16/05/2026
অতিরঞ্জিত কৃতিত্বের পোস্টমর্টেম
সদ্য বিদায়ী উপাচার্য প্রফেসর জয়নাল আবেদীন স্যারের উনার অর্জনের এক বিশাল লিস্ট ডুয়েটের ওয়েবসাইট এবং ফেইসবুকে উনি নিজেই প্রকাশ করলেন । এখানে উনি নিজেই নিজের ঢোল পিটিয়েছিন। গতকাল (১৪/০৫/২৬ ইং) ভিসি স্যারকে অব্যহতি করা হলেও অদ্য (১৫/০৫/২৬ ইং) সকাল ৮.০০ ঘটিকায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে নিয়ম লঙ্ঘন করে নিজের অর্জনের সত্য মিথ্যার মিশ্রন ঘটিয়ে বিশাল তালিকা প্রকাশ করেন। আসুন উনার অর্জনকেই বিষয়গুলিকেই একে একে বিশ্লেষন করা যাক:
১. এম-ডুয়েট প্রজেক্ট (১৭ সেপটেম্বর ২০২৫): অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন সম্প্রতি একনেকে ডুয়েটের জন্য পাশকৃত ৮৬৬+ কোটি টাকার প্রজেক্টেকে ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিজের অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন।
বাস্তবে M-DUET প্রকল্পটি গত ভিসি হাবিবুর রহমানের একটি ব্রেন চাইল্ড। ঐ প্রজেক্ট উনি নিজেই এককভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, বিশেজ্ঞ কমিটির মূল্যায়ন এবং প্রি একনেক পাশ করিয়ে বিগত ০৫ আগষ্টের পূর্বে তা একনেকে উত্থাপন এর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। হয়ত অনেকেই মনে করতে পারেন ভিসি হাবিবুর রহমান আসলেই কি করছিলেন? কারন হাবিবুর রহমানের সেই পরিমানের রাজনৈতিক সক্ষমতা ছিল। তিনি শিক্ষামন্ত্রীকেও পাত্তা দিতেন না। তিনি যা করেছেন। তা অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন স্যার রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে। ভিসি হাবিবুর রহমান নিজের ক্ষমতায় তিনি ২০০০ কোটি টাকার M-DUET প্রকল্পটি প্লানিং থেকে শুরু করে ৬/৭ ধাপ ক্লিয়ার করে একনেকে নিয়ে যান। যদি ধাপে ধাপে প্রকল্পের আকার ছোট হতে হতে শেষ পর্যন্ত ৮৬৬ কোটিতে এসে ঠেকেছে। M-DUET এ অধ্যাপক জয়নাল আবেদীনের অবদান কি? অনেকটা কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়ার মত অবদান। অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ০৫ আগস্টের পরে শুধুমাত্র মন্ত্রনালয়ে খোজ খবর নিয়েছেন যে M-DUET কবে উঠছে এবং কয়েকজন সহকারী ও যুগ্ম সচিবের সাথে যোগাযোগ রাখা পর্যন্ত।
২. UGC HEAT Project (২৭ আগস্ট ২০২৫): ইউজিসি থেকে World Bank এর অর্থায়নে ডুয়েটে ৩ টি হিট প্রজেক্ট পাশ হয় যার মুল্যমান ৬ কোটি টাকা। মজার বিষয় হচ্ছে প্রজেক্টের কোনটাই অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন স্যারের নয়, বিভাগভিত্তিক ৩ টি প্রজেক্টের পাশ হয়। একটি মেকানিক্যাল বিভাগ থেকে অধ্যাপক হাসান মোস্তফা আফরোজ স্যারের, অন্যটি টেক্সটাইল বিভাগ থেকে অধ্যাপক আবদুস শহীদ স্যারের, তৃতীয়টি সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অধ্যাপক আবদুর রহমান ফরহাদ স্যারের। সবগুলো প্রজেক্টেই উল্লিখিত অধ্যাপকবৃন্দের ব্যক্তিগত প্রজেক্ট। যেখানে ডুয়েট প্রশাসক হিসাবে অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন কেবল সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু কোনভাবে তার ভিসি হিসেবে অর্জন হিসেবে দেখানোকে অতিরঞ্জিত বিষয়।
৩. BEPRC প্রজেক্টঃ অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন স্যার, তার অর্জন হিসেবে ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকার BEPRC প্রজেক্ট উল্লেখ করেন। আগের মতই এই প্রজেক্টটি ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. ইজাদার সাব্বির হাসান স্যারের ব্যক্তিগত প্রজেক্ট। একইভাবে কারো ব্যাক্তিগত প্রজেক্টকে অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন স্যার ভিসি হিসেবে অর্জন দাবি দেখানো অতিরঞ্জিত বিষয়।
৪. IAB এক্রিডেশন (১০ মে ২০২৫) ভিসি স্যার নিজের অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। IAB এক্রিডেশন পাওয়ার ক্ষেত্রে ২ টি প্রতিবন্ধকতা ছিল ১ টি ছিল আর্কিটেকচার বিভাগে পূর্ণকালীন অধ্যাপক না থাকা (যেটি গত ভিসি হাবিবুর রহমান সমাধান করেন সরাসরি বাইরে থেকে একজন অভিজ্ঞ অধ্যাপককে তিনি নিয়োগ দেন)। অন্যটি ছিল ১/১ সেমিস্টার চালু করা, সেটিও ভিসি হাবিবুর রহমান আর্কিটেকচার বিভাগের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য শেষে একটি অতিরিক্ত সেমিস্টার যোগ করেন। অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীনের অবদান কি? উনি IAB অর্জনের ফল ভোগ করেছেন। এমনকি যেদিন IAB আক্রিডেশন দেয়া হবে সেদিন আর্কিটেকচারের শিক্ষার্থীদের প্রোগ্রামে যেতে বাধা দেন তিনি। এছাড়া উনি সকল ডিপার্টমেন্টে ১/১ সেমিস্টার চালু করেছেন। হয়তো আর্কিটেকচার বিভাগের প্রয়োজন হলেও বাকি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে এখনও ১/১ এর প্রয়োজনীয়তা শুরু হয়নি।
৫. UGC DUET Project এর কথা তিনি অর্জন হিসেবে বলেছেন। ইহা ডুয়েটে প্রতি বছরই দেয়া হয়। নতুন কিছু নয়। টাকার এমাউন্ট প্রায় একই আছে, ৩ লক্ষ টাকা। এই ধরনের জিনিস অর্জন হিসেবে দেখানো মানে কিছু না পারলে, পরীক্ষার খাতা যেভাবে ভরা হয় তার কৌশল।
৬. জব ফেয়ার প্রোগ্রামকে তার অর্জন হিসেবে অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন দেখিয়েছেন। হ্যা উনি জব ফেয়ার প্রোগ্রাম করেছেন। কিন্তু এর ফলে খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই এই জব ফেয়ার থেকে উপকৃত হয়েছিল।
৭. আন্তর্জাতিক কনফারেন্স, সেমিনার, ওয়ার্কশপ অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন স্যার নিজের অর্জন হিসেবে দেখিয়েছেন। তবে মজার বিষয় ডুয়েটে বিগত যত ভিসি ছিলেন সবার আমলেই আন্তর্জাতিক কনফারেন্স, সেমিনার, ওয়ার্কশপ হয়েছে। কিন্তু কোন ভিসিই অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীনের মত লোক দেখানো অবদান হিসেবে প্রচার করেননি।
৮. আলামুনাই এসোসিয়েশন এবং রিউনিয়ন প্রোগ্রামকে উনার অর্জন হিসেবে দেখিয়েছেন। সিভিল ডিপার্টমেন্ট বাদে বেশ কয়েকটা ডিপার্টমেন্টে শুধুমাত্র রিউনিয়ন প্রোগ্রাম আয়োজন হলেও প্রকৃত আলামুনাই এসোসিয়েশন হয় নি। যে রিউনিয়ন প্রোগ্রাম হয়েছে তা কোনটাই শিক্ষার্থীদের কোন কাজে আসবে না।
৯. Collaboration and MoU with University and Company। এখানে যে MoU এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই না, লোক দেখানো আইওয়াশ।
১০. র্যাকিং এবং ইন্টারন্যাশনাল এক্সপোজর হয়ত এখানে ভিসির অর্জন হিসাবে বলা যেতে পারে।
১১. নিউ হল চালু করণঃ বিজয় ২৪ হল চালু করা বলেছেন, বাট বানাইলো কে হল? যে চালু করনের কৃতিত্ব নিতে হবে?
১২. নিউ গেইট চালু করনঃ সিরিয়াসলি এটাও অর্জন?
১৩. মনোচিকিৎসক নিয়োগঃ সম্ভবত কাগজ কলমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে।
১৪. নিউ ডিপার্টমেন্ট চালু করনঃ ইসিই, বিএমই এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বিভাগ চালু করার কৃতিত্ব নিয়েছেন কিন্তু এইসব কেবল কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ।
১৫. নিউ ইনস্টিটিউট চালুঃ কেবল কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ।
১৬. নিউ ল্যাব চালুকরণঃ UGC HEAT project সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অধ্যাপক আবদুর রহমান ফরহাদ স্যারের প্রজেক্টের ল্যাব নিজের কৃতিত্ব বলে জাহির।
১৭. নিউ একাডেমিক প্রোগ্রাম চালুকরনঃ স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম HSS এবং আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের চালু করনের কথা বলা হয়েছে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন কাজ। ইহাকে কৃতিত্ব হিসেবে জাহির করার কোন মানে নেই।
১৮. ভূমি সম্প্রসারন প্রজেক্টঃ ৫ আগস্টের পরে ডুয়েটের সকল শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল ডুয়েট গেটের সামনে উপজেলা পরিষদ দখল করে নেয়া। কিন্তু অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদিন স্যার ভিসি হওয়ার পর পর নিজের গদি টিকিয়ে রাখার জন্য শিক্ষার্থীদের তার বিশেষ দলীয় বাহিনী (ইরফানুল হাসান সাকিব, আব্দুল্লাহ আল কুরাইশ উল্লেখযোগ্য) দ্বারা নিয়ন্ত্রন করে ভূমি আন্দোলন থেকে বিমুখী করেন। উনার ধারনা ছিল শিক্ষার্থী থেকে আন্দোলন হলে উনাকে সরকার ভিসি থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। পরবর্তীতে একটি লোক দেখানো কমিটি গঠন করে কিছু দূর্বল চিঠি পত্র ডিসি অফিস সহ কিছু জায়গায় প্রেরণ করেন। যার বাস্তব কোন ভ্যালু নেই।
১৯. প্রেসিডেন্ট AUB: এটা মুলত সাবেক ভিসি হাবিবুর রহমান তার রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে ভিসি পরিষদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। যা ০৫ আগস্টের ২০২৪ এর আগ পর্যন্ত, সরকার পতনের পরে নতুন করে ভিসি পরিষদের মিটিং হলে কয়েকদিন হাবিবুর রহমানে প্রক্সি দেন ভিসি অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন স্যার।
২০. ডুয়েট গ্র্যাজুয়েটদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীতে নিয়োগ সমস্যার সমাধানে ভিসি অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন স্যার কেবল চিঠি দেয়াকে কৃতিত্ব হিসেবে জাহির করলেন।
২১. ডিজিটাল সিস্টেম ডুয়েটঃ ICT সেলের রেগুলার কাজ, যার ৯৫% সিস্টেমই ভিসি হাবিবুর রহমানের আমলেই ছিল। সেইগুলোকে নিজের কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরলেন ভিসি অধ্যাপক ড. মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন স্যার।
২২.অনলাইন UG এবং PG এডমিশন সিস্টেমঃ এই সিস্টেম বহু আগে থেকেই ছিল।
২৩. মেরিট অনুযায়ী হলে সীট প্রদানঃ এটিকে অধ্যাপক মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন স্যারের কৃতিত্ব হিসেবে মানা যায়।
২৪. ক্লাব এক্টিভিটিঃ ভিসি জয়নাল আবেদীন স্যার আমলে বেশিরভাগ ক্লাবের সকল পর্যায়ে তিনি নিজের দলীয় লোক বসিয়ে ক্লাবগুলোকে সম্পুর্নভাবে নিজের কব্জাতে নিয়ন্ত্রন করতেন।
২৫. একাডেমিক এক্টিভিটিঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন কাজ, এখানে ভিসি না থাকলে এই কাজ কর্ম বন্ধ হয় না সেটা ০৫ আগস্টের পরেই দেখা গেছে। ভিসি ছাড়াই ফাইনাল এক্সাম হয়েছিল।
২৬. এক্সট্রা-কারিকুলার এক্টিভিটিঃ সবকিছু অনির্দিষ্ট কথাবার্তা৷ ক্রেডিট নেয়ার মত উল্লেখযোগ্য কিছুই না।
২৭-২৯. ডীন এওয়ার্ড টাকা বৃদ্ধি, থিসিস/প্রজেক্টের টাকা বৃদ্ধি এবং TA/RA/PhD Fellowship টাকা বৃদ্ধিঃ উনাকে এই কৃতিত্বের ক্রেডিট দিতে হবে।
৩০-৩১ ডুয়েট ভিসির চেয়ার হিসেবে BAETE এবং BPERB সদস্য। নিজের কোন কৃতিত্ব নেই।
৩২. UGC HEAT Project CoE member: চেয়ার হিসেবে সদস্য, নিজের কোন কৃতিত্ব নেই।
৩৩. সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সংস্কারঃ ভিসি জয়নাল আবেদীন স্যারের রেকম্যান্ডেশন লেটারে স্বাক্ষরে করে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য নির্মান করা কলেজকে B.Sc. দের হাতে উঠিয়ে দিয়ে, সেটাকে ডুয়েটের জাহির করতেছেন কৃতিত্ব হিসেবে।
৩৪ -৩৬ তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই না, হয়ত পাতা ভরার কাজে হয়ত লিখেছেন।
৩৭. নিয়োগে স্বচ্ছতাঃ বর্তমানে ডুয়েটের পিপড়াও জানে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারি নিয়োগে তিনি নির্দিষ্ট দলের লোকজনকেই নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগে জালিয়াতির বহু গ্রুপে ইতিমধ্যে এসেছে। উপযুক্ত সময়ে আরো অনেক কিছু প্রকাশ করা হবে।
৩৮-৪০ তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই না।
পরিশেষ একটা কথাই বলতে হয় “সমাজে এমন লোক অনেক আছে কিছু করার থেকে ক্রেডিট নেয়ার কাজে ব্যস্ত থাকে। ভিসি হওয়ার পর থেকে বর্তমান ভিসির ভূমিকা ছিল ব্যক্তি PR শীপ চালানো এবং ভিসির মেয়াদের পরদিন পর্যন্তও অধ্যাপক মোহম্মদ জয়নাল আবেদীন স্যার তাই করে গেছেন।“