17/04/2026
“আলোটা খুব ছোট ছিল… কিন্তু স্বপ্নগুলো ছিল আকাশের থেকেও বড়।”
রাত গভীর হলেই আমাদের বাড়িটা অন্যরকম হয়ে যেত। চারপাশে অন্ধকার নেমে আসত ধীরে ধীরে—যেন পৃথিবীটা নিজেই নিঃশব্দ হয়ে গেছে। তখন মা আলমারির কোণ থেকে সাবধানে বের করতেন সেই ছোট্ট কুপিটা। কেরোসিনের গন্ধটা ছড়িয়ে পড়ত ঘরে, আর কয়েক মুহূর্ত পরেই জ্বলে উঠত এক টুকরো হলদে আলো।
সেই আলোটা খুব বেশি ছিল না—
তবুও সেই আলোতেই আমি আমার পুরো পৃথিবীটা দেখতে পেতাম।
মাটির মেঝেতে পাটি পেতে বসতাম। সামনে খাতা, হাতে কলম। কুপির আলোটা ঠিকভাবে পড়ছে কিনা, সেটা নিয়ে কত হিসাব! একটু এদিক-ওদিক হলেই অক্ষরগুলো অন্ধকারে হারিয়ে যেত। তবুও আমি লিখতাম… বারবার লিখতাম… কারণ আমার কাছে ওই আলোই ছিল ভবিষ্যতের দরজা।
মা পাশেই বসে কাপড় সেলাই করতেন। মাঝে মাঝে তাকিয়ে বলতেন,
—“চোখ নষ্ট হয়ে যাবে বাবা, একটু দূরে বস।”
আমি হেসে বলতাম,
—“আর একটু পড়ি মা, কালকে স্যার জিজ্ঞেস করবে।”
বাবা তখন চুপচাপ হারিকেনটা ঠিক করতেন। মাঝে মাঝে বাতাসে শিখাটা কাঁপলে তিনি হাত দিয়ে ঢেকে দিতেন, যেন আলোটা নিভে না যায়।
সেই আলো নিভে যাওয়া মানেই যেন স্বপ্নটা একটু করে নিভে যাওয়া।
অনেক সময় পড়তে পড়তে চোখ ঝাপসা হয়ে আসত।
কিন্তু স্বপ্নগুলো কখনো ঝাপসা হয়নি।
আমি ভাবতাম—
একদিন আমার ঘরে অনেক বড় আলো থাকবে,
একদিন এই কষ্টগুলো গল্প হয়ে যাবে।
তারপর সত্যিই একদিন আলো বদলালো।
আমাদের ঘরে বিদ্যুৎ এল।
একটা বাল্ব জ্বলে উঠল—সাদা, উজ্জ্বল, পরিষ্কার আলো।
সেদিন মা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন, চোখে অদ্ভুত এক আনন্দ।
বাবা শুধু বলেছিলেন,
—“এবার আর অন্ধকারে পড়তে হবে না।”
কিন্তু জানো, সেদিন আমি অদ্ভুতভাবে খুশি হয়েও একটু কষ্ট পেয়েছিলাম।
কারণ সেই কুপির আলো, সেই হারিকেন—
ওগুলো শুধু আলো ছিল না, ওগুলো ছিল আমাদের সংগ্রামের সাথী।
আজ অনেক বছর পর,
চারপাশে ঝকঝকে আলো, স্মার্টফোন, আধুনিক জীবন—সবই আছে।
কিন্তু হঠাৎ যখন বিদ্যুৎ চলে যায়, আর কেউ একটা পুরোনো হারিকেন জ্বালায়—
তখন বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
মনে হয়,
আমি আবার সেই ছোট্ট ঘরে ফিরে গেছি…
আবার সেই পাটির উপর বসে আছি…
আবার কুপির আলোয় অক্ষরগুলো ধরার চেষ্টা করছি…
কিন্তু এখন একটা প্রশ্ন আমাকে ভয় দেখায়—
যদি সত্যিই আমরা আবার সেই সময়ে ফিরে যাই?
যদি একদিন এই আধুনিকতার সব আলো নিভে যায়…
আর আমরা আবার কুপির ক্ষীণ আলোয় জীবন শুরু করি?
তখন হয়তো আমরা বুঝব—
আলো বড় ছিল না,
বড় ছিল আমাদের ইচ্ছাশক্তি।
হারিকেনের ক্ষীণ শিখার নিচে বসেও
যে স্বপ্নগুলো জন্ম নিয়েছিল,
সেগুলোই একদিন পৃথিবীকে আলোকিত করেছে।
আজও যদি চোখ বন্ধ করি,
আমি স্পষ্ট দেখতে পাই—
একটা ছোট্ট কুপির আলো,
একটা নীরব ঘর,
আর একটা বাচ্চা ছেলে,
যে অন্ধকারের মাঝেও নিজের ভবিষ্যৎ লিখে চলেছে।
হয়তো যুগ পাল্টাবে, আলো বদলাবে—
কিন্তু সেই কুপির শিখার মতো জেদ আর আশাটা
যদি বেঁচে থাকে,
তাহলে কোনো অন্ধকারই আমাদের থামাতে পারবে না।
কারণ সত্যিকারের আলো কখনো বাইরে থেকে আসে না—
ওটা জন্মায় মানুষের ভেতরে। ✨
#ছোটবেলারস্মৃতি #কুপিরআলো #হারিকেন #সংগ্রামেরগল্প #স্বপ্নেরপথ #নস্টালজিয়া #জীবনেরগল্প