13/12/2025
ভারতীয় লোককথার অদ্ভুত জীব
পর্ব ১: সুন্দরবনের বাঘা-মানুষ
অভিষেক মিত্র
ভারত আর বাংলাদেশের বিস্তৃত সুন্দরবন অরণ্যের লোকবিশ্বাসে অন্যতম আলোচিত সংকর প্রাণী হল বাঘা-মানুষ, বা “বাঘ-মানুষ”। স্থানীয় মৎসজীবী, বাওালী আর মৌয়াল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে প্রচলিত আছে এই কাহিনী। এরা হল সেই সম্প্রদায়ের মানুষ যারা প্রায় প্রতিদিনই বাঘের রাজ্যে প্রবেশ করে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য। লিখিত নথিতে এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ফ্রান্সিস বুচ্যানন-হ্যামিলটনের Account of the District of Jessore (১৮১৬) গ্রন্থে। এই গ্রন্থের একটি অধ্যয়ে তিনি উল্লেখ করেছিলেন স্থানীয় মানুষদের লোকবিশ্বাসের কথা। সেখানে এই প্রাণীকে বর্ণনা করা হয়েছিল এক “আধা মানুষ আধা বাঘ আকৃতির ছায়াসঙ্গী প্রাণী” হিসেবে। পরে ব্রিটিশ অফিসার ই.জি. ম্যান তাঁর প্রবন্ধ Notes on the Sandarbans (জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল, ১৮৬৭)-এ একই ধরনের কাহিনি নথিবদ্ধ করেন। এই দুটি নথিকেই বাঘা-মানুষ সম্পর্কিত প্রাচীনতম লিখিত উল্লেখ বলে ধরে নেওয়া হয়।
রায়মঙ্গল, মাতলা আর বিদ্যাধরী নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোর লোককথায় পাওয়া যায় এই প্রাণীর উৎস কাহিনী। প্রচলিত সেই কাহিনী অনুযায়ী, বাঘা-মানুষ একসময় ছিল এক সাধারণ মানুষ। একদিন অরণ্যের মধ্যে শিকার করার সময় সে এক বাঘিনীর বাচ্চাকে হত্যা করে। আর সেই কারনেই তার উপর নেমে আসে এক ভয়াবহ অভিশাপ। শ্রী দিনেশচন্দ্র সেন তাঁর Eastern Bengal Ballads (১৯২৩) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছিলেন বসিরহাট অঞ্চলের এক প্রাচীন কিংবদন্তিকে। সেই কাহিনীতে বলা হয় যে বনমালি নামক এক শিকারী ইচ্ছাকৃত অরণ্যের নিয়মকে উলঙ্ঘন করে। আর সেই কারণে ক্রুদ্ধ হন বাঘের রক্ষক আত্মারা। সেই আত্মাদের অভিশাপে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে তাঁর শরীর। প্রথমে তার ত্বকে ফুটে ওঠে বাঘের মতো ডোরা দাগ, তারপর আস্তে আস্তে লম্বা হতে থাকে হাত আর পায়ের নখ। আর সব শেষে তার শক্তি আর প্রবৃত্তি হয়ে ওঠে প্রকৃত বাঘের মত। এরপর থেকে সে রাতের বেলায় জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে থাকে। তার অন্তরে তখনও বেঁচে ছিল তার মানবজীবনের স্মৃতি, কিন্তু তার আচরণ হয়ে উঠেছিল এক বন্য শিকারি প্রাণীর মতই।
বিভিন্ন স্থানীয় সম্প্রদায়ের লোককথায় বাঘা-মানুষের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা কিন্তু বেশ আলাদা, তবে এর কিছু বৈশিষ্ট্য প্রায় সর্বত্রই একই রকম। বলা হয় এর আকার একটি পূর্ণবয়স্ক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মত হলেও এ কিন্তু মানুষের মত সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর দেহ ঢাকা থাকে কমলা-বাদামি লোমে আর সেই লোমের উপর কালো ডোরা দাগ স্পষ্ট দেখা যায়। তবে এর দেহটা বাঘের মত হলেও এর মুখে মানুষের কিছু চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়। বলা হয় এর চোখ দু’টি হলদে বর্ণের উজ্জ্বল আলো ছড়ায়। এর নাক হয় চওড়া ও চ্যাপ্টা। এর নখর এতটাই ধারালো হয় যে সেটার সাহায্যে এ ম্যানগ্রোভ গাছের বাকল কেটে ফেলতে পারে। এস.সি. মিত্র তাঁর Sundarban Lokkatha Sangraha (১৯৫৮) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে তৎকালীন একাধিক গ্রামবাসীর বিশ্বাস করত যে বাঘা-মানুষ এক লাফে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। এটাও বলা হত যে বাঘ-মানুষের ডাক অনেকটা শোনায় বাঘের গর্জন আর মানুষের বেদনাভরা চিৎকারের সংমিশ্রণের মত।
তবে শুধু স্থানীয় লোককথাতেই নয়, বাঘা-মানুষের উল্লেখ পাওয়া যায় কিছু ঐতিহাসিক নথিতেও। সেখানে যদিও বাঘা-মানুষ নামটা ব্যবহৃত হয়নি। সেই সব নথিতে বলা হয়েছে যে বেশ কিছু মানুষ দাবী করেছিল এক অদ্ভুত সংকর আকৃতির প্রাণীকে দেখেছে বলে। এই প্রত্যক্ষদর্শনের কাহিনীর মধ্যে অন্যতম হল ১২ আগস্ট ১৮৯৪তে Calcutta Gazette-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন। সেখানে বলা হয়েছিল যে চাঁদপাই রেঞ্জের ঘন জঙ্গলে কাঠ কাটার সময় শ্রমিকরা নাকি দেখেছিল বাঘের মত এক আকৃতি মানুষের মত দু পায়ে ভর দিয়ে ছুটে আসছে। কিছুক্ষন পর প্রাণীটা আবার চার পায়ে হাঁটতে শুরু করে। এই দৃশ্য দেখে তৎক্ষণাৎ শ্রমিকরা সেই স্থান ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে সেখানে ফিরে এসে তারা দেখে যে গাছের গুঁড়িতে গভীর আঁচড়ের দাগ। এই দাগের বিশেষত্ব ছিল এটাই যে গাছের কান্ডের এতটা উপরের দিকে দাগটা ছিল যে কোন সাধারণ বাঘ অত উঁচুতে পৌঁছতে পারে না। প্রতিবেদনে প্রাণীটির সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। তবে স্থানীয় মানুষের মতে সেই প্রানীটাই ছিল বাঘা-মানুষ।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ বুলেটিনের এক প্রতিবেদনে বনরক্ষী আবদুল মজিদও অনুরূপ অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন। বর্ষাকালে হরিনভাঙ্গা নদীর ধারে টহল দেওয়ার সময় তিনি দেখেছিলেন একটা ছায়া মূর্তিকে। সেই ছায়া মূর্তির সারা দেহে ছিল বাঘের মত ডোরা কাটা দাগ আর সেটি মানুষের মত দু পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি আরও লেখেন যে প্রাণীটি কিছুক্ষন মানুষের মত দু পায়ে হেঁটে তারপর দ্রুত গতিতে জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছিল। মজিদ কিন্তু নিজে এটাকে কোন অতিলৌকিক প্রাণী বলে ব্যাখ্যা করেনি। তাঁর ব্যক্তিগত মত ছিল যে এটা হয়তো কোন আহত বাঘ যে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে চলাফেরা করছিল। তবে এই কাহিনী শুনে স্থানীয় মানুষরা দৃঢ়ভাবে বলেছিল যে এটাই সেই কুখ্যাত বাঘা-মানুষ।
সাম্প্রতিক কালেও সুন্দরবনে বসবাসকারী মৌয়ালদের কাছ থেকে শোনা যায় অদ্ভুত কিছু কাহিনী। ২০০৭ সালে বর্তমান পত্রিকায় গোসাবার এক মৌয়ালের বক্তব্য প্রকাশিত হয়। সেখানে সে বলে যে জঙ্গলের মধ্যে একটি গেওয়া গাছের আড়াল থেকে একটা “মানুষের আকৃতির বাঘের মুখ” তার দিকে তাকিয়ে ছিল। যদিও এর ঘটনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু এই খবর প্রকাশিত হতেই এলাকায় বাঘা-মানুষকে নিয়ে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
বৈজ্ঞানিকভাবে বাঘা-মানুষের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা না গেলেও, সুন্দরবনের লোকজ কাহিনীতে এর অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। কঠোর প্রকৃতি, সর্বক্ষণ ঘিরে থাকা বাঘের উপস্থিতি আর জঙ্গলে কাজের মানসিক চাপ – এই সব মিলিয়েই হয়তো সৃষ্টি হয়েছিল এই অদ্ভুত কাহিনিগুলো। তবে স্থানীয় মানুষের কাছে বাঘা-মানুষ হল সুন্দরবনের গভীর বিপদের এক প্রতীকী স্মারক।
তথ্যসূত্র
১) Francis Buchanan-Hamilton, Account of the District of Jessore, Government Press, 1816.
২) E.G. Man, “Notes on the Sandarbans,” Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1867.
৩) Dinesh Chandra Sen, Eastern Bengal Ballads, Calcutta University Press, 1923.
৪) S.C. Mitra, Sundarban Lokkatha Sangraha, Kolkata, 1958.
৫) “Strange Beast in the Forest,” Calcutta Gazette, 12 August 1894.
৬) Abdul Majid, “Field Observations from the Harinbhanga Range,” Bangladesh Forest Department Bulletin, 1972.
৭) “Gosaba Moualer Kotha,” Bartaman, Kolkata, 2007.