05/05/2026
নিয়ন্ত্রণহীনতায় দেশের রোগ নির্ণয় খাত: বিপাকে ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টরা, নেই সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মেরুদণ্ড বলা হয় রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনস্টিক সেক্টরকে। কিন্তু এই খাতের কারিগর যারা—সেই ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টদের নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে আজও কোনো সুনির্দিষ্ট কাউন্সিল বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে পেশাগত নিবন্ধন ও জবাবদিহির অভাবে একদিকে যেমন টেকনোলজিস্টরা চরম হতাশায় ভুগছেন, অন্যদিকে ঝুঁকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য।
নেই সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ, বাড়ছে বেকারত্ব
বর্তমানে দেশে কতজন ডিপ্লোমা বা গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাবরেটরি) রয়েছেন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান বা ডাটাবেজ নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা না থাকায় বিদেশের মতো এখানে পেশাগত লাইসেন্সিং বা নিবন্ধনের ব্যবস্থা নেই। এর ফলে অদক্ষ জনবল দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি পরিচালনার অভিযোগ উঠছে, যা ভুল রিপোর্টের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করে কয়েক হাজার গ্র্যাজুয়েট টেকনোলজিস্ট এখন কর্মসংস্থানের অভাবে দিশেহারা।
প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ল্যাবরেটরি মেডিসিন (NILMRC)
ল্যাবরেটরি সেবার মানোন্নয়ন ও পেশাজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ল্যাবরেটরি মেডিসিন এন্ড রেফারেল সেন্টার' (NILMRC) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বড় প্রত্যাশা ছিল, প্রতিষ্ঠানটি দেশের ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টদের জন্য উচ্চতর ট্রেনিং এবং পেশাগত রেজিস্ট্রেশনের কেন্দ্রবিন্দু হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এটি সাধারণ ৮-১০টি প্রতিষ্ঠানের মতোই কেবল রুটিন পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এখান থেকে টেকনোলজিস্টদের দক্ষতা বৃদ্ধি বা মান নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
পেশাজীবীদের হতাশা ও ক্ষোভ
ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টদের অভিযোগ, বছরের পর বছর তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার। নেই কোনো ক্যারিয়ার প্ল্যানিং, নেই দশম গ্রেডসহ অন্যান্য পেশাগত সুযোগ-সুবিধার বাস্তবায়ন। তারা বলছেন, "একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলে আমাদের অধিকার ও মান রক্ষা সহজ হতো। বর্তমানে আমরা অভিভাবকহীন অবস্থায় আছি।"
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি শক্তিশালী কাউন্সিল বা নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ছাড়া রোগ নির্ণয় খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব নয়। ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টদের পেশাগত মান বজায় রাখতে তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং নিবন্ধনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায়, মানহীন ল্যাবরেটরি সেবার কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে।
এ বিষয়ে, বাংলাদেশ সোস্যাইটি ফর মেডিকেল ল্যাবরেটরি টেকনোলজি(BSMLT) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্ট (BMLTA) এর নেতৃবৃন্দগণ দ্রুত তিনটি দাবি বাস্তবায়নে সরকারের নিকট অনুরোধ জানিয়েছেন:
১. অবিলম্বে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য পৃথক 'রেগুলেটরি কাউন্সিল' গঠন।
২. দেশব্যাপী গ্র্যাজুয়েট ও ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্টদের একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি।
৩. ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ল্যাবরেটরি মেডিসিনকে কেবল ল্যাব হিসেবে নয়, বরং প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে কার্যকর করা।
দেশের স্বাস্থ্যসেবার গুণগত পরিবর্তন আনতে ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টদের এই সংকট নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।