10/01/2026
দলীয় পুলিশ থেকে মুক্তির চেষ্টা চলছে : রংপুরে আইজিপি
১৫ বছরে পুলিশ একটি দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল
দূর্জয় রায়
বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম স্বীকার করেছেন যে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ পুলিশ একটি দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল, যার ফলে বাহিনীর ভেতরে নানামুখী বিচ্যুতি সৃষ্টি হয় এবং পুলিশের মাধ্যমে অনেক সময় গণবিরোধী কাজ সংঘটিত হয়েছে।
শনিবার বিকেলে রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন আইজিপি।
আইজিপি বলেন, “গত ১৫ বছরে পুলিশ দলীয় পুলিশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। আমাদের মধ্যে নানা ধরনের বিচ্যুতি ছিল। আমরা অনেক গণবিরোধী কাজ করেছি—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।”
তিনি বলেন, “জুলাই-আগস্ট মাসে যেসব দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বিপুল সংখ্যক আন্দোলনকারী প্রাণ দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। এসব ঘটনার পর পুলিশের ওপর যে দায়ভার এসেছে, তা অত্যন্ত ভারী।”
আইজিপি আরও বলেন, পুলিশের ভেতরে থাকা লোভী ও দলকানা কিছু নেতৃবৃন্দ এবং সদস্যের কর্মকাণ্ডের কারণে বাহিনী প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে পুলিশকে আবার স্বমহিমায় দাঁড় করানো, সদস্যদের মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং পেশাদারিত্বে ফেরানো—গত এক বছর ধরে সেই চেষ্টাই চলছে। “আমরা বলবো না শতভাগ সফল হয়েছি, তবে আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই,”—যোগ করেন তিনি।
শতভাগ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়—এমন বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন আইজিপি বাহারুল আলম। তিনি বলেন, “বিশ্বের কোথাও শতভাগ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আমাদের দেশে গত ১০–১৫–২০ বছরের পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যায়, প্রতি বছর সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার হত্যাকাণ্ড ঘটে।”
তবে পুলিশের লক্ষ্য স্পষ্ট—“আমাদের চেষ্টা থাকবে একজন লোকও যেন মারা না যায়। এটা আমাদের লক্ষ্য। আমরা পারফেকশনের দিকে এগোচ্ছি, যদিও বাস্তবতায় ব্যর্থতা ও দুর্বলতা থাকেই।”
শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে আইজিপি বলেন, “এই মৃত্যু জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দায় আমাদের ওপর এসেছে।”
তিনি জানান, খুলনা অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশই শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, “নির্বাচনের উপযোগী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। তবে বাংলাদেশ পুলিশ একা নয়।”
তিনি জানান, নির্বাচনের দিন প্রায় ৬ লাখ আনসার সদস্য, পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও নেভি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকবে।
ডেভিল হান্ট অপারেশন নিয়ে সমালোচনার জবাবে আইজিপি বলেন, “১৩ ডিসেম্বর থেকে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ শুরু হয়েছে। এ নিয়ে সমালোচনা আছে, রাজনৈতিক নেতারা বলছেন—আমাদের কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, পুলিশ চেষ্টা করছে অবজেক্টিভলি কাজ করতে। যাদের নির্বাচন বা আইনশৃঙ্খলার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কেবল তাদেরই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
“বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় অনেক মামলায় শত শত নাম যুক্ত করা হয়েছে, যাদের প্রকৃতপক্ষে কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। আমরা তাদের রিলিফ দেওয়ার চেষ্টা করছি,”—বলেন তিনি।
আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, “এখন সবচেয়ে বেশি দরকার সমাজের সমর্থন। পুলিশের মনোবল শক্ত রাখতে হবে।”
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “কোনো অপরাধী গ্রেপ্তার হলে যদি থানা ঘেরাও করা হয়, তাহলে কি আমি আইনশৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারবো?”
আইজিপি আরও বলেন, “আপনারা যদি অন্যায় দেখি আমাকে ধরবেন। কিন্তু ন্যায় কাজটা করতে দিলে পুলিশ তার দায়িত্ব পালন করতে পারবে। ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা, নিরাপদ ভোট পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমাদের অথরিটি প্রয়োজন।”
এর আগে আইজিপি বাহারুল আলম রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড অডিটোরিয়ামে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বিশেষ কল্যাণ সভায় অংশ নেন এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন।