05/02/2025
ভেঙে যাচ্ছে সব
_________________মতিয়ার রহমান
ভেঙে যাচ্ছে সব, ধূলোর আস্তরণে ঢেকে যায় মুখ,
শব্দেরা দগ্ধ, হারিয়ে ফেলে তাদের অর্থের সুখ।
সন্ধ্যা নামে ধীরে, আলো নিভে যায় চোখের পাতায়,
স্বপ্নেরা ধোঁয়ায় মিলিয়ে যায়, কিছুই থাকে না হাতের মুঠোয়।
পথেরা ক্লান্ত, জীর্ণ হয়ে গেছে পুরনো স্মৃতির ভারে,
বাতাসে ওড়ে ধুলোর ঘূর্ণি, ছিন্ন কাগজের মতো উড়ে।
তোমার কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেছে শহরের কোলাহলে,
শুধু রয়ে গেছে প্রতিধ্বনি, শূন্যতার গভীর চোরাবালিতে।
আকাশের নীল রঙ মুছে যাচ্ছে ধূসর মেঘের ছায়ায়,
বৃষ্টি আসে না, শুধু বজ্রের গর্জন শোনায়।
শুকনো পাতারা জানে, কবে ঝরে যাবে অনন্ত শূন্যে,
ভেঙে যাওয়া শব্দেরা খুঁজে ফেরে তাদের হারানো গন্তব্য।
সময়ের ঢেউ আছড়ে পড়ে স্মৃতির ভাঙা প্রাচীরে,
রাত্রি নামে, শহর ঘুমিয়ে পড়ে বিদ্যুতের ঝলকানিতে।
অপেক্ষার পালা শেষ, তবু অপেক্ষা কখনো ফুরোয় না,
বুকের গভীরে জমে থাকে চাপা কান্নার অতল নীরবতা।
ভেঙে যায় ঘর, ভেঙে যায় সম্পর্কের নরম সুতো,
হাতের মুঠো খুলে দিলে উড়ে যায় বিশ্বাসের পাখি।
শব্দেরা ফিরে চায় পুরনো ঠিকানা, হারিয়ে ফেলে দিশা,
বিষাদ জমে থাকে কবিতার ভাঁজে, রোদ ম্লান হয়ে যায়।
স্মৃতির দেয়ালে ফাটল ধরে, ফাঁক দিয়ে গলে পড়ে আলো,
তবু আঁধার ঘনীভূত হয়, গল্পেরা ঝরে যায় নীরবতায়।
নদী শুকিয়ে যায়, ভেঙে পড়ে সেতুর জীর্ণ কাঠামো,
সকল পথেই থমকে দাঁড়ায় ছায়া, ঘুমিয়ে পড়ে অন্ধকার।
ঘড়ির কাঁটা থেমে যায়, সময়ের হিসেব মুছে ফেলে রাত,
তোমার কণ্ঠের নরম স্পর্শ কোথায় হারিয়ে যায়?
আমাদের কথারা ভেঙে পড়ে ধুলোর আস্তরণে,
শুধু নিঃশব্দে বয়ে চলে বেদনার গোপন স্রোত।
সব কিছু ভাঙছে, শহর, স্বপ্ন, সম্পর্ক, স্মৃতি,
তবু কেউ একবারও বলে না, "আসো, নতুন করে গড়ি।"
ভেঙে পড়া ইটের মাঝে জন্ম নেয় না নতুন ঘর,
কেবল ঝরে পড়ে সময়, নিঃসঙ্গতার অদৃশ্য ছায়ায়।
তবু কোনো একদিন, ধূলোর নিচে বুনবে কি কেউ নতুন আশা?
নতুন কোনোরাত কি জ্বালাবে পুরনো প্রদীপের আলো?
ভেঙে যাওয়া শব্দেরা কি আবার খুঁজে নেবে পথ?
নাকি সবকিছু হারিয়ে যাবে, কালের অতল অন্ধকারে...
ভেঙে যায় মন্দির, মসজিদ, গির্জার পুরনো দেয়াল,
ভেঙে পড়ে মানুষের মন, তবু মুখে হাসির চাল।
ভাঙা দরজায় বসে থাকে একলা একটি ছেলে,
তার চোখে স্বপ্ন ছিল, তাও ধুলোর গন্ধে মেলে।
শহরের আলো মরে যায়, নিভে আসে নরম রোশনাই,
জানালার ওপাশে কে যেন ডাকে, ফিরে যাবেন ভাই?
কোথায় যাব, পথ যে মুছে গেছে ধুলোর অতলে,
কোথায় দাঁড়াব, এই শহর কেবল আঁধারে দোলে।
আমাদের বাড়ির উঠোন ছিল, ছিল শিশিরভেজা ঘাস,
আজ সে উঠোনে কেবল ধুলো, নেই স্নিগ্ধ বাতাস।
তোমার হাতের উষ্ণ ছোঁয়া কোথায় আজ হারালো?
ভেঙে যাওয়া সেই সব বিকেল কি আর ফিরে আসলো?
সমুদ্রের ঢেউও নাকি আজ ক্লান্ত হয়ে গেছে,
নদীর বুকেও জল নেই, কেবল শূন্য বয়ে বেছে।
সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে কি, বন্ধু?
সেইসব স্বপ্ন কি আজো বেঁচে আছে, নাকি সব মৃত?
দেয়াল লিখন মুছে যায়, রাজপথের চিহ্ন মলিন,
যুদ্ধের দামামা বাজে, আবারো পৃথিবী অশান্ত প্রবল।
মানুষেরা মানুষ নয়, তারা কেবল ছায়া হয়ে যায়,
একদিন যারা হাসতো, আজ তারা স্তব্ধ চোখে চায়।
ভেঙে যায় সংসার, ভেঙে যায় ভালোবাসার সেতু,
ভাঙনের গল্প শুনে, সময় হাসে নিঃশব্দে বসে।
ভাঙনের শেষ নেই, তবু কেউ বোঝে না কেন,
সবাই শুধু গড়তে চায়, জানে না কীভাবে গড়া যায় আবার।
তোমার হাতের ছোঁয়া কি একদিন ফিরবে?
শহর কি আবার প্রাণ ফিরে পাবে?
ভাঙা স্বপ্নেরা কি একদিন উঠবে নতুন ভোরের আলোয়?
নাকি তারা হারিয়ে যাবে, এক অনন্ত শূন্যতার কোলায়?__________________________________________