18/04/2026
“মেয়ের মা হওয়ার অপরাধ”
“এই যে শুনছো, আবার দুধটা ফেলে দিলে কেন? এত অপচয় করতে শেখালে কে তোমাকে?”
শাশুড়ির গলার তীক্ষ্ণ স্বরে চমকে উঠল মেঘলা। হাতটা কেঁপে গেল, গ্লাসের অল্প দুধ মেঝেতে পড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
মেঘলা মাথা নিচু করে বলল,
“মা, একটু বমি বমি লাগছিল… তাই—”
“তাই বলে দুধ ফেলে দিতে হবে?” কথার মাঝেই কেটে দিলেন সরস্বতী দেবী।
“এই অবস্থায় এমন আদিখ্যেতা করলে চলবে? আমরা কি এসব করতাম? যা দিত, চুপচাপ খেতাম।”
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ণব সব শুনছিল। এগিয়ে এসে বলল,
“মা, ওর শরীরটা ভালো নেই। ডাক্তারও বলেছে জোর করে কিছু খাওয়াতে না।”
সরস্বতী দেবী ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
“ডাক্তার! আজকালকার সবই ডাক্তার জানে, তাই না? সংসারের অভিজ্ঞতা বলে কিছু নেই!”
মেঘলা আর কিছু বলল না। চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেল। দরজা লাগিয়ে বিছানায় বসতেই চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।
এই বাড়িতে আসার পর থেকেই সে বুঝে গেছে—এখানে তার জায়গা আছে, কিন্তু গুরুত্ব নেই।
মেঘলার আর অর্ণবের বিয়ে হয়েছে ভালোবেসে। অর্ণব শহরের ছেলে, আর মেঘলা পাশের জেলার মেয়ে। বিয়েটা মেনে নিলেও সরস্বতী দেবীর মনে একটা আক্ষেপ রয়ে গেছে—
“ছেলের বিয়ে দিলে কিছু তো পাওয়া উচিত!”
সেই না পাওয়া জিনিসের ক্ষোভ যেন প্রতিদিন একটু একটু করে মেঘলার ওপর ঝরে পড়ে।
দিন কেটে যায়।
মেঘলার সাত মাস চলছে। শরীর ভারী হচ্ছে, হাঁটতে কষ্ট হয়। তবুও ঘরের সব কাজ তারই করতে হয়।
একদিন সকালে—
“মেঘলা! এতক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছো কেন? এই বাড়িতে কি কাজ নেই?”
চিৎকার করে উঠলেন সরস্বতী দেবী।
মেঘলা ধীরে ধীরে উঠে এসে বলল,
“মা, রাতে ঘুম হয়নি… একটু—”
“এইসব অজুহাত আমার কাছে চলবে না!”
কঠোর স্বরে বললেন তিনি।
অর্ণব তখন অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সব শুনে বলল,
“মা, ওকে একটু রেস্ট নিতে দাও না। ও এখন—”
“তুই চুপ কর!”
হঠাৎ করেই চিৎকার করে উঠলেন সরস্বতী দেবী।
“বউয়ের জন্য এত দরদ হলে আলাদা হয়ে যা! সংসার চালানো এত সহজ না!”
অর্ণব থেমে গেল। কিছু বলার ছিল, কিন্তু বলল না।
মেঘলার বুকটা হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে গেল।
সেই দিনই প্রথম, মেঘলা বুঝল—
নিজেকে রক্ষা করতে হলে তাকে নিজেকেই দাঁড়াতে হবে।
রাতের খাবারের সময়—
সরস্বতী দেবী বললেন,
“শুনেছি আজকাল আল্ট্রাসাউন্ড করে আগেই জেনে নেয় ছেলে না মেয়ে। করিয়েছো?”
মেঘলা মাথা নিচু করে বলল,
“না মা… আমরা এসব জানতে চাইনি।”
“হুম! পরে যেন আবার মেয়ে হলে মুখ ভার করে বসে না থাকো!”
তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন তিনি।
এই প্রথম, মেঘলা মুখ তুলে তাকাল।
ধীরে কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল—
“মা, ছেলে হোক বা মেয়ে—ও আমার সন্তান। আমি খুশিই থাকব।”
ঘরের ভেতর হঠাৎ করে নীরবতা নেমে এল।
সরস্বতী দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
“বেশ! খুব বড় বড় কথা শিখে গেছো!”
সময়ের চাকা ঘুরতে থাকে।
অবশেষে সেই দিন আসে—
মেঘলার কোলে আসে এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান।
অর্ণব খুশিতে চোখে জল এনে মেয়েকে কোলে নেয়।
“আমার ছোট্ট রাজকন্যা…”
কিন্তু সরস্বতী দেবীর মুখে হাসি নেই।
তিনি শুধু বললেন—
“মেয়ে…”
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা মেঘলা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে।
তার চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে হালকা হাসি।
সে ফিসফিস করে বলে—
“তোকে নিয়ে আমি নতুন করে বাঁচব… কেউ তোকে অবহেলা করতে পারবে না।”
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অর্ণব সব শুনছিল।
এই প্রথম, সে নিজের ভেতরে একটা সিদ্ধান্ত নেয়—
এইবার সে চুপ থাকবে না।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—
অর্ণব কি সত্যিই মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে?
সরস্বতী দেবীর মন কি নরম হবে?
নাকি মেঘলাকেই নিজের লড়াইটা একাই চালিয়ে যেতে হবে?
পরবর্তী পর্ব আসবে…