30/06/2026
"তুমি কি তাকে দেখেছ, যে নিজের ইচ্ছে বা প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ (উপাস্য) বানিয়ে নিয়েছে? এবং আল্লাহ জানার পরেও তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও হৃদয়ে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চোখের ওপর পর্দা টেনে দিয়েছেন। তাহলে আল্লাহর পর তাকে কে হেদায়েত দেবে? তোমরা কি ভেবে দেখবে না?
আমি যখন এই আয়াতটি প্রথমবার পড়ি, তখন আমি একটা ছোটখাটো অভ্যাসের মধ্যে ডুবে ছিলাম। এমন একটা অভ্যাস, যেটাকে আমি 'শুধু আর একবার' বলে এড়িয়ে যেতাম। তারপর আবারও, আবারও... এভাবে করতে করতে একসময় সেটা আমার আত্মার ভেতর গেঁথে গেল।
বাহির থেকে আমি সবার মতোই ছিলাম—নামাজ পড়তাম, মানুষকে সালাম দিতাম, হাসিমুখে কথা বলতাম। কিন্তু ভেতর থেকে আমি ছিলাম মক্কার সেই মুশরিকদের মতো, যে নিজের মূর্তিকে ছাড়তে পারে না। পার্থক্য শুধু এতটুকুই ছিল যে—তাদের মূর্তি পাথরের ছিল, আর আমার মূর্তি ছিল আমার নিজস্ব ইচ্ছে, আমার নফসের প্রবৃত্তি।
আমি কুরাইশদের সেইসব মানুষের কথা শুনতাম যারা আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে অস্বীকার করেছিল, আর ভাবতাম—আমি তো তাদের মতো নই, আমি তো মুসলমান। কিন্তু যখন এই আয়াতটি আমার সামনে এলো, আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম, থমকে দাঁড়ালাম। আল্লাহ বলছেন: "اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ" (সে নিজের ইচ্ছে বা প্রবৃত্তিকে নিজের খোদা বানিয়ে নিয়েছে)।
আমি প্রথমবার নিজের জীবনকে পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করালাম। কে ছিল আমার খোদা? আমার জিব—যা গীবত বা পরনিন্দায় অভ্যস্ত ছিল? আমার চোখ—যা হারাম জিনিস দেখা থেকে বিরত হতো না? আমার পেট—যা হালাল আর হারামের তফাত বুঝত না? নাকি আমার রাতগুলো—যা ইবাদতের জন্য নয়, বরং গুনাহে বিলীন হওয়ার জন্য জেগে থাকত? মক্কার মানুষ লাত আর মানাতের সামনে মাথা নত করত, আর আমি? আমি সেজদা করছিলাম আমার নফসের সামনে, আমার অভ্যাসের সামনে, আমার দুর্বলতার সামনে... অথচ আমি নিজেও তা জানতাম না!
এরপর আমি আয়াতের পরের অংশটুকু পড়লাম: "وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَىٰ عِلْمٍ" (এবং আল্লাহ জানার পরেও তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন)। এই সেই মুহূর্ত, যখন আমি ভেতর থেকে কেঁপে উঠলাম। আমার জ্ঞান বা জানাটা আমার কোনো উপকারে আসেনি, বরং আমার এই জানাই ছিল আমার শাস্তি। আমি জানতাম যে এটা গুনাহ, তাও আমি সেটা করতাম। আমি জানতাম এটা হারাম, তবুও আমি নিজের ইচ্ছেমতো সেটাকে নিজের জন্য হালাল বানিয়ে নিয়েছিলাম। আর তারপর, আল্লাহ আমার চোখের ওপর পর্দা টেনে দিলেন; এতটাই যে, নিজের অন্যায় বা পাপকে আমার আর অন্যায় মনে হতো না। সেটা আমার অভ্যাস, আমার পরিচয় এবং আমার জীবন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আর আজ, আমি যখন মক্কার কাফেরদের সম্পর্কে পড়ি যে—তারা কীভাবে নিজেদের ব্যবসা, নিজেদের সম্মান, আর বাপ-দাদার ধর্মের অহংকারে মজে ছিল এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন আমি আর তাদের দোষ দিতে পারি না। কারণ, আমিই তো তাদের আয়না! তারা মগ্ন ছিল নিজেদের ব্যবসায়, আর আমি মগ্ন ছিলাম আমার স্ক্রিনে (মোবাইলে)। তারা মগ্ন ছিল নিজেদের বংশের অহংকারে, আর আমি মগ্ন ছিলাম বন্ধুদের সামনে নিজেকে জাহির করায়। তারা নিজেদের এলাকা ছাড়তে পারেনি, আর আমি আমার খারাপ অভ্যাসটা ছাড়তে পারিনি।
পার্থক্য শুধু এতটুকুই—তারা প্রকাশ্য মূর্তির পূজা করত, আর আমি পূজা করতাম মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা মূর্তির; যাকে আমি বলতাম 'একটু আনন্দ পাওয়া', 'মন ভালো করা', কিংবা 'আর মাত্র একবার'।
কিন্তু এই আয়াতের শেষ অংশটি আমাকে পুরো নাড়িয়ে দিল: "فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ" (তাহলে আল্লাহর পর তাকে কে হেদায়েত দেবে?)
আমি বুঝতে পারলাম, না আমার জ্ঞান আমার কোনো সাহায্য করবে, না আমার নিজের ইচ্ছা শক্তি, না আমার বন্ধুরা, আর না আমার গত বছরের করা তওবা। আল্লাহ যখন নিজেই কাউকে ছেড়ে দেন, তখন তাকে ধরে রাখার মতো আর কেউ থাকে না। তিনি হয়তো আমাকে ছেড়েই দিয়েছিলেন, কিন্তু এই আয়াতটি আমাকে শক্ত করে ধরে ফেলল: "أَفَلَا تَذَكَّرُونَ" (তোমরা কি ভেবে দেখবে না?)
"
#ইসলামিক_স্ট্যাটাস #আত্মোপলব্ধি #হেদায়েত #গুনাহ #তওবা #ইসলামিক_ভিডিও