29/04/2026
এপ্রিল মাসে এই উপমহাদেশে দুইটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটা আপনারা সবাই জানেন, বাঙলাদেশ তার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম লোড করেছে।
(টাংকিতে জ্বালানি ভরার অনুষ্ঠান দেখলাম। এর আগে ভিত্তি প্রস্তর অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে জ্বালানির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠান, দুই দফা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান, কম্পানি উদ্বোধন অনুষ্ঠানসহ রূপপুর ইস্যুতে এই জাতি বহু আমোদ-ফূর্তি করেছে)
এপ্রিল মাসে এই অঞ্চলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে তামিলনাড়ুর কালপাক্কাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। ওরা নিউক্লিয়ার চুল্লিতে প্লুটোনিয়ামকে কনভার্ট করে ইউরোনিয়াম (২৩৩) বানিয়ে ফেলেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম এমন কিছু ঘটলো তাও এই মাসের ৬ তারিখে। ভারত পুরো পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের সারপ্রাইজ় দিয়েছে।
১৯৩০ এর দশকে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেইলস বোর সাহেবের ছাত্র ছিলেন হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। ছাত্র জীবনেই এই লোক এতো বড় গবেষক ছিলেন যে, ওপেনহাইমার, আইনস্টাইনরা ব্যক্তিগতভাবে উনাকে চিনতেন। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর জাহাঙ্গীর ভাবা দেশে ফিরে আসেন। উনার নাম শুনে আপনাদের আমোদিত হওয়ার কিছু নাই। উনি মুসলমান না।
যাইহোক, ভারতের স্বাধীনতার পর নেহরু সাহেব জ্বালানি-স্বনির্ভরতা নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। পেট্রো ডলারে বন্দি হবার ইচ্ছা উনার ছিল না, বাণিজ্যিক সোলার প্যানেল আবিষ্কার তখনও হয়নি।
জ্বালানি স্বনির্ভতার একমাত্র উপায় ছিল নিউক্লিয়ার পাওয়ার। কিন্তু নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ বানাতে যে ইউরেনিয়াম ২৩৫ দরকার, সেটা ভারতে ছিল না। এর মানে ঘুরে ফিরে আবার ইউরেনিয়াম আমদানী, আবার বিদেশের উপর নির্ভরশীলতা।
হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা তখন একটা বুদ্ধি দেন যে উড়িষ্যার সমুদ্র সৈকতে ইউরেনিয়াম পাওয়া না গেলেও, সেখানে থোরিয়াম পাওয়া যায়। পৃথিবীর বেশিরভাগ থোরিয়াম রিজ়ার্ভই ভারতে। আর থিওরিটিকালি থোরিয়ামকে কনভার্ট করে ইউরেনিয়াম ২৩৫ এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
থোরিয়ামকে কনভার্ট করার কাজটা সহজ না। পৃথিবীতে আগে কেউ এটা করার কথা কল্পনা করেনি। হোমি ভাবা তখন একটা বিশাল প্রজেক্ট শুরু করেন। এটার তিনটা স্টেপ।
১. ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানে প্রাপ্ত সস্তা ইউরেনিয়াম ২৩৮ কে কনভার্ট করে প্লুটোনিয়াম বানানো।
২. প্লুটোনিয়ামকে কনভার্ট করে ইউরেনিয়াম ২৩৩ বানানো।
৩. ইউরেনিয়াম ২৩৩ দিয়ে থোরিয়ামকে এক্টিভেট করা - যেন থোরিয়াম নিজে নিজে নিউক্লিয়ার চেইন রিএকশন শুরু করে দেয়। তাহলে আর ইউরেনিয়াম ২৩৫ এর দরকারই নেই। থোরিয়ামই টার্বাইন ঘুরাবে।
হোমি ভাবা নিজেই স্টেপ ১ সফল করে গেছেন। গত ৬ এপ্রিল ভারত সফলভাবে স্টেপ ২ শেষ করেছে। স্টেপ ৩ করতে তাদের সর্বোচ্চ আর ১০ বছর লাগবে।
মানে ২০৪০ সালে ভারত বিদ্যুতের জন্য জ্বালানি তেল, গ্যাস আর কয়লা আমদানী বন্ধ করে দিবে। ফলে ভারত মধ্যপ্রাচ্য আর আমেরিকার কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করবে। অন্যদিকে ভারত সোলার প্যানেল আমদানী কমিয়ে দিবে। সে চীনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করবে। ২০৪০ সালের ভারত হবে জ্বালানি-স্বনির্ভর স্বাধীন দেশ।
আর এপ্রিল মাসের এই অর্জন কেবল বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি না। এই কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যেই তারা ৫০০ মেগাওয়াটের মত বিদ্যুৎ তৈরি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে।
রেকর্ড ব্রেকিং এই ভয়াবহ অগ্রগতি করত ভারতের মোট খরচ হয়েছে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ১০ হাজার কোটি টাকার ফল তারা আগামী শত শত বছর পাবে। কারণ এর কোন মেয়াদ নেই।
আর আমরা রূপপুরে খরচ করেছি ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এটা আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে এক্সপেনসিভ প্রকল্প। আর এই টাকাটার ৯০% ঋণ করে আনা। তার মানে মোট খরচ আরও বেশি। রাশিয়ার দেওয়া ঋণে ৪% সুদ, মুদ্রাস্ফীতি আর ইউএস ডলার বরাবর টাকার ডিভ্যালুয়েশন হিসেবে নিলে - আমার হিসেবে এটা কমসে কম ২ লাখ কোটি টাকার প্রজেক্ট।
২ লাখ ২০ হাজার কোটিও হতে পারে।
এর মানে নিউক্লিয়ারের অপারেশন কস্ট কম দেখিয়ে সস্তায় বিদ্যুৎ পাওয়ার যে প্রচারণা - এর পুরোটা স্ক্যাম।
হাসিনার স্যাটেলাইট বানানোর খরচ উঠে আসার আগেই যেভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট অক্কা পাবে, এলপিজির তুলনায় রূপপুর লাভজনক হওয়ার আগেই এই পারমাণবিক কেন্দ্রটির মৃত্যু ঘটবে। প্রতি ইউনিট ২-৩ টাকায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে - এটা সর্বৈব মিথ্যাচার। এই হিসাবে শুধু অপারেশন কস্ট ধরা হয়েছে। বিনিয়োগ, ঋণ, সুদ, মুদ্রাস্ফীতি - এগুলা ধরা হয়নি।
ভারত যে কাজটা ১০-১৫ হাজার কোটিতে করতে পারে, আমরা সেটা রাশানদের ডেকে এনে ২ লাখ কোটিতে করেছি। তাও মাত্র ৬০ বছরের জন্য।
ভারতের সমুদ্র সৈকতে ইউরেনিয়াম নেই। আমাদের সমুদ্র সৈকতেও নেই। শিবিরের মোসাদ্দেকরা আরও ৭ জনম দাঁত দিয়ে বালি খুড়লেও বাঙলাদেশে ইউরেনিয়াম ২৩৫ পাওয়া যাবে না।
কিন্তু উড়িষ্যার মতই আমাদের কক্সবাজার, কুয়াকাটায় প্রচুর পরিমাণে থোরিয়াম আছে। আমরা থোরিয়াম দিয়েই অল্প টাকা খরচ করে বিদ্যুৎ বানাতে পারতাম।
ভারত পরাশক্তি হয়ে ওঠার জন্য তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিনিয়োগ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাই সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, সেতু নির্মাণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, রেল প্রযুক্তি, কম্পিউটার সাইন্স, ব্যাংকিং - সবকিছুর খরচ কমিয়ে দিয়েছে।
ভারত এক সেক্টরে পানি ঢেলে সব সেক্টরের আগুন নিভিয়েছে।
আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করিনি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বাধ্যতামূলক করেছি। তাই আমাদের প্রতিটা সেক্টর ধরে বিদেশি ভাড়া করতে হয়। এমনকি গার্মেন্টস পর্যন্ত আমরা নিজেরা চালাইতে পারি না। ভারতীয় লাগে। তারপর চড়া দাম দিয়ে, ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে নিজেই নিজের পাছার ছাল তুলে বিদেশিদের পায়ের জুতা বানিয়ে দিতে হয়।
আমরা ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করি, ঢাকা না দিল্লীর মত অ্যাবসার্ড স্লোগান দিই, সকাল-বিকাল সেভেন সিস্টার্স আলাদা করতে থাকি। কিন্তু কোনদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাও করে বলি না - বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি আর তাবলীগ অফ করতে হবে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাশানদের ভাড়া করে নিয়ে আসতে হবে, আমেরিকানদের নিয়ে আসতে হবে।
আমরা রূপপুর প্রকল্পে ১২ হাজার টাকায় বালিশ কিনে সেগুলো ৫০০০ টাকায় তুলেছি। একেকটা নাট বল্টু কিনেছি ১ লাখ টাকা দিয়ে। যেমন দূর্নীতির মহোৎসব করেছে বাঙলাদেশ সরকার, তেমনি দূর্নীতি আর ওভারপ্রাইজ় করেছে রাশান সরকার।
গত তিন সরকার আমল ধরে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে, সব রিসার্চ সেন্টারে ফ্রিতে বিশ্বমানের রিসার্চ ফ্যাসিলিটি এনে দেওয়ার জন্য সরকারের হাতে পায়ে ধরছি। সামান্য এই টাকাটা সরকার নিজে দিবে না, টাকা চাইলে ধান্দাবাজ মনে করবে, নিচু দৃষ্টিতে তাকাবে - সেটা জানি। আত্মসম্মানবোধ থেকে টাকা চাইতেও যাইনি। উলটো টাকা দিতে গেছি।
কিন্তু এই দেশের আমলাতন্ত্র (নট আমলা) এমনই ইনএফিশিয়েন্ট;
সিস্টেম আর সরকার এমনই ডিসফাংশনাল যে মাগনা প্রযুক্তি আর টাকা এনে দিলেও সেটা কুড়িয়ে খাওয়ার যোগ্যতা নেই।
এসব দেশে রাশানরা এসে বিজ্ঞানচর্চা করবে, দেশের সবচেয়ে ক্রিটিকাল সিকিউরিটি ইন্সটলেশন বিদেশিরা নিয়ন্ত্রণ করবে। আর স্বদেশিরা সেই ক্রিটিকাল ইন্সটলেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে টিকটক করবে, কুলিং টাওয়ারের পাশের মাঠে ফুড কার্ট বসাবে, তেল চিটচিটে প্লাস্টিকের টেবিলের উপর ছিটা রুটি দিয়ে হাঁসের মাংস খাবে।