29/11/2025
আসহাবে কাহফের ঘটনা থেকে শিক্ষাঃ
-
প্রথমেই সংক্ষেপে ঘটনাটা বলে নিচ্ছি। অনেকদিন আগের কথা, এক রাজ্যের রাজা প্রজা সকলেই ছিল মুশরিক। তারা সকলে মুর্তি পূজা করতো এবং বিশেষ এক দিনে সবাই মিলে আনন্দ উদযাপন করতো। বিশেষ এই দিনে সবার জন্য অনুষ্ঠানে যোগদান করা ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু একবার দেখা গেল সম্ভ্রান্ত পরিবারের সাত যুবক অনুষ্ঠানে আসেনি। তাদের ব্যাপারে কানাঘুষা শুরু হল যে তারা রাজ্যবাসীর দেব দেবীর পুজা বাদ দিয়ে ভিন্ন এক ইলাহের ইবাদত করা শুরু করেছে। এই খবর এক কান দুই কান করে পৌঁছে গেল রাজার কাছে। রাজার অন্যায় অত্য|চ|রের কথা তাদের অজানা ছিলোনা। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার।
যেই ভাবা সেই কাজ, এক রাতে তারা সকলের অজান্তে রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে গেলেন এবং আশ্রয় নিলেন একটি গুহায়। তাদের পাহারাদারি করার জন্য একটি কুকুরও সঙ্গী হল তাদের। অজানা শহরের অচেনা গুহায়, আশ্রয়হীন, সহায়হীন সাতজন যুবক পা বাড়িয়েছেন, পদে পদে আছে বিপদের শঙ্কা, মৃত্যুর ভয়...কিন্তু কোনো কিচছুই তাদেরকে থামাতে পারেনি, রবের উপর তাদের তাওয়াক্কুল সীমাহীন...তাওহীদের প্রশ্নে তাঁরা দৃঢ় ও আপোসহীন। মহান রবী কারিম তাওহিদের উপর তাঁদের অটলটার প্রতিদান দিলেন, তাঁর প্রতি এই যুবকদের আস্থা ও তাওয়াক্কুলের লাজ রাখলেন। সমস্ত ভয়-ভীতি-উদ্বেগ দূর করে দিয়ে তাদের দু'চোখে ঢেলে দিলেন প্রশান্তির ঘুম। গুহায় গিয়ে তারা প্রথমেই ৩০৯ বছর ঘুমালেন। একটানা তিনশো নয় বছর ঘুমানোর পর একদিন তাদের ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভাঙার পর তাদের মনে হচ্ছিলো তারা বুঝি কিছুক্ষণ আগে ঘুমিয়েছেন। এক ঘুমে যে তিনশো নয় বছর পার হয়ে গেছে সেটা তারা টেরই পাননি। ঘুম ভাঙার পর তারা ভীষণ ক্ষিদে অনুভব করলেন। তাই খাবারের খোঁজে একজনকে পাঠালো শহরে। খাবার আনতে গিয়ে ঘটে গেল এক বিশাল কান্ড, সবাই অপরিচিত মানুষ এবং তার হাতে থাকা কয়েক শতাব্দী পুরাতন মুদ্রা দেখে কৌতূহলী হয়ে উঠলো। যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে এখন আর আগের সেই জালেম রাজা নেই তখন তিনি তাদের কাছে সব খুলে বললেন। তৎকালীন বাদশাহ সব শুনে তাদেরকে দেখতে এলেন এবং পুনরায় ঘুমানোর বন্দোবস্ত করে দিলেন।
-
কয়েকটি লক্ষ্যনীয় বিষয়ঃ
-
এই সাত যুবক বাহ্যত অনেক বেশি ইবাদত করেননি, বছরের পর নফল ইবাদতে মগ্ন থাকার সময় কিংবা সুযোগ পাননি, কিন্তু তাওহিদের উপর অটল-অবিচল থেকেছেন, তাগুত বর্জন এবং দ্বীন-ঈমানের হেফাজতের জন্য হিজরত করেছেন, ঈমান আনার পর নিজ ঈমান আমলের উপর আশংকা থাকায় বাড়ি ঘর ছেড়ে আশ্রয় নেয় পাহাড়ের গুহায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকট তাদের এই আমল এত বেশি পছন্দ হয়েছিল যে কোরআনুল কারীমে তাদের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন এবং তারা কোন পার্শ্বে কিভাবে ঘুমাতো তাও বর্ণনা করেছেন। শুধু তাই নয় তাদের সাথে থাকা কুকুরটি গুহামুখে কিভাবে কোন ভঙ্গিতে বসেছিল তার বর্ণনাও দিয়েছেন কুরআনুল কারীমে। এথেকে বোঝা যায় তারা আল্লাহ তাআলার কত বেশি প্রিয় ছিলো।
-
শিক্ষাঃ
-
এই যুবকেরা যেভাবে নিজের দ্বীন ঈমান বাঁচানোর জন্য ঘর বাড়ি ছাড়ার কারনে আল্লাহ তাআলার এতটা নৈকট্য অর্জন করেছে । আজও যদি কোন ব্যাক্তি নিজের দ্বীন ঈমান বাঁচানোর জন্য হিজরত করে, ঘর বাড়ি ত্যাগ করে তাহলে সেও অনুরূপ নৈকট্য লাভ করবে। শুধু এতটুকুই পার্থক্য যে তার কথা কুরআনুল কারীমে আসবেনা, যেহেতু কুরআনুল কারীম নাজিল হয়ে গেছে।
এই ঘটনার আরেকটি শিক্ষা হলো, কেউ যদি নিজের দ্বীন ঈমান রক্ষার পাশাপাশি অন্যন্য মানুষের দ্বীন ঈমান রক্ষার জন্য নিজ ঘর বাড়ি ত্যাগ করে হিজরতের পথ বেছে নেয়, তাহলে সে যে কত বিশাল মর্যাদার অধিকারী হবে এবং আল্লাহ তাআলার কতখানি প্রিয় হবে তা আমাদের কল্পনারও বাইরে।
আল্লাহ তাবারকা ওয়া তায়ালা যেন আমাদেরকেও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করার তাওফিক দান করেন, সমস্ত তাগুতকে বর্জন করে তাওহিদের উপ অটল-অবিচল থাকার তাওফিক দান করেন।
©️ শায়েখ আবু উবাইদাহ আল-হিন্দী হাফিজাহুল্লাহ