10/06/2026
💦চেহারার সুন্দর হওয়ার চাইতে ভাগ্য সুন্দর হওয়াটা কিন্তু অনেক বেশি জরুরি এই কথাটার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে রইলেন ডা. দীপরা তবাসসুম। তিনি ছিলেন একজন সফল চিকিৎসক। বিয়ে করেছিলেন আরেক ডাক্তারকে। স্বামীর চেহারা ভালো না হলেও ডাক্তার-ডাক্তার মিলে তো ভালো হয়—এই কথায় বিশ্বাস করে অনেকেই যেমন বিয়ে করে, দীপরাও বিয়ে করেছিলেন।
কিন্তু বিয়ের পর জীবনটা তার জন্য জাহান্নাম হয়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। বাচ্চা হওয়ার পর 'পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন' (Postpartum Depression)—এই রোগে ভুগছিলেন ডা. দীপরা। এর সাথে ছিল উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস। স্বামী, শ্বশুরবাড়ির মানুষজন তাকে মানসিক ও শা'রীরিক নি'র্যাতন করত বলে অভিযোগ উঠেছে।
মৃ*ত্যু*র আগের তিন দিন নাকি কেউ তাকে খাবার দেয়নি। কেউ জিজ্ঞাসাও করেনি, কিছু খাবে? সম্ভবত মা ওনার বাসায় গিয়েছিল। একটু 'ভাত খাব' বলতে বলতেই মেয়ের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে। এরপর ওনাকে বাসার কাছের হসপিটালে না নিয়ে দূরের কোনো একটা হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৯০ মিনিট সিপিআর (CPR) করেও বাঁচানো যায়নি তাকে।
দীপরা মৃ/ত্যু/র আগে 'ফিমেল ডক্টরস ইন বাংলাদেশ' গ্রুপে পরিচয় গোপন করে পোস্ট করে কিছু লেখেন
"আমার ২ বছরের সন্তান আছে। তাকে নিয়ে সারাদিন ওখানেই থাকি। সামনে এফসিপিএস ফাইনাল পরীক্ষা, কিন্তু পড়তে পারি না। কেউ হেল্প করে না। আমার স্বামী ডাক্তার, সে নিজের কাজ নিয়ে অনেক ব্যস্ত। বাসায় থাকি শাশুড়ির সাথে। উনি আমার দেখা ওর্স্ট হিউম্যান বিং গুলোর মধ্যে একজন। অন্যদের কাছে তিনি কেমন জানি না, কিন্তু আমার কাছে তিনি সবচাইতে খারাপ, খুব খারাপ।"
"আমার সন্তান জন্মের পরের সময়টা ছিল খুব কঠিন। এখনো ডিপ্রেশন থেকে বের হতে পারিনি। থেরাপি নিচ্ছি, অনেক ব্যয়বহুল। আমার নিজের আয় না থাকায় নিয়মিত নিতেও পারি না। অনেক কথা কাটাকাটি হয়েছে, হাতাহাতি হয়েছে। এক পর্যায়ে আমার স্বামী আমাকে বলেছিল, তুই তো একটা ফোকন্নির বাচ্চা, দেখ তোর আশেপাশে কেউ নেই। এত গালাগালির মধ্যেও এই কথাটাই আমাকে সবচাইতে বেশি কষ্ট দিয়েছে। সত্যিই তো, আমার আশেপাশে কেউ নেই।
শাশুড়ি অ'ত্যাচার করলে বাবা-মা সাপোর্ট করে না, স্বামী অত্যাচার করলে কেউ সাপোর্ট করে না। সবাই বলে, এইসব তো হয়, মানিয়ে নাও। মানিয়ে নাও। মানে, আমি আসলেই একা! ছোটবেলা থেকেই আমার মায়ের সিজোফ্রেনিয়া দেখে বড় হয়েছি। অনেক কষ্ট করে এতদূর এসেছি। এমবিবিএস করেছি, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করতে চাই, কিন্তু পারছি কোথায়? আমি না আর বাঁচতে চাই না। রাগ করে অনেক ওষুধ খেয়ে ফেলেছি। বেঁচে থাকার জন্য কিছু নয়, হাতের কাছে যা পেয়েছি তাই খেয়েছি। কোনো ইফেক্টও হচ্ছে না। আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, আমি কি ১০ মিনিটও নিজের জন্য পাবো না? আল্লাহ আমাকে এমন ভাগ্য কেন দিলেন?"
গত ৪ জুন দীপরা তবাসসুম মা/রা গেলেন। বলা হচ্ছে, হার্ট অ্যাটাকে মা'রা গেছেন তিনি। তার শ্বশুর একজন বড় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, স্বামীও হৃদরোগের চিকিৎসক। এই যে একটা ডাক্তার মেয়ে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে গেল, তাও একটা ডাক্তার পরিবারে! মেয়েটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের স্বপ্ন দেখছিল। স্ত্রী, পুত্রবধূ হিসেবে চেয়েছিল একটু ভালোবাসা, একটু আন্তরিকতা, একটু সাহায্যের। চেয়েছিল নিজের চিকিৎসা করাতে। এর জন্য শুনতে হয়েছে অনেক কটু কথা।
এটি কি স্বাভাবিক মৃ/ত্যু? নাকি কাউকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মরে যেতে বাধ্য করা? এই হ/ত্যা কি এড়ানো যায়? অথচ বাহিরের পৃথিবীতে তিনি সবসময় হাসিমুখে থাকতেন। কাউকে বুঝতেই দিতেন না শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের কথা। ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দিতেন, শুধু একটু ভালো কথা শোনার আশায়। একটি মানুষ এভাবে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল শুধুমাত্র শ্বশুরবাড়ির মানুষ আর স্বামীর অত্যা'চারের কারণে। পার্টনার ভালো না হলে মানুষ দুনিয়াতেই জা'হান্নাম বোধ করে। জা'হান্নামের স্বাদ সে পেয়ে যায়। এটা কোনো স্বাভাবিক মৃ/ত্যু নয়, এটাকে বলে সম্মিলিত হ'ত্যা—মানসিক নি'র্যাতন, অবহেলা আর নীরবতার মাধ্যমে।
শ্বশুরবাড়ি আর স্বামীর অ'ত্যাচার আর অবহেলায় একজন প্রতিভাবান ডাক্তার, একজন মা, একজন মেয়ে চিরতরে চলে গেলেন। পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন একটি ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। বাচ্চা জন্মের পর অনেক মায়ের হরমোনাল পরিবর্তন, শারী'রিক দুর্বলতা, ঘুমের সমস্যা আর মানসিক চাপে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন হয়। এটাকে শুধু মন খারাপ ভাবলে কিন্তু চলবে না। চিকিৎসা না করলে এটি সুইসাইড বা অন্যান্য জটিলতায় রূপ নিতে পারে। ডা. দীপ্রার ক্ষেত্রে এই ডিপ্রেশনকে আরও ভ*য়*ঙ্কর করে তুলেছিল শ্বশুরবাড়ির নি'র্যাতন।
দীপ্রার মতো অনেক মেয়েই ভাবে, ডাক্তার বিয়ে করলে সুখী হবো। কিন্তু এই স্বামীর মতো মানুষরা প্রমাণ করে, ডিগ্রি বা পেশা দিয়ে মনুষ্যত্ব হয় না। স্বামী হিসেবে তা পাওয়া যায় আচরণে, সম্মানে, ভালোবাসায় এবং পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়।
সংগৃহীত