18/06/2026
#স্ক্রিনশট২
রাত তখন পৌনে তিনটা। চারদিকের নিঝুম নীরবতা ভেঙে অনন্যার ফোনের স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠল। একটা অচেনা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এসেছে। কোনো লেখা নেই, শুধু একটা **স্ক্রিনশট** পাঠানো হয়েছে।
অনন্যা ছবিটা জুম করতেই ভয়ে ওর শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ওটা একটা ইনস্টাগ্রাম লাইভ ভিডিওর স্ক্রিনশট। কিন্তু ভয়ের কারণ লাইভটা ছিল না, ছিল তার ব্যাকগ্রাউন্ড। লাইভে যে মেয়েটি বসে আছে, তার ঠিক পেছনের জানালার কাচে আবছা একটা মুখোশ পরা মুখ দেখা যাচ্ছে! আর সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো—মেসেজটার নিচে একটা টাইমার কাউন্টডাউন হচ্ছে। আর মাত্র ৩০ মিনিট বাকি!
অনন্যা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে গ্রুপ কলে ওর বাকি তিন বন্ধুকে যুক্ত করল—**রাইসা**, **মেহজাবিন** আর **আবির**।
# # # রহস্যের শুরু
"তুই নিশ্চিত এটা কোনো রসিকতা নয়?" আবিরের গলায় ঘুম জড়ানো সন্দেহ।
"ভালো করে দেখ আবির!" অনন্যা স্ক্রিনশটটা গ্রুপে পাঠিয়ে দিল। "এই মেয়েটা আমাদের ইউনিভার্সিটির জুনিয়র সাফিয়া। আর পেছনের এই জানালাটা... এটা ওদের হলের পেছনের সেই পরিত্যক্ত কোয়ার্টারের!"
রাইসা ছবিটা খুব খুঁটিয়ে দেখছিল। ও প্রযুক্তির বিষয়ে বেশ পারদর্শী। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ও বলে উঠল, "বন্ধুরা, এটা কোনো রসিকতা না। সাফিয়ার ফোন হ্যাক করা হয়েছে। কেউ দূর থেকে ওর ক্যামেরা অন করে এই লাইভটা দেখছে। আর এই টাইমারটা হলো কোনো ডিজিটাল লক বা বোমার কাউন্টডাউন। আমাদের এখনই ওখানে যেতে হবে।"
মেহজাবিন স্বভাবগতভাবে একটু ভীতু, কিন্তু বন্ধুদের বিপদে ও কখনো পিছিয়ে যায় না। ও ফিসফিস করে বলল, "কিন্তু রাত তিনটেয় ওই পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে যাব? পুলিশকে জানাব না?"
"পুলিশ আসতে আসতে ৩০ মিনিট পার হয়ে যাবে। যা করার আমাদের নিজেদেরই করতে হবে," অনন্যার গলায় এখন সাহসের দৃঢ়তা।
# # # মধ্যরাতের অভিযান
চার বন্ধু দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। আবির ওর মোটরবাইকটা নিল, আর তিন মেয়ে উঠল একটা স্কুটিতে। ফাঁকা, অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে ওরা যখন পরিত্যক্ত কোয়ার্টারের সামনে পৌঁছাল, তখন টাইমারের আর মাত্র **১৫ মিনিট** বাকি।
কোয়ার্টারটা কুয়াশা আর ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা ছিল। চারপাশটা দেখতে পুরো ভৌতিক সিনেমার মতো লাগছিল। ভাঙা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই একটা তীব্র পচা গন্ধ ওদের নাকে এল।
"সবাই সাবধানে থেকো," আবির একটা লোহার রড হাতে নিয়ে সবার আগে আগে চলল। মেহজাবিন ভয়ে অনন্যার হাত শক্ত করে ধরে রাখল।
হঠাৎ ওপরের তলা থেকে একটা মৃদু গোঙানির আওয়াজ পাওয়া গেল। রাইসা ওর ল্যাপটপে সাফিয়ার ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করার চেষ্টা করছিল। ও চেঁচিয়ে উঠল, "ওপরের বাঁ দিকের ঘরটা! সিগন্যাল ওখানেই সবচেয়ে বেশি!"
# # # থ্রিল আর চরম মুহূর্ত
ওরা যখন ওপরে পৌঁছাল, করিডোরের শেষ মাথার একটি ঘরের দরজা হালকা খোলা ছিল। ভেতরে একটা চেয়ারে সাফিয়াকে বেঁধে রাখা হয়েছে, আর মুখে টেপ আঁটা। সাফিয়ার ঠিক সামনে একটা ল্যাপটপ রাখা, যার স্ক্রিনে লাল রঙে সময় কমছে—**৩ মিনিট ২০ সেকেন্ড**।
হঠাৎ মেহজাবিন চিৎকার করে উঠল, "আবির, পেছনে!"
অন্ধকার থেকে একটা লম্বা, কালো মুখোশ পরা লোক ধারালো অস্ত্র হাতে আবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আবির চট করে সরে না গেলে মস্ত বড় বিপদ হতো। হাতের রড দিয়ে আবির আঘাতটা আটকাল, কিন্তু লোকটা অনেক শক্তিশালী ছিল। সে আবিরকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল।
"অনন্যা, রাইসা—তোরা টাইমারটা বন্ধ কর! আমি একে দেখছি!" মেহজাবিন ভয়ে কাঁপলেও, আবিরকে বাঁচানোর জন্য পাশে থাকা একটা ভাঙা কাঠের চেয়ার তুলে সজোরে ওই লোকটার পিঠে আঘাত করল।
আঘাত পেয়ে লোকটা ঘুরে দাঁড়াতেই আবির নিচ থেকে ওর পায়ে লাথি মেরে ফেলে দিল। দুজনের মধ্যে তুমুল ধস্তাধস্তি শুরু হলো।
ওদিকে ল্যাপটপের সামনে অনন্যা আর রাইসা। টাইমার বলছে—আর মাত্র **১ মিনিট** বাকি।
ল্যাপটপের স্ক্রিন লক করা, সেখানে একটি পাসওয়ার্ড চাইছে। রাইসা দ্রুত কিবোর্ডে আঙুল চালাতে লাগল। "এই পাসওয়ার্ডটা ওই স্ক্রিনশটেই আছে! অনন্যা, স্ক্রিনশটের নিচের কোণায় দেখ, কিছু একটা লেখা ছিল!"
অনন্যা নিজের ফোনে স্ক্রিনশটটা আবার খুলল। হ্যাঁ! সাফিয়ার জানালার নিচে ধুলোয় একটা কোড লেখা ছিল, যা স্ক্রিনশটে আবছা দেখা যাচ্ছে—**"404_DARK"**।
"রাইসা! টাইপ কর 404_DARK!" অনন্যা চেঁচিয়ে বলল।
টাইমারে তখন মাত্র **১০ সেকেন্ড**। ৯... ৮... ৭...
রাইসা এন্টার চাপল।
*বিপ!* স্ক্রিনটা সবুজ হয়ে গেল। টাইমারটা থেমে গেল ঠিক **০২ সেকেন্ড** থাকতে।
# # # অবসান
টাইমার থামতেই মুখোশধারী লোকটা বুঝতে পারল তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। সে আবির আর মেহজাবিনকে ধাক্কা দিয়ে জানালার কাচ ভেঙে নিচে লাফ দিল। নিচে ঝোপঝাড় থাকায় সে অন্ধকারে পালিয়ে গেল, কিন্তু ফেলে গেল তার ল্যাপটপ।
অনন্যা দ্রুত সাফিয়ার মুখের টেপ খুলে দিল। সাফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ও আমাদের ডিপার্টমেন্টের ল্যাব সহকারী... ও আমার সব ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে আমাকে হুমকি দিচ্ছিল..."
রাইসা ল্যাপটপটা নিজের ব্যাগে পুরে বলল, "সব প্রমাণ এখানে আছে। ও পালিয়ে পার পাবে না।"
ভোরের আলো তখন একটু একটু করে ফুটছে। চার বন্ধু কোয়ার্টার থেকে যখন বের হচ্ছিল, তখন মেহজাবিনের মুখে ভয়ের বদলে এক অদ্ভুত জয়ের হাসি। আর অনন্যা নিজের ফোনের সেই **স্ক্রিনশটটা** ডিলিট করতে করতে ভাবল—কখনো কখনো একটি সাধারণ ছবিও মানুষের জীবন-মৃত্যুর সীমানা ঠিক করে দিতে পারে।