06/06/2025
**ফতোয়া: কোরবানির গোশতের বণ্টন এবং বড় পরিবারের জন্য সম্পূর্ণ গোশত নিজে রাখা ও সংরক্ষণ করার সরয়ী বিধান** (আশাকরি উক্ত ফতুয়াটি আমাদের সব সাথীরাই পড়বেন)
**প্রশ্ন:** মুহতারাম মুফতি সাহেব আমার প্রশ্ন হল: কোরবানির গোশত কি তিন ভাগ করা আবশ্যক, যেখানে এক ভাগ নিজ পরিবার, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন এবং এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের জন্য রাখতে হবে? যদি কেউ পুরো গোশত নিজ পরিবারের জন্য রাখে, বিশেষ করে বড় পরিবারের প্রয়োজনের কারণে, তবে তার কোরবানি কি শুদ্ধ হবে? এছাড়া, সমাজে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী গোশতের এক ভাগ সমাজের মাধ্যমে গরিবদের দেওয়া হয়, কিন্তু দেখা যায় এই গরিব-দুঃখীরা পরবর্তীতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবারও গোশত চায়, যার ফলে নিজ পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত গোশতও থাকে না। এই প্রথা রোধ করে সম্পূর্ণ গোশত নিজ পরিবারের জন্য রাখা বা নিজের পছন্দ অনুযায়ী আত্মীয় ও ও নির্ধারিত নিজ পছন্দনীয় গরিবদের মাঝে বণ্টন করা কি জায়েয?
বিশেষ করে, যাদের পরিবার বড়, তাদের জন্য সম্পূর্ণ গোশত নিজ পরিবারের জন্য রাখা কি সর্বোত্তম, যদিও তিন ভাগে বণ্টন করা উত্তম। এ বিষয়ে কুরআন, হাদীস এবং ফিকহের দলিলসহ বিস্তারিত ফতোয়া প্রদান করলে উপকৃত হব।
**প্রশ্নকারী:** আব্দুর রহমান বাঙ্গালী
---
**ফতোয়া (জবাব):**
কোরবানির গোশতের বণ্টন সংক্রান্ত বিষয়ে শরীয়তের বিধান হলো, গোশত তিন ভাগে ভাগ করে নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং গরিব-দুঃখীদের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব (উত্তম ও পছন্দনীয়), তবে এটি ওয়াজিব কিংবা আবশ্যকীয় এমন কিছু নয়। যাদের পরিবার ছোট বা গোশতের প্রয়োজন কম, তাদের জন্য তিন ভাগে বণ্টন করা উত্তম। কিন্তু যাদের পরিবার বড় পারিবারিক চাহিদা বেশি এবং গোশতের পুরোটাই পরিবারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তাদের জন্য সম্পূর্ণ গোশত নিজ পরিবারের জন্য রাখাই সর্বোত্তম, কারণ শরীয়ত পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনকেও অগ্রাধিকার দেয়। এতে কোরবানি শুদ্ধ ও পূর্ণ হবে, এবং কোনো গুনাহ হবে না।
আর সমাজের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী গোশত বণ্টন না করে নিজের ইচ্ছানুযায়ী আত্মীয় বা গরিবদের মাঝে বণ্টন করা বা সম্পূর্ণ গোশত নিজে রাখাও জায়েয। নিম্নে কুরআন, হাদীস এবং প্রামাণিক ফিকহের কিতাবের দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
# # # **কুরআনের দলিল:**
কুরআনে কোরবানির গোশতের বণ্টন সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে, যা বণ্টনের প্রতি উৎসাহিত করে কিন্তু তিন ভাগে ভাগ করাকে বাধ্যতামূলক করে না।
1. **সূরা হাজ্জ (২২:৩৬):**
**وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ ۖ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ ۖ فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ**
**অনুবাদ:** “আর উটকে আমরা তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে গণ্য করেছি। এতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। অতএব, এগুলোর উপর সারিবদ্ধ অবস্থায় আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। অতঃপর যখন এগুলোর পার্শ্বদেশ মাটিতে পড়ে যায়, তখন তা থেকে তোমরা খাও এবং যারা প্রার্থনা করে না তাদেরকে এবং যারা প্রার্থনা করে তাদেরকে খাওয়াও। এভাবে আমরা এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।”
**ব্যাখ্যা:** এই আয়াতে নিজে খাওয়া এবং গরিব-দুঃখীদের খাওয়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তিন ভাগে ভাগ করা বা নির্দিষ্ট পরিমাণ বণ্টনের কথা বলা হয়নি। “فَكُلُوا مِنْهَا” (তোমরা খাও) এবং “وَأَطْعِمُوا” (খাওয়াও) শব্দ দ্বারা বোঝা যায় যে নিজে খাওয়া এবং অন্যকে দেওয়া উভয়ই জায়েয, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
2. **সূরা কাওসার (১০৮:২):**
**فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ**
**অনুবাদ:** “অতএব, তুমি তোমার রবের জন্য সালাত আদায় কর এবং কোরবানি কর।”
**ব্যাখ্যা:** এই আয়াতে কোরবানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু গোশতের বণ্টন সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই, যা নির্দেশ করে যে গোশতের ব্যবহারে স্বাধীনতা রয়েছে।
3. **সূরা ত্ব-হা (২০:১৩২):**
**وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا ۖ لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا ۖ نَحْنُ نَرْزُقُكَ ۗ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَىٰ**
**অনুবাদ:** “আর তুমি তোমার পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দাও এবং তাতে ধৈর্য ধর। আমরা তোমার কাছে রিযিক চাই না, আমরাই তোমাকে রিযিক দিই। আর সফলতা তাকওয়ার জন্য।”
**ব্যাখ্যা:** এই আয়াতে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। বড় পরিবারের ক্ষেত্রে গোশত নিজে রাখা পরিবারের প্রয়োজন পূরণের অংশ হিসেবে সর্বোত্তম হতে পারে।
# # # **হাদীসের দলিল:**
কোরবানির গোশতের বণ্টন সম্পর্কে হাদীসে নির্দেশনা রয়েছে, যা তিন ভাগে ভাগ করাকে উৎসাহিত করে, কিন্তু বাধ্যতামূলক করে না।
1. **হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত:**
**عن عبد الله بن عباس رضي الله عنهما قال: كان النبي صلى الله عليه وسلم يقسم لحوم الأضاحي ثلاثة أثلاث: ثلث لأهل بيته، وثلث لجيرانه، وثلث للمساكين**
**অনুবাদ:** হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “নবী (সা.) কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করতেন: এক তৃতীয়াংশ তাঁর পরিবারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ তাঁর প্রতিবেশীদের জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ গরিব-দুঃখীদের জন্য।”
**রেফারেন্স:** সুনানে বায়হাকী, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ২৬৫; ফাতহুল বারী, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৭৮।
**ব্যাখ্যা:** এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর তিন ভাগে বণ্টনের আমল উল্লেখ আছে, যা মুস্তাহাব। তবে এটি কোনভাবেই বাধ্যতামূলক প্রমাণিত নয়। এটি নির্দেশ করে যে যাদের পরিবার ছোট বা গোশতের প্রয়োজন কম, তাদের জন্য তিন ভাগে বণ্টন করা উত্তম। কিন্তু বড় পরিবারের জন্য সম্পূর্ণ গোশত নিজে রাখা জায়েয এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে সর্বোত্তমও বটে।
2. **হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত:**
**عن عائشة رضي الله عنها قالت: كنا نأكل من لحوم الأضحية ونتصدق منها وندخر**
**অনুবাদ:** হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, “আমরা কোরবানির গোশত থেকে খেতাম, দান করতাম এবং সংরক্ষণ করতাম।”
**রেফারেন্স:** সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১৯৭১।
**ব্যাখ্যা:** এই হাদীসে গোশত খাওয়া, দান করা এবং ফ্রিজে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ বা ভাগের কথা উল্লেখ নেই। এটি গোশতের ব্যবহারে স্বাধীনতা নির্দেশ করে।
3. **হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত:**
**عن جابر بن عبد الله رضي الله عنهما قال: كنا نأكل من الأضحية في أيام التشريق ونتصدق منها ونخزنها**
**অনুবাদ:** হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, “আমরা তাশরীকের দিনগুলোতে কোরবানির গোশত খেতাম, দান করতাম এবং সংরক্ষণ করতাম।”
**রেফারেন্স:** সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ১৫০৬।
**ব্যাখ্যা:** এই হাদীসটিও গোশতের ব্যবহারে স্বাধীনতার কথা নিশ্চিত করে যেমন খাওয়া ফ্রিজে সংরক্ষণ করা এবং দান করা ইত্যাদি তবে কোনভাবেই তিন ভাগে ভাগ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
4. **হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত:**
**عن علي رضي الله عنه قال: أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن نأكل من الأضحية ونتصدق منها ولا نحبس شيئا منها إلا ما نأكله أو نتصدق به**
**অনুবাদ:** হযরত আলী (রা.) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমরা কোরবানির গোশত থেকে খাব এবং দান করব, এবং এর কিছু সংরক্ষণ করব না, যা আমরা খাই বা দান করি তা ছাড়া।”
**রেফারেন্স:** মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ১৩১৬।
**ব্যাখ্যা:** এই হাদীসে গোশত খাওয়া এবং দান করার কথা বলা হয়েছে, তবে কোনো নির্দিষ্ট ভাগ বা পরিমাণের কথা উল্লেখ নেই।
5. **পরিবারের প্রতি দায়িত্বের গুরুত্ব:**
**عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: كفى بالمرء إثما أن يضيع من يعول**
**অনুবাদ:** হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোনো ব্যক্তির জন্য এটিই যথেষ্ট গুনাহ যে, সে তার পরিবারের (দায়িত্ব পালনে) অবহেলা করে।”
**রেফারেন্স:** সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৯৯৬।
**ব্যাখ্যা:** এই হাদীস থেকে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব বোঝা যায়। বড় পরিবারের ক্ষেত্রে গোশত নিজে রাখা পরিবারের প্রয়োজন পূরণের অংশ হিসেবে সর্বোত্তম হতে পারে।
# # # **ফিকহের কিতাবের দলিল:**
গ্রহণযোগ্য ফিকহের কিতাবগুলোতেও কোরবানির গোশতের বণ্টন সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব, তবে পুরো গোশত নিজে রাখা বা নিজের ইচ্ছানুযায়ী বণ্টন করারও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ জায়েয।
1. **আল-হিদায়া (ইমাম মারগিনানী):**
**وفي الأضحية يستحب أن يأكل الثلث ويتصدق بالثلث ويهدي الثلث، وإن أكل الجميع جاز ولا إثم عليه**
**অনুবাদ:** “কোরবানির গোশতের ক্ষেত্রে মুস্তাহাব হলো এক তৃতীয়াংশ খাওয়া, এক তৃতীয়াংশ দান করা এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজনদের দেওয়া। তবে যদি কেউ সম্পূর্ণ গোশত নিজে খায়, তবে তা জায়েয এবং এতে তার কোনো গুনাহ হবে না, এবং কোরবানি হয়ে যাবে।”
**রেফারেন্স:** আল-হিদায়া, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪২৩।
2. **ফাতাওয়া আলমগীরী:**
**يجوز للمضحي أن يأكل جميع الأضحية أو يتصدق بها أو يهديها، والأفضل أن يأكل ثلثها ويتصدق بثلثها ويهدي ثلثها**
**অনুবাদ:** “কোরবানিকারী ব্যক্তি সম্পূর্ণ গোশত নিজে খেতে পারে, দানও করতে পারে বা অন্যকে উপহারও দিতে পারে। তবে সর্বোত্তম হলো এক তৃতীয়াংশ খাওয়া, এক তৃতীয়াংশ দান করা এবং এক তৃতীয়াংশ উপহার দেওয়া। যেহেতু কোরবানিটা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই করা হয়েছে।”
**রেফারেন্স:** ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৯৩।
3. **দুররুল মুখতার (ইমাম হাসকাফী):**
**يجوز أكل جميع الأضحية ولا يجب التصدق بشيء منها، لكن التصدق أفضل**
**অনুবাদ:** “সম্পূর্ণ কোরবানির গোশত খাওয়া জায়েয, এবং এর কিছু দান করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে দান করা উত্তম।”
**রেফারেন্স:** দুররুল মুখতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩২০।
4. **আল-মাবসূত (ইমাম সারাখসী):**
**لا يجب على المضحي أن يتصدق من الأضحية، وإنما يستحب أن يأكل ويطعم ويتصدق، فإن أكل الجميع فلا حرج عليه**
**অনুবাদ:** “কোরবানিকারীর উপর গোশতের কিছু দান করা বাধ্যতামূলক নয়। বরং মুস্তাহাব হলো খাওয়া, খাওয়ানো এবং দান করা। যদি সে সম্পূর্ণ গোশত খায়, তবে তার উপর কোনো দোষ নেই, বরং তার কোরবানি সুন্দরভাবেই হয়ে যাবে।”
**রেফারেন্স:** আল-مাবসূত, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ১৪।
5. **বাদায়িউস সানায়ি (ইমাম কাসানী):**
**إن أكل المضحي جميع الأضحية جاز، لأن الأكل منها جائز والتصدق مستحب، فلو لم يتصدق لم يأثم**
**অনুবাদ:** “যদি কোরবানিকারী সম্পূর্ণ গোশত খায়, তবে তা অনুমোদিত। কারণ গোশত খাওয়া জায়েয এবং দান করা মুস্তাহাব। সুতরাং, যদি সে দান না করে, তবে কোনভাবেই গুনাহগার হবে না।”
**রেফারেন্স:** বাদায়িউস সানায়ি, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২২৬।
6. **ফাতাওয়া হিন্দিয়া:**
**يجوز للمضحي أن يأكل جميع لحم الأضحية، ويستحب أن يطعم منه الفقراء والمساكين، وإن لم يطعم جاز ولا إثم عليه**
**অনুবাদ:** “কোরবানিকারী সম্পূর্ণ গোশতই নিজে খেতে পারে। গরিব ও দুঃখীদের খাওয়ানোও মুস্তাহাব। তবে যদি সে না খাওয়ায়, তবে তা জায়েয এবং এতে তার কোনো গুনাহ হবে না।”
**রেফারেন্স:** ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৯৪।
7. **রদ্দুল মুহতার (ইমাম ইবনে আবিদীন):**
**يجوز للمضحي أن يأكل جميع الأضحية، ويستحب أن يتصدق منها، فإن لم يتصدق فلا إثم عليه، لأن الأصل في الأضحية الإباحة في الأكل والتصرف**
**অনুবাদ:** “কোরবানিকারী সম্পূর্ণ গোশত খেতে পারে। এর কিছু দান করা মুস্তাহাব। তবে যদি সে দান না করে, তবে তার কোনো গুনাহ হবে না, কারণ কোরবানির গোশতের মূল বিধান হলো কোরবানির গোশত খাওয়া ও এই গোশতের ব্যবহারে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।”
**রেফারেন্স:** রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৪৫৮।
# # # **প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সমাধান:**
1. **তিন ভাগে বণ্টন করা বাধ্যতামূলক নয়:** উপরের কুরআন, হাদীস এবং ফিকহের কিতাবের দলিল থেকে স্পষ্ট যে কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব, তবে বাধ্যতামূলক নয়। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর তিন ভাগে বণ্টনের আমল উল্লেখ আছে, যা যাদের পরিবার ছোট বা গোশতের প্রয়োজন কম, তাদের জন্য এটি উত্তম। তবে ফিকহের কিতাবগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে সম্পূর্ণ গোশত নিজে খাওয়া জায়েয এবং এতে কোনো গুনাহ হবে না। কোরবানির নেকিতেও কোন কমতি হবে না।
2. **বড় পরিবারের জন্য সম্পূর্ণ গোশত রাখা সর্বোত্তম:** যদি কোনো ব্যক্তির পরিবার বড় হয় এবং কোরবানির গোশতের পুরোটাই তার পরিবারের প্রয়োজন হয়, তবে সম্পূর্ণ গোশত নিজ পরিবারের জন্য রাখা শুধু জায়েয নয়, বরং পরিবারের দায়িত্ব পালনের কারণে এটি সর্বোত্তম। শরীয়ত পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনকে অগ্রাধিকার দেয়। হাদীসে বলা হয়েছে:
**عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: كفى بالمرء إثما أن يضيع من يعول**
**অনুবাদ:** “কোনো ব্যক্তির জন্য এটিই যথেষ্ট গুনাহ যে, সে তার পরিবারের (দায়িত্ব পালনে) অবহেলা করে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৯৯৬)
এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে বড় পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করা অগ্রাধিকার পায়। সুতরাং, এমন পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ গোশত নিজ পরিবারের জন্য রাখা সংরক্ষণ করা সর্বোত্তম।
3. **ছোট পরিবারের জন্য তিন ভাগে বণ্টন উত্তম:** `যাদের পরিবার ছোট এবং গোশতের প্রয়োজন কম, তাদের জন্য তিন ভাগে বণ্টন করা উত্তম, কারণ এতে সদকার সওয়াব পাওয়া যায় এবং সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়।` রাসূলুল্লাহ (সা.) এর তিন ভাগে বণ্টনের আমল এই দিকটি নির্দেশ করে।
4. **সমাজের প্রথা রোধ করা:** সমাজে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী গোশতের এক ভাগ সমাজের মাধ্যমে গরিবদের দেওয়া হয়, এবং পরবর্তীতে গরিব-দুঃখীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবারও গোশত চাওয়ায় নিজ পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত গোশত থাকে না বহু পরিবারের ক্ষেত্রে এবং আংশিক লজ্জিত হতে হয়। এই প্রথা রোধ করে নিজের ইচ্ছানুযায়ী গোশত বণ্টন করা বা সম্পূর্ণ গোশত নিজ পরিবারের জন্য রাখা জায়েয। শরীয়ত কাউকে বাধ্য করে না যে তাকে অবশ্যই সমাজের মাধ্যমে গোশত বণ্টন করতে হবে। ফিকহের কিতাবগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে গোশতের ব্যবহারে কোরবানিকারীর পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।
# # # **উক্ত ফতুয়ার সারসংপূর্ণ কথা হলো:**
কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব, তবে বাধ্যতামূলক নয়। যাদের পরিবার ছোট এবং গোশতের প্রয়োজন কম তবে কোরবানির পূর্ণ সক্ষমতা ছিল বিধায় কোরবানি দিয়েছে, তাদের জন্য তিন ভাগে বণ্টন করা (নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং গরিব-দুঃখীদের জন্য) উত্তম। `কিন্তু যাদের পরিবার বড় এবং গোশতের পুরোটাই প্রয়োজন, তাদের জন্য সম্পূর্ণ গোশত নিজ পরিবারের জন্য রাখা সর্বোত্তম, কারণ এটি পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনের অংশ।` এতে কোরবানি শুদ্ধ ও পূর্ণ হবে।
সমাজের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী গোশত বণ্টন না করে নিজের ইচ্ছানুযায়ী আত্মীয় বা গরিবদের মাঝে বণ্টন করা বা সম্পূর্ণ গোশত নিজে রাখাও জায়েয। এ বিষয়ে কুরআনের সূরা হাজ্জ (২২:৩৬), সূরা কাওসার (১০৮:২), সূরা ত্ব-হা (২০:১৩২), হযরত ইবনে আব্বাস (রা.), আয়েশা (রা.), জাবির (রা.), আলী (রা.) ও আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস এবং ফিকহের কিতাব যেমন আল-হিদায়া, ফাতাওয়া আলমগীরী, দুররুল মুখতার, আল-মাবসূত, বাদায়িউস সানায়ি, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ও রদ্দুল মুহতারে স্পষ্ট দলিল রয়েছে।
**দুইটি পরামর্শ:** বড় পরিবারের জন্য সম্পূর্ণ গোশত রাখা সর্বোত্তম হলেও, সম্ভব হলে অল্প পরিমাণ গোশত গরিব-দুঃখীদের মাঝে দান করা উত্তম, কারণ এতে সদকার সওয়াব পাওয়া যায়। তবে এটি ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।
_তবে আরেকটা পরামর্শ হলো: কারো সমাজে বিষয়টি যদি বাধ্যবাধকতা থাকে সমাজে একটি অংশ দিতেই হবে তাদের জন্য করণীয় হলো, ঈদের দিন কোরবানি না দিয়ে ঈদের পরের দিন কোরবানি দেওয়া।_
**আল্লাহই সর্বজ্ঞ।**
**ফতোয়া প্রদানকারী:** বান্দা আহকারুল ওয়ারা
**তারিখ:** ৫ জুন ২০২৫।