12/03/2025
আমার জন্ম বাংলাদেশে। ছোটবেলা থেকে এই শিক্ষায় বড় হয়েছি যে জননী এবং জন্মভূমি স্বর্গের থেকেও গর্বের। বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখার কোন এক গ্রামে আমার শিকড় পোঁতা, নাড়ি পোঁতা। এতসব গভীর আবেগের কথা না বললেও বাংলাদেশের ষড়ঋতুর আবর্তনে আমি বেড়ে উঠছি। কাজী নজরুল ইসলামের “একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী” গানের কথার মত আক্ষরিকভাবেই মিশে আছি আমি।
আমার সেই শৈশবের বাংলাদেশ আমার চোখের সামনে প্রতিদিন বদলে যেতে দেখছি। সমস্যা হয়ে গেল ধর্ম যখন রাজনীতি হয়ে গেল। রাজনীতির প্রভাবে দেশের সংবিধান বদলে গেল, বদলে গেল একটা নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা। ফলে একই দেশে বসবাস করেও শুধু ধর্মের ভিত্তিতে আমার বন্ধু ইমদাদুল হক আর বিকাশ মজুমদারের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নাগরিক বৈষম্য। রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয় থাকলে বিকাশ মজুমদার হয়ে যায় কাফের; তখন কাফের আর নজরুল ইসলাম রাসেলের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব না।
সেই মানুষটাই সুখি যে নিজের জন্মভূমিতে যদি জোটে সামান্য শাকভাত সেটা খেয়েই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। রাষ্ট্রধর্মের পরিচয়ের কারণে সাংবিধানিক বৈষম্যের শিকার হয় দেশের সংখ্যালঘু নাগরিক আর বৈষম্য নিপীড়নে পরিণত হতে সময় লাগে না। সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু আইডিয়াটাই এমন যে আধিপত্য বিস্তার না করে থাকতে পারে না। ফলে শাকভাত খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর স্বপ্ন অনেকের জন্যই বিলাসীতায় পরিণত হয়। বাঁচার জন্য কিছু মানুষ সাধের আশ্রয় ছেড়ে পাড়ি জমায় অন্যদেশে, কেউ হয় রিফিউজি, কেউ বাস্তুহারা উন্মুল। বিদেশে হয়ত কিছু মানুষ আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তায় সুখে থাকে কিন্তু সে কি কোনদিনও ভুলতে পারে তার শৈশবের নদী, খেলার মাঠ, স্কুলের গোল্লাছুট, শীতের সকালে খেজুরের রস, মাতৃভাষায় কথা বলার আকুতি? সে কি আসলেই সুখি হয়?
আজকে ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, থেমিসের ভাষ্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে, রাহুল আনন্দের বাড়ি পোড়ানো হয়েছে এরজন্য দায়ী রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয় আর নাগরিকের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। মন্দির পোড়ানো, বাড়িঘর লুটের ঘটনাকে বিভিন্ন কারসাজি করে গুজব বলে প্রচার করা হচ্ছে। এরথেকে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে? এই সবকিছুর জন্য দায়ী রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বৈষম্য।
বাংলাদেশকে কি আবারো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করা যায় না?