07/03/2026
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ এলো ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে। বয়ঃসন্ধির সময় কিশোরদের বগলের নিচে যে পাতলা লোম দেখা দেয় তার মত করে শিবিরের গুপ্ত দোকান থেকে কিছু কচি বুদ্ধিজীবী ইতিহাসবিদ বের হয়েছে। মুখে দাড়ি, বেশবাস লেবাস অনেকটা রকমারী’র সোহাগের মত। বাংলাদেশে ইতিহাসবিদ এখন এইসব ২৫ থেকে ৩৫ বছরের শিবিরের ও বামাতে ইসলামের এক্টিভিস্টরা। এদের জন্ম কিন্তু শিবির দেয়নি! বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, শিবিরের কোন মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভই নেই যেটা তাদের মৌলিক।
বাংলাদেশের আসল শত্রু হচ্ছে বামপন্থীরা। বৃহত পরিসরে বলতে গেলে ভারতবর্ষের বুকে সেদিনই অভিশাপ নেমে এসেছিল যেদিন এখানে কমিউনিস্ট ধর্মটা ঢুকেছিল। এই বৃহত পরিসরে আলোচনা আজ নয়। আজ শুধু বাংলাদেশ নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিতর্কিত করা শুরু করে বামপন্থীরা। এই বাম লেখক বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীনতাকে বিতর্কিত করার যুক্তি তথ্যই হয়ে উঠে বাংলাদেশে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠা জামাত ইসলামীর রাজনৈতিক ভবিষ্যত ও প্রাসঙ্গিকতা। আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে শেখ মুজিবের উত্থান ও বাংলাদেশের স্থপতি হয়ে উঠা বামপন্থীদের আঁতে ঘা লেগেছিল। শেখ মুজিব জীবনে কয়টা বই পড়েছে, এরা লোকজনের সঙ্গে তর্ক করতে গেলে ঠোট উল্টে বলে ‘আগে ভালো করে পড়ে আসেন’ এমনই এদের আত্মশ্লাঘা- সেখানে গোপালগঞ্জের মুজিব বাংলাদেশের স্থপতি! কি করে এটা তারা মেনে নিবে?
বদরুদ্দিন উমার, মঈদুল হাসান, মাসুদুল হক এই রকম জাসদ, মার্কসবাদীরা যেসব বই লিখেছে, তার সঙ্গে আহমদ ছফার গ্যাংরা মিলে, এরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের নেতৃত্বটা মেনে নিতে পারেননি। মঈদুল হাসান ছিল মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের সহকারী। তার সম্পর্কে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, সে পশ্চিমাদের এজেন্ট, ট্রটস্কিপর্থী। মূলধারা ৭১ নামে বই লিখে তিনি মূলত শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। মাসুদুল হক মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের ‘র’ এজেন্টদের কারসাজি দেখাতে চেয়েছেন। বদরুদ্দিন উমার বা ফরহাদ মযহার বয়স থাকার পরও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে সেই সময় তারা কি করেছিলেন সেই ইতিহাস না লিখলেও স্বাধীনতার পর দেশের স্বাধীনতাকে বিতর্কিত করতে কলম ধরেছিলেন। বাংলাদেশে জামাত শিবিরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে অবস্থান সেটি জাসদ করা লেখক বুদ্ধিজীবীদের থেকে ধার করা।
শেখ মুজিব স্বাধীনতা চান নাই এটাই তাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ও একমাত্র ব্য়ান। দুই, ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে হাইজ্যাক করে নিয়ে গেছে। ‘বেহাত বিপ্লব’ হচ্ছে সেই বিকৃত দুর্গন্ধ বমি! সলিমুল্লাহদের এইসব বমি পড়ে একটা জেনারেশন মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান করতে শিখেছে। এরাই ২৪-কে প্রকৃত স্বাধীনতা বলেছে। এগুলো বিকৃত ইতিহাসের ফল। এরাই বিকৃত ইতিহাস পরিবেশ করে মুক্তিযুদ্ধকে ‘আওয়ামী ইতিহাস’ ‘আওয়ামী বয়ান’ ‘আওয়ামী ন্যারেটিভ’ নাম দিয়েছে। স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছরে মুজিব সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কোন কাজই করেনি। সময়ই ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশের অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থনৈতিক অনটন মেটানোই ছিল মুজিব সরকারের লক্ষ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার দলিলপত্র হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র সরকারী স্বীকৃত দলিলপত্র। এর বাইরে কে কি বলল তাতে কিছু যায় আসে না। এই ১৫ খন্ডের দলিলপত্রের কাজ শুরু হয় ১৯৭৮ সালের জানুয়ারি মাসে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় যখন ক্ষমতায় ছিলেন জিয়াউর রহমান। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দলিলপত্র বইগুলো কিন্তু কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, এগুলো হচ্ছে দলিল। নথি, গোয়েন্দা রিপোর্ট, সংবাদপত্রের কাটিং, চিঠি, গোপন যোগাযোগের দলিল। জিয়ার আমলে প্রকাশিত এই দলিল বলছে ৬০ দশক থেকে মুজিব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বাংলাদেশ স্বাধীন করতে এবং তার বন্ধু চিত্তরঞ্জন সুতারকে যোগাযোগের দায়িত্বও দিয়েছিলেন!
মুক্তিযুদ্ধ একটা সরকারের নেতৃত্বে হয়েছিল। এটাই একমাত্র কর্তৃপক্ষ। সেই কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে গঠিত। শেখ মুজিব স্বাধীনতা চান নাই, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে ২৫ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন- অথচ উনার ছেলে, ভাতিজা, উনার শিষ্য রাজ্জাক তোফায়েল আগে থেকেই মুক্তিযুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন! কী অনাচার ইতিহাস নিয়ে! মুজিব একা স্বাধীনতা চান নাই অথচ তার পুরো দলের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রস্তুতি এক বছর আগে থেকে!
উনি যদি মুক্তিযুদ্ধ না-ই চান তাহলে কিসের ক্ষোভে তার প্রস্তর মূর্তিতে প্রস্রাব করলি? এত রাগ ক্ষোভ কেন?
বাকশাল খারাপ হলে সব কমিউনিস্টরা গলায় দড়ি দিয়ে মরে না কেন? মুজিব তো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই করেছিল যার নাম ‘বাকশাল’। এই যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য হাঁপুস নয়নে কাঁদে মতিউর রহমান, ৭৫ সালে মাত্র ৪টি পত্রিকা রেখে সব পত্রিকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বলে মুজিবকে স্বৈরাচার বলে, মতিউর রহমান যৌবনকালটা পুরোই কাটিয়ে দিয়েছিল এই রকম একটা রাষ্ট্রে জন্য না? কমিউনিস্টরা কি দলীয় পত্রিকা ছাড়া কোন অবাধ মত প্রকাশে বিশ্বাস করে? একতা পত্রিকা কি সেই কমিউনিস্ট শাসন চায়নি যা লেনিন মাও কায়েম করেছিল?
যাই হোক, বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিক দ্বিজাতিতত্ত্ব দিয়ে তাদের রাজনৈতিক ভিত্তিমূল তৈরি। ফলে এখানে মুজিব ভক্তরাও সময় সুযোগ পেলেই তাদের দ্বিজাতিতত্ত্বের ল্যাজ বের করে ফেলেন। ভারত ও হিন্দু বিদ্বেষ, পাকিস্তানের প্রতি যুক্তিহীন প্রেম ও ক্ষমা তারা কোনদিন ত্যাগ করতে পারবে না। মুজিব বিদ্বেষ তাই শুধু পাকিস্তান ভাঙার জন্য! ট্রেজিডি এই যে আবার তাকেই অভিযুক্ত করা হয় তিনি স্বাধীনতা চাননি!
©সুষুপ্ত পাঠক