাই ডিয়ার
সানফ্লাওয়ার,

তপ্ত দুপুরের এই কাঠফাঁটা রোদও আজ তোমার স্নিগ্ধতার কাছে হার মেনেছে। এই রোদে কৃষ্ণচূড়ার নিচে তোমাকে যখন দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল চারদিকের এই তপ্ত গরমে তুমি এক চিলতে শীতল ছায়া।
মেরুন রঙের এই ড্রেসটাতে তোমাকে আজ বড্ড মায়াবী লাগছে, আমার তো চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়েছে। জানো তো সানফ্লাওয়ার, আজ এই রোদে পুড়েও শুধু তোমার দিকেই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। ইচ্ছে করছিল সামনে গিয়ে দাঁড়াই, কিন্তু ওই যে—মুগ্ধতা দূর থেকেই বেশি সুন্দর। শুধু জেনে রেখো, এই ভিড়ের মাঝেও আমার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো সারাক্ষণ শুধু তোমাকেই খুঁজে ফেরে।

ভালো থেকো।

ইতি,

তোমার কেউ একজন..

চিঠিটা পড়া শেষ করে রোদেলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকটা কেমন জানি দুরুদুরু করছে। একবার আড়চোখে চারপাশে নজর বুলিয়ে নিল। ঠিক তখনই তিথি বলে উঠল,

—“আরে! মেরুন রঙের ড্রেস তো আজ রাইসাও পরেছে!” এই বলে সে খিলখিল করে হেসে উঠল।

রাইসা চরম বিরক্ত হয়ে রোদেলার হাত শক্ত করে টেনে ধরল। তিথির দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল,

—“হয়েছে, অনেক তামাশা হয়েছে! এবার থাম। এভাবে ৩২টা দাঁত বের করে না হেসে জলদি ওঠ। আমাদের এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে, এই ক্লাসটা কোনোভাবেই মিস দেওয়া যাবে না। তাড়াতাড়ি চল!”

রাইসা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, ওদের রেখেই
ক্লাসের দিকে হাঁটতে শুরু করল। রোদেলা আর তিথিও ওর পিছু পিছু যেতে লাগল।

এক ঘণ্টা পর…..

ঘণ্টাখানেক পর ক্লাস শেষ হলে ওরা তিনজন কথা বলতে বলতে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এল। তিথি হঠাৎ বলল,

—“চল, ফুচকা খাই।” রাইসা সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, চল যাই।”

রাইসা আর তিথি ফুচকা খাওয়ার জন্য পা বাড়ালেও রোদেলার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ও তখনো সেই চিঠির কথা ভাবছিল। ওর মাথায় শুধু ঘুরছে — একটা মানুষ কতটা ভালোবাসলে এতটা আবেগ দিয়ে এমনভাবে চিঠি লিখতে পারে!

হঠাৎ রোদেলার সামনে একটা ছেলে এসে দাঁড়াল। আচমকা কাউকে সামনে দেখে ও দু'কদম পিছিয়ে গেল। বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে ছেলেটার দিকে তাকাতেই দেখল, ছেলেটার হাতে একটা লাল গোলাপ। সে হাত বাড়িয়ে গোলাপটা রোদেলার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—“আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে পছন্দ করি, কিন্তু কখনো বলার সাহস পাইনি। প্রতিদিন আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে থাকি। তাই আজ এক বুক সাহস নিয়ে নিজের মনের কথাটা বলতে এসেছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভীষণ ভালোবাসি। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না রাইসা!”

ভালোবাসি' শব্দটা শুনেই রোদেলার মনের ভেতর যেন রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলতে শুরু করল। ও ভাবল, বাব্বাহ আজ দেখি লটারি লেগে গেছে! প্রথমে চিঠি, আর এখন সরাসরি প্রস্তাব। কিন্তু শেষ মুহূর্তে 'রাইসা' নামটা শুনেই রোদেলার মুখটা ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল। হৃদয়ের অন্তঃস্থলে যে প্রজাপতিরা উড়ছিল, তা এক নিমিষেই থেমে গেল।

কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তিথি আর রাইসা দুজনেই হাসতে লাগল। রোদেলা রাগে ছেলেটির হাতের গোলাপটা কেড়ে নিয়ে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিল। বিরক্ত হয়ে বলল,

—“বেয়াক্কাল লোক! রাইসা আর রোদেলাকে চেনে না, আসছে ঘোড়ার ডিমের প্রপোজ করতে!”

কথাগুলো বলেই রোদেলা হনহন করে সেখান থেকে চলে গেল। তিথি আর রাইসা হাসতে হাসতে রোদেলার পিছু পিছু এল। তিথি মজা করে বলল,

—“কিরে, আজকে কেমন লাগল? শেষ পর্যন্ত আজও ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যাকা হয়ে গেলি!”

রাইসাও তিথির সাথে তাল মিলিয়ে হাসতে লাগল।

রোদেলা ভীষণ বিরক্ত হলো। আসলে যখনই কেউ ওকে প্রপোজ করতে আসে, দেখা যায় সেই প্রপোজটা থাকে আসলে রাইসার জন্য। ওরা যমজ বোন হওয়ায় সহজে কেউ ওদের আলাদা করতে পারে না। রাইসার কপালের ডান পাশে একটা তিল আছে, যা দেখে চেনা যায় কে রাইসা আর কে রোদেলা। আর এই তিল না দেখেই সবাই ভুল করে রাইসা ভেবে রোদেলাকে প্রপোজ করে বসে।

পুরো রাস্তা জুড়ে তিথি আর রাইসা রোদেলাকে নিয়ে মজা করল। রোদেলা চুপচাপ সব সহ্য করল, কারণ ও এসবে এখন অভ্যস্ত। বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ওদের বিকেল পাঁচটা বেজে গেল।

চলবে_________

[ আজকের পর্ব কিন্তু ৩০০০+ শব্দ। পর্বটা আপনাদের কেমন লেগেছে কমেন্টে জানাবেন আর রিঅ্যাক্ট দিতে ভুলবেন না। ভুলগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]

26/03/2026

#হৃদয়ের_স্পন্দন_তুই
#তাসলিমা_তানজুম
#পর্ব -১৩

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]

রোদেলার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। ওর জানা সব দোয়া মনে মনে পড়ে নিজের বুকে ফুঁ দিয়ে নিল। তারপর খানিকটা ইতস্তত করে ঋদ্ধর বন্ধ দরজায় আলতো করে নক করল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে রোদেলা আরো দুবার নক করল।

খানিক বাদে ওপাশ থেকে ঋদ্ধর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

—“কে?”

রোদেলা আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল,

—“আ..আমি রো..রো.রোদেলা। আ..পনার জন্য খা..বার এনেছিলাম।”

—“আমি খাব না, চলে যাও এখান থেকে।” ওপাশ থেকে ঋদ্ধর নির্লিপ্তভাবে উত্তর এল।

ঋদ্ধর মুখ থেকে 'যাও এখান থেকে' শুনে রোদেলার খুব অভিমান হলো। এক মুহূর্তেই ওর কান্না পেয়ে গেল। মনে মনে ভাবল,
"ফুলগুলো ছিঁড়েছি বলে সবার সামনে ওভাবে অপমানিত হতে হলো, মা-বাবাও কত বকলেন! আর এখন ওনার জন্য এত কষ্ট করে খাবার নিয়ে এলাম, তাতেও কত দেমাগ! খাবে না তো না খাবে, আমার কী? না খেয়ে উপোস করে থাকুক সারারাত। ঘোড়ার ডিমের লোক একটা।"

ও ধুপ ধাপ পা ফেলে দরজার সামনে থেকে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু কয়েক পা যেতেই রোদেলার পা দুটো যেন আটকে গেল। ও মাঝপথে থমকে দাঁড়াল। চোখের সামনে ভেসে উঠল সকাল থেকে না খাওয়া ঋদ্ধর সেই ক্লান্ত মুখটা। বড় মা বলছিলেন, সে নাকি পার্টিতেও কিছু ছোঁয়নি। সারারাত এভাবে খালি পেটে থাকলে তো নির্ঘাত শরীর খারাপ করবে। লোকটা যতটাই রাগী হোক না কেন, ওনাকে এভাবে অভুক্ত রেখে ও নিজে কি শান্তিতে ঘুমাতে পারবে?

নিজের মনকে হাজার বুঝিয়েও রোদেলা আর সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোদেলা আবার ফিরে এল ঋদ্ধর বন্ধ দরজার সামনে। বন্ধ দরজার কপাটে কপাল ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে ডাকল,

—“শুনুন, আমি অনেক কষ্ট করে আপনার জন্য এই খাবার নিয়ে এসেছি। সকাল থেকে আপনি ঠিকঠাক কিছু খাননি। আপনি যদি এখন দরজা না খোলেন, আমি কিন্তু এখান থেকে এক পা-ও নড়ব না।”

ভেতর থেকে কয়েক মুহূর্ত কোনো সাড়া শব্দ পেল না।এক থমথমে নীরবতা দরজার ওপাশে। রোদেলা ভাবল, ঋদ্ধ কি তবে সত্যিই খুব বেশি রেগে আছে? নিস্তব্ধতা ভেঙে কিছুক্ষণ পর দরজাটা শব্দহীনভাবে খুলে গেল।

ঋদ্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক হাত দরজার চৌকাঠে রাখা, অন্য হাত পকেটে। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ও কিছুক্ষণ অনিমেষ দৃষ্টিতে রোদেলার দিকে তাকিয়ে রইল। রোদেলার এই জেদি মায়ামাখা চেহারাটা দেখে ঋদ্ধর রাগটা যেন মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল।

—“এখন কেন এসেছ? বলেছি তো আমার খিদে নেই,” ঋদ্ধর গলায় একরাশ ক্লান্তি।

রোদেলা এবার সরাসরি ঋদ্ধর চোখের দিকে তাকাল।
খাবারের ট্রে-টা শক্ত করে ধরে বলে উঠল,

—“খিদে নেই বললেই হলো? সকাল থেকে কিছু খাননি, দুপুরেও না। এখন দয়া করে একটু সরে দাঁড়ান, আমাকে ভেতরে যেতে দিন। আর নয়তো আমার হাতের এই ভারী ট্রে-টা আপনি ধরুন। দেখতেই তো পাচ্ছেন আমি আর এটা ধরে রাখতে পারছি না, আপনার মনে কি একটুও দয়া-মায়া নেই?”

ঋদ্ধ কিছুটা অবাক হয়ে রোদেলার মুখের দিকে তাকাল। ওর এই সোজাসাপ্টা অভিমানী কথা শুনে ঋদ্ধ আর না করতে পারল না। নিঃশব্দে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে রোদেলাকে ভেতরে আসার জায়গা করে দিল। রোদেলা বড়বড় পা ফেলে ঘরের ভেতরে ঢুকে টি-টেবিলে ট্রে-টা রাখল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,

—“নিজের শরীরের ওপর এভাবে রাগ দেখিয়ে কী লাভ? চুপচাপ খেয়ে নিন তো!”

রোদেলার এই শাসন মেশানো যত্নটুকু ঋদ্ধর ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য এলোমেলো করে দিল। দরজায় ওভাবেই দাঁড়িয়ে নিজের গাম্ভীর্য অটল রেখে কণ্ঠস্বরে কিছুটা কাঠিন্য ধরে রাখার চেষ্টা করল।

—“সব কটা রক্তজবা ছিঁড়ে এখন শাসন করতে এসেছ? তুমি তো জানোই ফুলগুলো আমার কতটা শখের ছিল। তবু কেন করলে এমনটা?”

রোদেলার মুখটা মুহূর্তেই ছোট হয়ে এল। ও অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আসলেও তো, ফুলগুলো ঋদ্ধর খুব প্রিয় ছিল — ভুলটা ও করেই ফেলেছে। কিন্তু পরক্ষণেই আগের দিনের সেই অপমানের কথা মনে পড়ে ওর চোখে জল এসে গেল। ও মাথা নিচু রেখেই ভাঙ্গা গলায় বলল,

—“এখানে আমার কী দোষ বলুন তো? আমাকে শুধু শুধু দোষ দেবেন না। আপনি আমার গায়ে হাত তুলেছিলেন বলেই তো আমি রাগের মাথায় ওসব করেছি। তখন আমার মনের ভেতর কতটা কষ্ট হচ্ছিল, সেটা কি একবারও ভেবে দেখেছেন? আপনি যদি গায়ে হাত না তুলতেন, তবে আমি কখনো আপনার শখের ফুলগুলো ছিঁড়তাম না। সব দোষ আপনার, আমার কোনো দোষ নেই!”

বলতে বলতে রোদেলার শেষ কথাগুলো যেন গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল। ও আর কথা বলতে পারল না। ঋদ্ধ কিছুটা হকচকিয়ে গেল রোদেলার এই পালটা যুক্তিতে।ঋদ্ধ একদমই আশা করেনি যে রোদেলা এভাবে নিজের জমানো কষ্টের কথাগুলো সরাসরি বলে দেবে। রোদেলার কাঁচুমাচু মুখ আর চোখের কোণে জমে থাকা জল দেখে ঋদ্ধর রাগটা মুহূর্তেই কেমন যেন মায়ায় বদলে গেল। স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রোদেলার দিকে। ভেতরকার কঠোরতাটুকু যেন এক নিমিষেই হালকা হয়ে এল। মনে মনে একটু হাসল, কিন্তু রোদেলা তাকাতেই মুখটা আবার শক্ত করে ফেলল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলল,

—“ঠিক আছে, বুঝলাম সব দোষ আমার। এখন চুপ করো। আমি খাব, তবে একটা শর্ত আছে।”

ঋদ্ধ চুপচাপ ধীর পায়ে সোফায় গিয়ে বসল। সামনের টেবিলের ওপর ল্যাপটপটা রেখে অফিসের কয়েকটা ফাইল ছড়িয়ে পাশে রাখল। একটা ফাইল উল্টেপাল্টে দেখার ভান করে এমন ভাব করল যেন ও ভীষণ ব্যস্ত। রোদেলা ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। ঋদ্ধর হঠাৎ এই ব্যস্ততা দেখে ও খানিকটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল,

—“শর্তটা কী, তা তো বললেন না?”

ঋদ্ধ ফাইলে দৃষ্টি স্থির রেখেই গম্ভীর গলায় বলল,

—“শর্ত একটাই। আমি এখন অফিসের খুব ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করছি, তাই হাত দিয়ে খেতে পারব না। তুমি আমাকে খাইয়ে দাও।”

রোদেলার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। ও যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না! খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে ও ঋদ্ধর হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমি খাইয়ে দেব মানে? আপনার হাত দুটোতে কী হয়েছে শুনি? ফোস্কা পড়েছে নাকি? নিজের হাত দিয়ে খেতে পারেন না? শখ কত, আমাকে বলছেন খাইয়ে দেওয়ার জন্য, এ্যাঁ!”

ঋদ্ধ হাতের ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে রোদেলার দিকে একবার শান্ত চোখে তাকাল। তারপর ল্যাপটপটা পায়ের উপর রেখে কিবোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতে খুব নির্বিকার গলায় বলল,

—“ফোস্কা পড়েনি, তবে দেখতেই তো পাচ্ছ হাত দিয়ে খুব ইম্পর্টেন্ট কাজ করছি। এখন কাজ ফেলে উঠতে গেলে সব এলোমেলো হয়ে যাবে। তুমি যদি খাইয়ে দিতে পারো, তবেই আমি খাব। আর না পারলে এই খাবার নিয়ে চলে যেতে পারো।”

ঋদ্ধর কথা শুনে রোদেলা এক মুহূর্ত ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বেশ কড়া গলায় বলল,

—“অফিসের কাজে আপনার হাত দুটো এতই যদি ব্যস্ত থাকে, তবে তো একটা বিয়ে করলেই পারেন! আপনি আরাম করে বসে ল্যাপটপে কাজ করবেন, আর আপনার গুণবতী বউ আপনাকে পাশে বসে যত্ন করে খাইয়ে দেবে। আমার ওপর কেন হুকুম চালাচ্ছেন শুনি?”

বিয়ের কথা শুনে ঋদ্ধর ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু রোদেলা খেয়াল করার আগেই সেই হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে মুখে আগের মতো গাম্ভীর্য ফিরে এল। ঋদ্ধ এবার ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে খুব নিষ্পৃহ গলায় বলল,

—“বিয়ে তো করবই, কিন্তু এখন তো আর কনে খুঁজতে বের হতে পারছি না। আপাতত তো তুমিই আছ, তো খাইয়ে দেবে নাকি আমি না খেয়েই থাকব?”

ঋদ্ধর শেষ কথাটা শুনে রোদেলার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। এক অজানা শিহরণে ও কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে রইল। 'আপাতত তুমিই আছ' -এই সামান্য কয়েকটা শব্দ কেন যেন ওর বুকের ভেতরটা ওলটপালট করে দিচ্ছে। লোকটা কি হুটহাট এমন কথা বলে ওকে অপ্রস্তুত করে দিতে খুব আনন্দ পায়?

রোদেলা নিজের ভেতরের এই অদ্ভুত অস্থিরতাটা সামলে নিল। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে প্লেটটা নিয়ে ও ঋদ্ধর পাশেই সোফায় একটু জায়গা করে বসল। ছোট এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে তাতে খানিকটা সবজি ভাজি মেখে ও ঋদ্ধর মুখের সামনে ধরল।
একটু বিরক্তির সুরে বলল,

—“অফিস থেকে ফেরার পরও কি এভাবে কাজ নিয়ে পড়ে থাকতে হয়? আপনি কি কাজ ছাড়া দুনিয়াতে আর কিছুই ইম্পরট্যান্ট মনে করেন না? এই নিন, মুখ হা করুন আর আমাকে উদ্ধার করুন তো।”

ঋদ্ধ ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকেই মুখটা একটু হাঁ করল। রোদেলার এমন আদুরে শাসন শুনে ওর ঠোঁটের কোণে আপনাআপনিই হাসি ফুটে উঠল।ঋদ্ধ মুখ টিপে সেই হাসিটা লুকানোর চেষ্টা করল, রোদেলার এই মিষ্টি বকবকানিটা ঋদ্ধ’র বেশ ভালোই লাগছে।

রোদেলা যখনই প্রথম রুটির টুকরোটা ওর মুখে তুলে দিল, ওর আঙুলগুলো আলতো করে ঋদ্ধর ঠোঁট স্পর্শ করে গেল। ওই প্রথম ছোঁয়াটুকুতেই ঋদ্ধর বুকের ভেতরটা হুট করে কেঁপে উঠল। এক ধরণের তীব্র ভালো লাগা যেমন ওকে ঘিরে ধরছে, তেমনই এক অজানা অস্থিরতাও কাজ করছে ওর ভেতরে। ওর নিজেরই হঠাৎ খুব গরম লাগতে শুরু করল। কপালে ছোট ছোট বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠছে। প্রতিটা ছোঁয়ায় নিজেকে সামলানোটা এখন ওর জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে।

নিজের ভেতরের এই হুট করে আসা অস্বস্তিটা লুকানোর জন্যই ঋদ্ধ ল্যাপটপের স্ক্রিনে একমনে কাজ করে যাওয়ার ভান করছে। রোদেলা একেকটা টুকরো মুখে তুলে ধরলে ঋদ্ধ বাধ্য ছেলের মতো সেগুলো মুখে পুরে নিচ্ছে। রোদেলাও কেমন জানি একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল। কেন যে বারবার ওর আঙুলগুলো ঋদ্ধর ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে আর কেনই বা ওর ভেতরটা এমন ওলটপালট করছে, ও নিজেও সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এই ঘোরের মধ্যেই আবার রুটির একটা টুকরো ছিঁড়ে তাতে ভাজি মাখাতে শুরু করল। এবার খানিকটা বিস্ময় নিয়ে বলল,

—“আচ্ছা, এই দুটো রুটি আর সামান্য একটু ভাজি খেয়ে আপনি সারারাত কাটিয়ে দেন কীভাবে, বলুন তো? আপনার শরীর কি একবারও দুর্বল লাগে না? এই ডায়েটের চক্করে পড়ে তো আপনি নিজেকে শেষ করে দিচ্ছেন!”

রোদেলার এই একটানা বকবকানিটা ওর শুনতে মোটেও খারাপ লাগছে না, বরং বেশ মন দিয়েই শুনছে। প্লেটের শেষ রুটির টুকরোটা ঋদ্ধর মুখে তুলে দিয়ে রোদেলা অবাক হয়ে বলল,

—“আচ্ছা, মানুষ কি এত কম খেয়ে বেঁচে থাকে? আপনার এই খাওয়া দেখলেই তো আমার উল্টো খিদে পেয়ে যায়। এই সামান্য খেয়ে সারারাত পার করে দেন কীভাবে? আপনি কি আসলে মানুষ, নাকি অন্য কিছু?”

রোদেলা প্লেটটা পাশে রেখে গ্লাসের পানিটুকু ঋদ্ধর দিকে এগিয়ে দিল। গ্লাসটা ধরার সময় ও ঋদ্ধর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু থমকে গেল। এসি চলছে, ঘরটা বেশ ঠান্ডাই হয়ে আছে, অথচ ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ঋদ্ধর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।

রোদেলা ভ্রু কুঁচকে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

—“এই এসি চলছে, ঘরটা কত ঠান্ডা! অথচ আপনি এমন ঘামছেন কেন? শরীর কি খারাপ লাগছে আপনার?”

ঋদ্ধ এক চুমুকে গ্লাসের অর্ধেকটা পানি খেয়ে নিল। রোদেলার প্রশ্নে ও ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। নিজের ভেতরের সেই তোলপাড় করা অস্থিরতাটা ও কীভাবে লুকাবে? ও গ্লাসটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে খুব স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,

—“না না, শরীর ঠিকই আছে। হঠাৎ করে একটু কেমন জানি গরম লাগছে, মনে হয় প্রেশারটা একটু ওঠানামা করছে। তুমি অত ভেবো না তো।”

ঋদ্ধর প্রেশার আপ-ডাউনের কথা শুনে রোদেলার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। ও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আলতো করে হাত বাড়িয়ে ঋদ্ধর কপালে তাপমাত্রা দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু হাতটা কপাল ছোঁয়ার আগেই ঋদ্ধ ঝট করে রোদেলার হাত ধরে ফেলল। ঋদ্ধর এমন আকস্মিক বাধায় রোদেলা কিছুটা হকচকিয়ে গেল। ও বেশ বুঝতে পারছে, ঋদ্ধর হাতের তালুটা অস্বাভাবিক রকমের গরম।

ঋদ্ধ কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ধরা গলায় বলল,

—“রোদ, বললাম তো আমি ঠিক আছি। প্লিজ, এখন তুমি এখান থেকে যাও। অনেক রাত হয়েছে, এবার তুমি গিয়ে ঘুমাও। আমার আরও কিছু কাজ বাকি আছে, সেগুলো শেষ করতে অনেক দেরি হবে।”

রোদেলা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে ঋদ্ধর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটার এমন হুট করে পাল্টে যাওয়া আচরণ ও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ঋদ্ধর চোখেমুখে এক ধরণের অস্থিরতা স্পষ্ট, যা রোদেলাকে বেশ বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে। রোদেলা প্লেটটা হাতে তুলে নিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

—“আচ্ছা ঠিক আছে, যাচ্ছি। কিন্তু শরীর বেশি খারাপ লাগলে বড় আম্মুকে কিন্তু অবশ্যই জানাবেন।”

ঋদ্ধ কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ালো। রোদেলা চলে যেতেই ঋদ্ধ পায়ের ওপর থেকে ল্যাপটপটা সরিয়ে রেখে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ও নিজের কপালে হাত রাখল। কপালটা তখনও ঘামে ভিজে আছে। ঋদ্ধর হৃদস্পন্দন যেন কিছুতেই স্বাভাবিক হতে চাইছে না।

চলবে__________

[ আজকের পর্বটি সাজাতে গিয়ে আমি নিজেই ভীষণ দোটানায় পড়েছি। মনের মতো করতে গিয়ে কয়েকবার লিখেছি আবার কেটেছি। গল্পের প্রয়োজনে কিছু দৃশ্য বা কথা যেভাবে লিখেছি, তা আপনাদের কাছে কেমন লাগবে বা বেশি কিছু মনে হবে কি না — তা নিয়ে একটু সংশয়ে আছি।
আসলে আপনাদের জন্য সুন্দর কিছু লিখতে গিয়ে এই খুঁতখুঁতে স্বভাবটা চলে আসে। আপনাদের একটুখানি মতামত পেলে আমার এই দ্বিধাটুকু কেটে যাবে। আপনাদের মূল্যবান মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।]

23/03/2026

#হৃদয়ের_স্পন্দন_তুই
#তাসলিমা_তানজুম
#পর্ব-১২

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]

ক্লাস শেষ করে ঋদ্ধ দ্রুত পায়ে পার্কিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল। সরাসরি অফিসে যেতে হবে, হাতে একদম সময় নেই। সকাল ১১টার মিটিংটা আসাদ শিকদারের বিশেষ অনুরোধে পিছিয়ে দুপুর ৩:৩০ এ দেওয়া হয়েছে, তাই ওকে এই অসময়েই ছুটতে হচ্ছে। ঋদ্ধ তড়িঘড়ি করে গাড়িতে গিয়ে বসল।

শহরের জ্যাম পেরিয়ে ঋদ্ধ যখন অফিসের সামনে পৌঁছাল, তখন ঘড়ির কাঁটা সাড়ে তিনটার ঘর ছুঁইছুঁই।
গাড়ি থেকে নেমে ব্লেজারটা গায়ে জড়িয়ে লিফটে উঠে সরাসরি কনফারেন্স রুমের দিকে হাঁটা দিল। ভেতরে সবাই ওর জন্যই অপেক্ষা করছিল।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল সবাই ইতিমধ্যে উপস্থিত। জাহিদ শিকদার গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তাঁর পাশেই ফারুক শিকদার, আসাদ শিকদার আর সাদমান বসে আছে। টেবিলের অপর পাশে ক্লায়েন্টরা অপেক্ষা করছেন। ঋদ্ধ ভেতরে আসতেই সবার নজর ওর দিকে স্থির হলো।

ঋদ্ধ নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় বসে ল্যাপটপটা ওপেন করতে করতে ঋদ্ধ শান্ত গলায় বলল,

—“অপেক্ষা করানোর জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। চলুন, আর দেরি না করে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।”

আসাদ শিকদার মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। জাহিদ শিকদার ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে ইশারায় শুরু করতে বললেন। ক্লায়েন্টদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলেন, “অবশ্যই মি: ঋদ্ধ , আমরাও তৈরি।”
:
:
মিটিং শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। প্রেজেন্টেশন শেষে জাহিদ শিকদার আর ফারুক শিকদার কাজের তাগিদে দ্রুত নিজেদের কেবিনের দিকে চলে গেলেন। কিছু সময় পর সাদমান ও চলে গেল। কিন্তু আসাদ শিকদার এখনো নিজের চেয়ারে স্থির হয়ে বসে আছেন। ঋদ্ধ ফাইলগুলো গুছিয়ে ল্যাপটপটা ব্যাগে ভরছে।

আসাদ শিকদার হাতঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

—“আজকের প্রেজেন্টেশনটা বেশ ভালো ছিল ঋদ্ধ। তবে তোমার চেহারায় ক্লান্তি ছাপিয়ে আজ অন্য কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। সব ঠিক আছে তো?”

ঋদ্ধ ফাইল গোছানো থামিয়ে চাচার দিকে তাকাল। ঋদ্ধ নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রেখে উত্তর দিল,

—“জি চাচ্চু, সব ঠিক আছে। আসলে ভার্সিটি থেকে সরাসরি এখানে আসা, তাই একটু ক্লান্ত বোধ করছি।”

আসাদ শিকদার কিছু সময় চুপ থেকে আবার ও বললেন,
—“শুধু কি ক্লান্তি? তোর চোখের ভাষা কিন্তু বলছে তুই অন্য কিছু নিয়ে ভাবছিস।”

ঋদ্ধ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। শান্ত গলায় বলল,

—“না চাচ্চু, তেমন কিছু না। প্রজেক্ট নিয়ে একটু বেশি চিন্তিত ছিলাম, তাই হয়তো আমাকে দেখে আপনার এমন মনে হচ্ছে। আপনি না থাকলে তো আজকের মিটিংটাই হতো না, ধন্যবাদ সময়টা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য।”

আসাদ শিকদার এবার প্রাণ খুলে হাসলেন। তিনি ঋদ্ধর কাঁধে হাত রেখে বললেন,

—“আরে পাগল, তোর জন্যই তো করা। শোন, কাজ তো চলতেই থাকবে, মাঝে মাঝে নিজের জন্যও একটু সময় দিস। যা এখন, একটু ফ্রেশ হয়ে বাড়ি যা।”

ঋদ্ধ ও হালকা হেসে আসাদ শিকদারের কাছ থেকে বিদায় নিল।

মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে ঋদ্ধ সরাসরি লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার পথেই সাদমানকে ফোন দিয়ে নিচে আসতে বলল। ঋদ্ধ পার্কিং লটে নিজের গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই দেখল সাদমান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে।

সাদমানকে দেখেই ঋদ্ধ হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল,

—“তাড়াতাড়ি কর, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন আরও দেরি করে পৌঁছালে ওরা কিন্তু ভীষণ রেগে যাবে। আর ওদের রাগের কথা তো তোর জানাই আছে!”

সাদমান খানিকটা হাঁপাতে হাঁপাতে গাড়ির দরজা খুলে পাশে বসল। ও একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,

—“আরে ভাই, বড় আব্বুকে সব ফাইলগুলো গুছিয়ে আসতে একটু তো সময় লাগল। আর তুমি দেরি নিয়ে এত ভাবছ কেন? দেরি তো তুমি করেছ, তাই ওরা তোমাকেই আচ্ছা করে ধোলাই দেবে, আমার কী! তোমাকে পচানোর দৃশ্যটা দেখার জন্য আমি অধীর আগ্রহে বসে আছি। চলো এখন, আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত গাড়ি চালাও।”

সাদমানের কথা শেষ হতে না হতেই ঋদ্ধ হঠাত্‍ স্থির হয়ে গেল। ও গাড়ি স্টার্ট না দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি সাদমানের চোখের দিকে তাকাল। ঋদ্ধর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে সাদমান শুকনো ঢোক গিলল। ঋদ্ধ কোনো কথা না বলে কেবল শান্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।

ঋদ্ধর এই আচমকা গম্ভীর আর তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে সাদমান ভয়ে চুপসে গেল। তার মনে হলো মজাটা বোধহয় একটু বেশিই হয়ে গেছে। আমতা আমতা করে হাতের ইশারায় বলল,

—“আরে... এভাবে তাকাচ্ছ কেন? আমি তো জাস্ট মজা করছিলাম। ঠিক আছে ভাই, সরি! আর এক শব্দও বলব না। এবার অন্তত গাড়িটা ছাড়ো, সত্যি দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

সাদমানের ভয়ার্ত মুখ দেখে ঋদ্ধর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। লম্বা শ্বাস ফেলে গাড়ি স্টার্ট দিল।
:
পার্টিতে পৌঁছাতেই উচ্চশব্দের মিউজিক ঋদ্ধর কানে এল। ও এমনিতে এসব কোলাহল খুব একটা পছন্দ করে না, কিন্তু বন্ধুর জন্মদিন বলে না এসে উপায় ছিল না।

পার্টিটা হচ্ছিল শহরের নামী রেস্টুরেন্ট 'স্কাই ভিউ'-এর রুফটপে। এই জায়গাটা ওদের বন্ধুদের আড্ডার প্রিয় ঠিকানা। ছাদটা আজ খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে নীল আর সাদা বেলুন দিয়ে। বন্ধুদের কলরবে পুরো পরিবেশটা উৎসবমুখর।

ঋদ্ধ ভেতরে পা রাখতেই আদিব এগিয়ে এল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ও কিছুটা অভিমানী সুরে বলল,

—“কিরে! তোদের কি আসার সময় হলো? আজ জয়ের জন্মদিন, আর তোরা আসলি একদম শেষ মুহূর্তে! আমরা তো ভেবেছিলাম তোরা আসবিই না।”

সাদমান আদিবের কাঁধে হাত রেখে কিছুটা কাঁচুমাচু মুখে বলল,

—“আরে আদিব ব্রো, অফিস থেকে বের হতেই জান বেরিয়ে গেছে। বড় আব্বুকে সব ফাইল বুঝিয়ে দিয়ে আসতে একটু দেরি তো হবেই।”

বলেই ও আদিবের একটু কাছে গিয়ে গলার স্বর নিচু করে কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলল,

—“আসলে ঋদ্ধ ভাইয়ার জন্যই দেরিটা হলো। আমাকে দিয়ে একগাদা ফাইল গুছিয়ে নিল, তারপর ওসব নিয়ে বড় চাচ্চুর কাছে পাঠাল। ওসব সামলাতেই তো সময় শেষ! এখন আমার ওপর রাগ করে লাভ নেই ব্রো, সব দোষ তো ওই বসের!”

সাদমানের এমন ভঙ্গি দেখে আদিব হেসেই ফেলল। ও জানে সাদমান সুযোগ পেলেই ঋদ্ধর ওপর দোষ চাপিয়ে মজা নিতে পছন্দ করে।

জয় তখন কেক কাটার টেবিলের সামনে বন্ধুদের ঘেরাও হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঋদ্ধকে দেখে ও এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল,

—“আমি তো ভেবেছিলাম তোরা বুঝি আজ অফিসেই রাত কাটিয়ে দিবি। যাক গে, এসেছিস এটাই বড় কথা। চল, আর দেরি নয়, আগে কেকটা কাটা যাক।”

জয়ের কথা শেষ হতে না হতেই ঋদ্ধ কিছুটা নিস্পৃহ ভঙ্গিতে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল। বন্ধুদের হইহুল্লোড় আর চারপাশের উৎসবমুখর পরিবেশের মাঝেও ওর চেহারার গাম্ভীর্য বিন্দুমাত্র কমল না। ও ধীরস্থির কণ্ঠে জয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,

—“হাতে একদম সময় নেই জয়। জরুরি কিছু কাজ বাকি আছে, তাই বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব হবে না। তুই বরং আর দেরি না করে দ্রুত কেক কাটার ব্যবস্থা কর। আমি কেকটা কেটেই বেরিয়ে পড়ব।”

ঋদ্ধর স্পষ্ট আর সটান কথায় জয়ের মুখের হাসিটা কিছুটা ম্লান হলেও ও জানে ঋদ্ধর ব্যক্তিত্ব এমনই।
জয় ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে জোর গলায় ডাক দিল,

—“সবাই এদিকে আয়! ঋদ্ধর তাড়া আছে, কেকটা এখনই কাটব।”

মুহূর্তের মধ্যেই সবাই কেক কাটার টেবিল ঘিরে ধরল। মোমবাতি জ্বালিয়ে, চারিদিকের কোলাহল ছাপিয়ে বন্ধুরা সমস্বরে গেয়ে উঠল,

‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’

জয়ের কেক কাটা শেষ হতেই হইহুল্লোড় আর ছবি তোলার ধুম পড়ে গেল। সাদমান এর মধ্যে আদিবের সাথে মিলে বেশ কয়েকটা সেলফি তুলে ফেলল।

সবাই যখন হাসাহাসি আর ছবি তোলায় মেতে আছে, ঋদ্ধ তখন ধীরপায়ে জয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে একটা ছোট গিফট বক্স বের করে জয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল,

—“শুভ জন্মদিন বন্ধু। ভালো থাকিস। আমার একটু তাড়া আছে, আজ আসি।”

জয় কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ঋদ্ধ ওর কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এল। সাদমান তখন আদিবের সাথে কথা বলছিল, ঋদ্ধকে বেরোতে দেখে ও-ও তড়িঘড়ি করে আদিবের কাছ থেকে বিদায় নিল।

—“আসি রে আদিব ব্রো, বস তো বের হয়ে গেল! কাল কথা হবে।”

ঋদ্ধ আর সাদমানকে লিফটের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে আদিব গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে রইল। ওদের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ও কিছুটা বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে বলল,

—“শালা নিজে তো আনন্দ করবেই না, সাথে যাকে নিয়ে এসেছে তাকেও শান্তি দেবে না। আস্ত একটা রোবট কোথাকার!”

আদিবের গলার স্বরে ক্ষোভের চেয়েও বেশি ছিল এক ধরনের অসহায়ত্ব। ও জানে ঋদ্ধর এই এমন গাম্ভীর্য ভাঙা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। পাশ থেকে জয় এসে ওর কাঁধে হাত রাখতেই আদিব একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বন্ধুদের আড্ডায় ফিরে গেল।

শহরের নিস্তব্ধ রাস্তা দিয়ে গাড়িটা দ্রুতগতিতে ছুটছে। সাদমান সিটে হেলান দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঋদ্ধর নির্লিপ্ত মুখটার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে ও আর চুপ থাকতে পারল না।

—“পার্টিতে আরেকটু সময় থাকলে কী এমন ক্ষতি হতো ভাইয়া?” সাদমানের গলায় স্পষ্ট আক্ষেপ।

সাদমানের কথা শুনেও ঋদ্ধ একদম নির্বিকার। যেন ও কিছু শুনতেই পায়নি, তার নজর সামনের রাস্তার দিকে স্থির। সাদমান থামল না, ঋদ্ধর দিকে সরাসরি তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,

—“পার্টিতে আরেকটু সময় থাকলে কী এমন ক্ষতি হতো ভাইয়া? ভার্সিটি থেকে সরাসরি মিটিংয়ে ছুটলে, ওভাবে খালি পেটে প্রেজেন্টেশন দিলে। দুপুরে একটা দানাও পেটে পড়ল না তোমার। ভাবলাম পার্টিতে গিয়ে অন্তত দুজনে একটু শান্তিতে খাব, অথচ তোমার জন্য ওখানেও কিছু ছোঁয়া হলো না। তুমি নিজের শরীরের ওপর যে পরিমাণ জুলুম করো, এটা কি ঠিক?”

সাদমান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে জানালার ওপাশে মুখ ফিরিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

—“আমার কথা তো ছেড়েই দাও, তোমার সাথে থাকলে আমার কপালেও খাবার জোটে না। কাচ্চি বিরিয়ানির কী চমৎকার সুগন্ধ বেরোচ্ছিল, ইশ! এক লোকমাও মুখে দিতে পারলাম না তোমার জন্য!”

সাদমানের এই করুণ আর্তনাদেও ঋদ্ধ একদম নির্বিকার। এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে ও খুব স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। সাদমানের অভিযোগ শুনে ও কেবল নিস্পৃহ গলায় বলল,

—“কাজের চেয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি তোর কাছে বড় হয়ে গেল সাদমান?”

—“আরে ভাই, পেট শান্ত না থাকলে কাজ হবে কী করে? তুমি তো মানুষ না, আস্ত একটা রোবট!”

সাদমানের কথা শুনে ঋদ্ধর ঠোঁটের কোণে মুহূর্তের জন্য খুব সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল।
:
:
গাড়িটা বাড়ির সদর গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। গ্যারেজে গাড়ি পার্ক করে ঋদ্ধ আর সাদমান যখন মূল দরজার সামনে দাঁড়াল, ঘড়ির কাঁটা তখন দশটা ছুঁইছুঁই। সাদমান কলিং বেলে চাপতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই সুরাইয়া বেগম দরজা খুলে দিলেন। তাঁর চোখেমুখে কিছুটা উদ্বেগের ছাপ। ওদের দেখেই তিনি খানিকটা অভিযোগের সুরে বললেন,

—“তোদের তো নয়টার মধ্যে ফেরার কথা ছিল! এখন দশটা বাজে । এত দেরি হলো কেন?”

ঋদ্ধ নির্লিপ্ত গলায় বলল, “পার্টিতে ছিলাম আম্মু, তাই দেরি হলো।”

কথাটুকু বলেই ও আর দাঁড়াল না, বড়বড় পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।

সাদমান একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুরাইয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে করুণ সুরে বলল,

—“বড় আম্মু, তোমার ছেলের পাল্লায় পড়ে আজ পার্টিতে আমার পেটে এক টুকরো কেক ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে, জলদি কিছু খেতে দাও।”

সুরাইয়া বেগম হেসে ফেললেন। সাদমানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

—“আচ্ছা বাবা, তুই হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়, আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।”

এদিকে ঋদ্ধ রুমে ঢুকে ব্লেজারটা খুলে বিছানায় ছুড়ে ফেলল। আলমারি থেকে একটা ছাই রঙের ট্রাউজার আর কালো রঙের টি-শার্ট বের করল। এরপর ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এল। সারা দিনের ক্লান্তি যেন শরীর জুড়ে জেঁকে বসেছে। ফ্রেশ হয়ে এসে একটু ঠান্ডা বাতাসের আশায় পা বাড়াল ছাদের দিকে। রাতের ছাদটা এখন বেশ শান্ত, কিন্তু বাগানের দিকে এগোতেই নজর আটকে গেল শখের রক্তজবা গাছটার ওপর। মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে এল। আজ ভোরবেলাও যে ডালটাতে অনেকগুলো টকটকে লাল ফুল ফুটে ছিল, সেই জায়গাটা এখন শূন্য।

গাছগুলোর প্রতি ঋদ্ধর টানটা বরাবরই একটু অন্যরকম। নিজের হাতে যত্ন করা এই শখের জিনিসগুলোর ওপর সামান্যতম অযত্ন বা কারো খামখেয়ালি ও কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। মুহূর্তেই ওর শান্ত চোখের দৃষ্টি বদলে গেল, দীর্ঘদিনের জমে থাকা গাম্ভীর্য ছাপিয়ে এক লহমায় তীব্র বিরক্তি আর রাগ ফুটে উঠল ওর পৌরুষদীপ্ত মুখাবয়বে। নিস্তব্ধ ছাদের বুক চিরে ওর গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো

—“আমার গাছের ফুল কে ছিঁড়েছে? কার এত বড় সাহস!”

ঋদ্ধর এমন চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম, মিলি বেগম আর শায়লা বেগম হন্তদন্ত হয়ে ছাদে ছুটে এলেন। তাঁরা আগে থেকেই জানতেন কেউ একজন ফুল ছিঁড়েছে, কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খোলেননি। ঋদ্ধর রাগী চেহারা দেখে সবাই চুপসে গেলেন। জাহিদ শিকদার, ফারুক শিকদার ও আসাদ শিকদার ছাদে ছুটে আসলেন।
একে একে বাড়ির প্রত্যেকেই ছাদে এসে উপস্থিত হল।

ঋদ্ধ দাঁতে দাঁত চেপে আবার জিজ্ঞেস করল, “আমি জানতে চাই, ফুলগুলো কে নিয়েছে?”

ঋদ্ধর কথা শুনে বাড়ির তিন কর্তা রক্ত জবা গাছের দিকে তাকালেন তা দেখে তাদের চোখ কপালে। তারা কালকেও গাছ ভর্তি জবা ফুল দেখেছিল। আর এখন কাছে একটা ফুল ও নেই।

সবাই যখন নীরব, তখন ফারজানা হুট করে বলে উঠল,
—“ফুল আর কে ছিঁড়বে? রোদেলাই ছিঁড়েছে!”

মুহূর্তেই সবার নজর গিয়ে পড়ল রাইসার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা রোদেলার ওপর। ভয়ে ওর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। শুকনো ঢোক গিলে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইছে। ভয়ে রোদেলার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।

ফারজানার মুখে রোদেলার নাম শুনে ঋদ্ধর চোখেমুখের সেই প্রলয়ংকরী রাগ মুহূর্তেই রূপ নিল এক গভীর শীতলতায়। ও কেবল এক পলক রোদেলার ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল—

—“ওহ!”

বলেই ও আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, গটগট করে ছাদ থেকে নেমে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ঋদ্ধর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে জাহিদ শিকদার গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন—

—“ফুলটা কি তুমিই ছিঁড়েছ রোদেলা?”

রোদেলা চুপচাপ শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ফারজানা আবার ফোড়ন কাটল,

—“দেখুন বড় আব্বু, ও কেমন ভয় পাচ্ছে। ওকে দেখলেই তো বোঝা যাচ্ছে কাজটা ওই করেছে।”

আসাদ শিকদার নিজের মেয়ের এই কাণ্ড দেখে ভীষণ বিরক্ত হলেন। রোদেলার ওপর রাগ করে তিনি বেশ কড়া গলায় বললেন,

—“রোদেলা, অন্যের শখের জিনিসের ওপর হাত দেওয়া যে ঠিক না, এই কাণ্ডজ্ঞানটুকু কি তোমার কোনোদিন হবে না? শুধু শুধু ওর মেজাজটা খারাপ করলে! যাও এখন রাইসার সাথে রুমে যাও। ভবিষ্যতে যেন এমন ভুল আর কোনোদিন না হয়।”

আসাদ শিকদার গটগট করে ছাদ থেকে নেমে যেতেই মিলি বেগম এগিয়ে এলেন। এতক্ষণ তিনি চুপ করে থাকলেও এবার রোদেলার দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে লাগলেন। রাইসার হাত থেকে রোদেলার হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বেশ কড়া গলায় বললেন,

—“তোর কি বুদ্ধিশুদ্ধি কোনোদিন হবে না রোদেলা? ছেলেটার অত শখের গাছের ফুল তুই কেন ছিঁড়তে গেলি? এই ফুল ছিঁড়ে তোর কী এমন লাভ হলো শুনি? শুধু শুধু ওর মেজাজটা বিগড়ে দিলি! যা এখন এখান থেকে, নিজের রুমে গিয়ে চুপ করে বসে থাক।”

ফারজানা আড়চোখে রোদেলার অবস্থা দেখে মনে মনে হাসল। কিন্তু ঋদ্ধকে এবভাবে চুপচাপ চলে যেত দেখে ও কিছুটা অসন্তুষ্ট হলো। ভেবেছিল ঋদ্ধ হয়তো রোদেলাকে ইচ্ছামত বকাঝকা করবে। কিন্তু ঋদ্ধ তো একদম কিছু না বলেই চলে গেল। পাশ থেকে সুরাইয়া বেগম রাইসাকে ইশারায় বললেন রোদেলাকে নিয়ে যেতে। রাইসা রোদেলাকে আগলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। নামার সময় সুরাইয়া বেগম আর জাহিদ শিকদারের কথোপকথন ওদের কানে এল। জাহিদ শিকদার নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করছিলেন,

—“ঋদ্ধ কখন আসল?”

সুরাইয়া বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—“এই তো কিছুক্ষণ আগে। সাদমান বলল ও দুপুরেও নাকি কিছু খায়নি। পার্টিতে গিয়েও এক পিস কেক ছাড়া আর কিছুই মুখে তোলেনি। ভেবেছিলাম বাড়িতে এসে অন্তত শান্তিতে খাবে, কিন্তু এখন যা দেখলাম — তাতে মনে হয় না ও কিছু ছোঁবে।”

কথাটা কানে যেতেই রোদেলা মাঝপথেই থমকে দাঁড়াল। রাইসাকে উদ্দেশ্য করে ও ফিসফিসিয়ে বলল,

—“তুই রুমে যা, আমি একটু আসছি।”

—“এখন আবার কোথায় যাবি?” রাইসা অবাক হয়ে ওর হাত টেনে ধরল।

—“আরে আসছি তো, তুই যা!”

বলেই রোদেলা হাত ছাড়িয়ে দ্রুতপায়ে নিচে নেমে গেল। রাইসা ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করল,

—“মেয়েটা আস্ত একটা পাগল!”

নিচে রান্নাঘরে গিয়ে রোদেলা খুব সাবধানে ঋদ্ধর জন্য খাবার বাড়ল। প্লেটে দুটো রুটি আর সামান্য সবজি ভাজি সুন্দর করে সাজিয়ে নিল। তারপর একটি ট্রেতে গ্লাস ভর্তি জল আর খাবারের প্লেটটা নিয়ে ধীরপায়ে ঋদ্ধর রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

চলবে________

[ আপনাদের কি 'হৃদয়ের স্পন্দন তুই' গল্পটা আর ভালো লাগছে না? লাইক - কমেন্ট এত কম কেন ! গত দুই পর্বে ২০০ রিয়েক্টও হয়নি। যদি এই পর্বেও লাইক কমেন্ট কম হয় তাহলে আমি এ সপ্তাহে গল্প দিবো না।]

Address

Gazipur

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Blogger Api posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share