27/07/2026
শিক্ষকদের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান/ মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আইনগতভাবে বাঁধা নেই অর্থাৎ
অযোগ্য নয়। মফিজুল হক বনাম মফিজুর রহমান এবং অন্যান্য মামলায় রায়ের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির বিশেষ করে, "স্থানীয় কর্তৃপক্ষ" (Local Authority) এবং "লাভজনক পদ" (Office of Profit)-এর আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই নজিরটি খৃবই গুরুত্বপূর্ন। এই সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় আজ আলোচনা করবো। আইনের শিক্ষার্থী, গবেষণা, আইনজীবী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও সাধারণ নাগরিকদের জানার সুবিধার্থে আলোচনা করবো।
♈মফিজুল হক বনাম মফিজুর রহমান এবং অন্যান্য।
♈রায়ের তারিখ: ০৭/০৩/১৯৯৬
♈মাননীয় বিচারপতি এ.টি.এম. আফজাল, সি.জে., মোস্তফা কামাল, লতিফুর রহমান এবং মোহাম্মদ আবদুর রউফ(আপিল বিভাগ)
✅ঘটনার পটভূমি (Fact of the Case)
বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ থানাধীন হোগলাপাশা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন (অনুষ্ঠিত: ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২)।
ফলাফল: আপীলকারী মফিজুল হক উক্ত নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হন এবং ৫ মার্চ ১৯৯২ তারিখে সরকারি গ্যাজেটের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশিত হয়।
🔴মফিজুল হক একই সাথে 'সম্মিলনী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়'-এর পূর্ণকালীন প্রধান শিক্ষক (Headmaster) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। উক্ত বিদ্যালয়টি যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন একটি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
🔴মফিজুর রহমান, যিনি ঐ ইউনিয়নের একজন ভোটার) দাবি করেন যে, ১৯৬১ সালের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধ্যাদেশের সাথে ১৯৮৩ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশের ধারা ৭(২)(ই) পাঠ করলে স্পষ্ট হয় যে, বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকতা করা মানে একটি "স্থানীয় কর্তৃপক্ষ"-এর অধীনে পূর্ণকালীন লাভজনক পদে (Full-time Office of Profit) অধিষ্ঠিত থাকা।
🔴অতএব, মফিজুল হক চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার জন্য আইনিভাবে অযোগ্য (Disqualified) ছিলেন এবং তথ্য গোপন করে প্রার্থী হয়েছিলেন।
🔴মফিজুল হক কোন কর্তৃত্ববলে (Under what authority) চেয়ারম্যান পদ দখল করে আছেন, তা দর্শানোর জন্য Quo Warranto এবং Mandamus প্রকৃতির রুল জারির আর্জি জানানো হয় এবং তাকে পদ থেকে অপসারণের আবেদন করা হয়।
✅রিট পিটিশনারের বক্তব্য (বিবাদী পক্ষ/রেসপন্ডেন্ট):
বেসরকারি হলেও বিদ্যালয়টি ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ ও সরকারি বিধিমালা দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত। সরকার শিক্ষকদের বেতনের বড় অংশ (৮০%) ও ভাতা প্রদান করে।
✅১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ধারা ৩০(১)(বি) অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীরা কোনো স্থানীয় বা আইনসভা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। ফলে বিদ্যালয়টি একটি 'সংবিধিবদ্ধ সংস্থা' বা 'স্থানীয় কর্তৃপক্ষ' এবং প্রধান শিক্ষক পদে থেকে নির্বাচন করা আইনত অবৈধ।
✅হাইকোর্ট বিভাগে চেয়ারম্যানের পক্ষে বক্তব্য হচ্চে, বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ বেসরকারি এবং জনগণের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত; বোর্ড থেকে কেবল শিক্ষা সংক্রান্ত "স্বীকৃতি" (Recognition) দেওয়া হয়েছে। জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট (General Clauses Act, 1897)-এর ধারা ৩(২৮) অনুযায়ী "স্থানীয় কর্তৃপক্ষ" হতে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে সরকার কর্তৃক কোনো আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়।
✅বিদ্যালয় কোনো সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা নয়, তাই তিনি ৭(২)(ই) ধারার অধীনে অযোগ্য নন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে পরাস্ত প্রার্থীর সমর্থক কর্তৃক পূর্বের রিট ও ট্রাইব্যুনালের তথ্য গোপন করে এই মামলা করা হয়েছে।
✅হাইকোর্ট বিভাগের রায় (High Court Division Judgment): হাইকোর্ট বিভাগ রিট আবেদনকারীর পক্ষে রায় দেন এবং Abdul Mazid Vs. Abu Zaffar Mohammad Khalil [14 BLD 488] মামলার নজির উল্লেখ করে বলেন যে, বেসরকারি স্কুল শিক্ষকও "স্থানীয় কর্তৃপক্ষের" অধীনস্থ পদে থাকেন।
🔴রুল 'Absolute' ঘোষণা করে আপীলকারী মফিজুল হককে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ (Unseated) করা হয়।
✅আপিলে বিভাগে চেযারম্যান হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগ থেকে 'Leave to Appeal' নিয়ে সিভিল আপীল নং ৬০/১৯৯৫ দায়ের করেন
✅আপীলকারীর পক্ষে আইনজীবীর বক্তব্য: হাইকোর্ট বিভাগ আইনের গুরুতর ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে রায় দিয়েছেন। শিক্ষা বোর্ড নিজে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হতে পারে, কিন্তু বোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কোনো বেসরকারি বিদ্যালয় নিজে 'স্থানীয় কর্তৃপক্ষ' হয়ে যায় না। General Clauses Act-এর ৩(২৮) ধারা হাইকোর্ট সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
✅রেসপন্ডেন্ট/পিটিশনারের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী বক্তব্য : সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদের আলোকে সর্বজনীন শিক্ষা বাস্তবায়নে সরকার এসব বিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ ও সিংহভাগ অর্থায়ন করে। তাই আইনি কাঠামোর দিক থেকে এটি সরকারেরই একটি বর্ধিত অংশ এবং কার্যতঃ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
✅আপিল বিভাগের Observation: প্রধান বিচারপতি এ.টি.এম. আফজালের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ অত্যন্ত সুস্পষ্ট আইনি বিশ্লেষণ প্রদান করেন:
🔴সংবিধিবদ্ধ সংস্থা (Statutory Body) বনাম সংবিধিবদ্ধ নিয়ম দ্বারা চালিত সংস্থা। আদালত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের Vaish Degree College (AIR 1976 SC 888) মামলার নীতি উদ্ধৃত করে বলেন—"আইনের মাধ্যমে জন্ম লাভ করা" আর "জন্মের পর আইনের নিয়ম দিয়ে পরিচালিত হওয়া"—এ দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
🔴বেসরকারি স্কুল আইনের মাধ্যমে জন্ম নেয় না, কেবল পরিচালনার জন্য সরকারি নিয়ম মেনে চলে। তাই এটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা local authority নয়।
🔴জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এর ৩(২৮) ধারার সঠিক ব্যাখায় "Local Authority' হতে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে "সরকার কর্তৃক গঠিত বা প্রতিষ্ঠিত" হতে হবে। কেবল 'Non-Government' শব্দটিই প্রমাণ করে এটি সরকার দ্বারা গঠিত নয়।
🔴১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ধারা ৩০(১)(বি) কেবল শিক্ষকদের একটি চাকুরীর আচরণবিধি বা শর্ত (Condition of service)। এটি ভঙ্গ করলে বিভাগীয় শাস্তি হতে পারে, কিন্তু এটি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সরাসরি প্রার্থীর অযোগ্যতা (Disqualification) সৃষ্টি করে না।
🔴হাইকোর্ট সরাসরি "অপসারণ" (Unseated) করার আদেশ দিয়ে ভুল করেছিলেন; Quo Warranto রিটে আদালত কেবল পদটি আইনি কি না তার "ঘোষণা" (Declaration) দেন, সরাসরি সরাতে পারেন না।
✅আপিল বিভাগের রায়: আপীল বিভাগ কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে আপীল মঞ্জুর (Appeal Allowed) করা হলো। হাইকোর্ট বিভাগের রায় ও আদেশের কার্যকারিতা বাতিল ও রহিত করা হলো।
Abdul Mazid Vs. Abu Zaffar Mohammad Khalil (14 BLD 488) মামলার ভুল সিদ্ধান্তকে বাতিল/রদ (Overruled) ঘোষণা করা হলো।
✅স্পষ্টভাবে বলা যায়, বেসরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান বা মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আইনগতভাবে অযোগ্য নন।
তথ্য: সিভিল আপিল নং ৬০/১৯৯৫।
ালত, ,