18/04/2026
মায়াবী আত্মা
মোঃ নাজিম উদ্দিন
পর্ব ২
মাহমুদুল হাসান তার নিজ গ্ৰাম কদমতলী চলে আসেন। নিঝুম রাত, শুধু দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, নিস্তব্ধ রাতটাকে আরও গভীর ও রহস্যময় করে তুলেছে। সেই নীরবতার মাঝেই মাহমুদুল হাসান নিজের বাড়ির সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন।
বারান্দায় কেউ বসে আছে। অন্ধকারে স্পষ্ট বোঝা যায় না। তাঁর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। কাছে যেতেই চমকে উঠলেন—
— “রেদু! এই রেদু! তোরে আমরা কত খুঁজতাছি!”
বারান্দায় বসে আছে হৃদয় হাসান।
এক মুহূর্ত দেরি না করে মাহমুদুল হাসান ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারলেন না।
হৃদয় হাসান শান্ত কণ্ঠে বলল,
— “বাবা, আমার কিছু হয়নি। তোমাদের রেদু হারায় নাই। কান্না করো না।”
কিন্তু বাবার কান্না থামছিল না।
মাহমুদুল হাসান বলল,
— আচ্ছা ঠিক আছে আমি আর কানমু না। রাত হয়েছে বাহিরে থাকতে হবে না, চল আগে ঘরে যায়।
ঘরে গিয়ে বসলো দু'জন!
— তোর মা তো তোর জন্য কষ্ট পাইতাছে। তোর কারণে তোর মামী নুসরাতরে পর্যন্ত মারছে।
হৃদয় হাসান বিস্মিত হয়ে তাকাল।
— “কি বলছো বাবা?”
হৃদয় হাসান এমনটি কখনো ভাবেনি।
সে ধীরে ধীরে জানাল,
— “ও আমাকে থাপ্পড় মেরেছিলো। তাই কাউকে কিছু না বলে চলে আসছি। যেন বুঝে, আমাকে থাপ্পড় দেওয়া তার ঠিক হয় নাই।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “তোর জন্য সবাই চিন্তায় পাগল। কেউ ভাবছে তুই হারায় গেছস।”
হৃদয় হাসান বলল,
— আমার জন্য মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছে তুমি এক্ষুনি তাদেরকে জানিয়ে দাও।
মাহমুদুল হাসান বলল,
— এখন তো রাত কিভাবে জানাবো সকাল হলে আমি গিয়ে তোর মাকে নিয়ে আসবো।
তখনো তাদের ঘরে টেলিফোন নেই। (বাংলাদেশে প্রথম ডিজিটাল টেলিফোন ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৯০ সালে।) তাই রাতেই খবর দেওয়া সম্ভব হলো না।
হৃদয় হাসান বলল,
— আচ্ছা।
মাহমুদুল হাসান বলল,
— তুই তো কিছু খাস নাই তোর জন্য দোকান থেকে কিছু নিয়ে আসি । দু'জনে মিলে রাতের খাবার খামু।
হৃদয় হাসান বলল,
— বাবা তুমি রুটি নিয়ে আসো।
মাহমুদুল হাসান দোকান থেকে রুটি নিয়ে আসেন।তারপর দুজনে খাবার খায়। খাবার খেয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই মাহমুদুল হাসান শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। সেখানে গিয়ে তার ছেলের খবরটি দিল।
মাহমুদুল হাসান বলল,
— আমার ছেলে কোথাও হারিয়ে যায়নি। রেদু সে তো আমাদের বাড়িতে চলে গিয়েছিলো।
সকলেই এই কথাটি শুনে খুশি হয়। সবচেয়ে বেশি খুশি হয় নুসরাত জাহান। সকলেই হৃদয় হাসানকে দেখতে চলে আসে হৃদয় হাসানদের বাড়িতে।
বাড়িতে গিয়ে আফরোজা ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
— “রেদু! এইতো আমার আদরের টুকরো রেদু। হৃদয় হাসানের কপালে চুমু দেয়। তুই এমন করলি কেন? নুসরাত তোকে থাপ্পড় দিছে আমাদের বললি না কেন?”
হৃদয় হাসানের চোখ নিচু হয়ে গেল।
— তোমরা কষ্ট পাবে ভেবে কিছু বলি নাই। তোমাদেরকে না জানিয়ে এভাবে চলে আসছি।
মাহমুদুল হাসান আফরোজাকে বলল,
— বাড়িতে মেহমান আসছে, তুমি গিয়ে রান্না করো।
আফরোজা বলল,
— আচ্ছা ঠিক আছে। আফরোজা রান্না করতে চলে যান।
রোকেয়া বলল,
— নুসরাতকে আমি মেরেছি আর কখনো তোমার সাথে এমন করার সাহস পাবে না।
হৃদয় হাসান বলল,
— আমি বুঝতে পারিনি তা না হলে এমনটি হতো না।
সকলেই হৃদয় হাসানকে দেখছে, তার সাথে কথা বলছে। কিন্তু নুসরাত জাহান হৃদয় হাসানের সাথে কথা না বলে সেখান থেকে সরে যায়।
এতোক্ষনে আফরোজার রান্না করা শেষ হয়েছে । খাবারের জন্য সকলকেই আফরোজা আসতে বলেন। সকলেই খাবারের জন্য আসেন কিন্তু নুসরাত জাহান একটু দেরি করে আসে।
খাবার খাওয়ার পর। নুসরাত জাহান আর তার ইসরাত জাহান বাহিরে গিয়ে দুজনে বসে থাকে।
সেখানে হৃদয় হাসান গিয়ে বলে,
— আমার ভুল হয়েছে! আমাকে ক্ষমা করে দাও নুসরাত। এমনটি হয়ে যাবে আমি বুঝতে পারিনি।
নুসরাত জাহান হৃদয় হাসানের সাথে কোনো কথা বলল না।
ইসরাত জাহান বলল,
— তোমার কারণে মা আপুকে অনেক মেরেছে। আর তোমার জন্য সে কেদেছে। তুমি হয়তো কোথাও হারিয়ে গেছো তা ভেবে।
নুসরাত জাহান হঠাৎ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল—
— “চুপ করবি তুই? আমি তখন এমনি এমনি ওরে থাপ্পড় দিছি। আমি নিজেই তো পড়ে গিয়ে ব্যথা পাইছিলাম!”
তার কণ্ঠে ছিল রাগ, কিন্তু সেই রাগের ভেতর লুকিয়ে ছিল অস্বস্তি আর অপ্রকাশিত কষ্ট।
ইসরাত জাহান অবাক হয়ে তাকাল বোনের দিকে।
— “আমাদেরকে তো এই কথা কখনো বলোনি!”
চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। হৃদয় হাসান কিছুটা এগিয়ে এসে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল—
— “তুমি কোথায় ব্যথা পেয়েছিলে, নুসরাত?”
নুসরাত জাহান মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার চোখে এক ঝলক অভিমান দেখা গেল, কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না।
হৃদয় হাসানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হলো। সে আরও কাছে এসে বলল—
— “তুমি কি আমার সাথে কথা বলবা না, নুসরাত?”
নুসরাত জাহান নিচের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল—
— “আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, ইসরাত।”
হৃদয় হাসানের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— “তুমি আমার উপর এতোটাই রেগে আছো?”
ইসরাত জাহান অসহায় দৃষ্টিতে দু’জনের দিকে তাকাল।
— “আপু, তুমি কি তার সাথে আর কথা বলবা না?”
নুসরাত জাহান চুপ রইল। তার নীরবতাই যেন সবচেয়ে কঠিন উত্তর।
হৃদয় হাসান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেষবারের মতো বলল,
— “আমার সাথে তাহলে কথা বলতে চাও না, নুসরাত?”
কিন্তু উত্তর এলো না।
হৃদয় হাসানের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। কারণ তার সাথে নুসরাত জাহান কোনো কথা বলে নাই।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। উঠোনজুড়ে এক ধরনের বিষণ্ন শান্তি নেমে আছে। নুসরাত জাহানদের ফেরার সময় হয়ে গেছে। তারা এসেছিল শুধু হৃদয় হাসানকে একবার দেখবে বলে—এখন আবার নিজ বাড়িতে ফিরে যাবে।
ঘরের ভেতর বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে। কারও কণ্ঠে স্বাভাবিকতার চেষ্টা, কারও চোখে অদৃশ্য আর্দ্রতা।
আমজাদ হোসেন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
— “আফরোজা, হৃদয়ের খেয়াল রাখিস।”
কণ্ঠে ছিল এক ধরনের স্নেহমিশ্রিত সতর্কতা।
আফরোজা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
— “সব সময় রাখি বাবা। আমার রেদুকে আমি কখনো হারাইতে চাই না।”
তার চোখের দৃষ্টি তখন ছেলের মুখে আটকে আছে—যেন বারবার দেখে নিচ্ছেন, সে সত্যিই তার সামনে আছে।
আয়েশা বেগম ধীরে ধীরে হৃদয়ের কাছে এসে বললেন,
— “হৃদয়, এই রকম আর করবি না কিন্তু?”
হৃদয় হাসান মাথা নিচু করে নানীর হাত ধরে বলল,
— “কখনো করবো না, নানী। আমি আর এমন কোনো কাজ করবো না, যাতে কেউ আমার জন্য কষ্ট পায়।”
তার কণ্ঠে অনুতাপের ছোঁয়া, কিন্তু সেই সাথে ছিল বড় হয়ে ওঠার এক নীরব প্রতিজ্ঞা।
রোকেয়া আঁচলটা ঠিক করতে করতে বললেন,
— “আচ্ছা, আমরা তা হলে যাই। তোমরা সবাই আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবা কিন্তু।”
সবার মুখে হালকা হাসি ফুটল। বিদায়ের সময় এমন কিছু কথা বলতেই হয়—যাতে দূরত্বটা একটু কম মনে হয়।
কিন্তু সবার মাঝে একমাত্র নুসরাত জাহান নীরব। সে একবারও হৃদয় হাসানের দিকে তাকাল না। কোনো কথা বলল না।
হৃদয় হাসান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, সে হয়তো একটুখানি কথা শুনতে চেয়েছিল—একটা ছোট্ট “ভালো থাকো” হলেও।
কিন্তু সেই শব্দটি আর শোনা গেল না।
দরজার বাইরে পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। ধুলো উড়িয়ে ধীরে ধীরে তারা চলে গেল হৃদয় হাসানদের বাড়ি থেকে।
উঠোনে নেমে এলো অদ্ভুত এক শূন্যতা।
হৃদয় হাসান অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে। সন্ধ্যার বাতাস তার মুখ ছুঁয়ে গেল, কিন্তু মনের ভেতরের ভার যেন আর সরল না।
ছোট বেলায় হৃদয় হাসান একটু দুষ্টু ছিলো এখন আর সেরকমটা নেই।
ছোটবেলায় হৃদয় হাসান ছিল ভীষণ দুষ্টু। সারাদিন দৌড়ঝাঁপ, দুষ্টুমি আর হাসি-আনন্দে মাতিয়ে রাখত পুরো বাড়ি। তবে এখন আর সে আগের মতো নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটাই শান্ত হয়ে গেছে।
সালটা ১৯৯৫, হৃদয় হাসানের বয়স ১৫ বছর। সে এখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। কৈশোরের স্বপ্ন, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি আর ছোট ছোট ইচ্ছে নিয়ে তার দিন কাটে।
একদিন সকাল বেলায় হৃদয় হাসান তার মা আফরোজার কাছে এসে বলল,
— মা, আগামীকাল আমার বন্ধুরা মিলে এক জায়গায় ঘুরতে যাবে। আমিও তাদের সঙ্গে যেতে চাই। বাবাকে তুমি বলো না? আমার একটু টাকা লাগবে।
আফরোজা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— কত টাকা লাগবে রে রেদু?
হৃদয় হাসান একটু ইতস্তত করে বলল,
— দুইশত টাকা।
আফরোজার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে গেল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— রেদু, তোর বাবা অনেক কষ্ট করে সংসার চালায়, তোর পড়ালেখার খরচ দেয়। এখন এত টাকা কোথায় পাবে বাবা?
হৃদয় হাসান অভিমানী কণ্ঠে বলল,
— মা, দুইশত টাকাই তো! এইটুকু দিতে পারবে না?
আফরোজা ছেলেকে শান্ত করে বললেন,
— আচ্ছা, তোর বাবা বাড়ি ফিরে আসুক, তারপর বলব।
মাহমুদুল হাসান বাজারে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বাজারের ব্যাগ হাতে বাড়ি ফিরলেন। উঠানে ঢুকেই ডাক দিলেন,
— রেদু! এই রেদু, এইদিকে আয়। তোর আম্মা কই?
আফরোজা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,
— এই তো আমি। কিছু বলবেন?
মাহমুদুল হাসান একটু ক্লান্ত গলায় বললেন,
— আর কি বলমু, দেখতাছ না হাতে কত বাজার! আগে ব্যাগটা ধরো।
আফরোজা ব্যাগ হাতে নিতে নিতে বললেন,
— আমি একটা কথা বলতে চাই।
মাহমুদুল হাসান বলল,
— কও, শুনতাছি।
আফরোজা ধীরে ধীরে বললেন,
— রেদুর দুইশত টাকা লাগবে।
মাহমুদুল হাসান ভ্রু কুঁচকে বললেন,
— এত টাকা দিয়ে কি করবি?
হৃদয় হাসান এবার নিজেই এগিয়ে এসে বলল,
— বাবা, আমি বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যেতে চাই।
মাহমুদুল হাসান কড়া স্বরে বললেন,
— কিসের এত ঘুরতে যাওয়া? কোথাও যাওয়ার দরকার নাই।
আফরোজা অনুরোধ করে বললেন,
— দিয়ে দেন না। আমাদের তো একটাই সন্তান।
হৃদয় তখন নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে অভিমানের ছায়া।
মাহমুদুল হাসান বিরক্ত হয়ে বললেন,
— তুমি চুপ থাকো। তোমার বেশি আদরে ছেলেটা মাথায় উঠছে।
হৃদয় হাসান কাঁপা গলায় বলল,
— আমি কি কখনো পড়ালেখার টাকা ছাড়া অপ্রয়োজনে টাকা চেয়েছি? লাগবে না আমার টাকা!
এই বলে সে কান্না চেপে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
আফরোজার দিকে তাকিয়ে মাহমুদুল হাসান ধীর কণ্ঠে বললেন,
— শোনো, আমার কাছে এখন দুইশত টাকা নেই। বাজার করতেই সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। টাকা না থাকলে আমি কীভাবে দিতাম।
আফরোজা কিছুটা অভিমান মিশ্রিত স্বরে বললেন,
— রেদুকে বললেই তো পারতেন, আপনার কাছে এখন টাকা নেই।
মাহমুদুল হাসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— আমার কাছে টাকা নেই, এই কথা আমি রেদুকে বলতে চাইনি। তুমি তো জানো, ও যা চেয়েছে, আমি কখনো না করি নাই। আমাদের কষ্ট হলেও আমি সব সময় চেয়েছি, রেদু যেন কষ্ট না পায়।
আফরোজা স্তব্ধ হয়ে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নরম স্বরে বললেন,
— তাহলে এমন করলেন কেন?
মাহমুদুল হাসান কোনো উত্তর দিলেন না।
এদিকে হৃদয় হাসান বাড়ি থেকে একটু দূরে এসে রাস্তার পাশে একা বসে কাঁদতে লাগল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট যেন চোখের জল হয়ে ঝরতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সে নিজের চোখ মুছে নিল।
মনে মনে ভাবল,
“বাবা তো কখনো এমন করেন না। আজ হঠাৎ এত রেগে গেলেন কেন?”
তার মন ভেঙে গেলেও বাবার প্রতি রাগের চেয়ে বিস্ময়ই ছিল বেশি।
ঠিক তখনই তার বন্ধু সুমন হৃদয় হাসানদের বাড়িতে গেল। গিয়ে দেখল, উঠানে শুধু হৃদয়ের মা-বাবা আছেন, কিন্তু হৃদয় নেই।
সুমন বলল,
— কাকা, হৃদয় বাড়িতে আছে?
মাহমুদুল হাসান একটু বিরক্ত গলায় বললেন,
— আমি কি জানি? দেখ কোথায় গেছে।
আফরোজা ব্যাকুল হয়ে বললেন,
— সুমন, রেদু আমাদের সাথে রাগ করে এইদিকে চলে গেছে। তুমি গিয়ে দেখ তো, কোথায় আছে।
সুমন আর দেরি করল না। দ্রুত পা ফেলে বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর যেতেই সে দেখতে পেল, রাস্তার ধারে মাথা নিচু করে বসে আছে হৃদয় হাসান।
সুমন কাছে গিয়ে বলল,
— কিরে বন্ধু, এখানে একা একা বসে আছিস কেন? তোর কি মন খারাপ?
হৃদয় হাসান মুখ ফিরিয়ে বলল,
— না তো।
সুমন হেসে বলল,
— বন্ধুর সাথে মিথ্যা বলতে নেই। তোদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। শুনলাম তুই রাগ করে চলে আসছিস।
হৃদয় হাসান এবার আর লুকাতে পারল না। ধীরে ধীরে বলল,
— তোদের সাথে ঘুরতে যেতে পারব না। বাবা আমাকে এখন টাকা দিতে পারবে না।
সুমন তার পাশে বসে বলল,
— বুঝতে পারছি। এই জন্যই তোর মন খারাপ। আমার কাছে টাকা থাকলে তোকে অবশ্যই দিতাম।
হৃদয় হাসান মৃদু হেসে বলল,
— আমি জানি।
সুমন আবার বলল,
— তোকে ছাড়া আমি কীভাবে যাই?
হৃদয় হাসান বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল,
— বন্ধু, এখন তোরা যা। পরেরবার তোদের সাথে ঘুরতে যাব।
সুমন দৃঢ় স্বরে বলল,
— না, আমি তোকে ছাড়া যাব না।
হৃদয় হাসান অবাক হয়ে বলল,
— আমার কারণে তুই যাবি না কেন? আমি তো বললাম, পরেরবার যাব।
সুমন মাথা নেড়ে বলল,
— তোকে ছাড়া আমি যাব না।
হৃদয় হাসান আবার বলল,
— এমন করিস না তো। তোরা যা।
সুমন এবার আরও জোর দিয়ে বলল,
— তোকে ছাড়া যাব না মানে যাব না।
হৃদয় হাসানের চোখে জল এসে গেল। সে আবেগভরা কণ্ঠে বলল,
— বন্ধু হচ্ছে সে, যে তোমার খারাপ সময়ে তোমার পাশে থাকবে। আর খারাপ সময়ে পাশে থাকা বন্ধুই তোমার সত্যিকারের বন্ধু।
একটু থেমে সে সুমনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— সুমন, তুই আমার সত্যিকারের বন্ধু।
সুমন হেসে তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
— আচ্ছা, এখন বাড়িতে যা। কাকা-কাকি তোর জন্য চিন্তা করছে।
হৃদয় হাসান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মনটা এখনও ভারী, কিন্তু বন্ধুর ভালোবাসা তার কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
চলবে...~~~