14/05/2026
জামাইয়ের ফোনে miss you জান মেসেজটা দেখে নীলার বুকটা ধক করে উঠে!!
রাত তখন প্রায় বারোটা। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল নীলা। ছোট্ট ঘরের এক কোণে তার তিন বছরের ছেলে রায়ান ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের মধ্যেও বারবার “মা” বলে ডাকছে। নীলা ছেলের গায়ে পাতলা কম্বলটা টেনে দিল। তারপর নিঃশব্দে চোখের পানি মুছে আবার জানালার পাশে গিয়ে বসলো।
একসময় এই বৃষ্টিই তার খুব প্রিয় ছিল। বিয়ের পর প্রথম বর্ষায় রাকিব তাকে ছাদে নিয়ে ভিজিয়েছিল। বলেছিল,
“তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মানুষ। কখনো তোমাকে কষ্ট দেব না।”
নীলা বিশ্বাস করেছিল। খুব সাধারণ পরিবারের মেয়ে ছিল সে। বাবা মারা গিয়েছিলেন ছোটবেলায়। মা মানুষের বাসায় সেলাই করে সংসার চালাতেন। সেই সংসার থেকে একদিন অনেক স্বপ্ন নিয়ে রাকিবের হাত ধরে নতুন জীবনে এসেছিল নীলা।
প্রথম দিকে সবকিছু সত্যিই সুন্দর ছিল। ছোট্ট ভাড়া বাসা, সীমিত আয়, কিন্তু অনেক ভালোবাসা। রাকিব অফিস থেকে ফিরলে নীলা দৌড়ে দরজা খুলে দিত। দুজনে মিলে রাতের খাবার খেত, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত। তারপর তাদের জীবনে এলো ছোট্ট রায়ান। ছেলেকে কোলে নিয়ে রাকিব কেঁদে ফেলেছিল আনন্দে।
কিন্তু সুখগুলো বোধহয় খুব বেশি দিন টেকে না।
রায়ানের জন্মের পর থেকেই রাকিব একটু বদলে যেতে শুরু করলো। আগের মতো সময় দিত না। অফিসের কাজের অজুহাতে রাত করে ফিরত। ফোন লুকিয়ে ব্যবহার করত। নীলা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। ভেবেছিল হয়তো সংসারের চাপ, টাকার চিন্তা।
একদিন গভীর রাতে রাকিব বাথরুমে ছিল। তখন তার ফোনে একটা মেসেজ আসে।
“তোমাকে খুব মিস করছি জান।”
নীলার বুকটা ধক করে উঠেছিল। হাত কাঁপছিল। সে ফোন খুলে দেখেছিল অসংখ্য ছবি, অসংখ্য ভালোবাসার কথা। অন্য এক মেয়ের সঙ্গে রাকিবের সম্পর্ক অনেক দিনের।
সেদিন নীলা কিছু বলেনি। শুধু সারারাত রায়ানকে বুকে জড়িয়ে কেঁদেছিল।
পরদিন সকালে সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি কি অন্য কাউকে ভালোবাসো?”
রাকিব একটুও অস্বীকার করেনি। বরং বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
“হ্যাঁ, ভালোবাসি। তোমার সাথে আর ভালো লাগে না। সারাদিন শুধু বাচ্চা আর সংসার নিয়ে পড়ে থাকো।”
কথাগুলো ছুরির মতো বিঁধেছিল নীলার বুকে। যে মেয়েটা নিজের সবকিছু ছেড়ে তার জন্য জীবন গড়েছিল, আজ সে-ই বোঝা হয়ে গেছে!
তারপর থেকে প্রতিদিনই অশান্তি বাড়তে লাগলো। রাকিব দিনের পর দিন বাসায় ফিরত না। সংসারের খরচও ঠিকমতো দিত না। নীলা নিজের গয়না বিক্রি করে ছেলের দুধ কিনেছে। অনেক রাত না খেয়ে থেকেছে, কিন্তু রায়ানকে কখনো বুঝতে দেয়নি।
একদিন রায়ান জ্বরে খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো। নীলা বারবার রাকিবকে ফোন করছিল। কিন্তু সে ফোন ধরেনি। পরে মাঝরাতে ফোন ধরে বিরক্ত কণ্ঠে বলেছিল,
“আমি ব্যস্ত আছি। এত নাটক করো না।”
নীলা ছেলেকে কোলে নিয়ে একা হাসপাতালে গিয়েছিল। সেদিন হাসপাতালের করিডোরে বসে তার মনে হয়েছিল পৃথিবীতে সে সত্যিই একা।
দিন যেতে লাগলো। একসময় রাকিব বাসায় আসাই প্রায় বন্ধ করে দিল। প্রতিবেশীরা কানাঘুষা করত। কেউ করুণা দেখাত, কেউ অপমান করত। কিন্তু নীলা সব সহ্য করত শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে।
এক রাতে রাকিব বাসায় এলো। সঙ্গে একটা ব্যাগ। খুব ঠান্ডা গলায় বললো,
“আমি আর এই সংসারে থাকতে পারব না। আমি ওকে বিয়ে করবো।”
নীলার মনে হচ্ছিল মাটিটা সরে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে। সে শুধু একবার বলেছিল,
“আমাদের কথা একবারও ভাবলে না? এই বাচ্চাটার কথা?”
রাকিব নির্লিপ্ত চোখে বলেছিল,
“তোমাদের দায়িত্ব নিতে পারবো না।”
তারপর দরজা খুলে চলে গিয়েছিল।
সেদিন নীলা দরজার সামনে বসে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। রায়ান ঘুম ভেঙে মায়ের কাছে এসে ছোট্ট হাতে চোখের পানি মুছে দিয়েছিল। বলেছিল,
“মা, তুমি কান্দো না।”
একটা তিন বছরের বাচ্চার সেই কথা নীলার বুকটা আরও ভেঙে দিয়েছিল।
পরদিন সকাল থেকে নীলা নতুন যুদ্ধ শুরু করলো। মানুষের বাসায় রান্নার কাজ নিল। কেউ কেউ অপমান করত, তবুও সহ্য করত। কারণ তার বাঁচতে হবে, ছেলেকে মানুষ করতে হবে।
অনেক রাতে কাজ শেষে বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীরে ছেলেকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। কখনো কখনো রায়ান জিজ্ঞেস করত,
“আমার বাবা কোথায়?”
নীলা উত্তর খুঁজে পেত না। শুধু বলত,
“তোমার বাবা অনেক দূরে থাকে।”
বছরখানেক পরে একদিন বাজারে হঠাৎ রাকিবকে দেখেছিল নীলা। তার পাশে সেই মেয়েটা। দুজন খুব হাসছিল। রাকিব একবারও ছেলের দিকে তাকায়নি। অথচ রায়ান বাবাকে দেখে দৌড়ে যেতে চাইছিল।
নীলা শক্ত করে ছেলের হাত ধরে রেখেছিল। কারণ সে জানত, কিছু মানুষ শুধু জন্ম দেয়, বাবা হতে পারে না।
সেদিন রাতে নীলা অনেক কেঁদেছিল। কিন্তু সেই কান্নার মাঝেও একটা জিনিস বুঝেছিল — সে আর আগের দুর্বল নীলা নেই।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলেছিল,
“যে মানুষ তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে, তার জন্য জীবন থেমে থাকতে পারে না।”
তারপর ধীরে ধীরে নীলা নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে শুরু করলো। ছোট্ট একটা সেলাই মেশিন কিনলো। বাসায় কাজ নিত। রায়ানকে স্কুলে ভর্তি করালো। কষ্ট ছিল, অভাব ছিল, কিন্তু একটা শান্তি ছিল — অন্তত প্রতিদিন আর অপমান সহ্য করতে হয় না।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে রায়ান মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,
“মা, বড় হয়ে আমি অনেক টাকা কামাবো। তোমাকে আর কাঁদতে দেবো নাহ!!
ছোট্ট রায়ানের হাতটা শক্ত করে বুকে টেনে নেয় নীলা!!!