20/08/2025
'মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ আজ বিশ্ব বাটপারদের খপ্পরে'
মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ ঢাকা শহরের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর খ্যাতিমান প্রধান শিক্ষক মরহুম শবদার আলী স্যারের হাত ধরে সমগ্র ঢাকা তথা বাংলাদেশের মধ্যে জায়গা করে নেয় এক অনন্য উচ্চতায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বিভিন্ন সময়ে কমিটি ও প্রশাসনে রদবদল হলেও শিক্ষক নিয়োগ ও একাডেমিক কার্যক্রমে কোনো রূপ ছাড় দেওয়া হয়নি। এ ধারা বজায় ছিল ২০১০ পর্যন্ত। তখন ছোটখাটো কিছু রাজনৈতিক ও উচ্চ মহলের চাপ থাকলেও প্রতিষ্ঠানে প্রকটভাবে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। সে কারণে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মহলে আত্মতুষ্টি ও সন্তুষ্টির মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ।
সবদার আলী স্যারের এত জনপ্রিয়তা, প্রতিষ্ঠানের এত সুনাম থাকা সত্ত্বেও মূল ও ব্রাঞ্চ-১ ছাড়া আর কলেবর বৃদ্ধি করার কথা চিন্তা করেননি। তিনি প্রায়শই বলতেন “যতো কক্ষ, ততো লক্ষ”। তাই ঐগুলো বাদ দিয়ে কোয়ালিটি ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। তাই পাঠদান প্রথা, খাতা মূল্যায়ন সিস্টেম, প্রশ্নের ধরন সবকিছুই চলত মানসম্পন্নভাবে এবং জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে। শিক্ষকদের মধ্যে মতাদর্শ ভিন্নতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানে কোনো গ্রুপিং ছিল না। শতভাগ না হলেও যোগ্যতা ও দক্ষতার একটা কদর ছিল। সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে চমৎকার মেলবন্ধন ছিল।
২০১০ এর পর আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ একটা সুনামির মধ্যে পড়ে গেল প্রতিষ্ঠান। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২ বার শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া বাংলার শিক্ষক জনাব ফরহাদ হোসেন শেষবার শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে চরমভাবে হেরে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। সরকার বদলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কাছে গেলেন কামাল মজুমদার সাহেবের। তারপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। নির্বাচন ছাড়া নতুন নতুন পকেট কমিটি, এডহক কমিটি করে প্রতিষ্ঠান থেকে যতোভাবে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার রাস্তা আছে, সব রাস্তা তৈরি করতে যা যা করা দরকার তার সবকিছু করেছেন নিখুঁতভাবে। কামাল মজুমদারকে সাথে নিয়ে যখন যাকে দরকার তাকে দিয়ে কাজ করিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির সর্বনাশ করতে তারা একের পর এক ক্যাম্পাস বৃদ্ধি, কলেজ, ইংলিশ ভার্সন ইত্যাদি চালু করে রাতারাতি আয়ের খাতগুলো তৈরি করতে থাকেন। তারা জায়গা কেনা, ভবন নির্মাণ, শিক্ষক নিয়োগ, কর্মচারী, আয়া, পিয়ন, ডাক্তার, নার্স, লাইব্রেরিয়ান, ডেমোনস্ট্রেটর, ড্রাইভার, কেয়ারটেকার, লিফটম্যান, আইটি’র মতো প্যাটার্ন বহির্ভূত নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন। আর এসব নিয়োগে কোনো রকম নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করা হয়নি। টাকা এবং আত্মীয়তাই এসব নিয়োগের মূল মাপকাঠিতে পরিণত হয়। স্বামী-স্ত্রী, মামা-খালু, চাচা-চাচি, ভাগনে-ভাগনি, ভাতিজা-ভাতিজি ইত্যাদি ব্যক্তিরাই হয়ে উঠে মনিপুরের চালিকা শক্তি।
কিছু গুণী, যোগ্য, দক্ষ শিক্ষককে অন্যায়ভাবে নির্মম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত করে; কিছু সিনিয়র শিক্ষককে বদলি ও হয়রানি করে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে হারার প্রতিশোধ নেয় ফরহাদ গং। চরমভাবে ভেঙে পড়ে স্কুলের শৃঙ্খলা, নিয়ম-কানুন। এই পরিস্থিতিতে যারা সুযোগ বুঝে পা চাটতে পেরেছেন, নিজের সবকিছু বিলিয়ে দেওয়ার পরে তাদের কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই সহকারী প্রধান পোস্টে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবে সিনিয়রিটি ব্রেক করে এক ন্যাক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা চরম ফ্যাসিস্ট ও অগণতান্ত্রিক আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
এই সময়ে তারা অ্যাকাউন্ট সেকশনে নিয়ন্ত্রণ নিতে পুরাতন হিসাবরক্ষকদের সরিয়ে নিজেদের লোক নিয়োগ করে। তারা এমপিওভুক্ত সিনিয়র শিক্ষকদের নানা কৌশলে নির্যাতনের মাধ্যমে এমপিও সারেন্ডার করিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ট্রাস্টি বোর্ডের আওতায় নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তবুও তারা আশা না ছেড়ে সকল শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে সেই টাকা নিজেদের পকেটে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু বেতন কাটা সহ অন্যান্য নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের নিয়োগকৃত পাচাটা শিক্ষক গ্রুপের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
২০২৩ সালে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রাঞ্চ-১ এর ইংরেজি বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক জাকির স্যার তার অনুগত ব্রাঞ্চ-১ এর আরো কয়েকজন শিক্ষক (নাম উল্লেখ করলাম না) কে সাথে নিয়ে ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। দলমত নির্বিশেষে সে আন্দোলনে প্রায় সবাই একত্রিত হয়। শিক্ষকদের মাঝ থেকে প্রচুর অর্থ চাঁদা হিসেবে উত্তোলন করা হয়। বাইরের অনেক ডোনারও নাকি টাকা-পয়সা সহায়তা দেয়। এসব টাকার কোনো হিসাব নেই। ব্রাঞ্চ-১ এর একজন আইটি ইঞ্জিনিয়ার তার পছন্দের কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে জাকির স্যারের সাথে এ সব অর্থের হিসাব-নিকাশ করতেন।
ফরহাদ স্যারের পতনের পর জাকির স্যার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হন। তখনও আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের মতো যারা বেশি টাকা দিতে পেরেছে তাদের কোনো রকম যোগ্যতার বিচার না করে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন ক্যাম্পাসে নিয়োগ দেন। সে ক্ষেত্রেও কুশীলব হিসেবে ব্রাঞ্চ-১ এর শিক্ষকরা অগ্রাধিকার পান। কিন্তু ফরহাদ গেলেও পুনরায় কামাল মজুমদার কিছু দুর্নীতিকারী বেইমান শিক্ষকদের নিয়ে স্কুলে আবার দখল প্রতিষ্ঠা করেন।
এমতাবস্থায় নিরীহ সিনিয়র শিক্ষকেরা আবার তাদের রোষানলের শিকার হন। ২০২৪ এর ৫ই আগস্ট হাজার শিক্ষার্থী ও ছাত্রজনতার রক্তের বিনিময়ে আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের বিদায় হলে সবাই মনে করেছিলো ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে দেশের সবখানে। যার সুফল মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজও ভোগ করতে পারবে। প্রতিষ্ঠানটি আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। বিদায় হবে অযোগ্য পাচাটা ফ্যাসিস্ট গ্রুপ। সেই আশায় ছিলেন হাজার হাজার অভিভাবক।
একটা এডহক কমিটি এসে কিছু কাজে হাতও দিয়েছিলেন। উপায়ান্তর না পেয়ে ইন্টারনাল সার্কুলার এর মাধ্যমে সহকারী প্রধান নিয়োগ দেওয়ার জন্য লিখিত ও ভাইভার মাধ্যমে একটা নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন করেন। সেখানে ব্রাঞ্চ-১ এর সুবিধাভোগী শিক্ষকদেরও অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। পরে যারা কৃতকার্য হন তাদের একটি প্যানেল করে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে নতুন এডহক কমিটি আসলে সবাই আবার বিভিন্ন বিএনপি নেতার পাচাটা শুরু করে নতুনভাবে বিএনপি সেজে নিজেকে জাহির করতে শুরু করেন। বিএনপি-ও দেখল, এই পাচাটা বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে তাদের ১৫টি বছর লেগেছে। আমরা নতুন পাচাটা গ্রুপ তৈরি করতে তো ঐ রকম সময় লাগাবে। কাজেই সময় কোথায়, এদেরকে নিয়েই কাজ চালিয়ে দিই। সুতরাং যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। প্রতিভাবান এক প্রধান শিক্ষককে (ভারপ্রাপ্ত) সামনে দিয়ে ফ্যাসিস্ট কায়দায় জামাত ট্যাগ দিয়ে মেধাবী কিছু সহ-প্রধানকে কোনো রকম নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে চেয়ার থেকে সরিয়ে পাচাটা গ্রুপটিকে দায়িত্বে বসিয়ে দেওয়া হয়।
এর পেছনে ও এই বাটপারদের হাত রয়েছে বলে অভিভাবক মহল মনে করে। এখন দেখার বিষয়, এই বাটপারদের রাহুগ্রাস থেকে কবে মুক্তি পায় আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ।
— একজন অভিভাবক