26/06/2026
রাধানগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বাজারের #ইতিবৃত্ত
মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলাধীন কাদিরপাড়া ইউনিয়ন-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হলো রাধানগর বাজার। এটি আশপাশের রাধানগর, পুকুড়িয়া, মাঙ্গনডাঙ্গা, কাদিরপাড়া, বরালিদহ, ঘাসিয়াড়া ও অন্যান্য গ্রামের মানুষের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষিপণ্য, মাছ, সবজি এবং বিভিন্ন ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাজারটি সপ্তাহজুড়েই সচল থাকে এবং স্থানীয় যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
রাধানগর গ্রাম কেবল একটি বাজার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই পরিচিত নয়; এটি কাদিরপাড়া ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ। স্থানীয় জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, গ্রামটির বিকাশে স্থানীয় জমিদার ও সমাজসেবী পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বহু বছর ধরে রাধানগর বাজার আশপাশের গ্রামের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত। ধান, পাট, সবজি, মাছ, গবাদিপশু এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বেচাকেনা এখানে হয়ে থাকে। বর্তমানে বাজারের পরিধি বেড়েছে এবং নানা ধরনের ব্যবসা গড়ে উঠেছে।
রাধানগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়
রাধানগর নামের সঙ্গে স্থানীয় রাধাকান্ত জিউ মন্দিরের ঐতিহ্যের সম্পর্ক রয়েছে বলে ঐতিহাসিক সূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে এখানেই বাজার, বিদ্যালয় ও ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়, যা গ্রামটিকে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে।
রাধানগরের ইতিহাস মূলত কাদিরপাড়া জমিদার (মুন্সি) পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বর্তমানে যে রাধানগর বাজার, বিদ্যালয় ও ডাকঘরকে আমরা চিনি, তার পেছনে প্রায় তিন শতাব্দীর একটি ধারাবাহিক বিকাশ রয়েছে।
১৭শ শতকে মজুমদার রাজীবলোচন দাস জলদস্যুদের আক্রমণের কারণে বর্তমান ঝিনাইদহ অঞ্চলের শৈলকুপা ছেড়ে প্রথমে দারিয়াপুর এবং পরে কাদিরপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। তিনিই কাদিরপাড়া মুন্সি পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত।
তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে মুন্সি বলরাম দাস এবং রামরাম দাস তৎকালীন রাজা সীতারাম রায়–এর আস্থা অর্জন করেন। তাঁদের বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে বিলপাকুড়িয়া তালুক লাভ এবং পরবর্তীতে কাদিরপাড়া জমিদারির ভিত্তি স্থাপিত হয়।
জমিদার পরিবার তাদের গৃহদেবতা রাধাকান্ত জিউ-এর নামে রাধানগর গ্রামের নামকরণ করে। রাধানগর বাজারের বিকাশকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা যায়—
অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকের জমিদারি যুগে কৃষিপণ্য, পাট, ধান, গরু-ছাগল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ছোট হাট হিসেবে যাত্রা। ব্রিটিশ আমলে ডাকঘর, বিদ্যালয় ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে বাজারের গুরুত্ব বাড়ে; আশপাশের বহু গ্রামের মানুষ এখানে কেনাবেচা করতে আসতেন। স্বাধীনতার পর দোকানপাট, ফার্মেসLালকল, সার-বীজের দোকান, ব্যাংকিং ও অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়। বর্তমানে পাকা সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়নের ফলে রাধানগর বাজার কাদিরপাড়া ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
রাধানগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ঠিক পাশ দিয়ে যে নদীটি বয়ে গেছে, সেটি স্থানীয়ভাবে "হানু নদী" নামে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা এই নামেই নদীটিকে চেনেন। সরকারি অনেক মানচিত্রে এটি ছোট নদী বা খাল হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং "হানু নদী" নামটি সব সময় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয় না।
প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী হানু নদী একসময় অনেক প্রশস্ত ও নাব্য ছিল। তখন হাটের দিনে নৌকায় মানুষ ও কৃষিপণ্য আসত। স্কুলের শিক্ষার্থীরাও অনেক সময় নৌকায় পারাপার করত। বর্ষাকালে নদীতে মাছ ধরা ও নৌকা চলাচল ছিল খুবই সাধারণ দৃশ্য। বর্তমানে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ এবং নদীতে পলি জমার কারণে এর নাব্যতা ও প্রবাহ নেই বললেই চলে।
রাধানগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ১৯৬৪ সালে। প্রয়াত ভোলানাথ কুণ্ডু, ফায়েক উদ্দিন মোল্যা এবং কোয়াত আলি শেখের জমিদানে এবং স্থানীয় আব্দুস সালাম মিয়া (বরালিদহ), আক্তার হোসেন মিয়া (বরালিদহ), চিত্তরঞ্জন সরকার (বরালিদহ) ও কবির উদ্দিন আহমেদ (কাদির পাড়া) এর উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বিদ্যালয়ের দক্ষিণ ও পূর্বপাশে নাকোল ইউনিয়নের বরালিদহ গ্রাম এবং উত্তর ও পশ্চিম পাশে কাদিরপাড়া ইউনিয়নের রাধানগর বাজার ও রাধানগর গ্রাম। বিদ্যালয়টি ২ একর ১৪ শতক জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে শিক্ষক বর্তমানে ১৬ জন এবং কর্মচারী ৬ জন। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, বানিজ্য ও মানবিক বিভাগে চার শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। এবং এই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে উজ্জ্বল কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। ২০০৩ সালে এই বিদ্যালয়ের ৫২ জন শিক্ষার্থী বিসিএস ক্যাডারসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। প্রকৌশলী হাসান শওকত, খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হুসাইন শওকত, পুলিশ সুপার সুভাষ সাহা, ডাঃ দেবাশীষ সাহা, প্রকৌশলী পলাশ সাুহা, ডাঃ নির্মল কুমার বিশ্বাস, ডাঃ শোভন রাহুত, ডাঃ পান্না লাল সাহা, প্রকৌশলী নৃপেন সাহা, প্রকৌশলী মিলন কুমার সাহা, প্রফেসর দীপঙ্কর কুণ্ডু, ডাঃ খন্দকার মাসুম, ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) আসাদুজ্জামান, ডাঃ সুবর্ণা সাহা, প্রকৌশলী সুমন সাহা, প্রকৌশলী মানবেন্দ্র সাহা, প্রকৌশলী সুনীল কুমার দাস, ডাঃ অরুন্থিয়া সোমা, প্রকৌশলী শুভাশিস সাহা, প্রফেসর সুভাষ চন্দ্র রাহুত, প্রফেসর বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস, ব্যাংক এজিএম আসাদুজ্জামান, আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার সাহা, শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ কামরুজ্জামান মিলন প্রমুখ উজ্জ্বল মুখ রাধানগর বিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থী।
রাধানগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম সভাপতি ছিলেন বরালিদহ গ্রাম এর সন্তান মোঃ আক্তার হোসেন। প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন বরালিদহ গ্রামের বাসিন্দা মসিহুল আজম। বর্তমান প্রধান শিক্ষক এর দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ নওয়াব আলী। কাদিরপাড়া, রাজানগর, পুকুরিয়া, মাঙ্গনপাড়া, বরালিদহ, ঘাসিয়াড়াসহ পার্শ্ববর্তী আরো কয়েকটি গ্রামের শিক্ষার্থীরা এই বিদ্যালয়ের পাঠ গ্রহন করে। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আন্তঃহাউজ ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান মেলা, পিঠামেলা, পহেলা বৈশাখ, সরস্বতী পূজা এবং ঈদে মিলাদুন নবী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে।
তথ্যপ্রদান:
মোঃ নওয়াব আলী, প্রধান শিক্ষক, রাধানগর মাধ্যমিক বিঃ
সাজেদা খাতুন
নির্মল কুমার বিশ্বাস ও
মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র শিক্ষক
বাজারের তথ্যগ্রহণ: উইকিপিডিয়া
#রাধানগর_মাধ্যমিক_বিদ্যালয়
#রাধানগর_বাজার
#হানু_নদী
#কাদিরপাড়া
#শ্রীপুর_মাগুরা
#মাগুরা
#লোকঐতিহ্য
#গ্রামীণ_ইতিহাস
#বাংলার_নদী
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ : Uzzal Hossain