28/11/2025
কম বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন। জেলে থাকতে মাকে হারিয়েছেন। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় ছোট ছেলেকে হারিয়েছেন। আরেক সন্তান হাজার মাইল দূরে লন্ডনে ছিল দেড় দশক। এ ছাড়া নিজ বাসা থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে! খালেদা জিয়ার জীবনের পুরোটাই ত্যাগ ও সংগ্রামে ভরা!
খালেদা জিয়া চাইলে উন্নত কোনো দেশে বাকি জীবনটা আরামে কাটিয়ে দিতে পারতেন। তবে তিনি একবার বলেছিলেন, “আমার স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকবো দেশবাসীকে ছেড়ে যাবো না।”
বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ ও সংগ্রামের সময়গুলো দেখে নিন -
২০০৭-২০০৮ সাল! এই সময়টায় খালেদা জিয়ার পরিবার ও দল – দু’টোর অবস্থাই ভীষণ নাজুক ছিল। তাঁর দুই ছেলেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। বড় ছেলে তারেক রহমান ছিলেন গু'রু'তর আ'হত। তিনি যান লন্ডনে। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন অ্যাজমা রোগাক্রান্ত। তিনি যান থাইল্যান্ড ও পরে মালয়েশিয়ায়।
এদিকে, বিএনপি ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে। বিপর্যয় আরও ঘনিয়ে আসে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতলে। নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে খালেদা জিয়ার ঢাকা সেনানিবাসের শহিদ মইনুল রোডের বাড়িটির
বরাদ্দ বাতিল করা হয়। পরে, ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাকে সেই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয় যেখানে তিনি ৩৮ বছর ধরে বসবাস করেছিলেন।
মূলত জিয়াউর রহমান প্রাণ হারানোর পর তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ টোকেন মূল্যে ওই ২.৭২ একর সম্পত্তি খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দিয়েছিলেন। এরপরও খালেদা জিয়ার বিপর্যয়ের শেষ হয়নি। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে খালেদা জিয়া গুলশানে তাঁর অফিসে অবরুদ্ধ হন। এই অবস্থায় মালয়েশিয়ায় আরাফাত রহমান কোকো প্রা'ণ হারায়।
পারিবারিক জীবনে ঝড় ঝঞ্ঝার এই সময়টাতে তিনি দলকে ভোলেননি। খালেদা জিয়া একবার বিরল রেকর্ড গড়েছিলেন! মাত্র ১৪ দিনে তিনি প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন! বিধ্বস্ত বিএনপিকে নতুনভাবে সংগঠিত করতে তিনি একের পর এক জেলা পাড়ি দিয়েছিলেন।
শতাধিক জনসভা ও পথসভায় নির্বাচনী ভাষণ দিয়েছিলেন। এভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনী অভিযানের ইতিহাসে
খালেদা জিয়া রেকর্ড গড়েছিলেন। তখন ছিল নির্বাচনের সময়, ২০০৮ সালের নির্বাচন। কিন্তু বিএনপি সেই নির্বাচনে হেরে যায়। পরাজয়ের পরও তিনি নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন। কিন্তু ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।
তাঁর গুলশানের বাড়ির সামনের রাস্তার দুই পাশে বালির ট্রাক দিয়ে আটকে রাখা হয়। ওই সময় খালেদা জিয়া রেগে গিয়ে পুলিশদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “এরা সবাই গোপালগঞ্জের, গোপালগঞ্জের নামই বদলে যাবে!” কিন্তু ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো প্রা'ণ হারানোর পর থেকে খালেদা জিয়ার শরীর ও মন ভেঙে পড়ে। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা তাকে ও বিএনপিকে বেশ ভুগিয়েছে।
তিনি হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছেন। তাঁর হার্টে তিনটি ব্লক ছিল। আগে একটা রিং পরানো হয়েছিল। তাই ২০২৪ সালের জুনে তাঁর শরীরে পেসমেকার বসানো হয়। হৃদপিণ্ডে লাগানো এই পেসমেকার
একটা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস। এটা নিয়মিত বিরতিতে হার্টকে সিগন্যাল পাঠায় যাতে হার্ট পাম্প করে।বেগম জিয়া আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসেও ভুগছেন। এরপর লন্ডনে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরেছেন।
ইতিহাস তাকে অনেক কারণেই মনে রাখবে। তবে আলাদা করে বলতে হয়, আশির দশকে জেনারেল এরশাদের
সামরিক শাসন অবসানের লক্ষ্যে দেশব্যাপী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে। এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে খালেদা জিয়া তিনবার গ্রেফতার হন।
এই আন্দোলনে সফল হয়ে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেবার তিনি ফেনী-১, বগুড়া-৭, ঢাকা-৫, ঢাকা-৯, চট্টগ্রাম-৮ – মোট ৫টি আসনে জিতেছিলেন,যা রেকর্ড! এই ৫ আসন থেকে
তার মোট ভোট ছিল ৩ লাখ ১৬ হাজার ০৬৩!
১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি ৫টি আসন থেকে জিতেছেন। এভাবে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে চারটি নির্বাচনে খালেদা জিয়া সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় ২০ লাখ ভোট পেয়েছেন!
দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে তাঁর প্রাপ্তি অনেক। তাঁর নামের সঙ্গে আছে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ তকমা। ত্যাগ ও সংগ্রামের দিক থেকে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই!
©