29/06/2025
**গল্পের নাম: নদীর ধারে এক বিকেল**
নদীর পাড়টা আজও আগের মতোই আছে—নিঃশব্দ, শান্ত, আর সেই পুরোনো গাছটা এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেখানে মোহাম্মদ আলী আর **হাফসা** একদিন নিজেদের স্বপ্নগুলো বুনেছিল।
নীল রঙের বাইকে বসে মোহাম্মদ আলী চুপচাপ তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। আকাশে হালকা মেঘ, হাওয়া একটু ভারী, ঠিক যেমন হয় কোনও হারানো দিনের গন্ধে ভরা বিকেলে।
হাফসার সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়েছিল কলেজ লাইব্রেরিতে। চুপচাপ, বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা মেয়েটি যেন নিজের ভেতরেই একটা জগত বয়ে নিয়ে বেড়াতো। মোহাম্মদ আলী সেই চোখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিল। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, তারপর ভালোবাসা—তাদের গল্পটা ছিল ধীর, গভীর আর নীরব।
হাফসা ছিল অনেকটা নদীর মতোই। তার হাসি ছিল টলটলে জলের মতো স্বচ্ছ, আবার দুঃখ ছিল গভীর, কখনো মুখ ফুটে বলত না। সে লেখালেখি করত—কবিতা, ছোটগল্প, মাঝে মাঝে ডায়েরির পাতা ভরে দিত এমন সব কথায় যা মোহাম্মদ আলী বুঝত না, কিন্তু অনুভব করত।
তাদের প্রিয় জায়গা ছিল এই নদীর পাড়। প্রতিদিন বিকেলে তারা আসতো—কেউ কিছু না বললেও, দু’জনের চোখে চলতো অসীম কথোপকথন।
কিন্তু হঠাৎ একদিন, হাফসা বলল, “আমার বাবা বদলি হয়েছেন, আমাকে ঢাকায় যেতে হবে… কিছুদিনের জন্য।” মোহাম্মদ আলী কিছু বলেছিল কি না, তার মনে নেই। শুধু মনে আছে, হাফসা সেদিন খুব চুপচাপ ছিল। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো নদীর পাড়ে এসেছিল তারা, আর হাফসা তার একটা কবিতার খাতা মোহাম্মদ আলীর হাতে দিয়ে বলেছিল, “সবটা তুমি বুঝবে না, কিন্তু কখনো যদি আমায় ভুলে যাও, এই খাতা তোমায় মনে করিয়ে দেবে।”
তারপর কেটে গেছে প্রায় সাত বছর। মোহাম্মদ আলী বহুবার চেষ্টা করেছে হাফসাকে খুঁজে পেতে, কিন্তু কোনো যোগাযোগ হয়নি। কেউ বলে সে এখন বিদেশে, কেউ বলে বিয়ে হয়ে গেছে। মোহাম্মদ আলী কাউকে বিশ্বাস করেনি। শুধু এই বাইকটা নিয়ে মাঝে মাঝে চলে এসেছে নদীর পাড়ে—যদি কখনো হাফসা ঠিক সেই আগের মতো, চুল খোলা করে দাঁড়িয়ে থাকে নদীর দিকে মুখ করে।
আজও সে এসেছে। বাইকে বসে, ডান হাতে এখনো হাফসার দেওয়া সেই পুরোনো কবিতার খাতা। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, কিন্তু অক্ষরগুলো এখনও জীবন্ত।
একটা পাতায় লেখা ছিল:
*"যদি নদীর ধারে কখনো চুপ করে বসে থাকো
জানো, আমি ঠিক পাশেই আছি।
দেখতে না পাও, তবু অনুভবে আমি থাকবো—
তোমার বাইকের পেছনের সিটে বসে..."*
মোহাম্মদ আলীর চোখ ছলছল করে ওঠে। এই নদী, এই বাতাস, এই গাছ—সবই আছে, শুধু হাফসা নেই। অথচ কোথাও না কোথাও, হয়তো সে এখনো আছে—একটি কবিতার লাইনে, একটি স্মৃতির কোণে, অথবা এই নীরব বিকেলের বুকে।
নদীর ঢেউ এসে ছুঁয়ে যায় তার পা, যেন বলে দেয়—হাফসা হারিয়ে যায়নি, সে আজও এখানে, ঠিক মোহাম্মদ আলীর হৃদয়ের গভীরে। ------ চলবে,,,