15/08/2026
তোমার অপেক্ষায়
২৬তম পর্ব — যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো
ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও হাফসা অনেকক্ষণ মোবাইলটা কানের কাছে ধরে বসে রইল।
মনে হচ্ছিল, মানুষটা হয়তো আবার ফোন করবে।
কিন্তু না।
নীরবতা।
ঘরের চারপাশে যেন হঠাৎ সবকিছু থেমে গেছে। ঘড়ির কাঁটার শব্দটাও আজ অস্বাভাবিক জোরে কানে আসছে।
হাফসা ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখল।
তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে—
“যাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো…”
সে চোখ বন্ধ করল।
তারপর একে একে কয়েকটা মুখ মনে পড়তে লাগল।
কাকে সে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে?
যে মানুষটা সবসময় তার পাশে থেকেছে?
নাকি সেই মানুষটা, যার কাছে সে নিজের জীবনের এমন কিছু কথা বলেছে যা আর কাউকে কখনো বলেনি?
হঠাৎ হাফসার বুকটা ধক করে উঠল।
একটা নাম মনে পড়তেই তার মুখের রং বদলে গেল।
“না… এটা হতে পারে না।”
সে নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করল।
“ও এমন কিছু করতে পারে না।”
কিন্তু যতই নিজেকে বোঝাতে চাইল, ততই সন্দেহটা মাথার ভেতর শক্ত হয়ে বসতে লাগল।
ঠিক তখনই দরজায় হালকা শব্দ হলো।
টক… টক…
হাফসা চমকে উঠে তাকাল।
“কে?”
কোনো উত্তর নেই।
আবার শব্দ হলো।
টক… টক…
হাফসা ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।
দরজা খোলার আগে একবার থেমে গেল সে।
তার বুকের ভেতর অজানা একটা ভয়।
শেষ পর্যন্ত দরজাটা খুলতেই সামনে কাউকে দেখা গেল না।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটা ছোট সাদা খাম।
হাফসা অবাক হয়ে খামটা তুলে নিল।
খামের ওপর তার নাম লেখা—
“হাফসার জন্য।”
তার হাত কেঁপে উঠল।
খামটা খুলে ভেতর থেকে একটা ছোট কাগজ বের করল।
মাত্র এক লাইন লেখা—
“তুমি যার ওপর বিশ্বাস করছো, সে তোমার কাছ থেকে সবচেয়ে বড় সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছে।”
হাফসার চোখ স্থির হয়ে গেল।
কাগজটা হাত থেকে পড়ে গেল মেঝেতে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার ফোন আবার বেজে উঠল।
স্ক্রিনে কোনো নাম নেই।
অচেনা নম্বর।
হাফসা কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে কোনো কথা নেই।
হাফসা কাঁপা গলায় বলল,
“আপনি কে?”
নীরবতা।
“আমাকে এই চিঠি কে দিয়েছে?”
কয়েক সেকেন্ড পর ওপাশ থেকে খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
“চিঠিটা আমি দিইনি।”
হাফসার শরীর যেন জমে গেল।
এই কণ্ঠ…
এই কণ্ঠ সে খুব ভালোভাবে চেনে।
সে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি?”
ওপাশের মানুষটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“হ্যাঁ। এবার আর পালিয়ে যাব না।”
হাফসার চোখ দিয়ে অজান্তেই পানি পড়তে শুরু করল।
“তাহলে এতদিন কোথায় ছিলে?”
ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
“তোমার কাছ থেকে দূরে।”
“কেন?”
“কারণ আমি জানতাম, আমি ফিরে এলে তোমার জীবনটা আর আগের মতো থাকবে না।”
হাফসা চোখ মুছে বলল,
“আর এখন?”
কণ্ঠটা এবার আরও নিচু হয়ে গেল।
“এখন সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।”
“কী সত্যি?”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর উত্তর এলো—
“যে মানুষটাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো, সে-ই আমাকে তোমার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।”
হাফসার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মতো হলো।
“কী বলছো তুমি?”
“আমি আগামীকাল তোমার সামনে থাকব। তখন সব বলব।”
“না! এখনই বলো!”
কিন্তু ওপাশ থেকে শুধু একটা কথা শোনা গেল—
“কাল দেখা হবে, হাফসা।”
কল কেটে গেল।
হাফসা ফোনটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখের সামনে এখন একটা প্রশ্নই—
কে সেই মানুষ, যাকে সে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে?
আর যদি সত্যিই সেই মানুষটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা লুকিয়ে রেখে থাকে?
তাহলে এতদিনের সম্পর্ক, বিশ্বাস আর ভালোবাসার কোনটা সত্যি?
হাফসা জানত না।
কিন্তু একটা বিষয় সে বুঝতে পারল—
আগামীকাল তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের দরজা খুলতে যাচ্ছে।
আর সেই দরজার ওপাশে হয়তো অপেক্ষা করছে এমন এক সত্যি,
যেটা জানার পর আর কোনো কিছুই আগের মতো থাকবে না…