Khalid hasan

Khalid hasan আমায় চিনিলে না?
🔥আমি তো অতল আঁধারের অন্তরালে দীপশিখার অন্বেষণরত এক নির্ভীক অভিযাত্রী🔥

 #ভিএম্পায়ার  #পর্বঃ২৭লেখাঃ  লাড্ডু সিং এখানে! আর চৌবাচ্চায় ওই মেয়েটাকে কেন বেঁধে রাখা! লাড্ডু সিং ওপাশের ঘরে প্রবেশ কর...
04/11/2025

#ভিএম্পায়ার
#পর্বঃ২৭
লেখাঃ

লাড্ডু সিং এখানে! আর চৌবাচ্চায় ওই মেয়েটাকে কেন বেঁধে রাখা! লাড্ডু সিং ওপাশের ঘরে প্রবেশ করতেই আমি চৌবাচ্চার কাছাকাছি গেলাম। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। আমার সমবয়সী বলেই মনে হচ্ছে। চোখ মুখ শুকিয়ে আছে মেয়েটার। তার গায়ে রূপালী রঙ্গের একটা অদ্ভুত ধরনের পোশাক জড়ানো। সেই পোশাক ভেদ করে বেরিয়ে আসছে রক্ত। বুঝাই যাচ্ছে লাড্ডু সিং মেয়েটার উপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে। মাথা নুইয়ে নিথর হয়ে আছে তার শরীর। মেয়েটাকে মুক্ত করার চিন্তা মাথায় আসলো। আমি খেয়াল করে দেখলাম মেয়েটার হাত দুটো চৌবাচ্চার মাঝখানে একটা পিলারের সাথে শক্ত করে বেঁধে দেয়া। মেয়েটা পানিতে দাঁড়িয়ে। হঠাৎই তার পায়ের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। তার পায়ের জায়গায় পা নেই। সেখানে বিশাল একটা মাছের লেজ নড়াচড়া করছে। যেনো পানিতে কোনো মাছ ছটফট করছে বলে মনে হচ্ছে! আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা কোনো রূপকথা নয়। আমার সামনে একটা মৎসকন্যা! ক্রিপ্টোরিয়ায় আমার দেখা দ্বিতীয় রহস্যময় জীব এটা!

প্রচন্ড অবাক হলাম আমি। তখনই পাশের ঘর থেকে লাড্ডু সিং এর চিৎকার ..
– এই সামান্য লিকুইড দিয়ে কি হবে আমার! ব্যাবসায় দেহি লাল বাত্তি জ্বইলা গেলো।

আমি মৎসকন্যার থেকে চোখ সরিয়ে এবার পাশের ঘরে উকি দিলাম। মেয়েটাকে মুক্ত করার আগে লাড্ডু সিং এর সাথে হিসাব নিকাশ করা জরুরী। খেয়াল করলাম লাড্ডু সিং তার দুই বডিগার্ডসহ পাশের ঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে। সেখানে একটা কাঠের তাকের উপর সারি সারি তরল ভর্তি শিশি সাজানো ঠিক যেমনটা দেখেছিলাম লাড্ডু সিং এর থেকে ভ্যানিশার কিনতে গিয়ে। ওগুলো কি ভ্যানিশারের শিশি!

আবারও লাড্ডু সিং এর হুঙ্কার ..
– মার্কেটে বহুত ডিমান্ড কিন্ত সাপ্লাই নাই। এখন আমার ব্যবসা চলবো ক্যামনে রে! এইদিকে মারমেইডরা পালায়া গেছে। তাদের পালাইতে সহযোগিতা করলো কেডায়! ক্রিপ্টোরিয়ার জঙ্গলে আসার সাহস কার হইলো! তারে যদি পাইতাম লাড্ডু খাওয়ায় দিতাম। মনে হইতাছে আমগো আস্তানা বদলাইতে হইবো।

লাড্ডু সিং তার বিশালদেহী বডিগার্ডদের সাথে কথা বলছে আর তরল ভর্তি শিশি গুলোর ভিতরে কিছু একটা করছে। ঘর গুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ায় তারা আমার অবস্থান এখনো টের পায়নি। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম সবকিছু। কেন যেনো মনে হতে লাগলো আমি অন্ধকারেও সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এটা কি কোনো জাদুশক্তি! আমি বুঝতে পারছি না। তবে সত্যিই মনে হচ্ছে আমার দৃষ্টি শক্তি আগের থেকেও বহুগুণে বেড়ে গেছে।

তাকিয়ে দেখলাম লাড্ডু সিং এর হাতে একটা কাঠি। আর সেই কাঠির ডগায় একটা ছোট্ট পাথর জ্বলজ্বল করছে। লাড্ডু সিং সেই জ্বলন্ত ছোট্ট পাথরের অংশটা কাঠি দিয়ে ভ্যানিশারের শিশিতে থাকা তরলে চুবাচ্ছে আর কথা বলছে ..
– সাপ্লাই কম ডিমান্ড বেশি। মনে হয় মালের দাম আরো বাড়াইতে হইবো। ইচ্ছা ছিলো ভ্যালমোরার বারটা বাজায় দেওনের কিন্ত ভ্যানিশারের সাপ্লাই না থাকলে তো হইবোনারে। অন্যদিকে সম্রাটের ভি যে আমিই চুরি করছিলাম সেইডা যদি সম্রাট জানতে পারে তাইলে তো আমি শ্যাষ। উল্টা ভি তো আমার থাইকা চুরি কইরা নিয়া গেছে ওই পিচ্চি পোলাগুলা। ওইগুলারে তো অহন ধরতে যাওয়াও ঝামেলা।

লাড্ডুর কথার মাঝেই আমি অনুভব করতে লাগলাম, আমার বুক যেনো প্রচন্ডভাবে তাপপ্রবাহ হচ্ছে। আমার গলার লকেটটা প্রচন্ড তাপ উৎপন্ন করছে সেইসাথে তীব্র লাল আলো। হঠাৎই লাড্ডু সিং এর হাতে থাকা পাথরটাও যেনো প্রচন্ডভাবে জ্বলে উঠলো। একইরকম তীব্র লাল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটছে সেটা থেকেও। জিনিসটার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে মাথা চুলকাতে লাগলো লাড্ডু সিং ..
– কিরে কিরে! এই মালে আবার এমন চকচক করতাছে ক্যান! আগে তো কখনও এমন হয়নাই!

আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না লাড্ডু সিং এর হাতে থাকা পাথরটাই আমার লকেটের অংশ। দুটো থেকে একই ধরনের লালছে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটছে। লাড্ডু সিং কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলাম ..
– কারণ জিনিসটা তার আসল মালিককে পেয়ে গেছে। তাই খুশিতে চকচক করছে।

সঙ্গে সঙ্গে লাড্ডু সিং আর তার বডিগার্ডরা ঘুরে দাড়ালো আমার দিকে। তার বডিগার্ডরা রাইফেল তাক করলো আমার দিকে। বিড়বিড় করে কথা বললো লাড্ডু সিং ..
– অসম্ভব! তুই সেই আকিরা না?

– বাহ, ভালোই ফেমাস তো আমি! মানুষ এখন অন্ধকারেও চিনে ফেলে আমাকে। এখন আবার অটোগ্রাফ চেয়ে লজ্জা দিবেন না প্লিজ।
– তোরে কি আর ভুলা যায়? আমার ভি চুরি করছোস তুই।

–হ্যাঁ, যেটা আপনি সম্রাটের থেকে চুরি করছিলেন।

– ওরে বাবারে! এই পোলায় দেহি আমার গোপন কথা শুইনা ফালাইছে। এরে তো লাড্ডু খাওয়ায় দিতে হবে এখনি। নইলে সম্রাট জানতে পারলে আমারেই লাড্ডু খাওয়ায় দেবে। তা ভাতিচা তুই ক্রিপ্টোরিয়ায় আসার সাহস পাইলি কিভাবে! আর আইলি যখন, আমার আস্তানায় ঢুকলি ক্যামনে! বাইরে আমার পোষা ডগি কি তোরে চাটাচাটি করেনাই?

– না রে কাকু, চাটাচাটির আগেই তোমার ডগিরে আমি বড়ো বড়ো লাড্ডু খাওয়ায় দিছি। বদহজম হয়ে কোমায় চলে গেছে।

– ওরে বাপ্রে! এ ছেলে দেখি বহুত ডেঞ্জারাস! ডগির সাথে ক্যামনে পারলি তুই! যেইহানে আমার বডিগার্ডরাই হের দিকে তাকাইলে প্যান্টে মুইতা দিতো!

– আরে কাকু, কথা কম। তোমার হাতে যে সুন্দর পাথরটা দেখা যাচ্ছে। ওইটা আমার কাছে হ্যান্ডওভার করো। ওইটার জন্যই ক্রিপ্টোরিয়ায় আসা লাগছে আমার।

–ওই ভাতিচা। অহন তোরে তো আমার লাড্ডু খাওয়াইতেই হবে। তুই আমার সব গোপন কথা জাইনা গেছোস। গার্ডস, শুট হিম।

লাড্ডু সিং এর গার্ডরা অনবরত রাইফেল থেকে গুলি ছুড়তে লাগলো। আমি ঠায় দাড়িয়ে রইলাম। একের পর এক বুলেট আমার শরীর ভেদ করে প্রবেশ করছে। আমি অনুভব করছিলাম সেগুলো আমার চামড়া ভেদ করে ভিতরে হাড় পর্যন্ত আঘাত করছে। তাদের রাইফেলের বুলেট শেষ হয়ে গেলো। আমি তখনও ঠায় দাড়িয়ে রইলাম। আমার ব্যথা অনুভব হচ্ছে ঠিকই কিন্ত তারা আমাকে দুর্বল করতে পারলো না। যেনো মনে হলো আমার শরীর থেকে কোনো রক্তই ঝড়ছে না।

ঠিক তখনই ঘটলো আশ্চর্য ঘটনা। আমার শরীর থেকে বুলেটগুলো ধীরে ধীরে নিজে থেকেই বেরিয়ে যাচ্ছে। ছেদ হওয়া চামড়া আপনাআপনি আগের মতো হয়ে যাচ্ছে। তারা তিনজনই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হঠাৎই বলে উঠলো লাড্ডু সিং ..
– ভ্যাম্পায়ার! তুই একটা ভ্যাম্পায়ার। এই শক্তি শুধু ভ্যাম্পায়ারেরই থাকে। তুই এতদিন মানুষ রূপে ডেল্টোরায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলি!

লাড্ডু সিং এবার তার বডিগার্ডদের উদ্দেশ্যে হুঙ্কার দিলো ..
–গার্ডস, এটা একটা ভ্যাম্পায়ার! ওর গলা কেটে আগুন লাগাতে হবে। আগুন আনো।

সঙ্গে সঙ্গে আমার এক হাতে আগুন জ্বালিয়ে ফেললাম আমি। আর লাড্ডু সিং এর উদ্দেশ্যে বললাম ..
– তোমাদের কি আগুনের খুব প্রয়োজন? আমার কাছে অফুরন্ত আগুন রয়েছে।

ভরকে গেলো তারা তিনজনই। আমি ধীরে ধীরে তাদের কাছাকাছি যেতে লাগলাম। তারা তিনজনই যেনো ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আগুনের এমন আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে তারা এখনো হজম করতে পারেনি।

লাড্ডু সিং যেনো ভয়ে তার বডিগার্ডের কোলে উঠে পড়বে। দুই হাত দিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছে তার হাতে থাকা পাথরটা। আমার চোখে প্রচন্ড রাগ। একদম লাড্ডু সিং এর চোখে চোখ রেখে বলে উঠলাম ..
– তোর হাতে যে জিনিসটা ধরে আছিস, ওইটা আমার সম্পত্তি।

লাড্ডু সিং আমতা আমতা করে জবাব দিতে লাগলো ..
– কি যে বলো ভাতিজা, এইডা তো আমার জিনিস। এইটা দিয়া আমি ভ্যানিশার বানাই।

– আচ্ছা! তাই নাকি। কিভাবে বানাস?

– ওইযে মারমেইডের চোখের জলে এই পাথরের ছোঁয়া দিলেই ভ্যানিশার প্রস্তুত। এজন্যই তো মারমেইড ধইরা ধইরা তাদেরকে চাবুক মাইরা মাইরা কান্না করাই। তুমি কিন্ত আমার সাথে বাড়াবাড়ি কইরো না ভাতিজা। আমার পিছনে কিন্ত সম্রাটের হাত আছে। হে নিজেও কিন্ত আমার থাইকা কমিশন খায়। আমারে ছাইড়া দাও। তোমার যদি কমিশন লাগে তাইলে নিও। এইডা হইলো পরশ পাথর, এইডা তো ভুলেও তোমারে দেয়া যাইবো না। ব্যবসায় লাল বাত্তি জ্বইলা যাইবো না তাইলে! অলরেডি আমার পাঁচটা মারমেইড পালায়া গেছে। আর ওই বাচ্চা মারমেইডরে বহুত কষ্টে সমুদ্র থাইকা ধরছি। কিন্ত হেতি কিছুতেই কানতাছে না।

প্রচন্ড রেগে গেলাম আমি ..
– তুই কি তোর পরশপাথর হ্যান্ডওভার করবি নাকি তোকে আমার এই আগুনের পরশ দিতে হবে?

এবার দুই হাতেই আগুনের গোলক বানালাম আমি। লাড্ডু সিং আরো ভীত হয়ে গেলো ..
– ওরে বাপ্রে! এইটা আবার কোন ধরণের সায়েন্স! হাতে কি পেট্রোল পাম্প সেটাপ কইরা লইছো নাকি ভাতিজা? এই আগুন জ্বলতাছে ক্যামনে! নিভেনা ক্যা!

– তোরে পুড়ায়া ছাই করার জন্য অবশ্য এত আগুনের দরকার হবেনা।

– বাপ্রে! আর কত কি দেখবো ভ্যালমোরায়! তুমি দেখি বিরাট ম্যাজিশিয়ান। আমি আগে জানতাম না ভাতিজা। দেখো ভাতিজা, তোমার সাথে আমার আগে যা শত্রুতা ছিলো আমি সব ভুইলা গেলাম। তবু এই জিনিস চাইও না। আমার ব্যবসার একমাত্র মূলধন এই পরশ পাথর।

– বুঝছি, তোরে এইভাবে শায়েস্তা করা যাবেনা।

আমার কথা শেষ না হতেই লাড্ডু সিং এর বডিগার্ডরা যেনো আমাকে আক্রমণ করার জন্য তেড়ে আসতে লাগলো। খেয়াল করলাম লাড্ডু সিং চালাকি করার চেষ্টা করছে। সে ধীরে ধীরে ভ্যানিশারের একটা শিশি হাতে নিচ্ছে। গার্ডরা আমার কাছে আসা মাত্রই সঙ্গে সঙ্গে দুই হাতে দুইজনের বুকে আগুনের গোলা ছুড়ে মারলাম আমি। বডিগার্ডরা আগুনের ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে পড়লো ভ্যানিশারের তাকে। সেইসাথে তারা লাড্ডু সিং এর গায়ে ধাক্কা দিলো। লাড্ডু সিং এর হাত থেকে ভ্যানিশারের শিশি পড়ে গেলো।

ভ্যানিশারের সাজানো শিশিগুলো চুরচুর করে ভাঙ্গতে লাগলো। বডিগার্ডদের গায়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। এসব দেখে লাড্ডু সিং ভয়ে আরো কুকরে গেলো। তবুও যেনো সে পাথরটা দিতে চাচ্ছে না আমাকে। আবারও হুঙ্কার করলাম আমি ..
– শেষ বারের মতো বলছি। তোকে জানে মারার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। ভালোয় ভালোয় পাথরটা দিয়ে দে।

লাড্ডু সিং এবার ভয়ে ভয়ে মিনতি করতে লাগলো ..
– ওরে বাপ্রে, পোলা তো নয় যেনো আগুনের গোলা! দিতাছি ভাতিজা দিতাছি, আমারে কিছু কইরো না। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দেও প্লিজ। .. এই নাও তোমার পাথর ..

লাড্ডু সিং তার এক হাতে জ্বলজ্বল করতে থাকা পাথরটা এগিয়ে দিলো আমার দিকে। আমি সেটা হাতে নিলাম। দেখতে লাগলাম চোখ বুলিয়ে। আমার লকেটের পাথরের অংশটায় একটা জায়গায় ভাঙ্গা মনে হয়। এই অংশটা কি সেই জায়গায় জুড়ে যাবে! পাথরটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে সেটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেললাম। লাড্ডু সিং তখনও ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার বডিগার্ডরা ছটফট করে নিজেদের গায়ের আগুন নিভাতে ব্যস্ত। প্রশ্ন করলাম লাড্ডু সিং এর উদ্দেশ্যে ..
– এখান থেকে কতদূরে মারমেইডদের আবাস?

– ক্রিপ্টোরিয়ার জঙ্গলের শেষ মাথায় সমুদ্র। সমুদ্রের পানিতেই তাদের বসবাস। তবে বিল্ডিংয়ের পিছনে একটা নদী আছে। সেটা দিয়েও নৌকাযোগে সমুদ্রে যাওয়া যায়।

– তুই অনেক বড়ো হারামী লাড্ডু। তুই ভ্যালমোরায় সব অপকর্ম ছড়িয়ে দিয়েছিস। তোকে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবেনা। আমি শীঘ্রই ভ্যালমোরার হিরো হতে যাচ্ছি। আর তোর মতো ভিলেনদের বাঁচিয়ে রাখা তো অন্যায় হয়ে যাবে। অন্যদিকে তুই আমার মনস্টার রূপটাও দেখে ফেলেছিস।

– ভাতিজা তুমি কিন্তু আমারে কিছু করবা না বলছো। প্লিজ আমারে ছাইড়া দেও। আমি তোমার কথা কাউরে কমুনা। তুমি যে একটা বিরাট ম্যাজিশিয়ান এইটা আমি কোনোদিন কাউরে কমুনা। আমার টাক মাথার কছম।

লাড্ডু সিং তার টাক মাথায় হাত দিয়ে কছম কাটলো। আমি বিরক্তি নিয়ে বললাম ..
– আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। জোসে জোসে কথা দিয়ে ফেলেছিলাম। অবশ্য খুন খারাবি করার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। আচ্ছা আমি কিছু করবো না তোকে।

কথাটা বলেই আমি ঘর থেকে বের হলাম। আমার পিছে পিছে আসতে লাগলো লাড্ডু সহ তার বডিগার্ডরা। তার বডিগার্ডদের গায়ের জামা কাপড় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দেখলাম। তারাও আর ভয়ে আমাকে আক্রমণ করছে না। আমি পিছন ঘুরে আবারও জিজ্ঞেস করলাম লাড্ডুর উদ্দেশ্যে ..
– তোমার ডগিকে কি খাইয়ে এমন দানব বানিয়েছিলে?

– আর বলো না ভাতিজা। ভ্যানিশার খাইয়েছিলাম। ভ্যানিশার মানুষ খেলে ভ্যানিশ হয়ে যায়। কিন্ত সেই জিনিস অন্যন্য জীবজন্তুর উপর ভিন্ন প্রভাব ফেলে। ডগি একদম মনস্টার হয়ে গেছিলো। কিন্ত আমার পোষা কুকুরতো তাই আমার কথামতোই চলতো। এই বিল্ডিংটার পাহাড়াদার হিসেবে রেখে দিছিলাম ওকে।

লাড্ডুর কথাগুলো শুনতে শুনতে আমি চৌবাচ্চায় নেমে গেলাম। পানি ডিঙ্গিয়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যেতেই মেয়েটা আমার দিকে মাথা তুলে চাইলো। যেনো সে আমাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে গর্জন করে উঠলো। তার সূঁচালো ভয়ংকর দাঁত দেখে চমকে উঠলাম। সে হয়তো আমাকেও তার শত্রু ভাবছে। সে ক্রমাগত গর্জন করতে লাগলো আর তার লেজ দিয়ে পানিতে আছাড় মারতে লাগলো। ছড়ানো পানিতে ভিজে যেতে লাগলাম আমি। পিছন থেকে চিৎকার করতে লাগলো লাড্ডু সিং ..
– করো কি করো কি! ওর কাছে যেও না। খুবই হিংস্র মারমেইড। ওকে ফাঁদ পেতে ধরা হয়েছিলো। কাছে যেও না সুযোগ পেলেই কামড়ে দেবে। কৌশল জানা না থাকলে ওদের কাছে যাওয়া উচিত না। ওরা নরখাদক। কাঁচা খেয়ে ফেলবে তোমাকে। আর আমাদেরকেও ছাড়বে না।

আমি লাড্ডু সিং এর কথায় পাত্তা দিলাম না। মারমেইডটার কাছে গিয়ে চোখে চোখ রাখলাম। সে ধীরে ধীরে শান্ত হলো। আমি তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বললাম ..
– ভয় নেই, আমি তোমাকে মুক্ত করছি। আশা করছি আমাকে আক্রমণ করবে না।

আমি জানিনা সে আমার কথা বুঝতে পেরেছে কিনা। তবে তাকে শান্ত মনে হলো।
আমি তার হাতের বাঁধন খুলতে লাগলাম। খুবই মোটা আর শক্ত রশি দিয়ে বেঁধে রেখেছে তাকে। খোলাই যাচ্ছেনা। আমি হাতে আগুন জ্বালিয়ে দড়িটা একদম পুড়ে ছাই করে দিলাম। মারমেইড মুক্ত হয়ে গেলো। তার লেজটা ধীরে ধীরে মানুষের পায়ের মতো হয়ে গেলো। সারা গায়ে মাছের রূপালী আঁশের মতো দেখতে পোশাক জড়ানো তার। আমার দিকে তাকিয়ে আছে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে। আমি বললাম ..
– তুমি মুক্ত, পিছনের নদী ধরে সমুদ্রে চলে যাও। তোমার পরিবারের কাছে।

কথাটা বলেই আমি লাড্ডু সিং এর এই গোপন আস্তানা থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। চৌবাচ্চা থেকে নেমে সদর দরজা পার হবার সময় পিছন ফিরে তাকালাম মারমেইডের দিকে। বললাম ..
– তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। তুমি চাইলে তাদের খেতে পারো। আমি কিছু মনে করবো না।

আমার কথা শুনেই মারমেইডটা যেনো নিজের রূপের পরিবর্তন ঘটানো শুরু করলো। তার হিংস্র রূপ প্রকাশ পেতে লাগলো। ধীরে ধীরে সে একটা বিকৃত রূপের মনস্টার হয়ে যেতে লাগলো। শরীরের আকার তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে গেলো। ঝাপিয়ে পড়লো লাড্ডু সিং আর তার বডিগার্ডের উপর। শুরু হলো আর্তনাদ। খুবই বিদ্ঘুটে লাগছিলো এই দৃশ্য। আমি দ্রুত বিল্ডিং থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে এলাম। কামড় মেরে মেরে লাড্ডু সিং এর দফারফা করতে হয়তো মারমেইড মেয়েটা খুব বেশি সময় নেবে না।

যে রাস্তায় জঙ্গলে ঢুকেছিলাম সে রাস্তা ধরে ফিরে যেতে লাগলাম আমি। জোরে জোরে পা চালিয়ে সেই পাকা রাস্তায় উঠে গেলাম প্রায় কয়েক মিনিট পর। আশেপাশে তাকালাম। এজেন্ট খালিদ নামের সেই আগন্তুককে কোথাও দেখতে পেলাম না। হেক্সব্লেডের সাথে কি করতে হবে সে ব্যপারে তার থেকে নির্দেশনার প্রয়োজন ছিলো। দাড়িয়ে থেকে আশেপাশে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ খুঁজলাম। লোকটার কোনো চিহ্ন নেই। তাহলে কি গেস্ট হাউসে ফিরে যাবো?

গেস্ট হাইসে ফেরার জন্য পা বাড়াতেই সঙ্গে সঙ্গে তীব্র আলোর ঝলকানি। সেইসঙ্গে খিল খিল হাসির শব্দ। আমার সামনে একটা পোর্টাল খুলছে। বুঝতে বাকি নেই বিদ্ঘুটে হাসির শব্দটা মারিয়ার বিকৃত হাসি। পোর্টাল থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো মারিয়া। কিন্ত ওটা শুধু মারিয়া নয়। শরীরটা যে অপরূপার। চোখদুটো কাজল কালো। কালো কাপড়ে জড়ানো পুরো শরীর। মাথায় হুডি চাপানো। যেনো এক মায়াবী ডাইনি। মুখে লেগে আছে একটা শয়তানি হাসি। আমার দিকে তাকিয়ে আছে দুষ্ট চাহনিতে। আচমকাই বলে উঠলো সে ..
– প্রিয়তমা, তোমার তো আমার মন্দিরে আসার কথা ছিলো। বাসর সাজিয়ে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য। তুমি কি চাওনা সূর্যদেব আমায় গ্রহণ করুক? তুমি কি চাওনা ভ্যালমোরায় এক নতুন যুগের সূচনা হোক? যেখানে তুমি হবে রাজা আর আমি হবো তোমার রাণী।

আহা, শখ কতো! ডাইনি কোথাকার। একরাশ বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন ছুড়লাম আমি ..
– তুমি অপরূপার শরীরে প্রবেশ করেছো কেন?

খিলখিল করে হাসতে হাসতে কাছে আসতে লাগলো মারিয়া। আমার পিছনে দাড়িয়ে গলা জড়িয়ে ধরলো। কানের কাছে ফিসফিস করে বললো ..
– শরীর ছাড়া কি বাসর উপভোগ করা যায়! ভয় নেই, আমি তাকে একেবারে খতম করিনি। সে এখনো জীবিত আছে। তোমার সাথে মিলনের জন্য একটা শরীরের খুবই প্রয়োজন ছিলো। অবশ্য কামড় খাওয়ার পর এই শরীর ত্যাগ করবো আমি। ভিক্টরের মেয়ের শরীরই হবে আমার সর্বশেষ শরীর। সূর্যদেব আমায় গ্রহণ করলে আর কখনো আমার শরীর বদলের প্রয়োজন হবেনা।

– কামড়! তুমি কোন কামড়ের কথা বললে?

আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে মারিয়া যেনো আমায় আরো শক্ত করে জড়াতে লাগলো..
– তোমার কি এখনো তেষ্টা পাচ্ছেনা প্রিয়তমা! তুমি কি পান করতে চাওনা? অনুভব করো আমার শরীর। এখানে শিরায় শিরায় বইছে তোমার তেষ্টা মেটাবার অমৃত। পান করো, অমর করো নিজেকে। সেইসাথে অমর করো আমাকেও।

– তোমার কথাবার্তা একদম মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না!

– সব বুঝে যাবে প্রিয়। বুঝানোর জন্য আমি তো আছি।

মারিয়া কথাটা বলেই আমায় শক্ত করে চেপে ধরে আমার গলায় নাক ঘষতে লাগলো। খুবই অস্বস্তি শুরু হলো আমার শরীরে। সে যেনো ধীরে ধীরে তার শরীরের প্রতি আমার আকর্ষণ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। আমি তার বাহুডোর থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা শুরু করলাম। তখনই শুনতে পেলাম আলিশার কন্ঠস্বর ..
– আকিরা! অপরূপা! তোমরা এখানে এসব কি করছো? আর অপরূপা এটা কেমন পোশাক পড়েছে! খুবই ভয়ংকর লাগছে দেখতে।

আলিশা আশ্চর্য হয়ে আমার থেকে কিছুটা দূরে দাড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার আড়াল থেকে আলিশার পাশে এসে দাড়ালো আদিল আর আব্রাহাম। আদিল যেনো আমাকে দেখামাত্র চিৎকার করে উঠলো ..
– ওরে হালায় কামডা করছোস কি! এই রাইতের বেলায় পর মহিলার লগে এইসব কি করতাছোস! আররে! আলিশার কপাল পুড়ছে।

আব্রাহাম সঙ্গে সঙ্গে আদিলের মুখ চেপে ধরলো। আলিশা আবারও প্রশ্ন করলো ..
– আকিরা! অপরূপা তোমায় এভাবে জড়িয়ে ধরে আছে কেন! তোমরা এখানে কি করছো!

হাসতে লাগলো অপরূপার বেশ ধরে থাকা মারিয়া ..
–অপরূপা নয় আমি মারিয়া। আর আকিরা শুধুই আমার। ওর থেকে আমায় কেউ আলাদা করতে পারবে না।

কেস খেয়ে যাচ্ছি দেখছি। সঙ্গে সঙ্গে আলিশার উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম আমি ..
– বিশ্বাস করো আলিশা। এই ডাইনিটা আমার উপর চড়াও হয়েছে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। ও একটা ডাইনি। আমার ইজ্জত লুটে নিতে চাচ্ছে। ছেড়ে দে আমায় ডাইনি কোথাকার। আমি শুধু আলিশার।

সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করলো আদিল মারিয়াকে উদ্দেশ্য করে ..
– ওরে ওরে, ডাইনি কোথাকার। ছেড়ে দে আমার বন্ধুকে। তুই দেহ পাবি কিন্ত মন পাবিনা।

এদিকে আমি আমার বন্ধুদের সামনে আমার শক্তির প্রদর্শন করানোর চেষ্টা করছি না। আমি যদি এখন মারিয়ার সাথে ফাইট শুরু করি তাহলে আলিশা সহ আমার বন্ধুরাও আমার মনস্টার রূপটা দেখে ফেলবে। আর আলিশা মনস্টার প্রচন্ডভাবে ঘৃণা করে। আমি কখনোই চাইনা আলিশা আমার ভয়ংকর রূপ দেখে আমার থেকে দূরে সরে যাক। এখন কি করা যায়! ভাবতে লাগলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে হাসতে লাগলো মারিয়া। হাসি থামিয়ে বলে উঠলো ..
– আকিরার শরীর মন সব আমার হবে। আমরা দুজন এক হয়ে যাবো। ভ্যালমোরায় নতুন যুগের সূচনা হবে। নতুন সাম্রাজ্য তৈরী হবে। যেখানে আকিরা হবে রাজা আর আমি হবো তার রাণী।

আমি অনেক চেষ্টা করেও মারিয়াকে ছাড়াতে পারছি না। সে যেনো আমার শরীর ভীষণ শক্তভাবে জড়িয়ে ধরেছে। চিৎকার করলাম আলিশার উদ্দেশ্যে ..
– আলিশা, আমি কখনো রাজা হবো কিনা জানিনা কিন্তু আমার হৃদয়ের পুরোটা জুড়ে তুমি। আমার কল্পনার রাজ্যে একমাত্র রাণী শুধু তুমি। এই ডাইনির কথা তুমি একদমই বিশ্বাস করো না। ও আমাকে ভীষণ শক্তভাবে জড়িয়ে ধরেছে।

আমার কথা শুনে আলিশা যেনো তেড়ে আসতে লাগলো আমার দিকে। হুঙ্কার করলো মারিয়ার উদ্দেশ্যে ..
– আমার বয়ফ্রেন্ডকে ছেড়ে দে ডাইনি…

কাছে এসে আলিশা তার রিভলভার উচুঁ করে ধরলো মারিয়ার কপাল বরাবর। অট্টহাসিতে মেতে উঠলো এবার মারিয়া। আলিশা বিরক্ত হয়ে গেলো। আমি খেয়াল করলাম আলিশার হাত কাঁপছে। কিন্ত তবুও সাহস দেখাতে হুঙ্কার করলো আলিশা। ..
– অপরূপার শরীর থেকে বের হয়ে যা ডাইনি। নইলে গুলি করে মেরে ফেলবো তোকে।

হাসি থামিয়ে বলতে লাগলো মারিয়া ..
– তুমি কি সত্যিই এমনটাই মনে করো! গুলি করলে আমার মৃত্যু হবে? তাহলে চালাও গুলি ..

আবারও অট্টহাসিতে মেতে উঠলো মারিয়া। হাসতে হাসতে আমাকে ছেড়ে দিলো সে। ছাড়া পেয়েই আমি আলিশার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাপরে! আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো আরেকটু হলে। কি যে শক্ত করে চেপে ধরেছিলো আমায়! কিন্ত সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম মারিয়ার দিকে তাকিয়ে আলিশা একদম অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। তার হাত থেকে রিভলভার পড়ে গেলো। আলিশা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগ মুহুর্তে ধরে ফেললাম আমি।

তাকিয়ে দেখলাম মারিয়ার শরীর বিকৃত হয়ে একটা মনস্টার রূপ নিয়েছে। তার পিছনে বিশাল বড়ো বড়ো দুটো কালো ডানা। চোয়ালে সূঁচাল দাঁত। জ্বলন্ত লালচে চোখ। চুলগুলো যেনো সাপের মতো ফনা তুলছে ছোবল মারার জন্য। তার এই বিকৃত চেহারা দেখে যেকোনো দুর্বল হৃদয়ের ব্যক্তি পাগল হয়ে যাবে। কিন্ত আমার বন্ধু আদিল যেনো মোটেও ভয় পেলো না। সে হুঙ্কার করে উঠলো ..
– ওরে বাপ্রে! এটাতো ডাইনি না। এইটা তো ভ্যাম্পায়ার। আমার কাছে ভ্যালমোরিয়ামের তলোয়ার আছে। শালি, তুই ভেবেছিস জঙ্গলে আমার বন্ধুকে একা পেয়ে ইজ্জত লুটে নিবি। তা তুই কোনোদিন পারবি না ডাইনির বাচ্চা। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।

আদিল তার পকেট থেকে ভ্যালমোরিয়ামের ছুড়িটা বের করে হাতে নিয়ে সজোরে ছুটলো মারিয়ার দিকে তাকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে। আদিলের এই সাহস দেখে আমি অবাক সেইসাথে অবাক আব্রাহামও। আব্রাহাম যেনো ভয়ে এতটা স্থির হয়ে গেছে সে আদিলকে আটকানোর চেষ্টাও করলো না। আদিল এত জোরে ছুটছে যে আমিও আদিলকে আটকাতে পারলাম না। আলিশার অচেতন শরীরটা মাটিতে শুইয়ে দিবো এমন সময় খেয়াল করলাম মারিয়া আদিলের হাত ধরে ফেলেছে তার দুই হাত দিয়ে। মারিয়ার দানবীয় শরীরের সামনে আদিল যেনো নেহাতই বাচ্চা। হাসতে হাসতে বলতে লাগলো মারিয়া ..
– তোমার জানা উচিৎ বেয়াদব ছেলে, আমি কোনো ভ্যাম্পায়ার নই আর এই ভ্যালমোরিয়াম আমার কিছুই করতে পারেনা। বেয়াদবির জন্য তোমাকে চরম শাস্তি পেতে হবে। আমার চোখের দিকে তাকাও।

আদিল যেনো জমে শক্ত হয়ে গেছে। সে ভয়ে আর নড়াচড়া করছে না। অন্যদিকে আব্রাহাম পাথরের মূর্তির মতো একমনে তাকিয়ে আছে মারিয়ার দিকে। মনে হচ্ছে আব্রাহাম অনেক আগেই হিপনোটিজম এর শিকার হয়ে গেছে। আমি আলিশাকে শুইয়ে দিয়ে মারিয়ার উদ্দেশ্যে দৌড় শুরু করলাম। আদিলকে ছাড়াতে হবে। বোকাটা আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করলাম আদিলের পায়ের পাতা পাথরের আকার ধারণ করতে শুরু করেছে। সর্বনাশ! আদিলকে সাদেকের মতো পাথরের মূর্তি বানাতে চাচ্ছে মারিয়া।

আমি হাতে আগুনের গোলক তৈরী করতে যাবো এমন সময় দেখতে পেলাম মারিয়াকে পিছন থেকে লাথি মারলো কেউ একজন। এক লাথি খেয়ে মারিয়া ছিটকে দূরে গিয়ে পড়লো। ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পরলো আদিলের সম্মোহিত হওয়া শরীর। সে কোনো নড়াচড়া করছে না। চিৎ হয়ে পড়ে রইলো। অন্ধকারে দেখতে পেলাম আমার সামনে দাড়িয়ে আছে একটা মনস্টার। সে মারিয়াকে আঘাত করেছে। চেহারা চিনতে পারলাম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই। এটা ভিক্টর! সে এখানে কখন এলো!

কথা বলার সুযোগ পেলাম না আমি। সঙ্গে সঙ্গে মারিয়া চড়াও হলো ভিক্টরের উপর। ভিক্টর একটা গর্জন করে উঠলো। হুঙ্কার করে বলে উঠলো সে
– তোকে আজ আমি আমি খুন করে ফেলবো মারিয়া।

ভিক্টরের চিৎকারে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো। আমি চোখের সামনে দেখতে পেলাম দুটো মনস্টার বাতাসে ভেসে ভেসে একে অপরকে আঘাত করতে ব্যস্ত। তাদের ডানা ঝাপটানোর বাতাসে যেনো জায়গাটায় ভূকম্পন শুরু হয়ে গেছে। এক পর্যায়ে ভিক্টর মারিয়ার গলা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়লো। মারিয়ার বুকে চেপে বসলো ভিক্টর। মারিয়ার গলা এমনভাবে টিপে ধরেছে তার পা দুটো ছটফট করছে অনবরত। মারিয়ার মাথায় থাকা এক ঝাঁক সাপ ভিক্টরের হাতে ছোবল মারছে একের পর এক। কিন্ত ভিক্টর যেনো থামছেই না। যেনো সত্যিই সে আজ মারিয়াকে শেষ না করা পর্যন্ত থামবে না।

ঠিক সেই মুহুর্তে আরো একটা আশ্চর্য ঘটনা শুরু হলো। তীব্র আলোর ঝলকানি। একটা পোর্টাল অপেন হলো আমার পাশেই। বেরিয়ে এলো এজেন্ট খালিদ। আর সে এসেই ভিক্টরের চুল ধরে এক ঝটকায় মারিয়ার থেকে দূরে সরালো। ভিক্টর দূরে গিয়ে ছিটকে পড়লো। এজেন্ট খালিদ যেনো চোখের পলকে কাজটা করে ফেললো। চোখের সামনে এত দ্রুত ঘটনা গুলো ঘটে যাচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না আমার কি করা উচিৎ।

ছাড়া পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাড়ালো মারিয়া। আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলো এজেন্ট খালিদের দিকে। এজেন্ট খালিদকে দেখা মাত্রই মারিয়া ডানা ঝাপটে উড়ে চলে গেলো। মনে হলো সে পালিয়ে যাচ্ছে। দূর আকাশ থেকে তার কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম আমি ..
– আবার দেখা হবে আকিরা। তোমাকে আমার হতেই হবে।

সঙ্গে সঙ্গে ভিক্টর ডানা ঝাপটে উড়ে আসলো এজেন্ট খালিদের উপর চড়াও হওয়ার জন্য। এজেন্ট খালিদ ঘুরে তাকালো ভিক্টরের দিকে। ভিক্টর যেনো এজেন্ট খালিদের দিকে তাকানো মাত্রই ডানা ঝাপটানো থামিয়ে দিলো। ধীরে ধীরে তার মনস্টার রূপ স্বাভাবিক হয়ে গেলো আর সে মাটিতে ধপাস করে পড়ে গেলো। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো এজেন্ট খালিদের সামনে। আর মাথা তুলে তাকালো আশ্চর্য দৃষ্টিতে। আর বলে উঠলো ..
– এটা কি সত্যিই তুমি! এটা অসম্ভব!

এজেন্ট খালিদ যেনো এক মুহুর্ত সময় নিলোনা। ভিক্টরের হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান মেরে তাকে ছুড়ে ফেললো পোর্টালের ভিতরে। এরপর নিজেও চলে গেলো পোর্টালের ভিতরে। কি চলছে কিছুই বুঝলাম না আমি। পোর্টালের আলো নিভে যেতেই চিৎকারের শব্দ ..
– আমার ঠ্যাং, আমার ঠ্যাং। ওরে বাবারে বাবা আমার ঠ্যাং কই!

ঘুরে তাকালাম আমি। চিৎকার করছে আদিল। মাটিতে শুয়ে নিজের পা চেপে ধরে চিৎকার করছে অনবরত। সঙ্গে সঙ্গে আব্রাহাম ছুটে এলো আদিলের কাছে। আদিলকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করতে করতে আমার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো আব্রাহাম ..
– ডাইনিটা কোথায় গেলো দোস্ত! মনে হইলো যেনো আমার মাথা চক্কর দিছে।

আমি বুঝতে পারলাম আদিল আব্রাহাম হিপনোটাইজ থাকায় তারা এতক্ষণ যা ঘটেছে তার কিছুই দেখতে পায়নি। আদিলের চিৎকার বেড়েই চললো ..
– দোস্ত আমার ঠ্যাং, আমার ঠ্যাং এর কি হইলো রে দোস্ত। মনে হইতাছে আমার ঠ্যাং অবশ হইয়া গেছে রে দোস্ত। আমি পঙ্গু হইয়া গেছিরে দোস্ত।

আব্রাহাম আদিলকে ঘাড়ে নিলো আর বলতে লাগলো ..
– তর ঠ্যাং অতিরিক্ত কাঁপাকাঁপি করতে করতে ঠান্ডায় জমে গেছে হয়তো। চল রুমে গিয়ে গরম পানির ছ্যাঁক দিলে ঠিক হবে।

আদিল আব্রাহামের ঘাড়ে উঠতে উঠতে আবার বলতে লাগলো ..
– ঠান্ডায় না রে দোস্ত .. ওই ডাইনিটা কিছু একটা করছে।

আব্রাহাম আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলো ..
– কি করছে!

আদিল কোনো জবাব দিতে পারলো না। সঙ্গে সঙ্গে আমার উদ্দেশ্যে কথা বললো আব্রাহাম ..
– কিরে তুই এভাবে দাড়িয়ে আছিস কেন! আর আলিশা ওইভাবে পড়ে আছে কেন! ও কি ডাইনিটাকে দেখে অতিরিক্ত ভয় পাইছে নাকি!

আমি আব্রাহামের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আলিশার শরীরটা মাটি থেকে উঠানোর জন্য এগোলাম ঠিক সেই মুহুর্তে আমার পিছন থেকে কাঁধে হাত রাখলো কেউ। ঘুরে তাকাতেই দেখলাম ভিক্টর। স্বাভাবিক চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে সে। আমার দিকে তাকিয়ে ভারী কন্ঠে বলে উঠলো লোকটা ..
– আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবে আকিরা।

কথাটা বলে ভিক্টর নিজের মেয়ের নিস্তেজ শরীরটা কাঁধে উঠিয়ে নিলো। আদিল আব্রাহাম চুপচাপ তাকিয়ে আছে। ভিক্টর আমার মুখোমুখি দাড়িয়ে আবারও বললো ..
– এটা কোনো অনুরোধ নয় আকিরা। এটা সতর্কবার্তা। ধীরে ধীরে ভ্যালমোরার সকল মনস্টার তোমার শত্রুতে পরিণত হবে। আমি আমার মেয়েকে এসবের মধ্যে জড়াতে চাইনা। আশাকরি তুমি আমার কথাটা স্মরণ রাখবে। জানোই তো, শি হেইট মনস্টার।

ভিক্টর ঘার ঘুড়িয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো। কাঁধে ঝুলছে তার মেয়ের নিস্তেজ দেহ। চুলগুলো এলোমেলো উড়ছে হালকা বাতাসে। আমরা তিন বন্ধু তাকিয়ে তাকিয়ে ভিক্টরের চলে যাওয়া দেখছি। ধীরে ধীরে কুয়াশায় হারিয়ে যেতে লাগলো তারা। বিড়বিড় করে কথা বললো আব্রাহাম ..
– বলেছিলাম না? ভিক্টরের মেয়ের কিছু হলে ও আজ আমাদের কাঁচা খেয়ে ফেলতো। বেটায় তার মেয়ের খোঁজে ক্রিপ্টোরিয়া পর্যন্ত চলে আসছে! তাও আবার রাতের বেলা। ভাবা যায়!

সঙ্গে সঙ্গে আদিলের প্যানপ্যানানি শুরু হয়ে গেলো ..
– ওরে বাবা! ওই ডাইনিটার ব্যপারে তো আরো ভাবা যায়না! মনে হইলেই আমার ঠ্যাং কাঁপতেছে! একি আমার ঠ্যাং, আমার ঠ্যাং কাঁপতাছেনা ক্যান! ওরে আকি তোর জন্য আইজ আমি প্যারালাইজড হইয়া গেলাম রে! আমার ঠ্যাং দুইখান যমের বাড়ি চইলা গেলোরে আকি।

আমি সঙ্গে সঙ্গে দূরে কুয়াশার আড়ালে একটা তীব্র আলোর ঝলকানি দেখতে পেলাম। আমি আব্রাহামের উদ্দেশ্যে বললাম ..
– ওকে নিয়ে দ্রুত রুমে ফিরে যা। আমাদের সকালেই ডেল্টোরায় যেতে হবে। আদিলকে হাসপাতালে নিতে হবে। মনে হচ্ছে ওর পায়ের অবস্থা অতিরিক্ত খারাপ।

– কিন্ত তুই! তুই রাইতের বেলা ঘর থেকে বাইর হইছিলি ক্যান!

– এসব কথা পরে জানলেও চলবে। এখন যা বলছি তাই কর। আমি একটু পরে আসছি।

আব্রাহাম আদিল চলে যেতেই আমার পাশে এসে দাড়ালো এজেন্ট খালিদ। আমার পাশে এজেন্ট খালিদের উপস্থিতি দেখে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ছুড়লাম আমি ..
– হু আর ইউ মিস্টার খালিদ? সবাই আপনাকে দেখে এত আশ্চর্য কেন হয়? মনে হচ্ছে আপনার অতীতের সাথে ভ্যালমোরার ইতিহাসের কোনো যোগসূত্র আছে। আজ আপনাকে সত্যিটা বলতেই হবে।

আমার চোখে প্রচন্ড রাগ। মারিয়াকে ভিক্টর আজ খতম করেই দিচ্ছিলো। কিন্ত এজেন্ট খালিদ ভিক্টরের হাত থেকে মারিয়াকে বাঁচিয়েছে। লোকটা ভালো নাকি খারাপ এখনো এটা নিয়ে আমি প্রচুর সন্দিহান। একটু আগের ঘটনায় তো সন্দেহ আরো বেশি বেড়ে গেছে। আমাকে জানতেই হবে আমি তার নির্দেশনা অনুযায়ী যা করছি তা ঠিক নাকি ভুল! লোকটার এই ধোঁয়াশা ঘেরা চরিত্রের মুখোশ উন্মোচন করা জরুরী। আমি আমার এক হাতে আগুনের গোলক তৈরী করে ফেললাম। উপহাস করতে লাগলো কিরা ..
–নাদান বাচ্চা! এমন ভুল একদমই করার চেষ্টা করোনা। আমি তাঁর শক্তি দূর থেকেই অনুভব করতে পারছি। পুরো ভ্যালমোরার সব মনস্টার এক হয়েও তোমার সামনে দাড়িয়ে থাকা লোকটার কিছুই করতে পারবে না। তবে যদি তুমি আমার সাথে চুক্তিবদ্ধ হও তাহলে খেলা পাল্টে যাবে। তোমার কি এ ব্যপারে কোনো আগ্রহ আছে আকিরা? আমি কিন্ত চুক্তির জন্য সর্বদাই প্রস্তুত।

বিড়বিড় করতে লাগলাম আমি কিরার উদ্দেশ্যে ..
–আচ্ছা! তাই নাকি! একবার তোমাকে ছাড়াই চেষ্টা করে দেখি।

– তুমি বার বার আমাকে হতাশ করো আকিরা..

কিরার হতাশাকে পাত্তা না দিয়ে এবার দুই হাতেই আগুনের গোলক তৈরী করে ফেললাম আমি। মনে হলো এজেন্ট খালিদের ভ্রু কুচকে গেছে। হুঙ্কার করলাম তার উদ্দেশ্যে ..
– আর কোনো ধোঁয়াশা নয়। সব সত্যি খোলসা করুন মিস্টার খালিদ। নয়তো আমি আক্রমণ করতে বাধ্য হবো।

আমার কথাতে যেনো এজেন্ট খালিদের ভাবভঙ্গির কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না। লোকটা যেনো একমনে তাকিয়েই রইলো আমার দিকে। এদিকে আমি তাকে আক্রমণ করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

—--------চলবে—------

কমেন্ট করে বলুন গল্পটা কেমন লাগছে। নইলে আকিরা আপনাদের উপর আক্রমণ করে দিতে পারে। এই ছেলে কিন্ত ভীষণ বদরাগি 🙄

 #ভিএম্পায়ার  #পর্বঃ২৬লেখাঃ  দুপুর বারোটার দিকে আমরা হোস্টেলের সামনে গাড়িতে উঠার জন্য প্রস্তুত। মাঝে মাঝে দু চারজন ছাত্...
02/11/2025

#ভিএম্পায়ার
#পর্বঃ২৬
লেখাঃ

দুপুর বারোটার দিকে আমরা হোস্টেলের সামনে গাড়িতে উঠার জন্য প্রস্তুত। মাঝে মাঝে দু চারজন ছাত্র এসে সেলফি নিচ্ছে। আব্রাহাম জানালো ক্রিপ্টোরিয়া প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে। যেতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘন্টা লাগবে। বেশিও লাগতে পারে কারণ ওদিকের রাস্তাঘাট ততটাও উন্নত না। জায়গাটা একদম সুনসান। তাছাড়া সেদিকে বসতি নেই বললেই চলে। জঙ্গলের দিকেও যাওয়া নিষিদ্ধ। আমি কেন এই সময় ক্রিপ্টোরিয়া যেতে চাচ্ছি সেটাও সে বুঝতে পারছে না। অন্যদিকে আদিল যেনো নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গাড়ির ব্যাকসীটে গিয়ে বসলো। আব্রাহাম ড্রাইভিং সীটে বসে পড়েছে। আমি তার পাশের সীটে বসতে যাবো এমন সময় সামনে এসে হাজির আলিশা ..
– একি আকিরা! তোমরা নতুন গাড়ি কিনেছো?

থতমত খেয়ে গেলাম আমরা। গাড়ির ভিতর থেকে হাসতে হাসতে বললো আদিল ..
– আমরা এই রাজ্যের টপ গোয়েন্দা। আমগো গাড়ি থাকবোনা! মানে আমগো সম্পর্কে তুমি দেহি কিছুই জানোনা। টাকা কি খালি তোমার বাপেরই আছে নাকি! শুনো মেয়ে, আমগো অহন রাজার সাথে উঠাবসা করা লাগে বুঝলা? গাড়ি না থাকলে হইবো! তা যাইবানি লং ড্রাইভে তোমার বয়ফ্রেন্ডের লগে? গেলে আহো ..

আমি আর আব্রাহাম বোকার মতো তাকিয়ে আছি আদিলের দিকে চেয়ে। ছেলেটা দাঁত বেড় করে হাসতেছে। বিড়বিড় করে আবারও আব্রাহামের উদ্দেশ্যে বললো সে ..
– পাপ যখন করমুই তাইলে পাপের ভাগ এট্টু ভাগাভাগি কইরা লইলে ক্ষতি কি..

কিন্ত আলিশা যেনো আদিলের উপর বিরক্ত হয়েই বললো ..
– হাউ ডেয়ার ইউ! মাথামোটা ছেলে খবরদার আমার আব্বুকে নিয়ে কোনো বাজে কথা বলবে না।

আদিলকে একটু গরম দেখিয়ে আলিশা এবার আমার প্রতি নরম সুরে প্রশ্ন করলো ..
– এই আকি! আমাদের না অপরূপাকে খুঁজতে যাওয়ার কথা ছিলো আজ! যাবেনা?

হোহো করে হেসে উঠলো আদিল ..
– হাহাহাহা .. লাইফের প্রথম কোনো মাইয়ারে দেখতেছি নিজের সতীনরে খুঁজতে যাওয়ার জন্য উতলা হইতে। ইয়া মাবুদ সবই তোমার লীলাখেলা ..

কিন্ত আলিশা যেনো আদিলের বিরক্তিকর কথাবার্তার কোনো আগামাথা বুঝলোই না। আলিশা আবারও প্রশ্ন করলো আমাকে ..
– এই, কাল রাতের নিউজটা দেখেছিলে তুমি! অপরূপা জীবিত আছে। আর ও কেমন তোমার নাম বলছিলো। ওকে যেনো ভূতে ধরেছে বলে মনে হচ্ছিলো।

উত্তর দিলো আদিল ..
– হ, প্রেমের ভূত! একেবারে খামছি দিয়া ধরছে। আগে তো মশকরা করতো এখন ভূতে ধরার পর সিরিয়াস প্রেমিকা হয়া গেছে। পুরো ভ্যালমোরায় রটায় দিছে সে আকিরে কতটা ভালোবাসে।

আলিশা বেজায় চটে গেলো ..
– ও এসব কি বলছে আকি?

পরিস্থিতি সামাল দিতে লাগলাম আমি ..
– আরে বাবা মেয়েটাকে আসলেই ভূতে ধরেছে। দেখোনি ভিডিওতে। নয়তো কেউ ইচ্ছে করে এডিট করে আমার নাম ঢুকাইছে। জানোইতো আমি অনেক ফেমাস। তাই আমার অনেক শত্রু আছে। আবার এমনও হতে পারে টিআরপি বানানোর উদ্দেশ্যে কেউ এমন করেছে।

– কিন্ত আকিরা কাল তুমি কিং এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলে। রাজিলের ইচ্ছায় তুমিও ক্রিপ্টোরিয়া অভিজানে যাচ্ছো ব্যপারটা জেনে ভীষণ ভালো লাগছে আমার। আমি জানি তুমি ক্রিপ্টোরিয়ার আসল সত্য যেভাবেই হোক সামনে আনবে। কি, আনবে না?

উত্তর দিলো আদিল ..
– আনবে মানে! আমরা তো অলরেডি রওনা করতেছি ওইদিকে। যমদূত আমগো জন্য ক্রিপ্টোরিয়ায় ওয়েটিং এ আছে। ইয়া মাবুদ, শেষ মেষ মরনটা ক্রিপ্টোরিয়াতেই করাইবা জন্য এতদিন বাঁচায়া রাখছিলা …

আদিল যেনো উপরের দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো প্রলাপ বকছে। আলিশা আদিলের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলো আমাকে ..
– তুমি আসলেই ক্রিপ্টোরিয়া যাচ্ছো? অপরূপার কি হবে তাহলে?

বোকার মতো হাসলাম আমি। মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবতে লাগলাম কি জবাব দেয়া যায়। বললাম ..
– গোপন সূত্রে সংবাদ পেয়েছি। ভূতে ধরা অপরূপা ক্রিপ্টোরিয়ার দিকে চলে গেছে। তাই সেদিকে তো আমাদের যেতেই হবে।

– গোপন সূত্র!
– আমি একজন গোয়েন্দা আলিশা। ভ্যালমোরার আনাচে কানাচে আমার গুপ্তচর ছড়ানো আছে।

কথাটা বলেই আমি যেনো সিনা টান টান করে দাঁড়ালাম ভাব দেখিয়ে। আলিশা যেনো অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। মেয়েটা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে না! ওদিকে আদিল বিড়বিড় করে বলে উঠলো ..
– এই হালায় দেহি নেতা মন্ত্রীদের থাইকাও বড়ো মিথ্যাবাদী! হালায় মিথ্যা বইলা বইলা আবার মেয়েটার সামনে কুল ভাব নিতাছে ..

একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে উঠলো আলিশা..
– তা এটা তুমি আমায় আগে বলবানা? চলো, আমিও যাবো সাথে।

চমকে উঠলাম আমরা তিনজনই। এতো দেখি মহাবিপদ! বলে উঠলো আব্রাহাম ..
– বইন মাফ করো, তোমার বাপে জানতে পারলে আমাদের রক্ষে নেই। ক্রিপ্টোরিয়া কোনো সাধারণ জায়গা না। আমরা বিপদেও পড়তে পারি।

সঙ্গে সঙ্গে আদিলের চিৎকার ..
– ওরে বাবা ডরে আমার ঠ্যাং কাঁপতাছে। ক্রিপ্টোরিয়ায় বিপদে মরমু কিনা জানিনা। কিন্ত এই মাইয়ার কিছু হইলে ভিক্টর আমগো কাঁচা খাইয়ালাইবো।

আলিশা যেনো আমাকে টান দিয়ে গাড়ির ব্যাকসীটে বসালো। আর আদিলকে টেনে হিঁচরে নামিয়ে দিয়ে নিজে আমার পাশে বসলো। আর বললো ..
– এজেন্সি “ট্রিপল এ” এর অপরূপাকে খুঁজার মিশনে আলিশার সাথে একযোগে কাজ করার কথা ছিলো। তাছাড়া তোমরা কি দেখোনি আকিরা আমাকে ডেল্টোরার জঙ্গলে ওই ভ্যাম্পায়ার এর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলো। আকিরা আমার সাথে থাকলে কেউ আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এটা আমি ভালো করেই জানি। এখন দ্রুত গাড়ি স্টার্ট করো।

আদিল সামনে গিয়ে আব্রাহামের পাশে বসলো। আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো ..
– যেইখানেই যাই বাঁশ আগে থাইকা অটোমেটিক রেডি হইয়া থাকে। এখন ঠ্যালা সামলাও।

আব্রাহাম লুকিং গ্লাসে আমার দিকে তাকালো। আমি ইশারায় গাড়ি ছাড়তে বললাম। আমার ইশারা পেয়ে আব্রাহাম গাড়ি চালাতে শুরু করলো।

….

শহর ছাড়িয়ে গ্রামের পর গ্রাম। গাড়ি ছুটতে লাগলো ক্রিপ্টোরিয়ার উদ্দেশ্যে। আলিশা যেনো আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেছে। আব্রাহাম খানিক পর পর জানাচ্ছে আরো কতদূর রাস্তা বাকি আছে।

ক্রিপ্টোরিয়ার ঠিক কাছাকাছি পৌঁছে খেয়াল করলাম জনবসতি একদমই নেই। চতুর্দিকে ধু ধু মাঠ। কোথাও কোথাও ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়ি টিলা। আব্রাহাম জানালো জঙ্গল প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। রাস্তা দিয়ে সামনে এক কিলোমিটার এগোলে ভিএমআর চেকপোস্ট। হয়তো এর বেশি যেতে পারবো না আমরা। আমি তাকে অভয় দিলাম আর চেকপোস্ট পর্যন্ত চালিয়ে যেতে বললাম। আব্রাহাম আমার কথামতোই গাড়ি এগিয়ে নিতে থাকলো।

কয়েক মিনিট পরেই আব্রাহামের বলা কাঙ্খিত চেকপোস্টের সামনে হাজির হলাম আমরা। আর আমাদের গাড়ি ঘিরে ধরলো কয়েকজন ভিএমআর সৈনিক। রাইফেল হাতে সৈনিকরা আব্রাহামকে প্রশ্ন করতে যেতেই সে জানালো বস পিছনের সীটে বসে আছে। আমি দরজার কাচ নামালাম। আলিশার ঘুম ভাংলো। সৈনিকদের একজন দরজায় উকি দিয়ে মাথা নুইয়ে প্রশ্ন করলো আমাকে ..
– স্যার, নিশ্চয়ই জানেন ক্রিপ্টোরিয়া জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ?

আমি একটা মুচকি হেসে বললাম ..
– তাহলে তো প্রমাণ করতেই হচ্ছে আমি কতটা অসাধারণ ..

কথাটা বলে আমি গাড়ির দরজা খুলে নেমে গেলাম। ভিএমআর সৈনিক ততক্ষণে আমাকে চিনে ফেললো…
– আরে স্যার, আপনি ডেল্টোরার গোয়েন্দা আকিরা না! যার সাথে এক টেবিলে বসে কাল রাতে কিং রামিল সংবাদ সম্মেলন করেছিলো?

মুচকি হাসলাম আমি ..
– যাক চিনতে পেরেছেন তাহলে ..

আদিল আব্রাহাম আলিশা তখনও গাড়ি থেকে নামার সাহস করেনি। একজন সৈনিক বলে উঠলো তখনই …
– স্যার, আপনার তো কিং রামিলের সাথে ক্রিপ্টোরিয়ায় আসার কথা ছিলো।

– আমি একটু আগেভাগেই ঘুরে দেখতে এলাম। জায়গাটা সম্পর্কে আইডিয়া নিতে হবে তো।

– কিন্তু স্যার, অনুমতিপত্র ছাড়া আপনাকে এলাউ করতে পারছি না। কিং রামিল আসবে এজন্য এ জায়গায় সিকিউরিটি আরো হাই করা হয়েছে। আপনার সাথে কি কোনো অনুমতিপত্র আছে? তাছাড়া এই জায়গাটা রাতের বেলা বেশি বিপজ্জনক।

– সমস্যা নেই, এক রাতেরই ব্যপার তো।

– দেখুন স্যার.. এখানে কোনো হোটেল, রিসোর্ট বা কোনো বসতি নেই যে আপনারা স্টে করবেন। সন্ধ্যার আগেই আপনাদের ব্যাক করতে হবে। আর আপনার কাছে অনুমতি পত্রও নেই। এত রিস্কি জায়গায় আমরা আপনাকে এলাউ করতে পারছি না।

একটু চিন্তিত হলাম আমি। যেভাবেই হোক ক্রিপ্টোরিয়ার জঙ্গলে তো আমাকে যেতেই হবে। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ভিতর থেকে চিৎকার করলো আদিল ..
– আরে ভাই যামু যমের বাড়ি এইজন্য আবার অনুমতিপত্রও লাগবো নাকি! আমরা তো জাইনা শুইনা সুইসাইড খাওয়ার লাইগাই আইছি তাইনা রে আব্রাহাম ..

আব্রাহাম মুখ চেপে ধরলো আদিলের। সঙ্গে সঙ্গে ভিএমআর সৈনিক আমার দিকে তাকিয়ে বললো ..
– স্যরি স্যার, আপনাদের ফিরে যেতে হবে।

– আরে বাবা ভয় নেই। আমার বন্ধুটা মজা করছে। তবে এখানকার ইউনিট প্রধান আমাকে ডেকেছে। তাকে ডাকুন। সে এলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

– ইউনিট প্রধান! আপনি কি ব্যাটালিয়ন কমান্ডার আরিয়ান স্যারের কথা বলছেন? তিনি আপনাকে ডেকেছেন?

মুচকি হাসলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে সৈনিকরা তাদের আরিয়ান স্যারের সাথে যোগাযোগ শুরু করে দিলো। প্রায় আধাঘন্টা কেটে যাবার পর একটা গাড়িতে তাদের কমান্ডার আরিয়ান চলে এলো। লোকটা আমার সামনে দাঁড়াতেই খেয়াল করলাম সমুদ্র তীরে যে আরিয়ানকে আমি দেখেছিলাম, আরিয়ান আর সেরকম নেই। ছেলেটা আগের থেকেও তাগড়া হয়েছে। শরীর স্বাস্থ্যের অনেক উন্নতি হয়েছে তার। আমাকে দেখামাত্র চিনে ফেললো সে ..
– আরে! আকিরা! তুমি এখানে!

– তোমাকে দেখে ভালো লাগলো আরিয়ান। অনেক ভালো জায়গায় প্রমোশন হয়েছে তোমার। মনে হয় নিজের সাধনার ফল পেয়ে গেছো তুমি। এখন একাই একটা ইউনিট সামলাচ্ছো।

আমার কথা শুনেই হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠলো আরিয়ান ..
– তোমাকেও টিভিতে দেখেছিলাম। তুমিতো দেখি অনেক পপুলার হয়ে গেছো। আর আগের থেকে অনেক পরিবর্তন দেখছি তোমার মধ্যে। একদম কিং এর সাথে সাক্ষাৎকার। যেটা আমাদের কপালেই জুটেনা কখনো। তুমি আসলেই জিনিয়াস আকিরা। আমি জানতাম, তোমার মধ্যে কিছু তো একটা আছে।

– হাহাহা সেইম টু ইউ মিস্টার আরিয়ান। তোমাকে কংগ্রাচুলেশন্স।

– আচ্ছা বাদ দাও। ক্রিপ্টোরিয়ায় কেন এসেছো সেটা বলো। সৈনিকরা বললো আমি নাকি ডেকেছি। এটা শুনেই তো টেনশনে পড়ে গেছিলাম। আমি কখনোই আমার পরিচিত কাউকে এত খারাপ জায়গায় ইনভাইট করবো না। তাইতো ছুটে এলাম দ্রুত। এখানে কিং আর সম্রাটের অনুমতি ব্যতিত প্রসাশনের লোকদেরও এলাউ করা হয়না। বলো তো কি উদ্দেশ্যে এসেছো তুমি?

– আমি এখানে এক রাত কাটাতে চাই। তোমার গেস্ট হাউসে। আমার সাথে আমার বন্ধুরাও এসেছে।

আরিয়ান যেনো মাথা নিচু করে ফেললো। আমতা আমতা করে বললো ..
– আমার সেই ক্ষমতা নেই আকিরা। অনুমতি পত্র লাগবে। আমি আইনের বাইরে যেতে পারিনা।

– পারবে আরিয়ান পারবে। জাস্ট একটা রাতই তো। আমরা সকালেই চলে যাবো। আমার বন্ধুরা জিদ ধরেছে ক্রিপ্টোরিয়ায় এক রাত থাকবে। তারা ক্লান্ত। আজ ফিরতে চাচ্ছেনা। অবশ্য এক রাতের বিনিময়ে তোমাকে আমি অবশ্যই পুরষ্কৃত করবো। জানোই তো, এখন কিং এর সাথে উঠাবসা আমার।

আরিয়ান অনেক চিন্তিত। ইতোমধ্যেই গাড়ি থেকে আমার বন্ধুরা নেমে গেছে। তারা সুন্দর একটা জায়গা পেয়ে ফটোগ্রাফি শুরু করে দিয়েছে। আরিয়ান তাদের দিকে তাকালো। আর কি যেনো ভাবতে লাগলো। তারপর আমার গা ঘেঁষে দাড়িয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগলো ..
– জায়গাটা অনেক খারাপ। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা অনিরাপদ। এখানে যদি রাত কাটাতে চাও তাহলে সন্ধ্যার আগেই গেস্ট হাউসে ঢুকতে হবে তোমার। জায়গাটা এতটা খারাপ যে সন্ধ্যার পর সৈনিকরাও ব্যারাক থেকে বের হয়না। আমি জানিনা হঠাৎ কোন শখে তুমি এখানে বেড়াতে এসেছো। আর কোন শখেই তুমি কিং এর সাথে জঙ্গলে প্রবেশের আগ্রহ দেখাচ্ছো এটাও বোধগম্য নয়। তোমায় একটা সত্যি কথা বলি আকিরা .. জঙ্গলে আসলেই দানব আছে। এর আগে রাতের বেলা সৈনিকদেরও রক্তশূন্য শরীর পাওয়া গেছিলো। ব্যাপারটা ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। সেই থেকে এখানকার সৈনিকরাও সন্ধ্যার পর বাইরে বের হয়না। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো জায়গাটা কতটা ভয়ংকর। কিন্ত জঙ্গলে কি আছে এটা আমরা কেউই জানিনা আর জানার চেষ্টাও করিনা। কিছু ব্যপার না জানার ভান করে থাকাও নিরাপদ। এমনকি সম্রাট নিজেও চায়না আমরা এসবে আগ্রহ দেখাই। শুধু তারই কাছের কয়েকজন মানুষ জানে জঙ্গলে সম্রাট কি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। শুধু তারাই জঙ্গলে প্রবেশ করার অনুমতি পায়। এর বাইরে যারা জঙ্গলে প্রবেশ করে তারা আর কখনও ফেরত আসেনা।

– আমি সবই জানি আরিয়ান। ভয় নেই, আমি জঙ্গলে যাওয়ার আগ্রহ দেখাবো না। তুমি শুধু আমাদের আজ রাতটা থাকার ব্যবস্থা করো।

– ঠিক আছে, সমুদ্র সৈকতের সেই পুরনো বন্ধু হিসেবে তোমার জন্য এটুকু রিস্ক নিতেই পারি। কিন্ত মনে রেখো, সন্ধ্যার পর আর সূর্য উঠার আগে তুমি আমাকে পাবেনা। আমাকে বলতে কাউকেই পাবেনা। তাই এই সময়টা নিজের ঘরেই কাটানোর চেষ্টা করবে।

সামান্য এইটুকু শর্ত দিয়ে আরিয়ান আমার কথায় রাজি হলো। সে তার গাড়িতে গিয়ে বসলো আর তার গাড়িকে অনুসরণ করতে বললো আব্রাহামের উদ্দেশ্যে। আমরা তার পিছু যেতে লাগলাম। আলিশা প্রশ্ন করতে লাগলো ..
– তুমি কি তার সাথে অপরূপার ব্যপারে জানিয়েছো?

আমতা আমতা করে উত্তর দিলাম আমি ..
– হ্যাঁ জানিয়েছি। বললো তারা অপরূপাকে দেখেনি। আমাদের আরাম করতে বললো গেস্ট হাউসে। আমাদের হয়ে তারাই অপরূপাকে খুঁজতে বের হবে। এখানে নাকি আমাদের বাইরে ঘুরাঘুরি করা এলাউ না।

হেসে উঠলো আদিল ..
– ভাই স্ক্রিপ্টে গন্ডগোল আছে। আমাদের হয়ে তারাই যদি অপরূপাকে খুঁজতে বের হয় তাইলে আমগো এইখানে থাইকা কাম কি? মানে ভুলভাল বুঝ দেয়া হচ্ছে!

বেজায় চটে গেলাম আদিলের উপর। সঙ্গে সঙ্গে আলিশার প্রশ্ন ..
– তাইতো! আমরা তাহলে এখানে থেকে কি করবো? চলো অন্য কোথাও গিয়ে অপরূপাকে খুঁজি .. সবাই আলাদা ভাবে খুঁজলে নিশ্চয়ই ওকে পাওয়া যাবে।

– আরে বাবা না, কমান্ডার আরিয়ান জানালো এই সময় আর আমাদের কোথাও যাওয়া উচিৎ না। জায়গাটা নাকি অনেক খারাপ। কাল সকালের আগে কোথাও যেতে নিষেধ করলো। একটু পর সূর্য ডুবতে শুরু করবে। তখন জায়গাটা অনেক ভয়ংকর হয়ে উঠবে।

হাসতে লাগলো আদিল …
– হাহাহা .. ভাই তুই কি মিছা কতার উপ্রে ডিগ্রী করছোস নাকি?

আদিলের মাথায় মেরে থামিয়ে দিলো আব্রাহাম। আদিল যেনো থামবার পাত্র নয় ..
– ঠিক আছে আমার কি, মরলে তো আর আমি একা মরমু না। কিন্ত মাইয়াডা জানলো না সতীনের খোঁজে আইসা নিজেই কতবড়ো বিপদে পড়তে যাইতাছে। সে ত আর জানেনা তার বয়ফ্রেন্ড যেইহানেই যায় সেইহানেই যমদূত ওত পাইতা থাকে ..

আমরা কেউই আর আদিলের প্যানপ্যানানিতে আগ্রহ দেখালাম না। আলিশা তো বিরক্তই হয়ে যাচ্ছে আদিলের কথাবার্তা শুনে। আমাদের গাড়িটা আরিয়ানের গাড়ি অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি যত এগোচ্ছে ততই যেনো আবহাওয়া শীতল হয়ে উঠছে। খানিক বাদেই আমাদের দৃষ্টি গোচর হলো ক্রিপ্টোরিয়ার জঙ্গল। গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে ধু ধু মাঠের মাঝ দিয়ে। মাঠের শেষ প্রান্তে জঙ্গল। আর দুইপাশে উঁচুনিচু ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়। জায়গাটা দেখে সাদেকের গ্রামের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। পরিবেশ কিছুটা একই তবে এখানকার জঙ্গলটা বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। জঙ্গলঘেষা একটা রাস্তা ধরে গাড়ি এগোতে লাগলো।

হঠাৎই আমার নজর গেলো জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করা একটা কাঁচা মাটির রাস্তায়। ভয়ানক দেখতে সেই রাস্তা। দুইপাশে ঘন জঙ্গলে ঢাকা রাস্তাটা যেনো ঘন অন্ধকারে ছেয়ে আছে। সোজা চলে গেছে জঙ্গলের মাঝ দিয়ে একদম ভিতরে। চলন্ত গাড়ি থেকে খুব বেশিক্ষণ দেখতে পারলাম না রাস্তাটা। আমাদের গাড়ি জঙ্গলে ঢুকবে না। এগিয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের পাশ দিয়ে বানানো পাকা রাস্তা বরাবর।
খানিক পরেই দেখতে পেলাম জঙ্গলের পাশে তিনটা সুউচ্চ বিল্ডিং। বুঝাই যাচ্ছে এগুলো সৈনিকদের ক্যাম্প।

আমাদের গাড়ি চলে গেলো সোজা গেস্ট হাউজের দিকে। একদম জাকজমকপূর্ণ বিল্ডিং। বুঝাই যাচ্ছে রাজা বাদশারাই শুধু এই বিল্ডিংয়ের গেস্ট হিসেবে থাকতে আসে। আরিয়ান গেস্ট হাউসের কেয়ার টেকারকে জানিয়ে দিলো আমাদের ব্যপারে। আর আমাদের বললো গেস্ট হাউজের বাইরে যেনো বের না হই। গেস্ট হাউজে প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা আছে। খানিক বাদে সূর্য ডুবতে শুরু করবে। আমাদের বাইরে বের হওয়া উচিৎ হবেনা এমনটাই জানিয়ে আরিয়ান তার ডিউটিতে ফিরে গেলো। আমরা আমাদের গাড়িটা গেস্ট হাউজের গ্যারেজে পার্কিং করে সোজা ভিতরে ঢুকতে শুরু করলাম।

আর মনে মনে ভাবতে লাগলাম সন্ধ্যার পরে আমাকে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে জঙ্গলের দিকে যেতে হবে। সেই ফেলে আসা ভয়ানক দেখতে কাঁচা রাস্তাটার দিকেই যেতে হবে আমাকে।

নিচতলাতেই সবার জন্য আলাদা আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডাইনিং রুমে আমাদের খাবারেরও ব্যবস্থাও করা হলো। সবাই একসাথে বসে খাওয়াদাওয়া সেড়ে নিলাম। এরপর বিশ্রামের পালা। বিকেল হয়ে গেছে এই ফাঁকে আমি আমার সকালের ঘুমটাও পুষিয়ে নেয়া শুরু করলাম। বলা যায় সবাই একটু ক্লান্ত তাই যে যার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। আমার ঘুম ভাংলো গভীর রাতে। ঘুম ভাংলো বললে ভুল হবে। ঘুম ভাঙ্গানো হলো। আমার ঘুম ভাঙ্গিয়েছে কিরা। সে আমাকে জঙ্গলে যাওয়ার কথা মনে করালো। মনে মনে খুশিই হলাম কিরার প্রতি। পরজীবিটা অতটাও খারাপ না যতটা আমি ভেবেছিলাম।

ঘরের দরজা খুলে এপাশ ওপাশ তাকালাম। বাকিদের ঘরের দরজা বন্ধ। মেইন গেটের দিকে চলে গেলাম। কেয়ারটেকারও ঘুমাতে গেছে বলে মনে হলো। রাত প্রায় কয়টা বাজে এটাও জানিনা আমি। জানাটা জরুরীও নয়। আমার কাজ জঙ্গলে। গলার লকেটটায় সাবধানে হাত রেখে দেখলাম সেটা গলায় ঠিকঠাক আছে কিনা। আজ লকেটটার পূর্ণতা পাবে। কিন্ত হেক্সব্লেডের একাংশ কোথায় আছে এটাও জানিনা আমি। এজেন্ট খালিদ যেহেতু বলেছে ক্রিপ্টোরিয়ার জঙ্গলে আমাকে যেতে হবে সেই আশাতেই পা বাড়াচ্ছি। হয়তো হেক্সব্লেডের পূর্নতাই আমার শক্তি বাড়ানোর একমাত্র উপায়।

কিন্ত আমি মেইন গেটেই গিয়ে দেখলাম বড়ো একটা তালা ঝুলছে কেচিগেটে। আরে! এখন বের হবো কিভাবে! তালাটায় হাত বুলিয়ে দেখতে লাগলাম। মনে হচ্ছে অনেক মজবুত। কেয়ারটেকারকে ডাকবো! নাহ, কেয়ারটেকার তো ভুলেও বাইরে যেতে দেবেনা আমাকে। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম ঘন অন্ধকারে ছেয়ে আছে। চাঁদের আলো আছে অথচ তবুও যেনো অন্ধকারাচ্ছন্ন লাগছে। হয়তো ক্রিপ্টোরিয়া অনেক ভয়ানক বলেই আমার এমন মনে হচ্ছে। হঠাৎই কথা বললো কিরা ..
– তুমি কি তোমার শক্তি সম্পর্কে অবগত নও! সামান্য একটা তালা খুলার ক্ষমতা নেই তোমার?

আরে আরে, পরজীবীটা যেনো তাচ্ছিল্য করলো আমাকে। তবে সে তো সত্যিই বলেছে। আমি কেন চেষ্টা করছি না তালা খুলার!

হাত দিয়ে শক্ত করে ধরলাম তালাটা। এরপর নিচের দিকে টান দিতে লাগলাম। হাতে দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো আগুন। যেনো তালাটাকে পুড়াতে ব্যস্ত সেই আগুন। ধীরে ধীরে তালাটা আগুনের তাপে লালচে হয়ে যেতে লাগলো। খানিক বাদেই হঠাৎই টুকুস করে খুলে গেলো। মনে হলো তালাটার ভিতর পর্যন্ত গলে গেছে।

তালা খুলেই আমি বের হলাম বিল্ডিং থেকে। একে একে সৈনিকদের বিল্ডিং গুলো পার হলাম। বাইরে যেনো একটা জনমানব নেই। ক্রিপ্টোরিয়া যে রাতের বেলা কতটা ভয়ানক লাগে হাড়ে হাড়ে টের পেতে লাগলাম। জঙ্গলের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পাকা রাস্তাটা ধরে হাঁটতে শুরু করেছি আমি। রাস্তায় কোনো ল্যাম্পোস্ট নেই। আবছা অন্ধকারাচ্ছন্ন চারদিকে। একপাশে ধুধু মাঠ অন্যপাশে ঘন জঙ্গল। একা একা এগিয়ে যাচ্ছি। যেনো ঝিঁঝিঁ পোকারও শব্দ নেই। নেই কোনো পাখপাখালির কিচিরমিচির। পুরো পৃথিবী যেনো থমকে আছে এখানে। আমি এগিয়ে যাচ্ছি বিকেলে দেখে আসা সেই কাঁচা রাস্তাটার উদ্দেশ্যে। যেটা পাকা রাস্তা থেকে নেমে সোজা জঙ্গলের ভিতরের দিকে ঢুকে গেছে।

কিছুদূর হাঁটার পরেই কাঁচা রাস্তাটা পেয়ে গেলাম। তাকিয়ে দেখলাম ঘন কালো অন্ধকার। এবার ভয় ভয় লাগছে। এত নীরব জায়গা যে গা ছমছম অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে একটা কন্ঠস্বর ..
– আসতে এত দেরি হলো কেন?

চমকে উঠলাম আমি। দেখলাম ঘন কালো রাস্তাটা থেকে উঠে আসছে একটা কালো পোশাক পরিহিত আগন্তুক। সে আমার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার ভয়টা হালকা কমে গেলো। এটাতো আমার কাঙ্খিত আগন্তুক এজেন্ট খালিদ। আমি তো এতক্ষণ তারই অভাব বোধ করছিলাম। আবারও কথা বললো লোকটা ..
– সোজা চলে যাবে এই রাস্তা ধরে। প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটতেই থাকবে। এরপর হাতের ডানে একটা বিশাল বটগাছ চোখে পড়বে। তুমি যাবে বাম দিকে বটগাছের বিপরীতে। জঙ্গল ধরে নাক বরাবর এগোলেই একটা ছোট্ট পুরনো বিল্ডিং চোখে পড়বে। সেখানেই আছে কাঙ্খিত হেক্সব্লেডের একাংশ। একটা জ্বলন্ত লাল ছোট্ট পাথর।

– ব্যস এটুকুই! আপনি সঙ্গে আসবেন না?

– এটা তোমার কাজ আকিরা। আমি শুধু নির্দেশনা দিলাম। কাজটা করতে হবে তোমাকেই। বলতে পারো এটা তোমার একটা পরীক্ষা। নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দাও। হাসিল করো হেক্সব্লেডের একাংশ। পূর্ণতা দাও হেক্সব্লেডকে। প্রমাণ করো হেক্সব্লেডের দাবিদার একমাত্র তুমি।

– মোটিভেশন ভালো ছিলো। কিন্ত এরপর কি আমি আমার পিতামাতার ব্যপারে জানতে পারবো? জানতে পারবো কি আমি? কি আমার পরিচয়? কোথা থেকে এসেছে আমার আগুনের শক্তি?

– হোহো .. কেন নয়। ধাপে ধাপে তুমি সে উদ্দেশ্যেই এগিয়ে যাচ্ছো। যাও আকিরা দেরি করোনা। ওখানে গেলে নিজেই বুঝে যাবে কি করতে হবে তোমার।

– আপনি না সবসময় আমাকে কনফিউশনে রাখেন। কি আছে আসলে ওই বিল্ডিংয়ে?


– খুবই সামান্য কয়েকজন শত্রু। তোমাকে সাবধান থাকতে হবে। মনে রেখো আকিরা, তুমি এখন যুদ্ধে যাচ্ছো। নিজের শক্তির পূর্ণ ব্যবহার করার চেষ্টা করবে।

– আপনি এভাবে বলছেন কেন! এখন তো মনে হচ্ছে খুবই ডিফিকাল্ট হবে। যদি পাথরটা উদ্ধার করতে না পারি?

– তাহলে ধরে নিবো আমি ভুল মানুষের উপর ভরসা করেছিলাম। ভ্যালমোরার আশার প্রদীপ নিভে যাবে মুহুর্তেই। প্রলয় শুরু হবে ভ্যালমোরায় কিন্ত বাঁচানোর জন্য কোনো হিরো থাকবে না।

তাকিয়ে রইলাম এজেন্ট খালিদের জ্বলজ্বল করা চোখদুটোর দিকে। লোকটা তো ভালোই ভাষণ দিতে পারে। সে কি আবেগপ্রবণ হয়ে গেলো নাকি! আমি তার রুমালে ঢাকা মুখ দেখে বুঝতে পারলাম না। সে এসেছে সমুদ্রের ওইপাড় থেকে! ভ্যালমোরার জন্য তার এত দরদ কেন এটাই বুঝে আসেনা! আর কি উদ্দেশ্যে সে ভ্যালমোরায় পড়ে আছে সেটাও জানিনা আমি। স্বার্থ ছাড়া যে কেউ কাউকে সহযোগিতা করেনা এটা আমি ভালো করেই জানি। আমাকে নিয়ে কি উদ্দেশ্য এই আগন্তুকের তা তো আমি জানিনা। তবে আমি সিদ্ধান্তে অটুট। আমার নিজের পরিচয় উদ্ঘাটন করার জন্য জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত আমি। আর ভ্যালমোরার হিরো হতে গেলে তো কথাই নেই। বলে উঠলাম এজেন্ট খালিদের উদ্দেশ্যে ..

– আচ্ছা যাচ্ছি .. জাস্ট একটা পাথরই তো উদ্ধার করতে হবে।

–আর একটা কথা আকিরা, কুকুর হইতে সাবধান।

– কুকুর! জঙ্গলে কুকুর আছে নাকি?

– থাকতেই পারে, আমি অনেকদিন সেদিকে যাইনি। এগোতে থাকো .. লকেটটা জামার ভিতর থেকে বের করে নাও। এটাই তোমাকে পথ দেখাতে সাহায্য করবে।

আগন্তুকের কথামতো কাঁচা রাস্তা ধরে আমি একা এগোতে লাগলাম। নিঃশব্দ নিশি, চাঁদের আলো জঙ্গলের পাতায় ছিটিয়ে আছে রুপালি ছায়া। বুকের ভেতর কেমন একটা দপদপ করছে। ভয়, না কি কৌতূহল, বুঝে উঠতে পারছি না। হঠাৎ লকেটটা বের করতেই দেখি, সেটা মৃদু আলোর মতো জ্বলজ্বল করছে। তার আলোয় পথ চিনতে আর কোনো বেগ পেতে হলো না আমার।

চারদিক নিস্তব্ধ। যেন প্রকৃতিও নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। পোকামাকড়ের একটাও শব্দ নেই। আমি জানি, আমি এখন ভ্যালমোরার সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গায় আছি। ক্রিপ্টোরিয়ার জঙ্গল। এখানে যা কিছু ঘটে, তার সবকিছুই অলৌকিক, যুক্তির বাইরে, রহস্যে মোড়া।

প্রায় পনেরো মিনিট ধরে ধীরপায়ে হাঁটার পর চোখে পড়লো আগন্তুকের বলা সেই বিশাল বটগাছটা। তার ছায়া যেন অন্ধকারকেও ঢেকে ফেলেছে। নির্দেশনা অনুযায়ী বটগাছের বিপরীত দিকের ঘন জঙ্গলে পা বাড়ালাম। লতাগুল্মের জাল ছিঁড়ে যতই ভেতরে যাচ্ছি, ততই এক অদ্ভুত আতঙ্কের গন্ধ ঘনিয়ে আসছে। বাতাস ভারী হয়ে উঠছে, পায়ের নিচে শুকনো পাতা চূর্ণ হয়ে মৃদু আওয়াজ তুলছে।

আরও কিছু দূর এগোতেই সামনে উদ্ভাসিত হলো একটা পুরনো একতলা বিল্ডিং। শ্যাওলায় ঢাকা, ভগ্নপ্রায় দেয়ালে সময়ের ক্ষতচিহ্ন। অদ্ভুতভাবে পরিচিত লাগছে জায়গাটা, যেন কোথাও আগে দেখেছি। কিন্তু ঠিক মনে করতে যাব, এমন সময়ই কানে এলো করুণ গোঙানির শব্দ।

দৃষ্টি সেদিকে ঘোরাতেই দেখি একটা কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। না, ওটা কুকুর নয়, যেন নরকের কোনো প্রহরী! দৈত্যাকার দেহ, তিনটি মাথা, ছয়টি চোখ। প্রত্যেকটা থেকে যেন আগুন ঝরছে। চোয়াল বেড়িয়ে আছে, জিভ ঝুলে পড়েছে, আর তার ফেনায়িত লালা মাটিতে টপটপ করে পড়ছে। গর্জনের শব্দে চারদিক কেঁপে উঠছে।

আমি বুঝে গেলাম, এই দানবাকৃতি কুকুরটাই বিল্ডিংয়ের প্রহরী। এতক্ষণ নিশ্চয়ই চারপাশে ঘুরছিলো, আর এখন আমার গন্ধ পেয়ে ক্ষুধার্ত নরপিশাচের মতো এগিয়ে আসছে। দূরে, কুকুরটার পিছনেই দেখতে পাচ্ছি বিল্ডিংয়ের সদর দরজা। কিন্তু তার চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

কুকুরটা এক পা, দু’পা করে এগিয়ে আসছে, গম্ভীর গোঙানিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তিন মাথার ছয়টি চোখ জ্বলজ্বল করছে অন্ধকারে, যেন তিন দিক থেকেই আমাকে একসাথে গিলে ফেলবে। আমার বুকের ভেতর বজ্রপাতের মতো ধুকপুকানি। এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাকে। লড়াইটা কি আমিই শুরু করবো, নাকি পিছু হটে পরিকল্পনা সাজাবো?

ভয়ে ভয়ে ফিস ফিস করে বললাম
– গুড টমি, রাগ করেনা সোনা। বিস্কুট খাবে?

কুকুরটার গোঙ্গানী থামলো না। মনে হলো সে আরো রেগে যাচ্ছে আমার কথায়। হেসে উঠলো কিরা ..
– কি হে, চুক্তি করবে নাকি! কুকুর বধ করার কৌশল আমার জানা আছে।

– তুমি তো কথাই বলোনা, এটা আমার যুদ্ধ।

সুযোগসন্ধানী কিরাকে থামালাম। অবশ্য কুকুর শান্ত করা যায় এমন কোনো কৌশল আমার মাথায় আসছে না। তাহলে তো যুদ্ধই একমাত্র উপায়। যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলাম আমি ..

– আগেই মাফ চেয়ে নিচ্ছি। পশু নির্যাতন করার কোনো ইচ্ছাই ছিলোনা আমার। কিন্ত তোর যা রাগ দেখতে পাচ্ছি। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই মনে হচ্ছে।

আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। বাতাসে একটা অজানা গন্ধ, ভয়, ধুলো আর অন্ধকারের মিশ্রণ। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিন মাথাওয়ালা কুকুরটা। ক্রিপ্টোরিয়ায় আমার দেখা প্রথম রহস্য। ছয়টা চোখে নরকের আগুন জ্বলছে, মুখ থেকে লালা নয়, যেনো বিষ ঝরছে। প্রত্যেকটা নিশ্বাসে গর্জনের সঙ্গে মিশে আছে এক অচেনা হুমকি।

আমি জানি, এখন ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। ফিরে যেতে চাইলেও সে আমাকে সেই সুযোগ দেবেনা। আমার পেছনে অন্ধকার জঙ্গল, সামনে বিল্ডিংয়ের সদর দরজা। আর মাঝখানে এই দৈত্য। লকেটের মৃদু আলোয় কুকুরটার ছায়া তিন দিক থেকে ছুটে আসছে মনে হয়।

আমি চোখ বন্ধ করে নিই এক মুহূর্তের জন্য। বাতাসে হাত ছড়িয়ে দিলাম।
এ যেন বিদ্যুৎ স্পর্শ করছি।
আমার মুঠো গরম হয়ে উঠছে।
মুহূর্তেই তালু থেকে বেরিয়ে এলো আগুনের গোলক, জ্বলন্ত সূর্যের মতো।

চোখ খুলেই ফিসফিস করে বলে উঠলাম ..
–আয় তাহলে শুরু করি ..দেখি, কার আগুন বেশি গরম।

দানবটা ঝাঁপিয়ে পড়লো। তার তিন মাথা তিন দিক থেকে যেনো কামড়াতে আসছে আমাকে। আমি পাশ কাটালাম, মাটিতে গড়িয়ে পড়লাম। ধুলো উড়লো, গাছের শেকড় ভেঙে গেলো। এক মুহূর্তে শরীর ঘুরিয়ে হাত বাড়ালাম, আগুনের গোলক ছুঁড়ে মারলাম তার বুকের দিকে। বিস্ফোরণের মতো শব্দ।
আগুন ছড়িয়ে পড়লো তার চামড়ায়, লোম পুড়ছে, কিন্তু দানবটা থামছে না। বরং আরো উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।

চিন্তায় পড়ে গেলাম তার হিংস্রতার এক ঝলক দেখেই। এ যেনো কিছুতেই থামবাড় পাত্র নয়। আমায় শেষ করার শপথ নিয়ে ফেলেছে নিশ্চয়ই।

আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে পেছনে ছুটলাম, কুকুরটা গর্জে উঠলো, আমার পিছু ছুটতে লাগলো সেও। তার পায়ের শব্দে মাটি কেঁপে উঠছে। হঠাৎ থেমে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি, হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে দিলাম।
দুই হাতের মাঝে আগুন ঘূর্ণি খেয়ে উঠলো, যেনো বায়ু আর আগুন একসাথে ঘূর্ণিঝড় হয়ে জন্ম নিচ্ছে। আমি গর্জে উঠলাম। আমার হাতে তৈরী হওয়া আগ্নিঝড় ছুটছে কুকুরটার দিকে।

তিন মাথাই একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো, ভেতর থেকে শিসের মতো গর্জন বেরোলো। আগুন তাকে ঘিরে ফেলেছে, কিন্তু সে পুড়ছে না, বরং আমার দিকে ছুটে আসছে আগুন ভেদ করে। এ যেনো হার মানতেই জানেনা।

কুকুরটার এক মাথা আমার কাঁধ ছুঁয়ে গেলো। চামড়ায় তীব্র জ্বালা। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম, গড়িয়ে দূরে সরলাম। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু আমার চোখে ভয় নেই, শুধু একরোখা জেদ।
হাত বাড়িয়ে মাটির ছাই মুঠোয় ধরলাম,
আগুনের সাথে যেনো আমার রক্তস্রোত মিশে যেতে লাগলো।

মুহূর্তে চারপাশ লালচে আলোয় ভরে গেলো। বাতাস গরম হয়ে উঠছে। আমার সামনে আগুনের রেখা বৃত্ত আকারে ঘুরছে, আমি সেই আগুনের ভিতরে দাঁড়িয়ে। নিজের শক্তি দেখে নিজেরই অবাক লাগছে। আবারও কুকুরটার গর্জন। কিন্ত মনে হলো সে অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। ..

–এবার শেষ করার পালা ..

আমি হাত তুলে গোলকটা ছুঁড়ে দিলাম। এইবার সরাসরি তার গলার দিকে। আগুনের গোলকটা কুকুরটার মাঝখানে আঘাত করলো। এক ঝলক আলো, তারপর বিস্ফোরণের শব্দে জঙ্গল কেঁপে উঠলো। কুকুরটার তিন মাথা চেঁচিয়ে উঠলো একসাথে, আর ধীরে ধীরে ধোঁয়ার ভেতর গলে যেতে লাগলো। তার ছায়া আগুনের সঙ্গে বিলীন হয়ে গেলো, যেনো নরকে ফিরে যাচ্ছে আবার।

বাতাস স্থির। শুধু আমার শ্বাসের শব্দ, আর চারপাশে জ্বলন্ত পাতার গন্ধ। আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম, মুঠো থেকে ছাই ছড়িয়ে দিলাম বাতাসে। কানে এখনো বাজছে কুকুরটার শেষ চিৎকার।

জীবনের প্রথম কোনো মার্ডার করলাম আমি। তাও আবার একটা অবলা কুকুর। না, হিংস্র অবলা কুকুর বললে ভালো হয়। ঘটনা ক্রিপ্টোরিয়ার বাইরে হলে হয়তো এতক্ষণে পশু নির্যাতনের মামলা হয়ে যেতো আমার নামে। আফসোস করে লাভ নেই। আমি যুদ্ধে আছি আর যুদ্ধে সবকিছুই ন্যায্য।

আমি মাথা তুলে তাকালাম। বিল্ডিংটা সামনে। দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ মনে হচ্ছে। আমার বুকের ভেতর আবার সেই দপদপানি শুরু হলো। বাইরেই যে হিংস্র দানব, না জানি ভিতরে আর কি কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য।

আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম, ছাইভরা মাটির ওপর দিয়ে এগিয়ে গেলাম সদর দরজার দিকে। আশেপাশের গাছের পাতায় এখনো আগুন জ্বলছে। ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে অগ্নিঝড়ের দাপট। সেই নিভু নিভু আগুনের আলো আমার ছায়া বিল্ডিংয়ের দেয়ালে লম্বা হয়ে উঠছে।

দরজার কাছে গিয়ে সজোরে ধাক্কা দিতেই কাঠের দরজা যেনো চৌচির হয়ে ভেঙ্গে পড়লো। মনে হলো আমার শক্তি আগের থেকে আরো পরিণত হয়েছে। ভিতরে প্রবেশ করলাম। ঘন অন্ধকার! সামনে আরেকটা দরজা দেখা যাচ্ছে যেখা‌ন থেকে মৃদু আলো আসছে। একটা ব্যপার লক্ষনীয়। বিল্ডিংয়ের ভিতরের পরিবেশ এত নিস্তব্ধ যে বাইরের কোনো আওয়াজ ভিতরে আসবে না।

হঠাৎই কানে বাজলো জোড়ালো হাসির শব্দ ..

– হাহাহাহা ..আমার থেকে পালিয়ে বাঁচার কোনো সুযোগ নাই। সত্যি করে বল তোদের বাকিরা কোথায় পালাইছে?

চাবুকের শব্দ। কোনো এক মেয়েলি কন্ঠস্বর আর্তনাদ করছে..
– আমায় ছেড়ে দাও। আমায় ছেড়ে দাও। আমি কিছু জানিনা।

থেমে গেলো চাবুকের আঘাত। আমি ধীর পায়ে শব্দ অনুসরণ করে দরজায় উকি মারার জন্য এগোচ্ছি। ভিতরে কি চলছে তা জানার জন্য। পরক্ষণেই খল খল পানির আওয়াজ। যেনো কেউ হাঁটু পানিতে হাটছে। উকি মারলাম দরজা দিয়ে। দেখলাম সামনের কক্ষটা বিশাল বড়ো। কক্ষের মাঝখানে একটা পানি ভর্তি বিশাল চৌবাচ্চা। তার মাঝখানে বেঁধে রাখা হয়েছে একটা মেয়েকে। আর পানি থেকে হেঁটে হেঁটে চৌবাচ্চা ডিঙ্গিয়ে ওপাশের ঘরের দিকে এগোচ্ছে একজন টাক মাথার বেঁটে লোক। এক দেখাতেই চিনে ফেললাম লোকটাকে। আরে! এটাতো লাড্ডু সিং! সে কি করছে ক্রিপ্টোরিয়ার জঙ্গলে!

—--- চলবে —----

গল্পটা সম্পর্কে যে কেনো অনুভূতি, আলোচনা শেয়ার করতে পারেন " বর্ণমেলা " গ্রুপে।
এবং প্রতি মাসেই জিতে নিন বই। গ্রুপ লিঙ্ক পিঙ্ক কমেন্টে দেয়া থাকলো।

Address

Kalshi
Mirpur
1216

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Khalid hasan posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Khalid hasan:

Share