20/01/2026
ফিসফিস ধ্বনি শুনে সাইমনের ঘুম ভেঙে দেখলো, তার ঘড়িতে তখন ভোর তিনটা। চারপাশে অন্ধকার, জানালার ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না নয়, গাঢ় কালো এক আভাস ঢুকছে। কেমন আভাস? মনে হলো কারো দীর্ঘশ্বাস। সে বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে গেলো। বাইরে তাদের বাড়ির পিছনের বিশাল কবরস্থানটা দিনের বেলায় যেমনই হোক, রাতের এ সময় যেন প্রাণ পেয়ে ওঠে। গাছের ডালগুলো শুকনো হাড়ের মতো দেখা যাচ্ছে।
সাইমনের দাদু তিন দিন আগে মারা গেছেন, আর ঠিক সেই দিন থেকেই অদ্ভুত ঘটনা শুরু হয়। দাদুর শেষ ইচ্ছে ছিল, তাকে পারিবারিক কবরস্থানে সমাধি দেওয়া হবে, পাশেই যেখানে তার স্ত্রী, সাইমনের দাদীর কবর। কিন্তু পারিবারিক সেই কবরস্থানটা বেশ পুরনো, মাঝারি আকারের, পরিত্যক্ত প্রায়। গেট ভাঙা, চারপাশে জঙ্গল। সাইমন প্রথমবার সেখানে যাওয়ার সময়ই অনুভব করেছিল一种 নিঃশব্দ চিৎকার, মাটির নিচ থেকে যেন উঠে আসে।
আজ দাদুর দাফনের পর থেকে সাইমন নিজেকে অস্থির লাগছিল। সে জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়তে যাবে, ঠিক তখনই শুনতে পেলো—টাপ… টাপ… টাপ… খুব স্বচ্ছন্দ, মেপে পায়ের শব্দ। শব্দটা বাড়ির ভেতর থেকে আসছে না, বাইরে থেকে… বাইরে? কবরস্থানের দিক থেকে?
সাইমন অনিচ্ছায় আবার জানালায় গেলো। নিঃশ্বাস আটকে গেল তার। কবরস্থানের গেটের কাছে, জ্যোৎস্নার আভাসে, সে স্পষ্ট দেখতে পেলো একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা, কুৎসিত ভঙ্গিতে ঝুঁকে থাকা, পরনে সাদা কাপড়। কিন্তু মুখ… মুখটা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢাকা, শুধু দু’টা গর্তের মতো চোখ, যেন তারা নয়, শুধু ফাকা স্থান।
ভূত? সাইমন বিজ্ঞান মানে, মনের ভুল মনে করে সে চোখ রগড়ালো। কিন্তু ওই মানুষটার হাত তখন উঠলো, একটা ধীর ইশারায় সে সাইমনের দিকে ডাকলো। আর তারপর… পা বাড়ালো কবরস্থানের গেট পার হয়ে ভেতরের দিকে। সাইমন দেখলো, সাদা কাপড় পরা ওই মানুষটা তার দাদুর কবরের দিকেই হাঁটছে।
অনুভূতিটা অসহ্য হয়ে উঠলো। যুক্তি বললো ঘুমাও, কিন্তু হৃদয় বললো কিছু একটা ভুল হচ্ছে। দাদুর সমাধির কি হয়েছে? শেষ পর্যন্ত সাইমন ফ্ল্যাশলাইট নিয়ে নিঃস্ব পদক্ষেপে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। রাতের ঠাণ্ডা বাতাসে গা শিউরে উঠল, পেছনে তার নিজের ছায়াটাও যেন শত্রু।
কবরস্থানের ভাঙা গেট পার হতে তার পায়ে কাঁটা বিঁধল। ভেতরে ঢুকতেই পরিবেশ পাল্টে গেল। বাইরে যা কিছু দেখা যাচ্ছিল, ভেতরে তা নয়। এখানে বাতাস নিশ্চল, গাছের পাতাও নড়ে না, কিন্তু শব্দ আছে… অস্পষ্ট ফিসফিসানি, অনেক মানুষের, অনেক কান্নার, অনেক ক্ষুদ্র হাসির। মাথার ওপর দিয়ে যেন বাদুড়ের ঝাঁক উড়ে গেল, কিন্তু ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় কিছু ধরা পড়ল না।
সাইমন দাদুর কবরের দিকে এগোতে লাগলো। পথে পড়লো পুরনো সমাধিগুলো, যেগুলোর পাথরে লেখা মুছে গেছে। কয়েকটা সমাধির পাথর খসে পড়েছে, ভেতরে শূন্যতা। কিন্তু আজকের দিনের দাদুর কবরটা… সেটা খোলা!
সাইমন দৌড়ে গিয়ে দেখলো, মাটি খনন করা হয়েছে, কাঠের কফিন দেখা যাচ্ছে, তবে ঢাকনা খোলা। ভেতরে দাদুর দেহ নেই। শূন্য কফিন।
হঠাৎ ফিসফিসানি থেমে গেল। সব শব্দ চলে গেল। চারপাশে পরম নিস্তব্ধতা নেমে এলো, যেটা পূর্বের কোনো আওয়াজের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
পেছনে একটা ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস তার গর্দানে লাগল।
সাইমন ধীরে ধীরে ঘুরে দেখলো। ওই সাদা কাপড় পরা মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে। এবার খুব কাছে। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় তার মুখ দেখা গেল—সাইমন চিৎকার করে উঠলো। ওটা কোনো মুখ নয়, ওটা তার দাদুর মুখ… কিন্তু ঠিক দাদুর মুখ নয়। চামড়া পচে ঝুলছে, চোখ দুটো ফাঁকা, কিন্তু ঠোঁট দুটি নড়ছে।
“তুই… তুই কেন এলি?” একটি ভাঙা, শব্দহীন প্রায় গলায় কথা বললো ওটা। “ওরা ক্ষুধার্ত… তুই ওদের খাবারে দিলি…”
“দাদু?” সাইমনের কণ্ঠ্য ভেঙে গেল।
“আমি নই… আমি শুধু তার মুখটা ধার করেছি… ওরা সবাই এখানে আছে, প্রতিটি কবরে। তারা শুধু একটা শরীর খোঁজে… একটা জীবন্ত শরীর… ফিরে আসার জন্য…”
সাইমন পেছনে হটতে লাগলো, কিন্তু পা পিছলে পড়ে গেল। মাটি হঠাৎ নরম, উষ্ণ মনে হলো। সে হাত দিয়ে ভর দিতে গিয়ে দেখলো, তার হাতের নিচে মাটি না, একটা মানুষের হাড়গোড়। সে আরও চিৎকার করতে যাবে, কিন্তু গলা থেকে আওয়াজ বেরোল না।
চারপাশের সমস্ত কবর থেকে তখন হাত বেরুতে শুরু করলো। শুকনো, মাংসহীন, হাড়ের হাত। তারা মাটি ফুঁড়ে উঠে আসছিল, দীর্ঘ আঙ্গুলগুলো সাইমনের দিকে বাড়ালো।
সাদা কাপড় পরা সত্ত্বাটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু মাথা নাড়ছিল, “ওরা তোমার শরীর চায়… এটা তাদের জায়গা… বাইরের কেউ এলে… তাকে ঠিক এখানেই থাকতে হয়…”
সাইমন উঠে দৌড় দিলো। কিন্তু কবরস্থানের গেটটা যেখানে ছিল, সেখানে এখন শুধু ঘন অন্ধকার, একটা দেয়ালের মতো। সে যেদিকেই ছুটে, সেদিক থেকেই হাড়ের হাতগুলো তাকে ঘিরে ধরলো। পা ধরে টানতে শুরু করলো, নিচে, মাটির দিকে… কবরের ভেতরের দিকে।
সাইমনের শেষ চিৎকার রাতের নির্জনতায় বিলীন হয়ে গেল।
পরের দিন সকালে পুলিশ ও প্রতিবেশীরা সাইমনের বাড়ি খুঁজে দেখলো সে নিখোঁজ। শেষ দেখা ওই রাতেই। তারা পারিবারিক কবরস্থানে খোঁজাখুঁজি করলো। দাদুর কবরে সব ঠিক আছে, মাটি সমান, কফিন বন্ধ। কিন্তু পাশের একটা পুরনো, নামবিহীন কবরের পাথরটা একটু এদিক-ওদিক হয়েছে, মনে হলো ভেতর থেকে কেউ তা ঠেলে দিয়েছে। আর সেই কবরের মাটিতে সাইমনের ফ্ল্যাশলাইট পড়ে ছিল, কাঁদা মাখা।
পুলিশ রিপোর্ট লিখলো: সম্ভবত রাতের অন্ধকারে কবরস্থানে পড়ে গিয়ে আহত হয়ে কোথাও চলে গেছে।
কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধ কামাল চাচা জানতেন বেশি। তিনি সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ির উঠানে বসে তামাক টানছিলেন, যখন দেখলেন, ওই মাঝারি আকারের কবরস্থানের দিকে, গেটের কাছে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে। ছায়াটা সাইমনের মতোই, কিন্তু তার মুখটা… মুখটা শুধু ফাকা অন্ধকার। আর তার পেছনে, কবরস্থানের ভেতরে, মনে হলো অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে, সবার চোখ আলোয় জ্বলজ্বল করছে, অপেক্ষা করছে… পরের আগন্তুকের জন্য।