26/10/2025
ডির্ভোসের আট মাস পার হলো কুহুর। কফির মগটা নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে নিকোষ কালো আকাশের পানে তাকিয়ে ডুব দেয় অতীতে। মেট্রিক পাস করার সাথে সাথেই তাকে বিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। কেউ এতে রাজি ছিল না, কিন্তু তার দাদীর অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে একপ্রকার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলের মাধ্যমে সবাইকে রাজি করানো হয়। বিয়ের মাত্র এক সপ্তাহ না যেতেই তার উপর শুরু হয় সব ধরনের অত্যাচার-শারীরিক, মানসিক, সবকিছু। এমনকি বাড়ির কারও সাথে যোগাযোগ করতেও দেওয়া হয় না তাকে।
একদিন দুপুরে, যখন তার জা এবং শাশুড়ি বাড়িতে ছিল না, সেই সুযোগে কুহু গোপনে তার শাশুড়ির ফোন নিয়ে বাবাকে একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে দেয়। সেই বার্তা পেয়ে তার পরিবারের সবাই মিলে পুলিশ নিয়ে ছুটে আসে এবং কুহুকে রেসকিউ করে নিয়ে যায়। থানায় ওদের পরিবারের নামে একটা কেস দায়ের করা হয়।
থানায় কেস দায়েরের পর পুলিশ যখন তদন্ত শুরু করে, তখন তারা একটা চাঞ্চল্যকর সত্য উন্মোচন করে। জানা যায়, কুহুর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা নারী পাচারের একটা বড় গ্যাংয়ের সাথে যুক্ত। তারা প্রতি মাসে মাসে ছদ্মবেশ পাল্টিয়ে নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত হয়ে যায়, যাতে ধরা না পড়ে। আরও ভয়াবহ যে, কুহুকেও তারা পাচার করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সে ছিল তাদের পরবর্তী শিকার।
পুলিশ এই গ্যাংটাকে ধরার জন্য অনেক খোঁজাখুঁজি করে, কিন্তু প্রথমে কোনো সন্ধান পায় না। অবশেষে, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং গোয়েন্দা তথ্যের সাহায্যে তারা গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরে ফেলে। আদালতে সব প্রমাণ সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করা হয়, এবং অপরাধীদের যথাযথ সাজা দেওয়া হয়।
এরপর কুহুর ডিভোর্স হয়ে যায়, কিন্তু তার এক্স হাসবেন্ড তাকে শাসায়, "আমি ফিরে আসব, কুহু, আমি ফিরে আসব। আর সেই দিন তোর জীবনকে ধ্বংসের স্তূপ করে দেব। তুই তৈরি থাকিস।"
কুহু সেইদিন ভয় পায়নি তার বিরুদ্ধে আরো একটি মামলা করে তবেই সে বাড়ি ফিরে। তার কিছুদিন পর তার দাদী মারা যান। ব্যাস! এর পর থেকে তাদের সংসারে কেমন শোকের ছায়া নেমে আসে। কেউ আর প্রাণখোলে হাসে না।
সবার মাঝেই অদ্ভুত এক নীরবতা আর দূরত্ব বিরাজ করচ্ছে। কুহুও কেমন সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নেয়।
হঠাৎ কাঁধে কারও হাত পড়তে চমকে উঠে কুহু। পিছন পানে ফিরে দেখে তার মা। সে একটু হেসে থতমত গলায় বলল, "কিছু বলবে কি?"
"হুম!"
"বলো শুনচ্ছি।"
"তোর বড়ো চাচা চাইছিলো, তুই আমাদের সাথে এয়ারপোর্টে যা।"
"সরি! আম্মু আমি পারবো না যেতে।"
"কিন্তু কেনো?"
" তুমি তো জানোই এইসব ভিড়-বাট্টা ভালো আমার ভালো লাগে না,তাই। তুমি বরং বড়ো চাচ্চুকে কিছু একটা বলে ম্যানেজ করে নিয়ো।"
"আজ এতোদিন পর রাজ বাড়ি ফিরবে, আর তুই যাবি না,বিষয়টা কেমন দেখায় না।"
"মা, ভাইয়া দেশে ফিরে বাসায়-ই তো আসবেন,তখন না হয় দেখবো,এখন ইচ্ছে করচ্ছে না। প্লিজ!"
"ঠিক আছে যা তুই ভালো বুঝিস, আমি আর কি বলব বল? তোর যা ইচ্ছে, সাবধানে থাকিস।"- কথাটা বলে তিনি দীর্ঘ শ্বাঃস ফেলে বের হয়ে গেলেন কুহু রুম থেকে।
কুহু ফোঁস করে শ্বাঃস নিলো তার মার যাওয়ার পানে তাকিয়ে। মেঘরাজকে সে দেখেছিলো অনেক আগে,এখন তার চেহারাটাও মনে নেই। আর তার দেখার আগ্রহটা ও জন্মাইনি। সে তাকে যমের মতো ভয় পায়। একবার সে মেঘরাজের হাতে বেশ শক্তপোক্ত চড় খেয়েছিলো, এর পর থেকে তার থেকে সে তার সম্মুখে ও যায়নি। মেঘরাজ বেশ রাগী আর গম্ভীর স্বভাবের। ওর বিয়ের সময় ওকে বেশ কয়েকবার আসার জন্য বলা হয়েছিলো কিন্তু তার ছুটি মিলেনি তাই আসেনি। দাদির মৃ'ত্যুর সময় ও আসতে পারেনি। এর নাম হয়তো প্রবাসজীবন।
কুহুর বাবারা দুই ভাই এক বোন। কুহুর ফুফুর বিয়েটা নারায়ণগঞ্জ শহরে হয়েছে। কুহুর বড় চাচার তিন সন্তান-দুই ছেলে ও এক মেয়ে।
বড় ছেলে মেঘ রাজ চৌধুরী, বহু বছর বিদেশে থাকার পর আজ দেশে ফিরছেন। ছোট ছেলে সাগর চৌধুরী, মেধাবী ও উদ্যমী একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সে একটি খ্যাতনামা আইটি কোম্পানিতে কর্মরত এবং প্রযুক্তির জগতে নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই এক বিশেষ পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।
আর একমাত্র মেয়ে নদী চৌধুরী, সাহসী ও সত্যনিষ্ঠ একজন সাংবাদিক। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করা নদী তার নির্ভীক প্রতিবেদন ও ন্যায়ভিত্তিক অবস্থানের জন্য সাংবাদিক মহলে বিশেষভাবে পরিচিত।
কুহু তার বাবার ঘরের একমাত্র মেয়ে তার আর কোনো ভাইবোন নেই।
এখন সে কলেজের ইন্টার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
যদিও কুহুর বাবা ও চাচারা সমাজের নামকরা ব্যবসায়ী, তবু কুহু নিজে খুব সাধারণভাবে জীবনযাপন করে। বিলাসিতা বা আড়ম্বরের ভিড়ে থেকেও সে সরল, বিনয়ী ও মাটির কাছাকাছি এক মেয়ে। কুহু আস্তে করে বেলকনি থেকে রুমে এসে কফির মগটা টেবিলের উপর রেখে পড়ার টেবিলে বসল।
________________________________
কুহুর মা মিসেস সামিনা চৌধুরী হালকা তাড়াহুড়ার ভঙ্গিতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভাইজান, চলুন দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমরা যাই।”
ঠিক তখনই কুহুর বড় চাচা আশরাফ চৌধুরী অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, “সেকি! আমার কুহু মা যাবে না? এতদিন পর মেঘ রাজ ফিরছে, আর ও থাকবে না?!”
সামিনা চৌধুরী একটু বিব্রত হাসি দিয়ে জবাব দিলেন, “ভাইজান, বেয়াদবি মাফ করবেন। ওর নাকি মাথা ব্যথা করছে, তাই যেতে চায় না। বলেছে, আমরা যেন যাই।”
আশরাফ চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৃদু হেসে বললেন, “আচ্ছা, চলো তাহলে রওনা দিই। ওকে বিশ্রাম নিতে দাও।”
তারপর আর দেরি না করে সবাই গাড়িতে উঠলেন।
চৌধুরী বাড়ির সামনে লাল রঙের বিলাসবহুল গাড়িগুলোর সারি একে একে গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেলো এয়ারপোর্টের উদ্দ্যেশে।
নিজের রুমের জানালা দিয়ে ভেসে আসা গাড়ির শব্দে কুহু বুঝতে পারল সবাই এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। বাড়িটা মুহূর্তেই কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করল। নিঃশব্দ নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা লম্বা তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে সে বইটা বন্ধ করে রাখল। পড়ার টেবিল থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসে ল্যাপটপটা হাতে নিল, তারপর বেডের নরম কুশনে হেলান দিয়ে বসল।
ল্যাপটপ অন করে একটা পছন্দের মুভি চালু করল সে। স্ক্রিনে রঙিন আলো ঝলমল করতে শুরু করতেই মুখে হালকা হাসি ফুটল কুহুর। এরপর নিচে নেমে গেল রান্নাঘরে। ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা জুসের বোতল বের করল, তারপর গ্যাসে তেল বসিয়ে চিপস ভেজে নিল নিজের মতো করে। ছোট্ট একটা ট্রে’তে চিপস আর জুস সাজিয়ে নিয়ে আবার নিজের রুমে ফিরে এল।
বেডে বসে কুহু ল্যাপটপটা সামনে রাখল। এক হাতে চিপস তুলে মুখে দিচ্ছে, আরেক হাতে জুসের গ্লাস তুলে নিচ্ছে।
_______________________________________
এয়ারপোর্টের ভিআইপি লাউঞ্জের সামনে দাঁড়িয় আছে চৌধুরী পরিবারের সবাই। অপেক্ষা করচ্ছে মেঘরাজ চৌধুরীর জন্য।
অবশেষে, কাচের দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে সোনালি রঙের ট্রলি টেনে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো এক লম্বা, সুঠামদেহী যুবক। চোখে কালো সানগ্লাস, গায়ে ধূসর ব্লেজার, ভিতরে সাদা শার্ট হালকা খোলা গলার বোতাম থেকে যেন একরকম রাফ্ চার্ম ছড়িয়ে পড়ছে। ছয় ফুট উচ্চতা, তীক্ষ্ণ চোয়াল, ঘন দাড়ির রেখা, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি এক কথায় একদম হট আর ক্লাসি লুক। এমন চেহারা দেখলে প্রথমেই যে শব্দটা মাথায় আসে তা হলো—“পারফেক্ট ম্যান!”
লাগেজ হাতে সবার সামনে এগিয়ে এসে, সালাম দিলো সে। অতঃপর সে তার বাবাকে সবার আগে জড়িয়ে ধরল।
"আলহামদুলিল্লাহ, বাবা কেমন আছেন?"
আশরাফ চৌধুরীর চোখে জল টলমল করে উঠল, কণ্ঠ ভারী হয়ে বললেন,“ভালো আছি বাবা অনেকদিন পর তোকে সামনে দেখছি।”
এরপর জড়িয়ে ধরল তার ছোট চাচা ও তার ভাই সাগরকে। নদী এগিয়ে এল চোখে পানি, মুখে হাসি। ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে।
সবশেষে এগিয়ে এলেন সামিনা চৌধুরী—যিনি মেঘ রাজ ও বাকি ভাইবোনদের কোলেপিঠে মানুষ করেছেন। নিজের সন্তান না হয়েও মাতৃত্বের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছেন এই ঘরের সন্তানদের জন্য।
মেঘ রাজ মৃদু হাসি দিয়ে ওনার সামনে দাঁড়াল, তারপর হঠাৎ করেই তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
“আম্মুনি আপনি কেমন আছেন ?”
সামিনা চৌধুরী চোখ মুছে হেসে উত্তর দিলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?”
“আলহামদুলিল্লাহ, আমিও ভালো আছি।”
লাগেজগুলো ট্রলি থেকে নামিয়ে একে একে গাড়িতে তুলল সে। পরিবারের সবাই উঠল নিজ নিজ আসনে।
মেঘ রাজ পেছনের সিটে বসল, একবার জানালার বাইরে তাকাল রাতের বাতাস মুখে লাগছে, আকাশে আধোচাঁদ, শহরের আলো ঝিকমিক করছে দূরে।
অনেকদিন পর দেশে ফেরা, অনেকদিন পর নিজের মানুষগুলোর স্পর্শ।
গাড়ি যখন ধীরে ধীরে এয়ারপোর্ট ছাড়ছে, তখন মেঘ রাজের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল।
#খুলে_দেও_এই_হৃদয়ের_প্রণয়ের_দ্বার
#নূরজাহান
#সূচনা_পর্ব
(রেসপন্স পেলে কন্টিনিউ করবো, না হলে এইখানেই বন্ধ করবো)