27/09/2025
সন্তান নেওয়া মানেই কি অতিরিক্ত খরচ বাড়া আর ফ্রীডোম চলে যাওয়া? কোরআন ও গবেষণা কি বলে?
আজকের দুনিয়ায় একটা অদ্ভুত ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। আপনি যদি জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর বা ইউরোপের কিছু দেশের দিকে তাকান তাহলে দেখবেন ওদের বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের সন্তান নিতে না চাওয়া।
অনেকেই ইচ্ছে করে সন্তান নিচ্ছে না, কেউ নিচ্ছে কিন্তু অনেক দেরি করে। কারণ তাদের মাথায় একটাই ভয় কাজ করছে যে সন্তান নিলে খরচ বেড়ে যাবে, ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে, ঘুমের সমস্যা হবে, ট্রাভেল বা স্বাধীনতা থাকবে না ইত্যাদি। মানে সন্তান নিলেই মনে হয় জীবনের আনন্দ ধ্বংস। তাই ওরা ভাবে আগে নিজেদের জীবনটা উপভোগ করি, পরে বাচ্চার কথা ভেবে দেখা যাবে।
কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই উল্টা। ওইসব দেশে এখন স্কুল খালি হয়ে যাচ্ছে, ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি কমছে, নতুন তরুণের অভাব দেখা যাচ্ছে। বয়স্ক কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তার উপর নিঃসঙ্গতা আর ডিপ্রেশন ভয়াবহ হারে বেড়ে চলেছে। এক কথায় সমাজ ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছে।
এখন প্রশ্ন হলো আপনি সন্তানকে কিভাবে দেখেন? কষ্ট হিসেবে, নাকি বরকত হিসেবে? ইসলাম এই ব্যাপারে আমাদেরকে অনেক কিছু জানিয়েছে।
কোরআনে আল্লাহ তায়ালা আমাদের সরাসরি সতর্ক করেছেন,
“তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমি তাদেরকেও রিজিক দিই এবং তোমাদেরকেও।” (সূরা বনী ইসরাইল ১৭:৩১)
এই আয়াত আজকের সমাজের জন্য একেবারে প্রাসঙ্গিক। এখানে আল্লাহ শুধু সন্তান হত্যা করতে নিষেধ করেননি, বরং সন্তান মানেই যে দরিদ্রতা নয় সেটা বুঝিয়েছেন। বরং আল্লাহ তাদের জন্য আলাদা রিজিক লিখে রাখার ব্যাপারেও বলছেন।
রাসূল ﷺ আরও বলেছেন,
“দারিদ্র্যের ভয়ে কেউ যেন সন্তান জন্মদান থেকে বিরত না থাকে; নিশ্চয় আল্লাহই রিজিক দেন।” (বায়হাকী, শুআবুল ইমান, হাদিস ৮২৯৭)
এখানে রিজিক শুধু টাকা নয়, মানসিক শান্তি, সামাজিক মর্যাদা ও সন্তুষ্টি সবই এর মধ্যে পড়ে। অন্য এক হাদীসে তিনি সন্তানকে বলেছেন,
“সন্তান হলো জান্নাতের ফুল।” (সহিহ বুখারী ৫৯৯৩)
অর্থাৎ সন্তান কেবল দায়িত্ব নয়, তারা আনন্দ, রহমত এবং পরিবারের জন্য এক আধ্যাত্মিক পুরস্কার। নবী ﷺ আরও বলেছেন,
“বিবাহ করো এবং সন্তান জন্ম দাও, কেননা আমি কিয়ামতের দিন তোমাদের সংখ্যাধিক্যে গর্ব করব।” (সুনান আবু দাউদ ২০৫০)
এখানে স্পষ্ট ইসলাম সন্তানকে সমাজের শক্তি হিসেবে দেখে। অর্থাৎ শুধু আবেগ বা ধর্মীয় অনুভূতির দিক থেকে নয়, একটি শক্তিশালী জাতি গঠনের জন্যও সন্তান অপরিহার্য।
আধুনিক সমাজবিজ্ঞানও আজ এই কথার সাথে একমত। গবেষণায় দেখা যায়, সন্তান জন্ম নেওয়ার পর পরিবারে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। সমাজবিজ্ঞানে একটি জনপ্রিয় টার্ম হলো Fatherhood Premium, যার মানে হলো সন্তানের বাবা হওয়ার পর গড় আয় বাড়ে।
Michelle Budig ও Melissa Hodges (Gender & Society, 2010) দেখিয়েছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাবা হওয়ার পর পুরুষদের আয় গড়ে বাড়ে, এমনকি পজিশনাল প্রমোশন পাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
Rebecca Glauber (2008, Gender & Society) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে বাবা হওয়ার পর পুরুষদের শ্রমবাজারে ফলাফল উন্নত হয়। তারা বেশি সময় কাজ করে, বেশি দায়িত্ব নেয় এবং বেশি আয় করে।
Killewald (American Sociological Review, 2013) দেখিয়েছেন যে যেসব বাবা সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে একই বাড়িতে থাকেন, তাদের আয়ের উন্নতি সবচেয়ে বেশি হয়। যারা পরিবার থেকে আলাদা থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে এই বোনাস দেখা যায় না। এটাকে বলা হয় breadwinner effect। পরিবারকে দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কারণে বাবারা আরও কর্মঠ হয়ে ওঠেন এবং নিয়োগকর্তারা তাদের “গুরুত্বপূর্ণ কর্মী” হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
Lundberg & Rose (2002, Review of Economics & Statistics) দেখিয়েছেন বাবা হওয়ার পর পুরুষদের বার্ষিক কাজের ঘণ্টা বেড়ে যায় এবং ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বাড়ে। Yu এবং তার সহলেখকরা (Demography, 2021) ২৬টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে বাবাদের বেতন সাধারণত ৩% থেকে ১০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
এমনকি ইউরোপের তথ্যও একই কথা বলছে। যুক্তরাজ্যের TUC রিপোর্ট দেখাচ্ছে পূর্ণকালীন বাবাদের গড় ঘণ্টা-মজুরি প্রায় ২১% বেশি তাদের তুলনায় যাদের সন্তান নেই। জার্মানিতে এটি প্রায় ১০%, ফিনল্যান্ডে ১৫%। গবেষকরা বলছেন, সন্তান নেওয়া কেবল আবেগের সিদ্ধান্ত নয়, এটা পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে আরও স্থিতিশীল করে এবং সমাজে দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করে।
তাহলে আমরা বুঝতে পারি ইসলাম যা ১৪০০ বছর আগে বলেছে “সন্তান রিজিকের মাধ্যম”, তা কেবল আধ্যাত্মিক কথাই নয়, বাস্তব সমাজেও সত্য। সন্তান নেওয়া বাবাকে অনুপ্রাণিত করে কঠোর পরিশ্রম করতে, বেশি উপার্জন করতে এবং সমাজে সক্রিয় থাকতে। পরিবার বড় হলে অর্থনৈতিক চাকা আরও দ্রুত ঘোরে। এটি শুধুমাত্র একটি পরিবারের জন্য নয়, একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক।
তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। আমরা যদি শুধু দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে পরিবার গড়তে দেরি করি বা সন্তান না নেই, তবে হয়তো ভবিষ্যতে আমরা জাপান-কোরিয়ার মতো সংকটে পড়ব। সেসব দেশে আজ কোটি কোটি টাকা খরচ করেও মানুষকে সন্তান নিতে রাজি করানো যাচ্ছে না।
শারীরিক আর মানসিকভাবে কি সন্তান না নেয়ার প্রবণতা আমাদের খুব উন্নত করেছে? উত্তর হচ্ছে, করেনি। একটা সময় হয়তো আপনার কাছে সব আছে, কিন্তু মন থেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার কিংবা আপনার লিগাসি বয়ে নেয়ার কেউ থাকছে না।
কিন্তু তখন খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে হলে নতুন প্রজন্ম দরকার, পরিশ্রমী তরুণ দরকার যারা জ্ঞানে ও বিজ্ঞানে পৃথিবীর নেতৃত্ব দিবে।
সু-সন্তান, নেক সন্তান হলো দুনিয়া ও আখিরাতের সেই বিনিয়োগ।