20/06/2025
আই এস আই ও তালেবান: বন্ধুত্ব-শত্রুর সমীকরণ
—পর্ব: ১
সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের সময় আফগানিস্তানের প্রধান প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে যাঁরা লড়াই করেছিলেন, ইতিহসে তাঁরা মুজাহিদ নামে পরিচিত । তৎকালীন সময়ে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের ইসলামবিরোধী কমিউনিস্ট মতাদর্শের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের মুসলিম সমাজকে রক্ষা ও একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত হয়।
তৎকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলমান কোল্ড ওয়ারের উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মুজাহিদদের সহায়তায় এগিয়ে আসে যেটি তারা অপারেশন সাইক্লোন কোড নামে পরিচালিত করে। আমেরিকার সাথে যোগ দেয়, পাকিস্তান, সৌদি আরব, আমেরিকা ও ব্রিটেন।
সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদদের লড়াইকে সহায়তা করতে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ‘অপারেশন সাইক্লোন’ নামে অভিযান পরিচালনা করে। এর জন্য তারা পাকিস্তানের ভূখণ্ড ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সাহায্য নেয়। কারণ পাকিস্তান হচ্ছে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। এই অভিযানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ করে এবং সৌদি আরব অর্থ সহায়তা দেয়। এরপর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এই অস্ত্র ও অর্থ ব্যবহার করে নিজ দেশে এবং আফগান-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করে।
দীর্ঘ ১০ বছর যুদ্ধের পর আফগানিস্তানের মাটিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করার পিছনে সহায়ক শক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে পাকিস্তান, সৌদি আরব, আমেরিকা ও ব্রিটেন। [১]
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯৮৪ সালে ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে প্রবেশ করে এবং সোভিয়েতের বিরুদ্ধে মুজাহিদদের সাথে যুদ্ধে যোগ দেয়।
যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আল-কায়েদাও যোগ দেয় এবং আফগান মুজাহিদদের সাহায্য করে। তখন এ সংস্থাটির নাম ছিল মাক্তাব আল-খাদামাত বা আফগান সার্ভিসেস ব্যুরো যার প্রধান কার্যালয় ছিল পাকিস্তানের পেশোয়ারে। ১৯৮৮ মাক্তাব আল-খাদামাত আল-কায়েদা নাম ধারন করে।
আল-কায়েদার সহ প্রতিষ্ঠাতা শেখ আব্দুল্লাহ ইউসুফ আল আজ্জাম এর ছেলে হুদাইফা আজ্জাম আল জাজিরার এক সাক্ষাৎকারে বলেন,
❝ওসামা বিন লাদেন ছিলেন মাক্তাব আল-খাদামাত এর অন্যতম প্রধান সহকর্মী। সংগঠনটির প্রতিটি কার্যক্রমে ওসামা বিন লাদেন তাঁর নিজস্ব অর্থ দিয়ে সহায়তা করতেন।❞ [২]
তাই ওসামা বিন লাদেনের পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে ঘন ঘন যাতায়েত ছিল। এভাবেই ওসামা বিন লাদেনের সাথে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক শুরু হয়। [৩]
মাক্তাব আল-খাদামাত ছিল একধরনের লজিস্টিকস কেন্দ্র, যার মাধ্যমে আরব ও অন্যান্য দেশ থেকে সোভিয়েত বিরোধী যোদ্ধারা আফগানিস্তানে যুদ্ধে যোগ দিত।
সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে মূলত এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল ধনী আরব দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নিয়ে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং আফগান মুজাহিদদের সাহায্য করা।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সাবেক কর্মকর্তা এবং বিশেষ বাহিনী এসএসজি-র সদস্য ব্রিগেডিয়ার সুলতান আমির তারার, যিনি কর্ণেল ইমাম নামে বেশি পরিচিত, তিনি নিজ হাতে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা মোল্লা ওমর ও তার অনুসারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। কর্নেল তারার ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তি, যিনি প্রকাশ্যে তালেবানের প্রতি সমর্থন জানাতেন এবং এজন্য তাকে অনেকে “গডফাদার অব দ্য তালেবান” বলে অভিহিত করেন। [৪]
তিনি আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে বলেন,
তিনি যখন সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে আফগান মুজাহেদদেরকে সাহায্য করছিলেন, তখন জানতে পারেন যে, এক ধনী আরব(ওসামা বিন লাদেন) সেখানে এসেছেন, যিনি আরব যোদ্ধাদেরকে সাহায্য করছেন, তাদের জন্য রাস্তাঘাট এবং বাসস্থান নির্মাণ করছেন। [৫]
সেসময় পাকিস্তানের শাসক ছিল সামরিক শাসক জেনারেল মুহাম্মদ জিয়াউল হক। তার সরকার আল কায়দা এবং গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর মাধ্যমে সোভিয়েত বিরোধী আফগান মুজাহিদদের সকল প্রকার সাহায্য করত।
তবে ১৯৮৮ সালে জিয়াউল হকের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন বেনজির ভুট্টো। তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার পর নীতিগত দিক থেকে ভিন্ন অবস্থান নেয়, যার ফলে আল-কায়েদার সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। এরপর আফগানিস্তানে পূর্বের মতো সমর্থনও বন্ধ করে দেয় বেনজির সরকার।
তাই বিন লাদেন আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে সে সময়ের বিরোধী নেতা নওয়াজ শরীফের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন, যিনি বেনজির ভুট্টোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।
সাবেক পাকিস্তানি গোয়েন্দা কর্মকর্তা খালিদ খাজা আল-জাজিরাকে বলেন,
❝নওয়াজ শরিফ সৌদি আরব, আরব আমিরাত সরকারের পাশাপাশি বিন লাদেনের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ সাহায্য পেতেন। তিনি দাবি করেন, নওয়াজ শরিফ প্রায়ই বিন লাদেনের কথা ইঙ্গিত করে খালিদকে বলতেন, “আমার পৃষ্ঠপোষক কোথায়? আমি তার সাথে দেখা করতে চাই।”❞[৬]
নওয়াজ শরিফের সাবেক অনুবাদক আলি মোহর বলেন,
❝নওয়াজ শরিফ ও বিন লাদেন দুজনের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল খালিদ খাজার। তিনি আফগান জিহাদের একজন প্রবল সমর্থক ছিলেন এবং নওয়াজ শরিফের পক্ষ থেকে প্রায়ই বিন লাদেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। যখন ভুট্টোর প্রথম সরকার পেশোয়ারে থাকা আরব মুজাহিদদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে, তখন খালিদই প্রথম বিন লাদেনকে বলেন, নওয়াজ শরিফকে সহযোগিতা করে ভুট্টো সরকারকে হটাতে হবে ।❞ [৭]
- ইউসুফ ইমাম
রেফারেন্স কমেন্ট বক্সে