30/06/2026
ঘুমন্ত অবস্থায় হুট করে মুখের উপর পানি পড়ায় ধরফরিয়ে উঠে বসলো মেয়েটা। কিছু পানি নাকে মুখে ঢুকে কাশি উঠলো। শীতের সকাল তার উপর আবার বরফ শীতল ঠান্ডা পানির স্পর্শে থরথর করে কেঁপে উঠলো পুরো কায়া। বেশ কসরত করে নিজেকে সামলে নিলো। কাশতে কাশতে চোখের কোণে জমা হলো পানি। শ্বাস নিলো জোড়ে জোড়ে। এই বুঝি দম টা বেড়িয়ে যাবে। ঠান্ডা পানি গায়ে পড়ায় দেহের কাঁপন বাড়লো বই কমলো না। গায়ের জড়ানো ভেজা শাড়ির আঁচল দিয়েই শীত নিবারনের ক্ষুদ্র চেষ্টা করলো। ভয়ে ভয়ে মাথা তুলে দেখলো সামনে তার শ্বাশুড়ি র'ক্তলাল চোখে তাকিয়ে আছে। শ্বাশুড়ির এমন চোখ দেখেই ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো রমণীর। সহসা মাথা নিচু করে ফেললো সে। বুঝলো আজ তার নিস্তার নেই।
সামনে দাঁড়ানো হোসনা বেগম হাতের মগটা বেশ শব্দ করে ফ্লোরে ফেললেন। সেই শব্দে চোখটা খিচে বন্ধ করে ফেললো ভীতু মেয়েটা। হোসনা বেগম ছেলের বউয়ের দিকে এগিয়ে এসে শক্ত হাতে তার চুলের মুঠি টেনে ধরলেন। রা'গে হিসহিসিয়ে বললেন
"জমিদারের বাচ্চা এখনও পড়ে পড়ে ঘুমালে বাড়ির কাজ গুলো করবে কে? ছেলে বিয়ে দিয়ে বউ এনেছি কি আরাম আয়েশ করে থাকার জন্য? তোকে ডাকতে আমাকে আসতে হলো কেনো বল?"
চুলে অতিরিক্ত টান পড়ায় মেয়েটার মুখের আদল খানি ব্যাথায় নীল বর্ণ ধারণ করলো। কান্না গুলো নিজের ভেতর গিলে নিয়ে নিচু স্বরে বললো
"রাতে জ্বর এসেছিলো আম্মু। একটু ও ঘুমাতে পারি নি। ভোরের দিকে চোখটা একটু লেগে এসেছিলো এইজন্যই উঠতে দেরি হয়ে গেছে।"
"মিথ্যা কথা বলার জায়গা পাশ না। তাছাড়া জ্বর আসলে মানুষ ম'রে যায় না। শুধু কাজে ফাঁকি দেওয়ার ধান্দা তোর। কি ভেবেছিস এসব বলবি আর আমিও তোকে তুলো তুলো করে রাখবো?"
সহসা মেয়েটা দুপাশে মাথা নাড়ালো। বুজে আসা স্বরে বললো
"বিশ্বাস করুন আম্মু আমি কোনো মিথ্যা বলছিনা। রাতে অনেক জ্বর এসেছিলো। আমাকে বিশ্বাস না করলে আপনার ছেলেকে জিজ্ঞেস করুন।"
হোসনা বেগম ধমকে উঠলেন। চুলের মুঠি আরো শক্ত করে ধরে বললেন
"খবরদার নেকামো করবি না। ভাবিস না তোর এই চোখের জলে আমি গলে যাবো। আর কথায় কথায় আমার ছেলেকে টানিস কেনো? এমন শিক্ষা দেবো না নিজের নাম ও ভুলি যাবি বে*শ্যা কোথাকার।"
অপমানে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেললো রমণী। সে সবকিছু সহ্য করতে পারলে ও এমন জ*ঘন্য গা*লি সহ্য করতে পারে না। অপমানে ম*রে যেতে ইচ্ছে করে। তবুও শ্বাশুড়ির মুখের উপর দুটো কথা বলার সাহস করে উঠতে পারলো না সে। পরে যদি এর থেকে বাজে কোনো ভাষায় গালি দেয় সেই ভয়ে।
"এমন সঙয়ের মতো বসে আছিস কেনো? রান্নাবান্না,ঘরের কাজ এগুলো কি তোর বাপের বাড়ির লোকেরা এসে করবে? ওঠ।"
মেয়েটাকে একপ্রকার ধাক্কা মে'রে সরে দাঁড়ালো হোসনা। শ্বাশুড়ির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে চুপচাপ উঠে দাঁড়ালো সে। পাশ ফিরে একবার স্বামী নামক মানুষটার দিকে তাকালো। যে ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে। এসব দিকে তার কোনো খেয়াল নেই। অবশ্য খেয়াল থাকবেই বা কেনো? তার কাছে তো বউ মানে রাতের বেলার সঙ্গী আর দিনের বেলার দাষী।
মেয়েটা আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। শ্বাশুড়ি তখনও দাঁড়িয়ে। মেয়েটাকে যেতে না দেখে পুনরায় ধমকে বললো
"এখনও যাচ্ছিস না কেনো?"
মেয়েটা ভয়ে ভয়ে বললো
"আম্মু শাড়িটাতো ভিজে গেছে। পাল্টে আসি। অনেক শীত করছে।"
"করুক শীত। অতো পাল্টা পাল্টির দরকার নেই। বাপের বাড়ি থেকে কয়টা কাপড় আনিস যে এতো বাহাদুরি তোর। সেই তো আমার ছেলের ঘাড়ে বসে কাঁঠাল ভেঙে খাস।"
শ্বাশুড়ির এতো অপমান, লাঞ্ছনা, খোঁচা মূলক কথা কোনোটারই কোনো উত্তর দিলো না মেয়েটা। নিজের ভেতর ক'ষ্ট গুলো চেপে চুপচাপ পা বাড়ালো রান্নাঘরের দিকে। তখনও ভেসে আসছে শ্বাশুড়ির খোঁচা মূলক বিষবাক্য।
"ভাব খানা দেখো মনে হয় কোনো নবাবের বেটি। সেই তো বাপের অমন কাঠের বাড়ি। ভিখিরির জাত। তার আবার অতো ফুটানি আসে কোথার থেকে? ওর তো সাত কপালের ভাগ্যে আমার সোনার টুকরো ছেলের মতো একটা বর জুটেছে। না হলে কোন বস্তিতে গিয়ে কপাল ঠুকতো ঠিক আছে।"
রান্না ঘরের কাজ করতে করতে শ্বাশুড়ির সব কথায় শুনতে পেলো মেয়েটা। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা পানি। পানি টুকু আঙুলের আগায় নিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ। মুখে ফুটে উঠলো তাচ্ছিল্যের হাসি। বিরবির করে বললো
"মা দেখো আমি সুখে আছি। বড্ড সুখে আছি। তোমরা আমাকে এমন সুখের সন্ধান দিলে এর ভাড় বহন করার মতো সাধ্য যে এই অধমের নেই। এখন কি করি বলো তো?"
নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে পেলো না। মেয়েটা। ব্যর্থ হয়ে পানিটুকু টোকা দিয়ে ফেলে দিলো। নিজের সকল অবাধ্য অনুভূতিকে গলা চেপে দাফন করে মন দিলো তথাকথিত সংসার নামক জেলখানায়। যার ভার বহন করতে হয় প্রতিটা মেয়েকে। যেখানে নেই কোনো সম্মান। নেই কোনো ইচ্ছে, শখ,আহ্লাদ, আবদার,ভালো লাগা, খারাপ লাগা। আছে শুধু এক বোঝা দায়িত্ব,কর্তব্য আর দিনশেষে প্রাপ্তিস্বরূপ অপমান, লা'ঞ্ছনা আর বি'ষবাক্যের দিয়ে হৃদয়ের গভীর ক্ষ'তবিক্ষত করার মতো ধারালো অ'স্র।
কঙ্কনা রেমান। বাবা মায়ের মেজো সন্তান। জন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে হলেও তিন ভাই বোনের ভরণপোষণের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তাদের প্রায়ই অভাব অনটনে পড়তে হয়। ফলস্বরূপ ইচ্ছে থাকলেও কোনো প্রকার আবদারের সুযোগ থাকে না। পরিবারের দিকে তাকিয়ে প্রায় সময়ই নিজের শখ গুলোকে নিজের ভেতরই গিলে নিতে হয়। প্রকাশ করার সাহস কিংবা সুযোগ কোনোটাই হয় না।
ছোটবেলা থেকেই কঙ্কনার স্বপ্ন বড় হয়ে একজন বড় মাপের লেখক হওয়ার। বাংলাদেশের মানুষ তাকে জানবে,তার লেখা গুলো পড়বে,সেখান থেকে সামান্য পরিমাণ হলেও জ্ঞান অর্জন করে নিজেদের জীবন বদলাবে এটাই তার একমাত্র লক্ষ্য। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর যখন একটু বুঝদার হলো তখনই প্রায়শই স্কুলের লাইব্রেরীতে গিয়ে অসংখ্য বই পড়তো। মাঝে মাঝে সেগুলো বাড়িতেও নিয়ে আসতো। কিন্তু মায়ের ভয়ে পড়ার সাহস পেতো না। রাতের বেলা সবাই ঘুমিয়ে পড়লে চুপিচুপি পড়তো আবার সকাল হলে সেগুলো নিয়ে লাইব্রেরীতে রেখে আসতো। এভাবেই তার দিন পার হচ্ছিল। নিজের একাডেমিক পড়াশোনা, চাঞ্চল্যে,দুষ্টুমি আর দিনশেষে কালজয়ী লেখকদের লেখা বই পড়ে সময় কাটতো। কঙ্কনার সবচেয়ে প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ। এই লেখক তার কাছে আইডল সমতুল্য। কঙ্কনা চেষ্টা করে তাকে অনুসরণ করতে। তার লেখা ধরণ রপ্ত করতে। তার লেখা প্রতিটা বই সে কয়েকবার করে পড়ে শেষ করে ফেলেছে। তবুও যেনো তৃষ্ণা মেটে না। সময় পেলে,মন খারাপ হলে,বিষন্ন বিকেলে,একাকী সময়ে যখন তখন হুট হাট করে তার লেখা বই গুলো পড়ে। প্রতিটা লাইন মন দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করে। কঙ্কনার এমন বই পড়ুয়া স্বভাব দেখে স্কুলের সবাই তাকে বই পোকা বলে ডাকতো। স্যারও মাঝে মাঝে মজা করে বলতো কঙ্কনাকে বইয়ের সাগরে ডুবিয়ে দিলেও বোধহয় সে ডুববে না। উল্টে খুশি হয়ে মনের আনন্দে নিজেকে বইয়ের মাঝে বিলিয়ে দিবে। কঙ্কনা সেসব কথা শুনে শুধু হাসতো। কঙ্কনার সবচেয়ে বড় গুন হলো সে কখনো কারোর সঙ্গে তর্কে জড়ায় না। চুপচাপ সরে আসে। তার মতে তর্ক করে বোকারা। কুকুর কা'মড় দিলে যদি মানুষও কুকুরকে পাল্টা কা'মড়ে দেয় সেই বোকামির মতোই বলদামি পৃথিবীতে আর একটাও নেই। কঙ্কনা সর্বোদা চেষ্টা করে নিজের কাজ,নিজের যোগ্যেতা দিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার। শুধু শুধু তর্ক করে মূর্খতার পরিচয় দেওয়া তার ধাচে নেই।
এভাবেই সময় সময়ের মতো যেতে লাগলো। কঙ্কনাও ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো। প্রাইমারির গন্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক এরপর মাধ্যমিক এভাবেই সময় পার হতে লাগলো। বন্ধুত্বের শূন্য খাতায় হুট করেই যুক্ত হলো একটা নাম লুনা। কঙ্কনার এক এবং একমাত্র সখী। লুনা মেয়েটা বড্ড মিশুকে চঞ্চল। মুখ দিয়ে যেনো তার খই ফুটে। মানুষকে খুব সহজেই আপণ করে নিতে পারে। সেভাবেই চুপচাপ, ইন্ট্রোভার্ট, শান্ত মেয়েটার মন জয় করেছিলো। বন্ধুত্বের মতো পবিত্র বন্ধন তৈরি করেছিলো।
সময়ের তালে কঙ্কনা ও বড় হয়ে উঠলো। হুট করে ইচ্ছে হলো লেখালেখির। বড় ভাইয়ের ফোন নিয়ে চুপিচুপি ফেসবুকেই শুরু করলো লেখালেখির যাত্রা। প্রথম প্রথম পরিচিতি না পেলেও ধীরে ধীরে তার লেখা মানুষে পড়তে লাগলো। পাঁচট লাইক থেকে দশটা এরপর পঁচিশটা এভাবে বাড়তে লাগলো। সময়ের তালে তার লেখালেখির জীবনও সুন্দর ভাবে চলতে লাগলো। আর তাকে পুরোপুরি সাপোর্ট করতো তার সখী লুনা।
কঙ্কনার এই সাধারণ জীবনের মাঝে হঠাৎ করেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতো উদয় হলো বিয়ে নামক শব্দ। বড়লোক ছেলে পেয়ে বাবা মা আর দ্বিমত করলেন না। কঙ্কনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে বিয়ে দিয়ে দিলো আহানের সঙ্গে। সেই থেকেই কঙ্কনার জীবন থমকে গেলো। জেলখানার গন্ডিতে বন্দী হলো তার সকল ইচ্ছে। লেখালেখির যাত্রা সমাপ্তিও ঘটল তখন। নিজের ইচ্ছে, স্বপ্ন গুলোকে দাফন করে সমাজ এবং পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য দিনের পর দিন অবহেলা,অযত্ন আর অপমানে পড়ে রইলো স্বামী নাম অমানুষের বাড়িতে। সেই সংসারের বয়স এখন দুই এ এসে ঠেকেছে। এই দু'বছরে শ্বশুর বাড়ি কতো অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করেছে কঙ্কনা। কখনো বাবা মায়ের কাছে বলে নি। একদিন না পেরে মাকে বলেছিলো। তার মা তাকে উল্টো দোষারোপ করে বলেছিলো মেয়ে মানুষের জীবনই এমন। একটু মানিয়ে চলবি না। এতো অধৈর্য্যে হলে চলবে। মন দিয়ে সংসার কর। সেদিনের পর কঙ্কনা আর টু শব্দটি করে নি। মুখ বুজে সব সহ্য করে পড়ে রইলো সংসারে।
রান্না করতে করতে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে গিয়ে কঙ্কনার মনে আবারও পুরনো ঘা জেগে উঠলো। নিজের স্বপ্নকে পূরণ করতে না পারার ব্যর্থতা তাকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়। তবুও মেয়েটা কিছু বলে না। স্বামীর কাছে একদিন একটা স্মার্ট ফোনের আবদার করেছিলো। সেদিন আহান তাকে অমানুষের মতো মে'রে বলেছিলো তার কোনো যোগ্যতাই নেই স্মার্ট ফোন ব্যবহার করার। দ্বিতীয় বার যেনো তার মুখ থেকে এসব কথা বের না হয়। সেই থেকে কঙ্কনা আর নিজের ইচ্ছের কথা বলে না। চুপচাপ সয়ে নেয়।
"কি রে নবাবের বেটি রান্না কতোদূর? আজ কি কপালে খাবার কিছু জুটবে নাকি না খেয়েই থাকতে হবে।"
পেছন থেকে শ্বাশুড়ির কন্ঠ শুনে চমকে উঠলো কঙ্কনা। দ্রুত হাত চালিয়ে বললো
"হয়ে গেছে আম্মু। আপনারা টেবিলে গিয়ে বসুন আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।"
" সামান্য রান্না তাই করতে এতো দেরি। বাকি কাজ গুলো কখন শেষ করবি?"
"রান্না শেষ করেই বাকি কাজ গুলোও করে ফেলবো আম্মু।"
"সব কাজ যেনো ঠিকঠাক হয়। নাহলে কিন্তু সেদিনের মতো হাতে গরম খুন্তির ছ্যাকা দিয়ে কাজ কাকে বলে শিখিয়ে দিবো।"
সেদিনের কথা মনে হতেই কঙ্কনার আঁতকে উঠলো। নিজের হাত দুটো শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে কাঁপা স্বরে বললো
"কোনো ভুল হবে না আম্মু। আমি সাবধানে কাজ করবো।"
হোসনা বেগম ছেলের বউয়ের দিকে বিরক্তির চোখে তাকিয়ে নিজের মতো বকবক করতে করতে চলে গেলো। আর কঙ্কনা ব্যস্ত হয়ে পড়লো সংসার নামক জেল খানার দায়িত্ব সামলাতে।
চলবে?
#কঙ্কনার_স্বপ্নসিঁড়ি
#সূচনা_পর্ব
#উম্মে_হাবিবা
তোমাদের রেসপন্স পেলে লিখবো নাহলে হয়তো এখানেই স্টপ করবো😔❤️🩹