29/10/2025
Ulo Jamalpur Sadar sir
সময় তখন দুপুর ১২: ৪৫। একটা কল আসে আমার ফোনে। ইটাইল ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রাম থেকে। ফোন রিসিভ করার পর শুধু ও পাশ থেকে কান্নার আর আর্তনাদের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ভয়ে শরীর মোচড় দিতে থাকে, আমি শুধু জিজ্ঞেস করতে থাকলাম কি হয়েছে, কে বলছেন, প্লিজ শান্ত হউন। তখন মনে হল উনার হাত থেকে আরেকজন ফোনটা নিলো, আমাকে বলা শুরু করলো স্যার আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাদের গ্রামের বেশ কয়েকজনের গরু ধপাধপ পরতেছে আর মরতেছে। বললো একজনের ৪ টা গরু মারা গেল। আমি শুধু ঠিকানাটা নিয়েই ফোনটা কাটলাম। জায়গাটা অনেক দূর,জেলার একেবারে শেষপ্রান্ত, পিয়ারপুর,মির্জাপুর। আমি শুধু তখন কয়েক মিনিটের জন্য ডিএলও স্যারের রুমে গেলাম। স্যারের সাথে পরামর্শ করে ব্যাগ গুছালাম। স্যার আর আমি মরার ইতিহাস শুনে কিছুটা টেনটেটিব ডায়াগনোসিস করলাম, স্যার পোস্ট মর্টেমের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে যেতে বললেন।
আমার পুরো টিম প্রস্তুত হল। মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকস নিয়ে রওনা হলাম, ধুম বৃষ্টি, ভাংগা, সরু রাস্তা পার হয়ে প্রায় ১.৩০ মিনিট পর বেলা ২ টা নাগাদ পৌছালাম খামারির বাড়ি। আমাদের গাড়ি দেখে ইতিমধ্যে অনেক লোকের সমাগম। তাদের কাছে হিস্ট্রি শুনলাম। পাশেই প্রায় ৬০০-৭০০ মিটার দূরেই একটি ব্যাটারির কারখানা, সেখান থেকে ব্যাটারি পুড়িয়ে নাকি সিসা আলাদা করে, তাদের ধারনা ওখানকার পুড়ার অবশিষ্টাংশ, সিসা, পানি সবকিছু আশেপাশের খাল ও নিচু এলাকাতে প্লাবিত হয়, ওখানে কচি তরতাজা ঘাস গজায়, আর তারা বুজতে না পেরে গত ৪-৫ দিন থেকে দলবেঁধে গুরু ঐ মাঠে, নিচু এলাকায় চড়তে দেয়, তারপর থেকেই গত চার দিন থেকে তাদের এলাকার গরুর আচরণে পরিবর্তন আসে,পেট ফুলতে থাকে,মুখে লালা আসতে থাকে, পায়খানার সাথে রক্ত আসতে থাকে। তারা এসব বলতে লাগলেন আর কাঁদতে লাগলেন, আর ঐ দিকে বাড়ির ভেতরে মহিলাদের হাহাকারে এক হৃদয় বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
আমরা যেয়ে দেখলাম চারটি বড় ও একটি ছোট গরু মরে পরে আছে।
শুরু করলাম পোস্ট মর্টেম। সে এক কঠিন কাজ। এলাকাবাসী ভয়ে কেউ ধরে না, কেউ চামড়া ছিলাতে হেল্প করতে সাহস পায়না, নিজেরাই চামড়া স্কিনিং করে গরুর বডির বিভিন্ন পার্ট অপেন করলাম। একে একে হার্ট, লিভার, স্প্লিন, কিডনি, লাংস, ইন্টেসটিনাল এবং রুমিনাল কন্টেন্ট আলাদা করে পৃথক পৃথক কন্টেইনারে ঢুকিয়ে পলিথিনি মুড়িয়ে কুল বক্সে বরফ দিয়ে প্রস্তুত করলাম।
পাশাপাশি পয়জনিং টেস্টের জন্য আলাদা করে ঐ এলাকার ঘাস,খড় পলিথিনে মুড়িয়ে সংগ্রহ করলাম।
জনাব হেকমত আলীর ১২ টি গরুর মধ্যে ৫ টি মারা গেল, বাকী গরুগুলোকে সময় নিয়ে ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশন করে কিছু জরুরি চিকিৎসা প্রদান করি, পরামর্শ প্রদানের পর আগামীকাল সকালে অফিসে এসে ঔষধ নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করি।
আশেপাশের আরো ৫-৭ জনকে পরামর্শ, চিকিৎসা ও প্রেসক্রিপশন করে দেই আমার টীম। এসব করতে করতে কখন যে মাগরিবের আযান দিল টেরই পায় নি।
এরই মাঝে একটু পরপর ফোন দিয়ে খোঁজ নিচ্ছিলেন সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব জিনাত শহীদ পিংকি মহোদয়। উনার মাঝেও প্রাণির প্রতি এক ধরনের মমত্ববোধ অনুভব করলাম। উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বোচ্চটুকু করার আশ্বাস দেন তিনি।
ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে যখন আমরা অফিসে প্রবেশ করলাম তখন এশার আযান দিলো। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম আমার টিমের সদস্যরা গাড়ি থেকে নেমেই আবার কাজে লেগে গেলেন, কেউ স্যাম্পল গুলাকে নামিয়ে নতুন একটা কোলবক্সে তুলতেছেন,কেউ আইস প্যাক রেডি করতেছেন, কেউ নমুনা গুলো ঢাকায় প্রেরণের জন্য চিঠি লিখা শুরু করলেন।
সবাই মিলে সব গুছিয়ে নমুনাগুলা পরীক্ষা করার জন্য কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান কেন্দ্র, ৪৮,কাজী আলাউদ্দিন রোড ঢাকায় পাঠানোর জন্য প্রস্তুত হলাম। যখন আমরা চিন্তা করছিলাম ঢাকায় কে যাবে.....তখনই সম্মানিত ডিএলও স্যার ফোন দিয়ে বললেন ঢাকায় যাওয়ার জন্য একজনকে স্যার বলে রেখেছেন, আজ রাত ১২ টার বাসে তিনি যাবেন। জেলা প্রধান হিসাবে স্যারের দায়িত্ববোধ আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
আশা করি জেলা প্রাণিসম্পদ, উপজেলা প্রশাসন,সুশীল সমাজ, সাংবাদিকবৃন্দ, এলকাবাসী সকলের সহায়তায় খামারী আবার ঘুরে দাঁড়াবে, তার মুখে আবার হাসি ফুটবে, সে আবার বুক ফুলিয়ে কথা বলবে। চলুন না আমরা সবাই যার যতটুকু আছে তা নিয়ে উনার পাশে দাঁড়াই। মহান আল্লাহপাক উনাকে ধৈর্য্য এবং সাহস দান করুন।