13/05/2026
শিক্ষক থেকে জননেতা: আধুনিক মান্দার রূপকার সামসুল আলম প্রামাণিকের বর্ণাঢ্য পথচলা
বিশেষ প্রতিবেদন, মান্দা নিউজ পয়েন্ট:
রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, রাজনীতি মানে একটি জনপদের ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প। নওগাঁর মান্দা উপজেলার ইতিহাসে সেই গল্পের মহানায়ক হিসেবে যার নাম বারবার উচ্চারিত হয়, তিনি সামসুল আলম প্রামাণিক। ক্ষমতার সংখ্যাতত্ত্বে নয়, বরং দৃশ্যমান উন্নয়নের নিরিখে তিনি আজও মান্দাবাসীর হৃদয়ে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম।
শৈশব ও কৈশোর: হীরা নদীর তীরের সেই দুরন্ত কিশোর
সামসুল আলম প্রামাণিকের ব্যক্তিত্বের সেই দৃঢ়তা আর মাটির প্রতি মমত্ববোধের শিকড় প্রোথিত ছিল তার শৈশবে। মান্দার বুক চিরে বয়ে চলা আত্রাইয়ের শাখা হীরা নদীর পাড়েই কেটেছে তার দুরন্ত ও দুর্দমনীয় কৈশোর। নদীর উত্তাল ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সাঁতার কাটা, বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে বন্ধুদের সাথে ছুটে চলা আর বর্ষায় হীরা নদীর গর্জন শুনে বেড়ে ওঠা এই কিশোরই পরবর্তীতে মান্দার রাজনীতির হাল ধরেছিলেন।
হীরা নদীর সেই উদ্দাম স্রোত যেন তার চরিত্রে মিশিয়ে দিয়েছিল এক হার না মানা জেদ। কৈশোরের সেই দুরন্তপনা তাকে কেবল সাহসীই করেনি, বরং মান্দার প্রতিটি ধূলিকণা আর মানুষের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে শিখিয়েছিল। নদীর তীরের সেই দূরন্ত ছেলেটি যখন উচ্চশিক্ষার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তখনও তার হৃদয়ে হীরা নদীর সেই সজল স্মৃতি আর গ্রামীণ মানুষের জন্য কিছু করার বাসনা ছিল অম্লান। সম্ভবত নদীর ভাঙাগড়ার সেই আজন্ম শিক্ষা থেকেই তিনি পরবর্তীতে গড়ে তুলেছিলেন আধুনিক মান্দার শক্তিশালী অবকাঠামো।
শিক্ষা ও কর্মজীবন: মেধার সাথে নেতৃত্বের মেলবন্ধন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করার পর সামসুল আলম প্রামাণিক তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন শিক্ষকতার মতো মহান পেশা দিয়ে। শিক্ষক হিসেবে তার সেই সময়কার জনপ্রিয়তা তাকে সাধারণ মানুষের দুঃখ-সুখের খুব কাছে নিয়ে যায়। তবে নব্বই দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তাকে সরাসরি জনপ্রতিনিধিত্বের পথে টেনে আনে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি মান্দা উপজেলা বিএনপিতে যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের মেধা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় দলের কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন।
সংসদীয় ক্যারিয়ার: হ্যাটট্রিক জয়ের ইতিহাস
সামসুল আলম প্রামাণিকের রাজনৈতিক জীবনের স্বর্ণযুগ ছিল ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল।
• ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি): ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন।
• ১৯৯৬ (জুন): আওয়ামী লীগের শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে পরিচিত মান্দায় তিনি ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিককে পরাজিত করে জয় ছিনিয়ে আনেন।
• ২০০১: অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো (ফেব্রুয়ারি ৯৬ সহ) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি মান্দার রাজনীতিতে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রমাণ করেন।
উন্নয়ন ও ইমাজ উদ্দিনের সাথে তুলনা: এক সাহসী জনশ্রুতি
মান্দার রাজনীতিতে একটি বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক সাত সাতবার সংসদ সদস্য এবং পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও, উন্নয়নের প্রশ্নে সামসুল আলম প্রামাণিক তাকে ছাড়িয়ে গেছেন—এটিই এখন স্থানীয় জনশ্রুতি। সাধারণ মানুষের মাঝে একটি কথা আজও প্রচলিত—ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক সংখ্যাতত্ত্বে বড় হলেও, আধুনিক মান্দার রূপকার হিসেবে সামসুল আলম প্রামাণিকই শ্রেষ্ঠ।
১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য থাকাকালীন সামসুল আলম প্রামাণিক মান্দার প্রতিটি ইউনিয়নে পাকা রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্ট এবং ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার যে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, তা আজও উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে এবং মন্ত্রী হয়েও উন্নয়নের যে গতি আনতে পারেননি, সামসুল আলম প্রামাণিক কেবল সংসদ সদস্য হিসেবেই তার চেয়ে বহুগুণ বেশি দৃশ্যমান কাজ করে দেখিয়েছেন। তার আমলেই মান্দা উপজেলা সদরের আধুনিকায়ন এবং গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল।
রাজনীতির এক সজ্জন নক্ষত্র
সামসুল আলম প্রামাণিক কেবল উন্নয়নই করেননি, বরং তিনি ছিলেন একজন নীতিবান ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। মান্দা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও নওগাঁ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি হিসেবে তিনি দলকে সুসংগঠিত করেছিলেন। তার মার্জিত ব্যবহার ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ কথা দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। ক্ষমতার দাপট নয়, বরং কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন।
একটি নক্ষত্রের প্রয়াণ ও উত্তরসূরিদের জন্য শিক্ষা
জীবন প্রদীপ একদিন নিভে যায়, কিন্তু রেখে যায় কর্মের আলো। মান্দার এই কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ ও উন্নয়নের কারিগর ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উনার প্রয়াণে মান্দার রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা আজও অপূরণীয়। সেদিন কেবল বিএনপি নয়, বরং সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছিল জনপ্রিয় এই নেতাকে।
উপসংহার
সামসুল আলম প্রামাণিক আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু মান্দার প্রতিটি পাকা রাস্তার মোড়ে, প্রতিটি কালভার্টের বাঁকে, প্রতিটি উন্নয়নমূলক স্থাপনায় তার নাম লেখা আছে অদৃশ্যভাবে। তার জীবন আমাদের এক অমোঘ শিক্ষা দেয়—মানুষ আসলে ব্যক্তির পেছনে নয়, ছুটে চলে কাজের পেছনে। ক্ষমতা হারিয়ে গেলে ভিড় মিলিয়ে যায়, কিন্তু উন্নয়ন আর ভালোবাসা মানুষকে অমর করে রাখে। হীরা নদীর তীরের সেই দুরন্ত ছেলেটি আজ মান্দার ইতিহাসের এক অক্ষয় নক্ষত্র হয়ে আছেন।
➡️ নিয়মিত সংবাদ পেতে আমাদের ব্যাক আপ পেজে ফলো দিয়ে পাশে থাকুন: Manda News Point ব্যাক আপ গ্রুপ Manda news point fan club