12/12/2025
আমাদের বিল্ডিংয়ে চার তলায় ফোর এ তে একটা ছেলে থাকে। চুপচাপ আর ভীষণ হ্যান্ডসাম। হাসে না।
কেমন করে দেখা হলো বলি! আমরা তো পাঁচতলায় থাকি, একদিন লিফটে কী যেন ঝামেলা হলো। ইউনিভার্সিটি যাব বলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হলো। নামছি যখন তখনি পাশ ঘেঁষে নামলো ছেলেটা। কালো শার্ট, কাঁধে ব্যাগ, খুব পরিপাটি। মিষ্টি একটা পারফিউম ছিল গায়ে। মনটা জাস্ট বয়েই গেল আমার।
আমি পিছু পিছু নামলাম। নিচে গিয়ে দেখলাম নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে বেরিয়ে গেল। কী ড্যাশিং লাগছিল দেখতে! একেবারে নায়ক। মনে দাগ কেটে গেল আমার।
লিফটের ঝামেলা চলল সপ্তাহখানেক। এর মধ্যে তিনদিন দেখা হলো। প্রতিদিনই আমার পেছনে সিঁড়ি বেয়ে নামে। তারপর ধুপধাপ করে আমাকে পাশ কাটিয়ে পেছনে ফেলে নেমে যায়। একদিন তো দেখলাম পিংক শার্ট পরনে। কী যে সুন্দর লাগছিল দেখতে! কে বলে পিংক শুধু মেয়েদের মানায়?
ওকে তো সবার থেকে বেশি মানায়। ইশ! ‘ও’ বলে ফেললাম।
আমি দারোয়ান চাচার কাছে খোঁজ নিলাম। সুদর্শনের নাম নীলিম রহমান। মা-বাবার সঙ্গে থাকেন। ছোট বোন আছে একজন। সাফা নাম।
লিফট ঠিক হলো। আমি লিফটে ঠিক সেই সময় ধরে নামতে থাকলাম৷ ওমা লিফটে নেই তিনি৷ ঘটনা কি?
একটু অনুসন্ধান করতে তথ্য বেরোলো লিফট চড়েন না তিনি। ক্লাস্ট্রোফোবিক তিনি৷ বাহ! আমিও কি কম যাই? আমিও এখন থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামবো তাহলে। সকাল নয়টা থেকে নয়টা পাঁচ। আমি নামি। তিনিও নামেন। একবার যদি নেমে দেখি তিনি নামেননি। আমি আবার উঠি। তারপর আবার। কখনো হাই হ্যালো হয়নি৷ তাকানই-না আমার দিকে। তাতে অবশ্য আমারই সুবিধা। আমি ইচ্ছেমত তাকাতে পারি৷ এত সুন্দর মানুষ হয়!
একেবারে স্বচ্ছ কাচে রোদের আলো পড়া রংধনুর মত সুন্দর!
সানগ্লাস পরনে দেখলাম একদিন, মনে হলো, শুধু শুধু শাহরুখ শাহরুখ করে গলা শুকায় সবাই। তাকে দেখলে নিশ্চয়ই করত না। দেখেই বুঝা যায়, খুব যত্ন করে নিজের। আপাদমস্তক সৌন্দর্যসচেতন।
আমি আবার এরকম না। একটু অগোছালো। না না একটু বেশিই অগোছালো! জামা প্যান্ট ওড়না কিচ্ছু মিলিয়ে পরি না। চুল মাঝে মাঝে বাঁধি।
তো কি হয়েছে? আমি শুনেছি পরিপাটি আর সুন্দর ছেলেদের একটু অগোছালো আর অল্প সুন্দরী বউ হয়। হ্যাঁ তো। আমার ছোটফুপির তো হলো। ছোটফুপি কখনোই সাজেন না। উনার বর তো একেবারে সালমান শাহের মত ফ্যাশন সচেতন। আমারও এমন হবে তাহলে..হবেই।
একদিন হলো কি আমি ফিরছি। লিফটে উঠলাম না। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছি। দেখি, তিনি নামছেন। পাশে ভীষণ… ভীষণ… সুন্দরী একটা মেয়ে। নীল জামদানী পরনে খোলা চুলের অপ্সরা। গল্প থেকে উঠে আসা মেইন লিড।
দু'জনে হেসে হেসে কথা বলতে বলতে নামছেন। ঠিক সেইদিন, প্রথমবার চোখাচোখি হলো আমাদের। এক পলকের জন্য। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়েছিলাম। আর তিনি উদাসীনভাবে। পথ চলতে এমনি চোখ পড়লে যা হয়।
মাথায় রক্ত চড়ে গেল আমার৷
এমন তো কথা ছিল না। সুন্দর ছেলের এত সুন্দরী বউ হবার তো কথা না! আমার হবার কথা।
আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, মেয়েটি কলিগ! মেয়েটির হয়ত বিয়ে হয়ে গেছে। খোঁজ নিই কি করে?
পরদিন সকালে সিঁড়ি দিয়ে নামছি। বেরিয়েই দেখা হয়ে গেল তার সাথে।
আমি ডেকেই ফেললাম,
—নীল শাড়ি পরনে যে একজন ছিল পাশে! কি হয় আপনার?
নীলিম সাহেব চমকে তাকালেন।
—জি? আমাকে বলছেন?
—কে হয়? গার্লফ্রেন্ড?
—কলিগ!
—কলিগ বাসায় নিয়ে এসেছেন কেন?
—জি?
আমি তেড়ে গেলাম। একটা অদৃশ্য ঝড় ভর করলো আমার ভেতর। দু-হাতে প্রচন্ড জোরে, বলতে গেলে সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিলাম তাকে। আচমকা ধাক্কা সামলাতে পারলেন না। তিনটা সিঁড়ি উল্টে গিয়ে পড়ে গেলেন নিচে। রেলিংয়ে লেগে ঠোঁট কেটে গেল তার। রক্ত চেপে ধরে তিনি হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন। বলতেই হবে শক্তি আছে আমার।
—আর কখনো কোনো কলিগ যদি বাসায় আসে জানে মে*রে ফেলবো আমি।
হুংকার দিয়ে নীলিমকে দাঁড় করিয়ে আমি নেমে চলে এলাম৷ সেদিন সন্ধ্যা নাগাদ বেল বাজলো আমাদের দরজার। চার তলা থেকে একজন ভদ্রলোক এসেছেন, হাতে মিষ্টি আর ফুল। বললেন,
—শ্রুতি বাসায় আছে?
মা ডেকে পাঠালেন। গেলাম। তিনি ফুল আর মিষ্টি আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। সাথে একটা কার্ড।
—আমি নীলিমের বন্ধু। ও আপনাকে দিতে বলল। আমি অপেক্ষা করব। নীলিম আমাকে আপনার জবাব শুনে যেতে বলেছে।
—আসুন ভেতরে আসুন।
আমি আপ্লুত হয়ে পড়লাম। বাহ! এক ধাক্কায় প্রেমে পড়ে গেছে আমার। পড়তেই হবে। দেখতে হবে না মেয়েটা কে! ব্রিলিয়ান্ট আর তেজস্বী মেয়ে আমি। আমার একটা তেজ আছে না? হুহ।
ঘরে এসে আপ্লুত হয়ে কার্ড খুললাম।
বড় বড় অক্ষরে লিখা,
“একবার আমাকে দেখতে আসবেন! কত ব্যথা পেয়েছি দেখে যান!”
আমি ড্রয়িংরুমে ছুটে গেলাম৷ বললাম,
—আপনি একটু দাঁড়ান। আমি এক্ষুনি আসছি।
আমি চেঞ্জ করলাম। আমার সবথেকে প্রিয় জামাটা পরলাম। শাড়িই পরতাম। কিন্তু আমার তো একটা শাড়িও নেই। থাকবে কি করে? কোনোদিন তো শাড়ি পরার দরকার হয়নি। প্রেম হয়নি। প্রেমিকের সাথে দেখা করারও ব্যাপার ছিল না। শাড়ি কেনা হয়নি৷ তবে এরপর কিনে ফেলবো। তৈরি হয়ে আমি তার সঙ্গে গেলাম৷ নীলিমদের বাসায়। নীলিমের মা দরজা খুলে দিলেন। নীলিম সোফায় শুয়ে টিভি দেখছে। কাঁটা ঠোঁট আর থেতলানো নাক কালসিটে হয়ে আছে। তবে ব্যান্ডেজ ফ্যান্ডেজ নেই।
আমি যেতেই নীলিমের মা আমায় খুব ওয়ার্মলি ওয়েলকাম করলেন। আমি তো পারলে তখনি কদমবুসি করে ফেলি। নীলিমের বন্ধুটি বলল,
—ভেতরে আসুন। নীলিমের ঘর এটা।
আমি ওর ঘরে গেলাম। ইশ, সারা গায়ে তখন যে আমার কী একটা অনুভূতি চলছে। বলে বুঝানো যাবে না। ওর ঘরটাও ভীষণ সুন্দর ওর মত। ভাবতেই পারছিলাম না। একদিন এই ঘরে আমি এসে থাকব।
নীলিম চেয়ার টেনে বলল আমায়, বসুন।
—আমি বসলাম। গদগদ হয়ে বললাম, আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন!
—কেন?
আমি খুব লজ্জা পেলাম। বোকা নাকি?
বুঝে না কিছু! “তুমি” ডার্লিং ছাড়া কাকে বলে আর?
—কেন আমাকে ধাক্কা মেরেছিলেন?
ওর গলার স্বরে কিছু একটা ছিল স্ফুলিঙ্গের মত। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম।
মুহূর্তেই একটা ব্যাপার ঘটে গেল। নীলিম ওর ব্যাডসাইড টেবিলের ড্রয়ার খুললো। তারপর একটা পিস্তল বের করল। রিভলবার! একেবারে সোজা আমার কপালে ঠেকিয়ে দিল। আমি চোখ বন্ধ করে চিৎকার দিয়ে ফেললাম। নীলিম আমার মুখ চেপে ধরলো।
—আমার সাথে এই অস্বাভাবিক ব্যবহারটুকুর কারণ কি? এক্ষুনি কান ধরে স্যরি বলবেন। যাস্ট নাউ।
আমি দরদর করে ঘামতে লাগলাম। এ কাকে মন দিয়ে বসে আছি আমি? এ তো ডাকাত পুরো। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে কান ধরলাম। নীলিম মুখ থেকে হাত সরালো আমার। আমি স্যরি বললাম।
নীলিম রিভলবারটা আরেকটু দাবিয়ে বলল,
—আর কখনো এমন করলে মেরেই ফেলবো।
আমি চোখ মুছে বললাম,
—আর করবো না। কোনোদিন না। ভুল হয়ে গেছে; স্যরি।
—আচ্ছা, কারণটা কি?
আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম,
—আপনার কলিগকে দেখে খুব রাগ হয়েছিল আমার!
—কেন? কেন রাগ হয়েছিল?
—তিনি খুব সুন্দরী বলে। নীলিম রিভলবার নামিয়ে নিল।
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম,
—আপনার সঙ্গে কাউকে আমি সহ্য করতে পারি না। কোনোদিন পারবোও না। আবার কেউ আসলে আবার ধাক্কা দেব। ছাদ থেকে ফেলে দেব।
আমি দরজা খুলে একছুটে বেরিয়ে এলাম। একটুর জন্য পড়তে পড়তে গিয়ে সোফার কার্নিশে ধরলাম৷ থরথর করে কাঁপছিলাম তখন। গান পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কথা বলে এসেছি? আমিও তো কম না।
বাসায় এলাম কাঁদতে কাঁদতে! মা বললেন,
—কি হয়েছে রে শ্রুতি?
আমি ফিসফিস করে বললাম,
—ভালোবাসা খুন হয়েছে মা। এই তো যুদ্ধ শুরু হলো আমার…
পরবর্তী অংশ পেতে Glow Mart পেজে লাইক দেন।
#ভালোবাসা_খু_ন_হয়েছে
#তৃধা_আনিকা