04/11/2025
#ভিএম্পায়ার
#পর্বঃ২৭
লেখাঃ
লাড্ডু সিং এখানে! আর চৌবাচ্চায় ওই মেয়েটাকে কেন বেঁধে রাখা! লাড্ডু সিং ওপাশের ঘরে প্রবেশ করতেই আমি চৌবাচ্চার কাছাকাছি গেলাম। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। আমার সমবয়সী বলেই মনে হচ্ছে। চোখ মুখ শুকিয়ে আছে মেয়েটার। তার গায়ে রূপালী রঙ্গের একটা অদ্ভুত ধরনের পোশাক জড়ানো। সেই পোশাক ভেদ করে বেরিয়ে আসছে রক্ত। বুঝাই যাচ্ছে লাড্ডু সিং মেয়েটার উপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে। মাথা নুইয়ে নিথর হয়ে আছে তার শরীর। মেয়েটাকে মুক্ত করার চিন্তা মাথায় আসলো। আমি খেয়াল করে দেখলাম মেয়েটার হাত দুটো চৌবাচ্চার মাঝখানে একটা পিলারের সাথে শক্ত করে বেঁধে দেয়া। মেয়েটা পানিতে দাঁড়িয়ে। হঠাৎই তার পায়ের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। তার পায়ের জায়গায় পা নেই। সেখানে বিশাল একটা মাছের লেজ নড়াচড়া করছে। যেনো পানিতে কোনো মাছ ছটফট করছে বলে মনে হচ্ছে! আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা কোনো রূপকথা নয়। আমার সামনে একটা মৎসকন্যা! ক্রিপ্টোরিয়ায় আমার দেখা দ্বিতীয় রহস্যময় জীব এটা!
প্রচন্ড অবাক হলাম আমি। তখনই পাশের ঘর থেকে লাড্ডু সিং এর চিৎকার ..
– এই সামান্য লিকুইড দিয়ে কি হবে আমার! ব্যাবসায় দেহি লাল বাত্তি জ্বইলা গেলো।
আমি মৎসকন্যার থেকে চোখ সরিয়ে এবার পাশের ঘরে উকি দিলাম। মেয়েটাকে মুক্ত করার আগে লাড্ডু সিং এর সাথে হিসাব নিকাশ করা জরুরী। খেয়াল করলাম লাড্ডু সিং তার দুই বডিগার্ডসহ পাশের ঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে। সেখানে একটা কাঠের তাকের উপর সারি সারি তরল ভর্তি শিশি সাজানো ঠিক যেমনটা দেখেছিলাম লাড্ডু সিং এর থেকে ভ্যানিশার কিনতে গিয়ে। ওগুলো কি ভ্যানিশারের শিশি!
আবারও লাড্ডু সিং এর হুঙ্কার ..
– মার্কেটে বহুত ডিমান্ড কিন্ত সাপ্লাই নাই। এখন আমার ব্যবসা চলবো ক্যামনে রে! এইদিকে মারমেইডরা পালায়া গেছে। তাদের পালাইতে সহযোগিতা করলো কেডায়! ক্রিপ্টোরিয়ার জঙ্গলে আসার সাহস কার হইলো! তারে যদি পাইতাম লাড্ডু খাওয়ায় দিতাম। মনে হইতাছে আমগো আস্তানা বদলাইতে হইবো।
লাড্ডু সিং তার বিশালদেহী বডিগার্ডদের সাথে কথা বলছে আর তরল ভর্তি শিশি গুলোর ভিতরে কিছু একটা করছে। ঘর গুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ায় তারা আমার অবস্থান এখনো টের পায়নি। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম সবকিছু। কেন যেনো মনে হতে লাগলো আমি অন্ধকারেও সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এটা কি কোনো জাদুশক্তি! আমি বুঝতে পারছি না। তবে সত্যিই মনে হচ্ছে আমার দৃষ্টি শক্তি আগের থেকেও বহুগুণে বেড়ে গেছে।
তাকিয়ে দেখলাম লাড্ডু সিং এর হাতে একটা কাঠি। আর সেই কাঠির ডগায় একটা ছোট্ট পাথর জ্বলজ্বল করছে। লাড্ডু সিং সেই জ্বলন্ত ছোট্ট পাথরের অংশটা কাঠি দিয়ে ভ্যানিশারের শিশিতে থাকা তরলে চুবাচ্ছে আর কথা বলছে ..
– সাপ্লাই কম ডিমান্ড বেশি। মনে হয় মালের দাম আরো বাড়াইতে হইবো। ইচ্ছা ছিলো ভ্যালমোরার বারটা বাজায় দেওনের কিন্ত ভ্যানিশারের সাপ্লাই না থাকলে তো হইবোনারে। অন্যদিকে সম্রাটের ভি যে আমিই চুরি করছিলাম সেইডা যদি সম্রাট জানতে পারে তাইলে তো আমি শ্যাষ। উল্টা ভি তো আমার থাইকা চুরি কইরা নিয়া গেছে ওই পিচ্চি পোলাগুলা। ওইগুলারে তো অহন ধরতে যাওয়াও ঝামেলা।
লাড্ডুর কথার মাঝেই আমি অনুভব করতে লাগলাম, আমার বুক যেনো প্রচন্ডভাবে তাপপ্রবাহ হচ্ছে। আমার গলার লকেটটা প্রচন্ড তাপ উৎপন্ন করছে সেইসাথে তীব্র লাল আলো। হঠাৎই লাড্ডু সিং এর হাতে থাকা পাথরটাও যেনো প্রচন্ডভাবে জ্বলে উঠলো। একইরকম তীব্র লাল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটছে সেটা থেকেও। জিনিসটার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে মাথা চুলকাতে লাগলো লাড্ডু সিং ..
– কিরে কিরে! এই মালে আবার এমন চকচক করতাছে ক্যান! আগে তো কখনও এমন হয়নাই!
আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না লাড্ডু সিং এর হাতে থাকা পাথরটাই আমার লকেটের অংশ। দুটো থেকে একই ধরনের লালছে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটছে। লাড্ডু সিং কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলাম ..
– কারণ জিনিসটা তার আসল মালিককে পেয়ে গেছে। তাই খুশিতে চকচক করছে।
সঙ্গে সঙ্গে লাড্ডু সিং আর তার বডিগার্ডরা ঘুরে দাড়ালো আমার দিকে। তার বডিগার্ডরা রাইফেল তাক করলো আমার দিকে। বিড়বিড় করে কথা বললো লাড্ডু সিং ..
– অসম্ভব! তুই সেই আকিরা না?
– বাহ, ভালোই ফেমাস তো আমি! মানুষ এখন অন্ধকারেও চিনে ফেলে আমাকে। এখন আবার অটোগ্রাফ চেয়ে লজ্জা দিবেন না প্লিজ।
– তোরে কি আর ভুলা যায়? আমার ভি চুরি করছোস তুই।
–হ্যাঁ, যেটা আপনি সম্রাটের থেকে চুরি করছিলেন।
– ওরে বাবারে! এই পোলায় দেহি আমার গোপন কথা শুইনা ফালাইছে। এরে তো লাড্ডু খাওয়ায় দিতে হবে এখনি। নইলে সম্রাট জানতে পারলে আমারেই লাড্ডু খাওয়ায় দেবে। তা ভাতিচা তুই ক্রিপ্টোরিয়ায় আসার সাহস পাইলি কিভাবে! আর আইলি যখন, আমার আস্তানায় ঢুকলি ক্যামনে! বাইরে আমার পোষা ডগি কি তোরে চাটাচাটি করেনাই?
– না রে কাকু, চাটাচাটির আগেই তোমার ডগিরে আমি বড়ো বড়ো লাড্ডু খাওয়ায় দিছি। বদহজম হয়ে কোমায় চলে গেছে।
– ওরে বাপ্রে! এ ছেলে দেখি বহুত ডেঞ্জারাস! ডগির সাথে ক্যামনে পারলি তুই! যেইহানে আমার বডিগার্ডরাই হের দিকে তাকাইলে প্যান্টে মুইতা দিতো!
– আরে কাকু, কথা কম। তোমার হাতে যে সুন্দর পাথরটা দেখা যাচ্ছে। ওইটা আমার কাছে হ্যান্ডওভার করো। ওইটার জন্যই ক্রিপ্টোরিয়ায় আসা লাগছে আমার।
–ওই ভাতিচা। অহন তোরে তো আমার লাড্ডু খাওয়াইতেই হবে। তুই আমার সব গোপন কথা জাইনা গেছোস। গার্ডস, শুট হিম।
লাড্ডু সিং এর গার্ডরা অনবরত রাইফেল থেকে গুলি ছুড়তে লাগলো। আমি ঠায় দাড়িয়ে রইলাম। একের পর এক বুলেট আমার শরীর ভেদ করে প্রবেশ করছে। আমি অনুভব করছিলাম সেগুলো আমার চামড়া ভেদ করে ভিতরে হাড় পর্যন্ত আঘাত করছে। তাদের রাইফেলের বুলেট শেষ হয়ে গেলো। আমি তখনও ঠায় দাড়িয়ে রইলাম। আমার ব্যথা অনুভব হচ্ছে ঠিকই কিন্ত তারা আমাকে দুর্বল করতে পারলো না। যেনো মনে হলো আমার শরীর থেকে কোনো রক্তই ঝড়ছে না।
ঠিক তখনই ঘটলো আশ্চর্য ঘটনা। আমার শরীর থেকে বুলেটগুলো ধীরে ধীরে নিজে থেকেই বেরিয়ে যাচ্ছে। ছেদ হওয়া চামড়া আপনাআপনি আগের মতো হয়ে যাচ্ছে। তারা তিনজনই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হঠাৎই বলে উঠলো লাড্ডু সিং ..
– ভ্যাম্পায়ার! তুই একটা ভ্যাম্পায়ার। এই শক্তি শুধু ভ্যাম্পায়ারেরই থাকে। তুই এতদিন মানুষ রূপে ডেল্টোরায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলি!
লাড্ডু সিং এবার তার বডিগার্ডদের উদ্দেশ্যে হুঙ্কার দিলো ..
–গার্ডস, এটা একটা ভ্যাম্পায়ার! ওর গলা কেটে আগুন লাগাতে হবে। আগুন আনো।
সঙ্গে সঙ্গে আমার এক হাতে আগুন জ্বালিয়ে ফেললাম আমি। আর লাড্ডু সিং এর উদ্দেশ্যে বললাম ..
– তোমাদের কি আগুনের খুব প্রয়োজন? আমার কাছে অফুরন্ত আগুন রয়েছে।
ভরকে গেলো তারা তিনজনই। আমি ধীরে ধীরে তাদের কাছাকাছি যেতে লাগলাম। তারা তিনজনই যেনো ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আগুনের এমন আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে তারা এখনো হজম করতে পারেনি।
লাড্ডু সিং যেনো ভয়ে তার বডিগার্ডের কোলে উঠে পড়বে। দুই হাত দিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছে তার হাতে থাকা পাথরটা। আমার চোখে প্রচন্ড রাগ। একদম লাড্ডু সিং এর চোখে চোখ রেখে বলে উঠলাম ..
– তোর হাতে যে জিনিসটা ধরে আছিস, ওইটা আমার সম্পত্তি।
লাড্ডু সিং আমতা আমতা করে জবাব দিতে লাগলো ..
– কি যে বলো ভাতিজা, এইডা তো আমার জিনিস। এইটা দিয়া আমি ভ্যানিশার বানাই।
– আচ্ছা! তাই নাকি। কিভাবে বানাস?
– ওইযে মারমেইডের চোখের জলে এই পাথরের ছোঁয়া দিলেই ভ্যানিশার প্রস্তুত। এজন্যই তো মারমেইড ধইরা ধইরা তাদেরকে চাবুক মাইরা মাইরা কান্না করাই। তুমি কিন্ত আমার সাথে বাড়াবাড়ি কইরো না ভাতিজা। আমার পিছনে কিন্ত সম্রাটের হাত আছে। হে নিজেও কিন্ত আমার থাইকা কমিশন খায়। আমারে ছাইড়া দাও। তোমার যদি কমিশন লাগে তাইলে নিও। এইডা হইলো পরশ পাথর, এইডা তো ভুলেও তোমারে দেয়া যাইবো না। ব্যবসায় লাল বাত্তি জ্বইলা যাইবো না তাইলে! অলরেডি আমার পাঁচটা মারমেইড পালায়া গেছে। আর ওই বাচ্চা মারমেইডরে বহুত কষ্টে সমুদ্র থাইকা ধরছি। কিন্ত হেতি কিছুতেই কানতাছে না।
প্রচন্ড রেগে গেলাম আমি ..
– তুই কি তোর পরশপাথর হ্যান্ডওভার করবি নাকি তোকে আমার এই আগুনের পরশ দিতে হবে?
এবার দুই হাতেই আগুনের গোলক বানালাম আমি। লাড্ডু সিং আরো ভীত হয়ে গেলো ..
– ওরে বাপ্রে! এইটা আবার কোন ধরণের সায়েন্স! হাতে কি পেট্রোল পাম্প সেটাপ কইরা লইছো নাকি ভাতিজা? এই আগুন জ্বলতাছে ক্যামনে! নিভেনা ক্যা!
– তোরে পুড়ায়া ছাই করার জন্য অবশ্য এত আগুনের দরকার হবেনা।
– বাপ্রে! আর কত কি দেখবো ভ্যালমোরায়! তুমি দেখি বিরাট ম্যাজিশিয়ান। আমি আগে জানতাম না ভাতিজা। দেখো ভাতিজা, তোমার সাথে আমার আগে যা শত্রুতা ছিলো আমি সব ভুইলা গেলাম। তবু এই জিনিস চাইও না। আমার ব্যবসার একমাত্র মূলধন এই পরশ পাথর।
– বুঝছি, তোরে এইভাবে শায়েস্তা করা যাবেনা।
আমার কথা শেষ না হতেই লাড্ডু সিং এর বডিগার্ডরা যেনো আমাকে আক্রমণ করার জন্য তেড়ে আসতে লাগলো। খেয়াল করলাম লাড্ডু সিং চালাকি করার চেষ্টা করছে। সে ধীরে ধীরে ভ্যানিশারের একটা শিশি হাতে নিচ্ছে। গার্ডরা আমার কাছে আসা মাত্রই সঙ্গে সঙ্গে দুই হাতে দুইজনের বুকে আগুনের গোলা ছুড়ে মারলাম আমি। বডিগার্ডরা আগুনের ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে পড়লো ভ্যানিশারের তাকে। সেইসাথে তারা লাড্ডু সিং এর গায়ে ধাক্কা দিলো। লাড্ডু সিং এর হাত থেকে ভ্যানিশারের শিশি পড়ে গেলো।
ভ্যানিশারের সাজানো শিশিগুলো চুরচুর করে ভাঙ্গতে লাগলো। বডিগার্ডদের গায়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। এসব দেখে লাড্ডু সিং ভয়ে আরো কুকরে গেলো। তবুও যেনো সে পাথরটা দিতে চাচ্ছে না আমাকে। আবারও হুঙ্কার করলাম আমি ..
– শেষ বারের মতো বলছি। তোকে জানে মারার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। ভালোয় ভালোয় পাথরটা দিয়ে দে।
লাড্ডু সিং এবার ভয়ে ভয়ে মিনতি করতে লাগলো ..
– ওরে বাপ্রে, পোলা তো নয় যেনো আগুনের গোলা! দিতাছি ভাতিজা দিতাছি, আমারে কিছু কইরো না। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দেও প্লিজ। .. এই নাও তোমার পাথর ..
লাড্ডু সিং তার এক হাতে জ্বলজ্বল করতে থাকা পাথরটা এগিয়ে দিলো আমার দিকে। আমি সেটা হাতে নিলাম। দেখতে লাগলাম চোখ বুলিয়ে। আমার লকেটের পাথরের অংশটায় একটা জায়গায় ভাঙ্গা মনে হয়। এই অংশটা কি সেই জায়গায় জুড়ে যাবে! পাথরটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে সেটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেললাম। লাড্ডু সিং তখনও ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার বডিগার্ডরা ছটফট করে নিজেদের গায়ের আগুন নিভাতে ব্যস্ত। প্রশ্ন করলাম লাড্ডু সিং এর উদ্দেশ্যে ..
– এখান থেকে কতদূরে মারমেইডদের আবাস?
– ক্রিপ্টোরিয়ার জঙ্গলের শেষ মাথায় সমুদ্র। সমুদ্রের পানিতেই তাদের বসবাস। তবে বিল্ডিংয়ের পিছনে একটা নদী আছে। সেটা দিয়েও নৌকাযোগে সমুদ্রে যাওয়া যায়।
– তুই অনেক বড়ো হারামী লাড্ডু। তুই ভ্যালমোরায় সব অপকর্ম ছড়িয়ে দিয়েছিস। তোকে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবেনা। আমি শীঘ্রই ভ্যালমোরার হিরো হতে যাচ্ছি। আর তোর মতো ভিলেনদের বাঁচিয়ে রাখা তো অন্যায় হয়ে যাবে। অন্যদিকে তুই আমার মনস্টার রূপটাও দেখে ফেলেছিস।
– ভাতিজা তুমি কিন্তু আমারে কিছু করবা না বলছো। প্লিজ আমারে ছাইড়া দেও। আমি তোমার কথা কাউরে কমুনা। তুমি যে একটা বিরাট ম্যাজিশিয়ান এইটা আমি কোনোদিন কাউরে কমুনা। আমার টাক মাথার কছম।
লাড্ডু সিং তার টাক মাথায় হাত দিয়ে কছম কাটলো। আমি বিরক্তি নিয়ে বললাম ..
– আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। জোসে জোসে কথা দিয়ে ফেলেছিলাম। অবশ্য খুন খারাবি করার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। আচ্ছা আমি কিছু করবো না তোকে।
কথাটা বলেই আমি ঘর থেকে বের হলাম। আমার পিছে পিছে আসতে লাগলো লাড্ডু সহ তার বডিগার্ডরা। তার বডিগার্ডদের গায়ের জামা কাপড় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দেখলাম। তারাও আর ভয়ে আমাকে আক্রমণ করছে না। আমি পিছন ঘুরে আবারও জিজ্ঞেস করলাম লাড্ডুর উদ্দেশ্যে ..
– তোমার ডগিকে কি খাইয়ে এমন দানব বানিয়েছিলে?
– আর বলো না ভাতিজা। ভ্যানিশার খাইয়েছিলাম। ভ্যানিশার মানুষ খেলে ভ্যানিশ হয়ে যায়। কিন্ত সেই জিনিস অন্যন্য জীবজন্তুর উপর ভিন্ন প্রভাব ফেলে। ডগি একদম মনস্টার হয়ে গেছিলো। কিন্ত আমার পোষা কুকুরতো তাই আমার কথামতোই চলতো। এই বিল্ডিংটার পাহাড়াদার হিসেবে রেখে দিছিলাম ওকে।
লাড্ডুর কথাগুলো শুনতে শুনতে আমি চৌবাচ্চায় নেমে গেলাম। পানি ডিঙ্গিয়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যেতেই মেয়েটা আমার দিকে মাথা তুলে চাইলো। যেনো সে আমাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে গর্জন করে উঠলো। তার সূঁচালো ভয়ংকর দাঁত দেখে চমকে উঠলাম। সে হয়তো আমাকেও তার শত্রু ভাবছে। সে ক্রমাগত গর্জন করতে লাগলো আর তার লেজ দিয়ে পানিতে আছাড় মারতে লাগলো। ছড়ানো পানিতে ভিজে যেতে লাগলাম আমি। পিছন থেকে চিৎকার করতে লাগলো লাড্ডু সিং ..
– করো কি করো কি! ওর কাছে যেও না। খুবই হিংস্র মারমেইড। ওকে ফাঁদ পেতে ধরা হয়েছিলো। কাছে যেও না সুযোগ পেলেই কামড়ে দেবে। কৌশল জানা না থাকলে ওদের কাছে যাওয়া উচিত না। ওরা নরখাদক। কাঁচা খেয়ে ফেলবে তোমাকে। আর আমাদেরকেও ছাড়বে না।
আমি লাড্ডু সিং এর কথায় পাত্তা দিলাম না। মারমেইডটার কাছে গিয়ে চোখে চোখ রাখলাম। সে ধীরে ধীরে শান্ত হলো। আমি তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বললাম ..
– ভয় নেই, আমি তোমাকে মুক্ত করছি। আশা করছি আমাকে আক্রমণ করবে না।
আমি জানিনা সে আমার কথা বুঝতে পেরেছে কিনা। তবে তাকে শান্ত মনে হলো।
আমি তার হাতের বাঁধন খুলতে লাগলাম। খুবই মোটা আর শক্ত রশি দিয়ে বেঁধে রেখেছে তাকে। খোলাই যাচ্ছেনা। আমি হাতে আগুন জ্বালিয়ে দড়িটা একদম পুড়ে ছাই করে দিলাম। মারমেইড মুক্ত হয়ে গেলো। তার লেজটা ধীরে ধীরে মানুষের পায়ের মতো হয়ে গেলো। সারা গায়ে মাছের রূপালী আঁশের মতো দেখতে পোশাক জড়ানো তার। আমার দিকে তাকিয়ে আছে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে। আমি বললাম ..
– তুমি মুক্ত, পিছনের নদী ধরে সমুদ্রে চলে যাও। তোমার পরিবারের কাছে।
কথাটা বলেই আমি লাড্ডু সিং এর এই গোপন আস্তানা থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। চৌবাচ্চা থেকে নেমে সদর দরজা পার হবার সময় পিছন ফিরে তাকালাম মারমেইডের দিকে। বললাম ..
– তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। তুমি চাইলে তাদের খেতে পারো। আমি কিছু মনে করবো না।
আমার কথা শুনেই মারমেইডটা যেনো নিজের রূপের পরিবর্তন ঘটানো শুরু করলো। তার হিংস্র রূপ প্রকাশ পেতে লাগলো। ধীরে ধীরে সে একটা বিকৃত রূপের মনস্টার হয়ে যেতে লাগলো। শরীরের আকার তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে গেলো। ঝাপিয়ে পড়লো লাড্ডু সিং আর তার বডিগার্ডের উপর। শুরু হলো আর্তনাদ। খুবই বিদ্ঘুটে লাগছিলো এই দৃশ্য। আমি দ্রুত বিল্ডিং থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে এলাম। কামড় মেরে মেরে লাড্ডু সিং এর দফারফা করতে হয়তো মারমেইড মেয়েটা খুব বেশি সময় নেবে না।
যে রাস্তায় জঙ্গলে ঢুকেছিলাম সে রাস্তা ধরে ফিরে যেতে লাগলাম আমি। জোরে জোরে পা চালিয়ে সেই পাকা রাস্তায় উঠে গেলাম প্রায় কয়েক মিনিট পর। আশেপাশে তাকালাম। এজেন্ট খালিদ নামের সেই আগন্তুককে কোথাও দেখতে পেলাম না। হেক্সব্লেডের সাথে কি করতে হবে সে ব্যপারে তার থেকে নির্দেশনার প্রয়োজন ছিলো। দাড়িয়ে থেকে আশেপাশে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ খুঁজলাম। লোকটার কোনো চিহ্ন নেই। তাহলে কি গেস্ট হাউসে ফিরে যাবো?
গেস্ট হাইসে ফেরার জন্য পা বাড়াতেই সঙ্গে সঙ্গে তীব্র আলোর ঝলকানি। সেইসঙ্গে খিল খিল হাসির শব্দ। আমার সামনে একটা পোর্টাল খুলছে। বুঝতে বাকি নেই বিদ্ঘুটে হাসির শব্দটা মারিয়ার বিকৃত হাসি। পোর্টাল থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো মারিয়া। কিন্ত ওটা শুধু মারিয়া নয়। শরীরটা যে অপরূপার। চোখদুটো কাজল কালো। কালো কাপড়ে জড়ানো পুরো শরীর। মাথায় হুডি চাপানো। যেনো এক মায়াবী ডাইনি। মুখে লেগে আছে একটা শয়তানি হাসি। আমার দিকে তাকিয়ে আছে দুষ্ট চাহনিতে। আচমকাই বলে উঠলো সে ..
– প্রিয়তমা, তোমার তো আমার মন্দিরে আসার কথা ছিলো। বাসর সাজিয়ে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য। তুমি কি চাওনা সূর্যদেব আমায় গ্রহণ করুক? তুমি কি চাওনা ভ্যালমোরায় এক নতুন যুগের সূচনা হোক? যেখানে তুমি হবে রাজা আর আমি হবো তোমার রাণী।
আহা, শখ কতো! ডাইনি কোথাকার। একরাশ বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন ছুড়লাম আমি ..
– তুমি অপরূপার শরীরে প্রবেশ করেছো কেন?
খিলখিল করে হাসতে হাসতে কাছে আসতে লাগলো মারিয়া। আমার পিছনে দাড়িয়ে গলা জড়িয়ে ধরলো। কানের কাছে ফিসফিস করে বললো ..
– শরীর ছাড়া কি বাসর উপভোগ করা যায়! ভয় নেই, আমি তাকে একেবারে খতম করিনি। সে এখনো জীবিত আছে। তোমার সাথে মিলনের জন্য একটা শরীরের খুবই প্রয়োজন ছিলো। অবশ্য কামড় খাওয়ার পর এই শরীর ত্যাগ করবো আমি। ভিক্টরের মেয়ের শরীরই হবে আমার সর্বশেষ শরীর। সূর্যদেব আমায় গ্রহণ করলে আর কখনো আমার শরীর বদলের প্রয়োজন হবেনা।
– কামড়! তুমি কোন কামড়ের কথা বললে?
আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে মারিয়া যেনো আমায় আরো শক্ত করে জড়াতে লাগলো..
– তোমার কি এখনো তেষ্টা পাচ্ছেনা প্রিয়তমা! তুমি কি পান করতে চাওনা? অনুভব করো আমার শরীর। এখানে শিরায় শিরায় বইছে তোমার তেষ্টা মেটাবার অমৃত। পান করো, অমর করো নিজেকে। সেইসাথে অমর করো আমাকেও।
– তোমার কথাবার্তা একদম মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না!
– সব বুঝে যাবে প্রিয়। বুঝানোর জন্য আমি তো আছি।
মারিয়া কথাটা বলেই আমায় শক্ত করে চেপে ধরে আমার গলায় নাক ঘষতে লাগলো। খুবই অস্বস্তি শুরু হলো আমার শরীরে। সে যেনো ধীরে ধীরে তার শরীরের প্রতি আমার আকর্ষণ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। আমি তার বাহুডোর থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা শুরু করলাম। তখনই শুনতে পেলাম আলিশার কন্ঠস্বর ..
– আকিরা! অপরূপা! তোমরা এখানে এসব কি করছো? আর অপরূপা এটা কেমন পোশাক পড়েছে! খুবই ভয়ংকর লাগছে দেখতে।
আলিশা আশ্চর্য হয়ে আমার থেকে কিছুটা দূরে দাড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার আড়াল থেকে আলিশার পাশে এসে দাড়ালো আদিল আর আব্রাহাম। আদিল যেনো আমাকে দেখামাত্র চিৎকার করে উঠলো ..
– ওরে হালায় কামডা করছোস কি! এই রাইতের বেলায় পর মহিলার লগে এইসব কি করতাছোস! আররে! আলিশার কপাল পুড়ছে।
আব্রাহাম সঙ্গে সঙ্গে আদিলের মুখ চেপে ধরলো। আলিশা আবারও প্রশ্ন করলো ..
– আকিরা! অপরূপা তোমায় এভাবে জড়িয়ে ধরে আছে কেন! তোমরা এখানে কি করছো!
হাসতে লাগলো অপরূপার বেশ ধরে থাকা মারিয়া ..
–অপরূপা নয় আমি মারিয়া। আর আকিরা শুধুই আমার। ওর থেকে আমায় কেউ আলাদা করতে পারবে না।
কেস খেয়ে যাচ্ছি দেখছি। সঙ্গে সঙ্গে আলিশার উদ্দেশ্যে বলে উঠলাম আমি ..
– বিশ্বাস করো আলিশা। এই ডাইনিটা আমার উপর চড়াও হয়েছে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। ও একটা ডাইনি। আমার ইজ্জত লুটে নিতে চাচ্ছে। ছেড়ে দে আমায় ডাইনি কোথাকার। আমি শুধু আলিশার।
সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করলো আদিল মারিয়াকে উদ্দেশ্য করে ..
– ওরে ওরে, ডাইনি কোথাকার। ছেড়ে দে আমার বন্ধুকে। তুই দেহ পাবি কিন্ত মন পাবিনা।
এদিকে আমি আমার বন্ধুদের সামনে আমার শক্তির প্রদর্শন করানোর চেষ্টা করছি না। আমি যদি এখন মারিয়ার সাথে ফাইট শুরু করি তাহলে আলিশা সহ আমার বন্ধুরাও আমার মনস্টার রূপটা দেখে ফেলবে। আর আলিশা মনস্টার প্রচন্ডভাবে ঘৃণা করে। আমি কখনোই চাইনা আলিশা আমার ভয়ংকর রূপ দেখে আমার থেকে দূরে সরে যাক। এখন কি করা যায়! ভাবতে লাগলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে হাসতে লাগলো মারিয়া। হাসি থামিয়ে বলে উঠলো ..
– আকিরার শরীর মন সব আমার হবে। আমরা দুজন এক হয়ে যাবো। ভ্যালমোরায় নতুন যুগের সূচনা হবে। নতুন সাম্রাজ্য তৈরী হবে। যেখানে আকিরা হবে রাজা আর আমি হবো তার রাণী।
আমি অনেক চেষ্টা করেও মারিয়াকে ছাড়াতে পারছি না। সে যেনো আমার শরীর ভীষণ শক্তভাবে জড়িয়ে ধরেছে। চিৎকার করলাম আলিশার উদ্দেশ্যে ..
– আলিশা, আমি কখনো রাজা হবো কিনা জানিনা কিন্তু আমার হৃদয়ের পুরোটা জুড়ে তুমি। আমার কল্পনার রাজ্যে একমাত্র রাণী শুধু তুমি। এই ডাইনির কথা তুমি একদমই বিশ্বাস করো না। ও আমাকে ভীষণ শক্তভাবে জড়িয়ে ধরেছে।
আমার কথা শুনে আলিশা যেনো তেড়ে আসতে লাগলো আমার দিকে। হুঙ্কার করলো মারিয়ার উদ্দেশ্যে ..
– আমার বয়ফ্রেন্ডকে ছেড়ে দে ডাইনি…
কাছে এসে আলিশা তার রিভলভার উচুঁ করে ধরলো মারিয়ার কপাল বরাবর। অট্টহাসিতে মেতে উঠলো এবার মারিয়া। আলিশা বিরক্ত হয়ে গেলো। আমি খেয়াল করলাম আলিশার হাত কাঁপছে। কিন্ত তবুও সাহস দেখাতে হুঙ্কার করলো আলিশা। ..
– অপরূপার শরীর থেকে বের হয়ে যা ডাইনি। নইলে গুলি করে মেরে ফেলবো তোকে।
হাসি থামিয়ে বলতে লাগলো মারিয়া ..
– তুমি কি সত্যিই এমনটাই মনে করো! গুলি করলে আমার মৃত্যু হবে? তাহলে চালাও গুলি ..
আবারও অট্টহাসিতে মেতে উঠলো মারিয়া। হাসতে হাসতে আমাকে ছেড়ে দিলো সে। ছাড়া পেয়েই আমি আলিশার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাপরে! আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো আরেকটু হলে। কি যে শক্ত করে চেপে ধরেছিলো আমায়! কিন্ত সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম মারিয়ার দিকে তাকিয়ে আলিশা একদম অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। তার হাত থেকে রিভলভার পড়ে গেলো। আলিশা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগ মুহুর্তে ধরে ফেললাম আমি।
তাকিয়ে দেখলাম মারিয়ার শরীর বিকৃত হয়ে একটা মনস্টার রূপ নিয়েছে। তার পিছনে বিশাল বড়ো বড়ো দুটো কালো ডানা। চোয়ালে সূঁচাল দাঁত। জ্বলন্ত লালচে চোখ। চুলগুলো যেনো সাপের মতো ফনা তুলছে ছোবল মারার জন্য। তার এই বিকৃত চেহারা দেখে যেকোনো দুর্বল হৃদয়ের ব্যক্তি পাগল হয়ে যাবে। কিন্ত আমার বন্ধু আদিল যেনো মোটেও ভয় পেলো না। সে হুঙ্কার করে উঠলো ..
– ওরে বাপ্রে! এটাতো ডাইনি না। এইটা তো ভ্যাম্পায়ার। আমার কাছে ভ্যালমোরিয়ামের তলোয়ার আছে। শালি, তুই ভেবেছিস জঙ্গলে আমার বন্ধুকে একা পেয়ে ইজ্জত লুটে নিবি। তা তুই কোনোদিন পারবি না ডাইনির বাচ্চা। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।
আদিল তার পকেট থেকে ভ্যালমোরিয়ামের ছুড়িটা বের করে হাতে নিয়ে সজোরে ছুটলো মারিয়ার দিকে তাকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে। আদিলের এই সাহস দেখে আমি অবাক সেইসাথে অবাক আব্রাহামও। আব্রাহাম যেনো ভয়ে এতটা স্থির হয়ে গেছে সে আদিলকে আটকানোর চেষ্টাও করলো না। আদিল এত জোরে ছুটছে যে আমিও আদিলকে আটকাতে পারলাম না। আলিশার অচেতন শরীরটা মাটিতে শুইয়ে দিবো এমন সময় খেয়াল করলাম মারিয়া আদিলের হাত ধরে ফেলেছে তার দুই হাত দিয়ে। মারিয়ার দানবীয় শরীরের সামনে আদিল যেনো নেহাতই বাচ্চা। হাসতে হাসতে বলতে লাগলো মারিয়া ..
– তোমার জানা উচিৎ বেয়াদব ছেলে, আমি কোনো ভ্যাম্পায়ার নই আর এই ভ্যালমোরিয়াম আমার কিছুই করতে পারেনা। বেয়াদবির জন্য তোমাকে চরম শাস্তি পেতে হবে। আমার চোখের দিকে তাকাও।
আদিল যেনো জমে শক্ত হয়ে গেছে। সে ভয়ে আর নড়াচড়া করছে না। অন্যদিকে আব্রাহাম পাথরের মূর্তির মতো একমনে তাকিয়ে আছে মারিয়ার দিকে। মনে হচ্ছে আব্রাহাম অনেক আগেই হিপনোটিজম এর শিকার হয়ে গেছে। আমি আলিশাকে শুইয়ে দিয়ে মারিয়ার উদ্দেশ্যে দৌড় শুরু করলাম। আদিলকে ছাড়াতে হবে। বোকাটা আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করলাম আদিলের পায়ের পাতা পাথরের আকার ধারণ করতে শুরু করেছে। সর্বনাশ! আদিলকে সাদেকের মতো পাথরের মূর্তি বানাতে চাচ্ছে মারিয়া।
আমি হাতে আগুনের গোলক তৈরী করতে যাবো এমন সময় দেখতে পেলাম মারিয়াকে পিছন থেকে লাথি মারলো কেউ একজন। এক লাথি খেয়ে মারিয়া ছিটকে দূরে গিয়ে পড়লো। ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পরলো আদিলের সম্মোহিত হওয়া শরীর। সে কোনো নড়াচড়া করছে না। চিৎ হয়ে পড়ে রইলো। অন্ধকারে দেখতে পেলাম আমার সামনে দাড়িয়ে আছে একটা মনস্টার। সে মারিয়াকে আঘাত করেছে। চেহারা চিনতে পারলাম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই। এটা ভিক্টর! সে এখানে কখন এলো!
কথা বলার সুযোগ পেলাম না আমি। সঙ্গে সঙ্গে মারিয়া চড়াও হলো ভিক্টরের উপর। ভিক্টর একটা গর্জন করে উঠলো। হুঙ্কার করে বলে উঠলো সে
– তোকে আজ আমি আমি খুন করে ফেলবো মারিয়া।
ভিক্টরের চিৎকারে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো। আমি চোখের সামনে দেখতে পেলাম দুটো মনস্টার বাতাসে ভেসে ভেসে একে অপরকে আঘাত করতে ব্যস্ত। তাদের ডানা ঝাপটানোর বাতাসে যেনো জায়গাটায় ভূকম্পন শুরু হয়ে গেছে। এক পর্যায়ে ভিক্টর মারিয়ার গলা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়লো। মারিয়ার বুকে চেপে বসলো ভিক্টর। মারিয়ার গলা এমনভাবে টিপে ধরেছে তার পা দুটো ছটফট করছে অনবরত। মারিয়ার মাথায় থাকা এক ঝাঁক সাপ ভিক্টরের হাতে ছোবল মারছে একের পর এক। কিন্ত ভিক্টর যেনো থামছেই না। যেনো সত্যিই সে আজ মারিয়াকে শেষ না করা পর্যন্ত থামবে না।
ঠিক সেই মুহুর্তে আরো একটা আশ্চর্য ঘটনা শুরু হলো। তীব্র আলোর ঝলকানি। একটা পোর্টাল অপেন হলো আমার পাশেই। বেরিয়ে এলো এজেন্ট খালিদ। আর সে এসেই ভিক্টরের চুল ধরে এক ঝটকায় মারিয়ার থেকে দূরে সরালো। ভিক্টর দূরে গিয়ে ছিটকে পড়লো। এজেন্ট খালিদ যেনো চোখের পলকে কাজটা করে ফেললো। চোখের সামনে এত দ্রুত ঘটনা গুলো ঘটে যাচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না আমার কি করা উচিৎ।
ছাড়া পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাড়ালো মারিয়া। আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলো এজেন্ট খালিদের দিকে। এজেন্ট খালিদকে দেখা মাত্রই মারিয়া ডানা ঝাপটে উড়ে চলে গেলো। মনে হলো সে পালিয়ে যাচ্ছে। দূর আকাশ থেকে তার কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম আমি ..
– আবার দেখা হবে আকিরা। তোমাকে আমার হতেই হবে।
সঙ্গে সঙ্গে ভিক্টর ডানা ঝাপটে উড়ে আসলো এজেন্ট খালিদের উপর চড়াও হওয়ার জন্য। এজেন্ট খালিদ ঘুরে তাকালো ভিক্টরের দিকে। ভিক্টর যেনো এজেন্ট খালিদের দিকে তাকানো মাত্রই ডানা ঝাপটানো থামিয়ে দিলো। ধীরে ধীরে তার মনস্টার রূপ স্বাভাবিক হয়ে গেলো আর সে মাটিতে ধপাস করে পড়ে গেলো। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো এজেন্ট খালিদের সামনে। আর মাথা তুলে তাকালো আশ্চর্য দৃষ্টিতে। আর বলে উঠলো ..
– এটা কি সত্যিই তুমি! এটা অসম্ভব!
এজেন্ট খালিদ যেনো এক মুহুর্ত সময় নিলোনা। ভিক্টরের হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান মেরে তাকে ছুড়ে ফেললো পোর্টালের ভিতরে। এরপর নিজেও চলে গেলো পোর্টালের ভিতরে। কি চলছে কিছুই বুঝলাম না আমি। পোর্টালের আলো নিভে যেতেই চিৎকারের শব্দ ..
– আমার ঠ্যাং, আমার ঠ্যাং। ওরে বাবারে বাবা আমার ঠ্যাং কই!
ঘুরে তাকালাম আমি। চিৎকার করছে আদিল। মাটিতে শুয়ে নিজের পা চেপে ধরে চিৎকার করছে অনবরত। সঙ্গে সঙ্গে আব্রাহাম ছুটে এলো আদিলের কাছে। আদিলকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করতে করতে আমার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো আব্রাহাম ..
– ডাইনিটা কোথায় গেলো দোস্ত! মনে হইলো যেনো আমার মাথা চক্কর দিছে।
আমি বুঝতে পারলাম আদিল আব্রাহাম হিপনোটাইজ থাকায় তারা এতক্ষণ যা ঘটেছে তার কিছুই দেখতে পায়নি। আদিলের চিৎকার বেড়েই চললো ..
– দোস্ত আমার ঠ্যাং, আমার ঠ্যাং এর কি হইলো রে দোস্ত। মনে হইতাছে আমার ঠ্যাং অবশ হইয়া গেছে রে দোস্ত। আমি পঙ্গু হইয়া গেছিরে দোস্ত।
আব্রাহাম আদিলকে ঘাড়ে নিলো আর বলতে লাগলো ..
– তর ঠ্যাং অতিরিক্ত কাঁপাকাঁপি করতে করতে ঠান্ডায় জমে গেছে হয়তো। চল রুমে গিয়ে গরম পানির ছ্যাঁক দিলে ঠিক হবে।
আদিল আব্রাহামের ঘাড়ে উঠতে উঠতে আবার বলতে লাগলো ..
– ঠান্ডায় না রে দোস্ত .. ওই ডাইনিটা কিছু একটা করছে।
আব্রাহাম আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলো ..
– কি করছে!
আদিল কোনো জবাব দিতে পারলো না। সঙ্গে সঙ্গে আমার উদ্দেশ্যে কথা বললো আব্রাহাম ..
– কিরে তুই এভাবে দাড়িয়ে আছিস কেন! আর আলিশা ওইভাবে পড়ে আছে কেন! ও কি ডাইনিটাকে দেখে অতিরিক্ত ভয় পাইছে নাকি!
আমি আব্রাহামের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আলিশার শরীরটা মাটি থেকে উঠানোর জন্য এগোলাম ঠিক সেই মুহুর্তে আমার পিছন থেকে কাঁধে হাত রাখলো কেউ। ঘুরে তাকাতেই দেখলাম ভিক্টর। স্বাভাবিক চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে সে। আমার দিকে তাকিয়ে ভারী কন্ঠে বলে উঠলো লোকটা ..
– আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবে আকিরা।
কথাটা বলে ভিক্টর নিজের মেয়ের নিস্তেজ শরীরটা কাঁধে উঠিয়ে নিলো। আদিল আব্রাহাম চুপচাপ তাকিয়ে আছে। ভিক্টর আমার মুখোমুখি দাড়িয়ে আবারও বললো ..
– এটা কোনো অনুরোধ নয় আকিরা। এটা সতর্কবার্তা। ধীরে ধীরে ভ্যালমোরার সকল মনস্টার তোমার শত্রুতে পরিণত হবে। আমি আমার মেয়েকে এসবের মধ্যে জড়াতে চাইনা। আশাকরি তুমি আমার কথাটা স্মরণ রাখবে। জানোই তো, শি হেইট মনস্টার।
ভিক্টর ঘার ঘুড়িয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো। কাঁধে ঝুলছে তার মেয়ের নিস্তেজ দেহ। চুলগুলো এলোমেলো উড়ছে হালকা বাতাসে। আমরা তিন বন্ধু তাকিয়ে তাকিয়ে ভিক্টরের চলে যাওয়া দেখছি। ধীরে ধীরে কুয়াশায় হারিয়ে যেতে লাগলো তারা। বিড়বিড় করে কথা বললো আব্রাহাম ..
– বলেছিলাম না? ভিক্টরের মেয়ের কিছু হলে ও আজ আমাদের কাঁচা খেয়ে ফেলতো। বেটায় তার মেয়ের খোঁজে ক্রিপ্টোরিয়া পর্যন্ত চলে আসছে! তাও আবার রাতের বেলা। ভাবা যায়!
সঙ্গে সঙ্গে আদিলের প্যানপ্যানানি শুরু হয়ে গেলো ..
– ওরে বাবা! ওই ডাইনিটার ব্যপারে তো আরো ভাবা যায়না! মনে হইলেই আমার ঠ্যাং কাঁপতেছে! একি আমার ঠ্যাং, আমার ঠ্যাং কাঁপতাছেনা ক্যান! ওরে আকি তোর জন্য আইজ আমি প্যারালাইজড হইয়া গেলাম রে! আমার ঠ্যাং দুইখান যমের বাড়ি চইলা গেলোরে আকি।
আমি সঙ্গে সঙ্গে দূরে কুয়াশার আড়ালে একটা তীব্র আলোর ঝলকানি দেখতে পেলাম। আমি আব্রাহামের উদ্দেশ্যে বললাম ..
– ওকে নিয়ে দ্রুত রুমে ফিরে যা। আমাদের সকালেই ডেল্টোরায় যেতে হবে। আদিলকে হাসপাতালে নিতে হবে। মনে হচ্ছে ওর পায়ের অবস্থা অতিরিক্ত খারাপ।
– কিন্ত তুই! তুই রাইতের বেলা ঘর থেকে বাইর হইছিলি ক্যান!
– এসব কথা পরে জানলেও চলবে। এখন যা বলছি তাই কর। আমি একটু পরে আসছি।
আব্রাহাম আদিল চলে যেতেই আমার পাশে এসে দাড়ালো এজেন্ট খালিদ। আমার পাশে এজেন্ট খালিদের উপস্থিতি দেখে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ছুড়লাম আমি ..
– হু আর ইউ মিস্টার খালিদ? সবাই আপনাকে দেখে এত আশ্চর্য কেন হয়? মনে হচ্ছে আপনার অতীতের সাথে ভ্যালমোরার ইতিহাসের কোনো যোগসূত্র আছে। আজ আপনাকে সত্যিটা বলতেই হবে।
আমার চোখে প্রচন্ড রাগ। মারিয়াকে ভিক্টর আজ খতম করেই দিচ্ছিলো। কিন্ত এজেন্ট খালিদ ভিক্টরের হাত থেকে মারিয়াকে বাঁচিয়েছে। লোকটা ভালো নাকি খারাপ এখনো এটা নিয়ে আমি প্রচুর সন্দিহান। একটু আগের ঘটনায় তো সন্দেহ আরো বেশি বেড়ে গেছে। আমাকে জানতেই হবে আমি তার নির্দেশনা অনুযায়ী যা করছি তা ঠিক নাকি ভুল! লোকটার এই ধোঁয়াশা ঘেরা চরিত্রের মুখোশ উন্মোচন করা জরুরী। আমি আমার এক হাতে আগুনের গোলক তৈরী করে ফেললাম। উপহাস করতে লাগলো কিরা ..
–নাদান বাচ্চা! এমন ভুল একদমই করার চেষ্টা করোনা। আমি তাঁর শক্তি দূর থেকেই অনুভব করতে পারছি। পুরো ভ্যালমোরার সব মনস্টার এক হয়েও তোমার সামনে দাড়িয়ে থাকা লোকটার কিছুই করতে পারবে না। তবে যদি তুমি আমার সাথে চুক্তিবদ্ধ হও তাহলে খেলা পাল্টে যাবে। তোমার কি এ ব্যপারে কোনো আগ্রহ আছে আকিরা? আমি কিন্ত চুক্তির জন্য সর্বদাই প্রস্তুত।
বিড়বিড় করতে লাগলাম আমি কিরার উদ্দেশ্যে ..
–আচ্ছা! তাই নাকি! একবার তোমাকে ছাড়াই চেষ্টা করে দেখি।
– তুমি বার বার আমাকে হতাশ করো আকিরা..
কিরার হতাশাকে পাত্তা না দিয়ে এবার দুই হাতেই আগুনের গোলক তৈরী করে ফেললাম আমি। মনে হলো এজেন্ট খালিদের ভ্রু কুচকে গেছে। হুঙ্কার করলাম তার উদ্দেশ্যে ..
– আর কোনো ধোঁয়াশা নয়। সব সত্যি খোলসা করুন মিস্টার খালিদ। নয়তো আমি আক্রমণ করতে বাধ্য হবো।
আমার কথাতে যেনো এজেন্ট খালিদের ভাবভঙ্গির কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না। লোকটা যেনো একমনে তাকিয়েই রইলো আমার দিকে। এদিকে আমি তাকে আক্রমণ করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
—--------চলবে—------
কমেন্ট করে বলুন গল্পটা কেমন লাগছে। নইলে আকিরা আপনাদের উপর আক্রমণ করে দিতে পারে। এই ছেলে কিন্ত ভীষণ বদরাগি 🙄