Ayesha Siddika Asha-আয়েশা সিদ্দিকা আশা

Ayesha Siddika Asha-আয়েশা সিদ্দিকা আশা লেখকেরও ক্ষত হয়, অনুভব করেই প্রতিটি লাইন লেখা হয় ❤️‍🩹🤍
(1)

“১০০ বছর আগের সেই চিঠি আজও পুরো সত্যটা বলেনি…”কে লিখেছিল সেটি? #গল্প_তৃতীয়_দরজা
31/05/2026

“১০০ বছর আগের সেই চিঠি
আজও পুরো সত্যটা বলেনি…”

কে লিখেছিল সেটি?
#গল্প_তৃতীয়_দরজা

“তৃতীয় দরজাটা এখনো বন্ধ…কিন্তু ভেতর থেকে আজও শব্দ আসে…” #গল্প_তৃতীয়_দরজা
31/05/2026

“তৃতীয় দরজাটা এখনো বন্ধ…
কিন্তু ভেতর থেকে আজও শব্দ আসে…”

#গল্প_তৃতীয়_দরজা

“দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা ‘আমি খুন করিনি… আমি নির্দোষ।’” তাহলে খুনি কে? #গল্প_তৃতীয়_দরজা
31/05/2026

“দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা
‘আমি খুন করিনি… আমি নির্দোষ।’”

তাহলে খুনি কে?
#গল্প_তৃতীয়_দরজা

 #গল্প_তৃতীয়_দরজা  #লেখনীতে_আয়েশা_সিদ্দীকা_আশা পর্ব:৩৮মেজবা আয়নার সামনে বসে আছে। সন্ধ্যার আলোটা জানালা দিয়ে ঢুকে তার ম...
31/05/2026

#গল্প_তৃতীয়_দরজা
#লেখনীতে_আয়েশা_সিদ্দীকা_আশা
পর্ব:৩৮
মেজবা আয়নার সামনে বসে আছে। সন্ধ্যার আলোটা জানালা দিয়ে ঢুকে তার মুখে এক অদ্ভুত কোমল ছায়া ফেলেছে। সে ধীরে ধীরে কাজল তুলছে। তার হাতটা কাঁপছে সামান্য, তবুও নিজের চোখ দুটোকে আরও গভীর, আরও রহস্যময় করে তুলতে ব্যস্ত। কাজলের চিকন রেখা টানতে টানতে হঠাৎই দরজার পাশে হালকা শব্দ হলো।
-আপা...
নরম গলায় ডাকল জামিলা বাইজি। মেজবা আয়নার দিকে তাকিয়েই বলল,
-কি ?
জামিলা একটু থেমে, কেমন যেন দ্বিধায় পড়ে বলল,
-আপা... ছোট জমিদার আইছে। আপনার লগে দেখা করবার চায়।
কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল মেজবার কানে। মেজবার হাত কেঁপে উঠল। কাজলের রেখা হঠাৎ বেঁকে গেল চোখের কোণে। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই চোখে এখন ভয়, অবাক হওয়া আর চাপা অস্থিরতা।

-কি বললি?
তার গলা কেঁপে উঠল।

জামিলা এবার একটু জোরে বলল,
-ছোট জমিদার নিজে আইছে আপা। বাইরেই দাঁড়ায় আছে।

মেজবার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। যেন বহুদিন চাপা পড়ে থাকা কোনো অতীত হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ছে। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে রাখা চিরুনি পড়ে গিয়ে মেঝেতে শব্দ করল।
-না… এটা হতে পারে না
নিজের মনেই ফিসফিস করল সে। তার চোখে ভেসে উঠল কিছু পুরনো স্মৃতি… কিছু অসমাপ্ত কথা… কিছু অজানা ভয়।
জামিলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে এই দেখা হওয়াটা শুধু একটা সাধারণ দেখা না… এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক না বলা গল্প।
মেজবা ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়াল… কিন্তু ঠিক দরজার সামনে এসে থেমে গেল।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
বাইরে… ছোট জমিদার অপেক্ষা করছে।
আর ভেতরে… মেজবা প্রস্তুত হচ্ছে তার মুখোমুখি হতে…

ছোট জমিদার যে কিনা মেজবার দিকে কোনোদিন চোখ তুলে তাকায়নি। যেন মেজবা তার চোখে অস্তিত্বহীন। রাস্তার ধুলো যেমন পায়ের নিচে পড়ে থাকে, ঠিক তেমনই উপেক্ষা, তেমনই অবহেলা। মেজবা বহু বার জমিদার বাড়ি গিয়েছে। মেজবার সাথে আরও অনেক সুন্দরী সুন্দরী বাইজিরা নাচঘর মাতিয়ে এসেছে‌ কিন্তু অরিত্র কখনও তাদের দিকে ভুল করেও দৃষ্টি রাখেনি। বাইজিদের প্রতি তার ঘৃণা ছিল প্রকাশ্য, নির্মম। যেন ওদের চোখে তাকানোও পাপ।
তাহলে আজ?
আজ সে নিজে এসেছে… এই রোশনি কুঞ্জে…
আর সোজা মেজবার খোঁজ করছে!
কেন?
মেজবার বুকের ভেতরটা ধকধক করে কাঁপছে। এটা কি অপমানের নতুন কোনো খেলা? নাকি… অন্য কিছু?
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটা আজ কেমন? আগের মতোই কঠোর, নাকি তার চোখে আজ অন্য কোনো ছায়া?
জামিলা ধীরে বলল,
-আপা…ওনার চোখমুখ কেমন জানি অস্থির লাগতেছে।”
মেজবা থমকে গেল।
অস্থির?
ছোট জমিদার… আর অস্থির?
তার মনে সন্দেহ আরও ঘন হয়ে উঠল। যে মানুষটা বাইজিদের ছায়া সহ্য করতে পারত না, সে আজ নিজে এসে দাঁড়িয়েছে এই দরজার সামনে। নিশ্চয়ই কোনো বড় কারণ আছে।
হয়তো কোনো ঝড় আসছে… মেজবা দরজার কপাটে হাত রাখল। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, গলা ভারী হয়ে উঠেছে।
মেজবা আর দেরি করল না। ধীরে ধীরে দরজার কপাট খুলে দিল। পুরনো কাঠের দরজাটা কিঞ্চিৎ শব্দ করে সরে গেল পাশে। বাইরে করিডোরটা নিস্তব্ধ শুধু দূরে কারও পায়ের মৃদু শব্দ, আর নিচ থেকে ভেসে আসছে আতরের গন্ধ। সে একবার গভীর নিঃশ্বাস নিল, তারপর পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে। ঘূর্ণায়মান সরু সিঁড়ি বেয়ে সে নিচে নামতে লাগল‌। নিচে নামার জন্য সে শাড়ি সামান্য উপড়ে উঠালো। নূপুরের আড়ালে দেখা গেল অনাকাঙ্ক্ষিত এক কাটা দাগ। মেজবার ডান পায়ের চওড়া অংশে একটা কাটা দাগ জ্বলজ্বল করছে। মেয়েদের নূপুরের জোড়া টা যেই জায়গায় স্থায়ী হয় ঠিক সেখানটায়।
প্রতিটা ধাপ যেন আজ ভারী হয়ে উঠেছে। হাঁটার ছন্দে তার পায়ের নূপুর হালকা শব্দ তুলছে ঝন... ঝন.. শব্দটা অদ্ভুতভাবে পুরো বাড়িটা জুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। নামতে নামতে তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে।
কেন এসেছে সে?
কি বলবে?
আর… সে কি আগের মতোই নিষ্ঠুর?
বাড়িটা অদ্ভুত আকৃতির। রোশনী বাঈ খুব বুদ্ধি করে বিড়িটার গড়ন এমন করেছে। মানতেই হবে তার কুটবুদ্ধি প্রখর। বাইরে থেকে কেউ কুনো ক্ষরে টের পাবেনা এটা সাক্ষৎ একটা নরক। এমনি ভেতরে ঢুকলেও সে ঘোলক ধাধায় ফেসে যাবে। সিঁড়ি থেকে নামার পর আবার একটা করিডোর সামনে পড়ল। পরিচিত রাস্তা ধরে কয়েকটা ঘর পেরিয়ে মেজবা তার কাঙ্খিত জায়গায় চলে আসলো। ছোট বৈঠকখানাটা দেখা যাচ্ছে এখন। আলোটা একটু ম্লান, তবুও স্পষ্ট বোঝা যায় একজন মানুষ চুপচাপ বসে আছে। মেজবা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। অরিত্রর পিঠ দেখি যাচ্ছে। সে সোজা হয়ে বসে আছে, কিন্তু কাঁধ দুটো অদ্ভুতভাবে ভারী লাগছে… যেন কোনো অদৃশ্য বোঝা চেপে আছে তার উপর।
মেজবা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
এই মানুষটাই… যে কোনোদিন তার দিকে তাকায়নি…‌আজ সেই মানুষটাই তার জন্য অপেক্ষা করছে! অপেক্ষা জিনিসটা বরই অদ্ভুত। নিজে অন্যজনের করলে বিরক্ত লাগে আর কেউ নিজের জন্য অপেক্ষা করলে অদ্ভুত এক শান্তি লাগে।
অরিত্র নড়ছে না, কথা বলছে না শুধু বসে আছে স্থির হয়ে। ঠিক যেনো কাঠের পুতুল।
মেজবার মনে মনে ভাবল, সে কি বুঝতে পারছে না, আমি চলে এসেছি?
নাকি… সে ইচ্ছে করেই পিছনে তাকাচ্ছে না?
এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর অস্বস্তি একসাথে জমাট বাঁধল চারপাশে।

অরিত্র বৈঠকখানার মাঝখানে বসে আছে পায়ের উপর পা তুলে, একেবারে নিশ্চুপ। সাদা পাঞ্জাবিটা পরিপাটি, তবুও যেন কোথাও এক অদৃশ্য অগোছালো ভাব লুকিয়ে আছে। মুখে চাপ দাড়ি, চোয়ালটা শক্ত … আর চোখের মণি ধূসর। ঠান্ডা আর অচেনা।
তার পুরো দেহভঙ্গি যেন বলছে‌, সে এখানে আছে, কিন্তু তার মন কোথাও অনেক দূরে।
অরিত্রর সামনে ছোট টেবিলে একটা কাপ চা রাখা। ধোঁয়া ওঠা থেমে গেছে অনেক আগেই।
সে ছুঁয়েও দেখেনি।
মেজবা এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
তার নূপুরের শব্দ থেমে গেল। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে উঠল একেবারে।
তবুও…
অরিত্র মাথা তুলল না। একবারের জন্যও না।
সে যেন জানেই না তার সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে। নাকি… জেনেও দেখছে না? মেজবার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। এটা কি সেই পুরনো অবহেলা?
নাকি… আরও গভীর কিছু?‌কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল।‌সময় যেন থেমে আছে।
শেষ পর্যন্ত মেজবা নিজেই কাঁপা গলায় বলল,
-আমারে ডাকছেন?”

অরিত্র সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
-হুম।
একটা ছোট, ঠান্ডা উত্তর। তাতে না ছিল আবেগ, না কোনো কোমলতা।

মেজবা আবার বলল,
-কোনো বিশেষ প্রয়োজন?

অরিত্র এবার ধীরে ধীরে কথা বলল, গলাটা গভীর কিন্তু শুষ্ক,
-পরশু… তোমাদের জমিদার বাড়ি যেতে হবে।

মেজবা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, কিন্তু সে এখনো কিছু বুঝতে পারছে না।

অরিত্র থামল না,
-জমিদার বাড়ির বিয়েবাড়ি… রমরমা করে রাখতে হবে।

কথাগুলো যেন আদেশের মতো শোনাল। কোনো অনুরোধ নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই।
মেজবার বুকের ভেতরটা কেমন হালকা ধাক্কা খেল।
-আমাদের…?
সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
-মানে… বাইজিরা যাবে?

অরিত্র এবার একটু নড়ল। কিন্তু তবুও মাথা তুলল না।
-হ্যাঁ,
সে বলল,
-নাচ, গান… সব। যেন কোনো ত্রুটি না থাকে।

মেজবা চুপ করে রইল।‌তার চোখে এবার কষ্টের ছায়া স্পষ্ট। এটাই কি তবে কারণ? এই জন্যই সে এসেছে? যে মানুষটা বাইজিদের ঘৃণা করত… আজ সেই মানুষটাই তাদের দিয়ে নিজের বাড়ির আনন্দ সাজাতে চায়?
একটা তিক্ত হাসি মেজবার ঠোঁটে ফুটে উঠল, কিন্তু সে সেটা লুকিয়ে ফেলল।
-আর কিছু

অরিত্র শান্ত কণ্ঠে বলল,
-না কিন্ত এই কাজটা… তোমাকেই দেখতে হবে।
কথা বলার সাথে সাথে অরিত্র পাঁচ আঙুল অভ্যাস বসত টেবিলে টোকা দিতে শুরু করল। ঠিক যেভাবে আঙ্গুল দিয়ে পিয়ানো বাজানো হয়।

মেজবার বুক ধক করে উঠল।
তাকেই? কেন?
এতজন বাইজি থাকতে… তারই নাম কেন বলল সে? মেজবা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার কণ্ঠে চাপা প্রশ্ন,
-আমাকেই… কেন?

এবার অরিত্রর আঙুল ধীরে থেমে গেল।
ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল…

অরিত্র ধীরে ধীরে বলল,
-রুহানিয়া রূপকুড়ি জমিদার বাড়ির ছোট পুত্র… অর্থাৎ জমিদার অরিত্র চৌধুরীর বিবাহ বলে কথা।
তার গলায় এক অদ্ভুত স্থিরতা। যেন নিজের কথাগুলোও সে অনুভব করছে না।
-শুনেছি… তুমি খুব সুন্দর নৃত্য করো। কখনো দেখা হয়নি। এবার দেখার সুযোগ হবে।
কথাগুলো শেষ হতেই ঘরটা যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মেজবা স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে। সে যেন আকাশ থেকে পড়ে গেছে।
এই মানুষটা…
যাকে সে এতদিন নিঃশব্দে ভালোবেসে এসেছে…
যার একটুখানি দৃষ্টি পাওয়ার জন্য কত রাত জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কাটিয়েছে…
আজ সে-ই এসেছে তাকে নিয়ে যেতে…
তার নিজের বিয়েতে…একজন বাইজি হিসেবে।
মেজবার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
কিন্তু মুখে সে কিছুই প্রকাশ করল না। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেল, তবুও সে নিজেকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে রাখল।
-তাই নাকি…
খুব আস্তে বলল সে, গলায় চাপা কাঁপন লুকিয়ে।
তার চোখে জল এসে ভিড় করছে, কিন্তু সে মাথা নিচু করে ফেলল। যেন কেউ দেখতে না পায়।
ভালোবাসা…
কখনো কখনো এমন নির্মম রূপ নেয়, সে আজ বুঝল। যে মানুষটার জন্য তার হৃদয় এতদিন ধরে কেঁদেছে, আজ সেই মানুষটার আনন্দের দিনে…তাকেই সাজতে হবে হাসিমুখে।
অরিত্র তখনো মাথা তুলে তাকায়নি।
সে জানেই না, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার হৃদয় এই মুহূর্তে চুপচাপ ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
মেজবা ধীরে ধীরে বলল,
-ঠিক আছে… আমরা যাবো।
কথাটা বলার সময় তার গলায় যেন কাঁটার মতো কিছু বিঁধে রইল। মেজবার
এই যাওয়া… শুধু একটা নাচ-গানের আয়োজন না…এটা তার নিজের ভালোবাসার শেষ বিদায়ের পথ।

অরিত্র তার পাঞ্জাবির ভাঁজ থেকে একটা টাকার বান্ডিল বের করল। কোনো শব্দ না করে সেটা মেজবার দিকে এগিয়ে দিল।
-এটা রাখো,
তার গলা ঠান্ডা, নিরাবেগ।
-সব ব্যবস্থা যেন ঠিকঠাক হয়।

মেজবা যেন জমে গেল। সে শুধু তাকিয়ে রইল সেই টাকার বান্ডিলের দিকে। তার চোখ ভরে উঠেছে জলে.... টলমল করছে, কিন্তু গড়িয়ে পড়ছে না এখনো।
এই টাকা...
এটা কি পারিশ্রমিক...?
নাকি তার ভালোবাসার দাম..?
মেজবার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
যে মানুষটার জন্য সে নিজের মন নিঃশব্দে উৎসর্গ করেছে আজ সেই মানুষটাই তাকে কিনতে এসেছে? তার আঙুলগুলো কেঁপে উঠল, কিন্তু সে হাত বাড়াল না।
শুধু তাকিয়ে রইল চোখে একরাশ অব্যক্ত কষ্ট, অপমান, আর ভাঙা স্বপ্নের ছায়া নিয়ে।
ঘরটা নিস্তব্ধ।

অরিত্রর হাত এখনো বাড়ানো…
আর মেজবা দাঁড়িয়ে আছে চোখে জল নিয়ে, কিন্তু মাথা নিচু করে। কারণ সে ভেঙে পড়েছে…
কিন্তু ভাঙার শব্দটা কাউকে শুনতে পাচ্ছেনা। দেখতে পাচ্ছে না..

অরিত্র ধীর পায়ে রোশনি কুঞ্জ থেকে বেরিয়ে গেল। ধোঁয়াটে আলোতে তার কাঁধে ঝরছে অদ্ভুত স্থিরতা, আর পা ঠেকছে শক্তভাবে মেঝেতে। সে গিয়েছে, কিন্তু মেজবা যেন জায়গা থেকে সরতেই পারছে না। তাকে দাড়িয়ে থাকতে হলো অন্যরকম এক অস্থিরতা, এক অজানা বোঝাপড়া ছুঁয়ে গিয়েছে তার শরীরে। মনে হচ্ছে, প্রতিটা শ্বাস নিলে কিছু ভেঙে যাচ্ছে। তার বুক কেঁপে উঠছে, কিন্তু সে কেন কেঁপে যাচ্ছে এটা সে নিজেই বুঝতে পারছে না। তার সারা শরীর অবচেতনভাবে একরকম অনোর্ত্তিত হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেছে। হাত, পা, চোখ, সবই ঠিক আছে, কিন্তু মনে হচ্ছে ভিতরে কিছু ভেঙে পড়েছে।

-কেন এরকম হচ্ছে?
মাথার ভেতর ঘুরছে এই প্রশ্ন।
কিছুতেই যেন মিলছে না সে তো এখন শুধু একজন বাইজি, অথচ হৃদয় চিৎকার করছে, চোখ ভিজে গেছে, আর মনের ভিতরে কেঁপে উঠছে অজানা যন্ত্রণা।
সেই দিনটা তার জন্য শুধু অন্য কোনো বিয়ের আয়োজন নয়। এটা তার নিজের হৃদয়ের এক গোপন যন্ত্রণা, যা সে কেউকে দেখাতে পারছে না। সে ধীরে ধীরে হাতদুটো জোড় করে বুকের কাছে রাখল, চোখ ভিজে গেলেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কারণ কিছু অনুভূতি… বলা যায় না। কোনো কণ্ঠে… কোনো চোখে প্রকাশ করা যায় না। তবুও মনের ভিতরে, প্রতিটি কোণায় সেই অদ্ভুত কষ্ট ঘুরে বেরায়।

মেজবা আসতে আসতে সিঁড়ির দিকে উঠল, উপরের দিকে। প্রতিটি ধাপ যেন তার মনে আরও ভারী হয়ে উঠছে। তার মনে প্রশ্ন ঘুরছে, যেন অদ্ভুত এক কান্নার ঢেউ।
সে জমিদারের ছেলে… আমি তো শুধু একজন সাধারণ বাইজি। ছোট, নগণ্য। তার কিসের ঠেকা আমার ভালোবাসার মূল্য দিতে হবে?
সে মাথা নিচু করে এগোচ্ছে, চোখে অশ্রু জমে আছে। মনে হচ্ছে, প্রতিটি ধাপে তার হৃদয় আরও ভাঙছে।
মনের গভীরে প্রশ্ন ওঠে
কেন আমি এত কষ্ট পাচ্ছি? আমি তো জানি, আমি তার কাছে কোনো দাম নেই। আমি শুধু এক ‘বাইজি’ মাত্র। তবু… মনে হচ্ছে সবকিছু ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, ভাঙছে।
তার হাত সিঁড়ির রেল ধরে শক্ত করে, যেন কিছু না কিছু স্থির রাখার চেষ্টা করছে।
কিন্তু হৃদয়?
হৃদয়টা শূন্য, ধ্বংসপ্রায়।
এই যন্ত্রণা কি শুধুই তার নিজের জন্য?
যে মানুষটিকে সে সারাজীবন ভালোবেসেছে, আজ সেই মানুষটাই তার ভালোবাসার মূল্য নির্ধারণ করছে…
আর সে, এত অল্প বয়সে, এত অল্প ক্ষমতায়, শুধু দাঁড়িয়ে আছে, কষ্টে ভেঙে পড়ছে।
সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে তার মনে আরও একরাশ প্রশ্ন “কেন আমি এই কষ্ট পাচ্ছি?”
কিন্তু উত্তর নেই।
শুধু আছে অবিরাম ধাক্কা, ভাঙা স্বপ্নের আওয়াজ, আর চোখে জমে থাকা অশ্রু।
মেজবা থেমে দাঁড়াল। তার হাত রেল ছাড়লো না। কিন্তু ভেতরে… তার মন যেন ভেঙে গেছে, হাজার টুকরো হয়ে ছিটকে পড়েছে।
কারণ ভালোবাসা… কখনো কখনো এমন নির্মম হয়।

জমিদার বাড়িটা আজ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।‌ সারাটা বাড়ি ফুলে ফুলে সাজানো। ফটক থেকে শুরু করে অন্দরমহল পর্যন্ত যেদিকে চোখ যায়, শুধু রঙিন ফুলের ছড়াছড়ি। দরজার খিলান জুড়ে ঝুলছে গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালা, বারান্দার রেলিংয়ে জড়িয়ে আছে বেলি আর শিউলির লতা।
হালকা বাতাস এলেই ফুলের গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে পুরো জমিদার বাড়িটা যেন এক সুবাসিত স্বপ্নের ভেতর ডুবে আছে।
গ্রামের একটাও মানুষ বাদ যায়নি। সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কারণ, এটা যে সাধারণ কোনো বিয়ে নয়, জমিদার বাড়ির ছেলে-মেয়ের বিয়ে। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন আসতে শুরু করেছে, কেউ হাঁটতে হাঁটতে, কেউ গরুর গাড়িতে চড়ে। সবার মুখে একটাই কথা,
“আজ জমিদার বাড়িতে বিয়ে!”
বাড়ির ভেতরে বাইরে একসাথে চলছে কোলাহল, হাসি, গল্প, ব্যস্ততা সব মিলিয়ে এক রাজকীয় উৎসবের আবহ। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালেই কোথাও যেন লুকিয়ে আছে অদৃশ্য এক টান, একটা না বলা রহস্য…
যা এখনো কেউ বুঝতে পারছে না।

গ্রামের সব মানুষ একে একে এসে ভিড় করেছে জমিদার বাড়িতে। ফটক পেরিয়ে উঠোনে পা রাখতেই সবার মুখে উপচে পড়া হাসি। কারও হাতে উপহার, কারও চোখে কৌতূহল, আবার কেউ শুধু এই আয়োজন দেখতেই এসেছে। গ্ৰামের সব থেকে গরিব লোকজনও হাতে করে কিছু না কিছু এনেছে।
উঠোন জুড়ে পাটি পেতে বসানো হয়েছে সারি সারি আসন।‌এক পাশে বড় বড় ডেগে রান্না হচ্ছে। ধোঁয়া উঠছে তাতে, তার সঙ্গে ভেসে আসছে মসলার গাঢ় গন্ধ।
খাওয়াদাওয়া শুরু হয়ে গেছে জোর কদমে।
ভৃত্যরা একের পর এক থালা সাজিয়ে দিচ্ছে
সাদা ভাত, গরম গরুর মাংস, মুরগির ঝোল, পোলাও, ইংলিশ, রুই কাতলা আর সঙ্গে নানা রকম ভর্তা আর মিষ্টি।
ছোটরা আনন্দে জমিদার বাড়ির উঠোনে দৌড়া দৌড়ি করছে। একজন ভৃত্য হাক দিয়ে বলল,
-ওও পুচো চিংড়ির দল। এইহানে আসো। খাজা আছে,,, খাইবানা,
বাচ্চারখ দৌড়ে সেদিকে গেল।

কেউ কেউ বলছে,
-এমন আয়োজন অনেকদিন দেহি নাই!

কেউ আবার বলছে,
-জমিদার বাড়ির বিয়া, এমনই হইবো!

মেয়েদের দিকেও আলাদা আয়োজন‌। তারা দল বেঁধে বসে, হাসাহাসি করতে করছে।‌ পান‌ খাচ্ছে।
জমিদার বাড়ির মাঠটা খাওয়াদাওয়া, হাসি, গল্পে প্রাণবন্ত পরিবেশ। তবুও
এই আনন্দের মাঝেও, কোথাও যেন অদৃশ্যভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক অজানা অনুভূতি… যেন এই উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গল্প।

অন্দরমহলের ভেতরে তখন ভিন্ন এক ব্যস্ততা।
ইরাকে মাঝখানে বসিয়ে তাকে সাজানো হচ্ছে।
ঘরের চারপাশে মৃদু আলো, বাতাসে আতরের হালকা গন্ধ। সব মিলিয়ে এক শান্ত ও কোমল পরিবেশ। জমিদার বাড়ি আজ উন্মুক্ত সবার জন্য। অন্দরমহলের ঘরটা যেন হঠাৎ করেই অন্য এক জগতে বদলে গেছে।
ইরাকে মাঝখানে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তার সামনে বড় আয়না। নাজমা বেগম নিজ হাতে তুলে নিলেন একটা লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি। গাঢ় রক্তিম রঙ, তার উপর সোনালি জরির ভারী কাজ। যেন প্রতিটি নকশার ভেতরে লুকিয়ে আছে রাজকীয় ইতিহাস।
তিনি খুব যত্ন করে শাড়িটা ইরার গায়ে জড়িয়ে দিতে লাগলেন। প্রতিটি ভাঁজ ঠিক করে বসালেন, পাড়টা সুন্দর করে কাঁধে তুলে দিলেন। এরকম তিনি ধীরে ধীরে লম্বা কালো চুলটা খুলে দিয়ে‌ সযত্নে গুছিয়ে দিলেন,
মাঝখানে সিঁথি করে বড় একটা খোঁপা বেঁধে দিলেন। মিরা আর ফুলি দু’পাশে বসে কখনো চুড়ি পরাচ্ছে, কখনো কানের দুল ঠিক করে দিচ্ছে।
সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। সকলের চোখে যেন বিস্ময় থামছেই না। ইরার হাত দু’টো সামনে এনে এক করে লাল কাঁচের চুড়ি পরানো হলো। চুড়ির টুংটাং শব্দে ঘরের নীরবতা কেঁপে উঠল। তারপর এলো গয়না।
গলায় ভারী সোনার হার, কানে ঝুলে পড়া দুল,
নাকে নথ, কপালে টিকলি… প্রতিটি গয়না পরার সঙ্গে সঙ্গে ইরা যেন আর একটু করে বদলে যেতে লাগল।
চোখে হালকা কাজল টানা হলো। চোখ দু’টো আরও গভীর, আরও মোহময় হয়ে উঠল।
ঠোঁটে হালকা লাল আভা, গালে লাজুক রঙ।
সবশেষে, নাজমা বেগম আর মীরা দুজন মিলে তার মাথার ওপর টেনে দিল বড় লাল ওড়নার ঘোমটা। উড়নাটা এতই বড় ছিল যে পুরো ঘর বিছিয়ে পড়ত। কিন্তু গ্ৰামের আরও মহিলারা থাকার জন্য ফুলি সেটাকে জড়ো করে নিজের কোলো রাখলো। মুহূর্তেই একটা মেয়ে থেকে সে হয়ে উঠল একেবারে পূর্ণ বউ। ইরা ধীরে আয়নার দিকে তাকাল। সে যেন নিজেকেই চিনতে পারল না।
এই কি সে?
এই কি সেই ইরা
যে এতদিন চুপচাপ অন্দরমহলে ছিল? তার চোখে হালকা জল চিকচিক করল।
মনের ভেতরে ঢেউ খেলল হাজারটা অনুভূতি
ভয়, লজ্জা, অজানা ভবিষ্যৎ…
আর কোথাও খুব গভীরে একটা নাম। একটু পরেই সেই নামে সে কালিমা পাঠ করবে।
ঘরের বাইরে তখন বিয়ের বাজনা বাজছে,
মানুষের কোলাহল বাড়ছে।
আর ভেতরে মোমের আলোয় লাল শাড়ি পড়া এক নববধূর নীরব চোখে একটা নতুন জীবনের শুরু ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অপরদিকে, অরিত্রর কক্ষে অরিত্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতরে হালকা আলো, চারপাশে সাজানো নতুন কাপড়, আতরের গন্ধে ভরে আছে বাতাস। আজ সে আর আগের সেই অরিত্র না। আজ সে বর।
তার পরনে গাঢ় মেরুন রঙের ভারী কাজ করা শেরওয়ানি, সোনালি সূচিকর্মে পুরো পোশাকটা যেন রাজকীয় আভা ছড়াচ্ছে। সে ধীরে ধীরে হাতা ঠিক করল, গলার বোতাম লাগাল,
আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থেমে রইল।
তার চোখে আজ অদ্ভুত এক গভীরতা। অনেক যুদ্ধ পেরিয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। এক ভৃত্য এগিয়ে এসে তার হাতে তুলে দিল মাথার পরাজকীয় পাগড়ি (সাফা) গাঢ় রঙের কাপড়, তার ওপর সোনালি কাজ, সামনে ঝুলছে একখানা ছোট অলংকার সারপেঁচ।
অরিত্র পাগড়িটা মাথায় বাঁধল। ভৃত্য এসে সেটাকে ঠিক করে দিল। সামনের অংশটা একটু উঁচু করে সাজিয়ে দিল। তারপর কাঁধে হালকা করে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো একপাশে ওড়না। সবকিছু শেষ হলে সে আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল। আজ সে শুধু একজন ছেলে না একজন জমিদার বাড়ির বর। তার চোখে হালকা কঠোরতা এখনো আছে, কিন্তু তার ভেতরে কোথাও একটা শান্তি নেমে এসেছে।
ঠোঁটের কোণে অল্প একটা হাসি ফুটল। মনে মনে শুধু একটা কথাই ভেসে উঠল,
ইরা…

জমিদার বাড়ির উঠোন আজ যেন আলো আর শব্দে জেগে উঠেছে। চারদিকে ঝাড়বাতির আলো, রঙিন কাগজের ফানুস, সানাইয়ের মিষ্টি সুর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো পরিবেশটাই এক রাজকীয় স্বপ্নের ভেতর ডুবে আছে। উঠোনের মাঝখানে বড় করে সাজানো হয়েছে বিয়ের আসর। লাল আর সোনালি কাপড়ে মোড়া চেয়ার। চারপাশে ফুলের মালা ঝুলছে। বিয়ের আসর টাকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। মাঝখানে ঘন শিউলি ফুলের মালা দিয়ে পৃথক করা হয়েছে।গ্রামের মানুষজন চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। কারও চোখে মুগ্ধতা, কারও চোখে কৌতূহল। ফিসফাস, হাসাহাসি সব মিলিয়ে এক জমজমাট পরিবেশ। এই কোলাহলের মাঝেই বিয়ের আসরে ধীরে ধীরে এসে বসল অরিত্র।
একপাশে অরিত্র চেয়ারে বসে আছে, অন্যপাশ টা ইরার জন্য।
চারপাশে এত মানুষ, এত শব্দ তবুও তার চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা। কিন্তু ভেতরে?
ভেতরে যেন ঝড় বইছে। তার হাত দু’টো মুঠো করে ধরা, শ্বাস একটু ভারী।
ঠিক তখনই
অন্দরমহলের দিক থেকে হালকা একটা সাড়া পড়ল।
-কনে আইতাছে…
মুহূর্তেই সব ফিসফাস থেমে গেল। সব চোখ একসাথে ঘুরে গেল সেই দিকে।
খুব ধীরে কয়েকজন মহিলা ঘিরে নিয়ে আসছে ইরাকে।
তার মাথার লাল ঘোমটা সামনে বুক পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে। আর পিছনে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত আছে তা অনুমান করা গেল না।
হাঁটার সময় পায়ের নূপুরের শব্দ খুব হালকা করে বাজছে। চারপাশের আলো তার ওপর পড়ে মনে হচ্ছে সে যেন বাস্তব না, একটা স্বপ্ন। একটা ভ্রম।
মিরা , চৈত্রিক আর ফুলি দুই পাশে ধরে রেখেছে তাকে। প্রতিটা পা ফেলতে ফেলতে
সে এগিয়ে আসছে বিয়ের আসরেরর দিকে।
অরিত্র তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে।
সময় যেন থেমে গেছে। যখন ইরাকে শিউলি ফুলের অপর পাশে বসানো হলো, তখন তার ঘোমটার আড়াল থেকে চোখ দু’টো একটু উপরে উঠল।
আর অরিত্রর চোখের সঙ্গে চোখ মিলল।
সেই এক মুহূর্ত চারপাশের সব শব্দ যেন মিলিয়ে গেল। সানাই, মানুষের কোলাহল সব দূরে সরে গেল।
শুধু দু’জন মানুষ,,, দু’জোড়া চোখ,,,
একজনের চোখে গভীর ভালোবাসা, ভয় আর জেদ… আরেকজনের চোখে অজানা প্রশ্ন, দ্বিধা, আর লুকানো কাঁপন।
ইরা যেন কিছু বলতে চাইল চোখ দিয়ে।
কিন্তু পারল না।
অরিত্রর ঠোঁট নড়ল হালকা করে
কোনো শব্দ বের হলো না,
তবুও বোঝা গেল সে বলতে চাইছে
“আমি আছি…”

চলবে......

30/05/2026

টোনা টুনির সংসার....!
#নব্বই_দশকের_ভালোবাসায়_মোড়ানো_তুমি

 #নব্বই_দশকের_ভালোবাসায়_মোড়ানো_তুমি  ়েশা_সিদ্দিকা_আশা পর্ব:৩বছর খানেক আগের কথা না… যেন আরেক জন্মের কথা। তখন সুজন আলি ...
30/05/2026

#নব্বই_দশকের_ভালোবাসায়_মোড়ানো_তুমি
়েশা_সিদ্দিকা_আশা
পর্ব:৩
বছর খানেক আগের কথা না… যেন আরেক জন্মের কথা। তখন সুজন আলি টগবগে জোয়ান। বুকভরা শক্তি, চোখভরা স্বপ্ন। আর পুতুল? সে তখন সবে কৈশোরে পা দেওয়া চঞ্চল এক মাইয়া। সারাদিন এপাড়া-ওপাড়া ঘুইরা বেড়াইতো সে। ঘরে মনই টিকতো না।
কখনো গাছে চইড়া কাঁচা আম পাড়তেছে,
কখনো খালে নামছে মাছ ধরতে, আবার কখনো ঝুড়ি হাতে শাক তুলতে গেছে মাঠের আইলে। পুতুলরে নিয়া তার মায়ের চিন্তার শেষ আছিল না। সারাক্ষণ বকা দিতো
-এই মাইয়া! একটু ঘরে বইতে পারস না? সারাদিন টইটই কইরা ঘুরোস ক্যান?

পুতুল তখন খিলখিল কইরা হাসতো। তার হাসির শব্দ শুনলে আশেপাশের মানুষও হাসি চাপতে পারতো না। দুই পাশে শক্ত কইরা কলা বেনি করা চুল। রোদে পোড়া গোলগাল মুখ।
পায়ে কাদা মাখা, হাতে কাঁচের চুড়ি তবুও কী যে মায়া আছিল মাইয়াডার ভিতর! পুরা গ্রাম চিনতো তারে। কেউ ডাকতো “আমেনা”, কেউ “পুতুল”, আবার কেউ আদর কইরা “পুতলি”ও কইতো। সন্ধ্যা হইলে নদীর ঘাটে বইসা পা দুলাইতো সে। আর আকাশভরা লালচে মেঘের দিকে তাকাইয়া কীসব ভাবতো নিজের মনেই।
সেই সময়ই প্রথম সুজন আলির নাও বাইতে বাইতে চোখে পড়ে পুতুল। আর তারপর থেইকা যেন গ্রামের সব রাস্তা, সব আইল, সব বিকেল কেমন কইরা জানি পুতুলের দিকেই গিয়া থামতে লাগলো। সুজন আর পুতুলদের বাড়ি খুব বেশি দূরে আছিল না। হাঁটলে বিশ মিনিটের রাস্তা। মাঝখানে শুধু কয়ডা আইল, বাঁশঝাড় আর একটা সরু খাল। সুজন প্রায়ই পুতুলরে দেখতো। কখনো কলপাড়ে, কখনো মাঠে, আবার কখনো অন্য মাইয়াগো সাথে হইহুল্লোড় কইরা ঘুরতে। পুতুলরে দেখলেই সুজনের বুকের ভিতর কেমন জানি করতো।
নিজেও বুঝতো না ওই অনুভূতির মানে কী।
দূর থেইকা লুকায়া লুকায়া দেখতো সে।
পুতুল হাসলে তারও মন ভালো হইয়া যাইতো।
আবার দুইদিন না দেখলে অস্থির লাগতো।
একদিন বিকালে সুজন উঠছিল মোখলেস চাচাগো পেয়ারা বাগানে। ডাসা ডাসা পেয়ারা ধরছে গাছে। সুজন ডাল ধইরা উপরে বইসা পেয়ারা পাড়তেছিল। হঠাৎ নিচে চোখ যাইতেই দেখে মাথার দুই পাশের বেনী দুলাইতে দুলাইতে পুতুল রাস্তা দিয়া যাইতেছে। রোদের আলোয় তার চোখে পড়ে কুচকাইয়া আসতেছিল। মুখে আগের মতোই চঞ্চল ভাব। সুজনের বুকডা ধক কইরা উঠলো। সে গাছের উপর থেইকাই হাক ছাইড়া কইলো,
-ওই পুতুল! পেয়ারা খাবি?

পুতুল দাঁড়াইয়া উপরে তাকাইল। তারপর উপর নিচ দুলাইয়া মাথা নাড়লো। সুজনের মুখে অজান্তেই হাসি ফুইটা উঠলো। সে তাড়াতাড়ি কয়ডা ডাসা পেয়ারা পাড়লো। তারপর নিচে ছুইড়া দিয়া কইলো,
-ধর! এইডা খুব মিষ্টি।

পুতুল দুইহাতে পেয়ারাগুলা ধরলো। তারপর একটা কামড় দিয়া চোখ বড় বড় কইরা কইলো
-ইশ! কত মিঠা!

ওই মুহূর্তে সুজনের মনে হইলো পৃথিবীর সবথেইকা সুন্দর কথা বুঝি এইডাই।

এরপর থেইকাই সুজন সুযোগ পাইলেই লুকাইয়া লুকাইয়া পুতুলরে এইডা-সেইডা দিত।
কখনো হাটের মেলা থেইকা রেশমি চুড়ি, কখনো লাল আলতা, কখনো ঝুনঝুনি দেওয়া নূপুর, আবার কখনো চুলের রঙিন ফিতা।
পুতুল প্রথম প্রথম নিতে লজ্জা পাইতো।
চারপাশে তাকাইয়া আস্তে কইল,
-কেউ দেইখা ফেলবো…

সুজন বুক ফুলায়া কইল,
-দেইখা ফেললে ফেলবো।
তবুও শেষমেশ পুতুল সবই নিত। বাড়িতে গিয়া লুকায়া লুকায়া দেখতো। রাইতে ঘুমানোর আগেও চুড়িগুলা হাতে পইড়া মিটমিট কইরা হাসতো সে। এইভাবেই কয়দিন চলার পর সুজনের বুকের ভিতরকার কথাগুলা আর আটকা থাকলো না। একখান প্রেমপত্র লিখলো সে কাঁপা কাঁপা হাতে। বাজার থেইকা কিনা নীল কাগজে। অনেক কষ্টে মনের কথাগুলা লিখছে,,,,

সেদিন দুপুরে পুতুল নদীর ঘাটে হাঁড়ি-পাতিল মাজতেছিল। চারপাশ ফাঁকা। শুধু পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। ঠিক তখনই চুপি চুপি সেখানে গেলো সুজন। পুতুল প্রথমে দেইখা আঁতকাইয়া উঠলো।
-এই! এইহানে আইছো ক্যান?

সুজন কিছু কইলো না। শুধু তাড়াতাড়ি কইরা পুতুলের ভেজা হাতডা ধরলো। পুতুলের বুক ধড়ফড় কইরা উঠলো। চারপাশে ভয়ার্ত চোখে তাকাইল সে। সুজন জোর কইরা ভাঁজ করা চিঠিডা তার হাতে গুইজা দিয়া আস্তে কইলো,
-কাউরে দেখাইবি না। একলা পড়বি…

হঠাৎই সুজনের বুকডা ধক কইরা উঠলো। পিছন ফিরা দেখে পুতুলের মা দাঁড়াইয়া আছে!
কোমরে হাত দিয়া কড়া চোখে তাকাইয়া আছে দুইজনের দিকে। তিনি কড়া গলায় কইলেন,
-এই ছ্যাড়া! এইহানে কী করস?

সুজন থমকাইয়া গেল। মুখ শুকাইয়া কাঠ হইয়া গেল। তবুও নিজেকে সামলাইয়া আমতা আমতা কইলো,
-ওই চাচি… গোসল করবার আইছিলাম। পুতুল আছে দেইখা চইলা যাইতাসি…

পুতুল ততক্ষণে ভয়ে আধমরা। কাঁপা হাতে তাড়াতাড়ি চিঠিডা আঁচলের ভিতর লুকাইয়া ফেললো। তার বুক এত জোরে ধুকপুক করতেছিল যে মনে হইতেছিল আশেপাশের মানুষও বুঝি শুনতে পাইবো। পুতুলের মা সন্দেহভরা চোখে একবার মাইয়ার দিকে, একবার সুজনের দিকে তাকাইলেন।
-হ, যাও যাও। কামকাজ নাই শুধু ঘুইরা বেড়াও।

সুজন আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াইল না।
তাড়াতাড়ি সেইহান থেইকা চইলা গেলো।
যাইতে যাইতেও তার বুক কাঁপতেছিল।
আর পুতুল… সে হাঁড়ি মাজা বাদ দিয়া চুপচাপ বইসা রইলো। আঁচলের ভিতর লুকানো চিঠিডার উষ্ণতা তখনও তার হাতের তালুতে লাগা।

গভীর নিশুতি রাত।
চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভাসতেছিল। পুতুল চুপিচুপি উঠে বসল। পাশে তার মা ঘুমাইয়া আছে। সে আস্তে কইরা হাত বাড়াইয়া মায়ের মুখে হাত দিলো। নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে বুঝলো, ঘুম এখনো ভাঙে নাই। তখন বুক ধুকপুক করা হাতে বালিশের নিচ থেইকা চিঠিডা বাইর করলো পুতুল।
হারিকেনের টিমটিমে আলোয় কাগজটার উপর ছায়া পড়তেছিল। পুতুলের হাত কাঁপতেছিল হালকা। সে ধীরে ধীরে কাগজটা খুললো। নীল কাগজে কাঁচা হাতে লেখা অক্ষর। কোথাও কালি বেশি, কোথাও হালকা। তবুও সেই লেখাগুলা পুতুলের চোখে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর জিনিস মনে হইলো। ভারি ভারি শ্বাস ফেলতে ফেলতে পড়তে লাগলো সে...

প্রিয় পুতুল,

চিঠির শুরু কেমনে করমু বুঝতাছি না। এই জীবনে কোনোদিন কাউরে চিঠি লিখি নাই। তাই ভুল হইলে মাফ কইরা দিস। পুতুল, তোরে প্রথম কবে দেইখছি সেইডা আমার মনে নাই। কিন্তু তোরে দেইখা আমার বুকের ভিতর কবে থেইকা কেমন কেমন করে, সেইডা আমি নিজেও জানি না। পুতুল, তোরে দেখলেই আমার বুকডা কেমন করে। সারাদিন তোর কথাই মনে হয়। তুই হাসলে আমার মনডা ভালো হইয়া যায়। একদিন তোরে না দেখলে বুক টা খাঁ খাঁ করে। চোখ বন্ধ করলেই শুধু তোর কাজল কালো ডাগর ডাগর চোখ দুইডা ভাইসা উঠে। তুই কি আমারে তাবিজ করছোস রে পুতুল! তুই যখন দুই পাশে বেনি কইরা হাসতে হাসতে রাস্তা দিয়া যাস, আমার মন চায় শুধু চাইয়া থাকি। তুই যখন খালপাড়ে শাক তুলস, আমি দূর থেইকা লুকাইয়া দেহি। তুই যখন আম কুড়াস, পেয়ারা খাস, সইগো লগে হাসাহাসি করস, তখন আমার মনডা কেমন জানি খুশি হইয়া যায়। অনেকবার ভাবছি তোরে কইমু, কিন্তু সাহস পাই নাই।‌ পুতুল, আমি গরিব ঘরের পোলা। আমার বড়লোকি কিছু নাই। সোনা-দানা দেওনের ক্ষমতা নাই। কিন্তু একটা জিনিস আছে‌ "আমার মন"।
সেই মনডা আমি অনেক আগেই তোর কাছে হারাইয়া ফেলছি। সারাদিন কাম করি, কিন্তু ফাঁকে ফাঁকে তোর কথাই মনে পড়ে। রাইতে ঘুমাইতে গেলেও তোর মুখডা চোখের সামনে ভাসে। আমি জানি না ভালোবাসা কারে কয়। গ্রামের মাস্টার সাবের বইয়ে পড়ছিলাম, মানুষ নাকি কাউরে খুব বেশি মনে করলে সেইডারে ভালোবাসা কয়। তাই যদি সত্যি হয়, তাইলে আমি তোরে অনেক বেশি ভালোবাসি। তুই হয়তো আমারে নিয়া হাসবি। হয়তো ভাববি আমি পাগল হইয়া গেছি। কিন্তু এই কথাগুলা আর বুকের ভিতর রাখবার পারলাম না।
পুতুল, তুই যদি আমারে পছন্দ না করস, তাইলে এই চিঠিডা ছিঁইড়া ফালাইয়া দিস। আমি আর কোনোদিন তোরে বিরক্ত করুম না।
আর যদি তোর মনেও আমার লাইগা একটুও মায়া থাকে, তাইলে কাল বিকালে লাল ফিতা পইরা নদীর ঘাটে আইস। তুই আইলে বুঝমু, আমার ভালোবাসা একলা না। আর না আইলে বুঝমু, এই কথা বাতাসের লগেই উড়াইয়া দিতে হইবো। শেষে একটা কথা কই। সারা দুনিয়ায় আমার সবচাইতে প্রিয় মানুষ যদি কেউ থাকে, সেইডা তুই। আল্লাহ তোরে ভালো রাখুক।
ইতি
তোরে লুকাইয়া লুকাইয়া দেখা এক পাগল মানুষ,
সুজন মাঝি

পড়তে পড়তে পুতুলের গাল লাল হইয়া উঠলো। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটলো। তার জীবনে এই প্রথম কেউ তারে নিয়া এমন কথা লিখছে। বুকের ভিতর কেমন অচেনা সুখের ঢেউ উঠতেছিল। মনে হইতেছিল হারিকেনের ছোট্ট আলোটা বুঝি আজ অন্যদিনের চাইতেও বেশি উজ্জ্বল। চিঠির শেষ লাইনে সুজন লিখছিল

“তুই যদি আমারে একটু ভালোবাসস, তাইলে কাল লাল ফিতা পইরা আইস।”

এই লাইন পড়তেই পুতুলের বুক ধক কইরা উঠলো। সে তাড়াতাড়ি চারপাশে তাকাইল।
মনে হইলো কেউ বুঝি তার বুকের শব্দ শুনে ফেলবো। তারপর চিঠিডা বুকের সাথে জড়ায়া ধইরা আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করলো পুতুল।
সেই রাতেই প্রথমবার কোনো এক জোয়ান ছেলের নাম মনে করতে করতে ঘুম আইলো তার.....

চলবে.....

 #গল্প_তৃতীয়_দরজা  #লেখনীতে_আয়েশা_সিদ্দীকা_আশা পর্ব:৩৭কেটে গেছে চার দিন। এই চার দিনে যেন অনেক কিছু বদলে গেছে। ঝড়, অশান...
30/05/2026

#গল্প_তৃতীয়_দরজা
#লেখনীতে_আয়েশা_সিদ্দীকা_আশা
পর্ব:৩৭
কেটে গেছে চার দিন। এই চার দিনে যেন অনেক কিছু বদলে গেছে। ঝড়, অশান্তি, কান্না সবকিছুর পর অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়েছে
ইরা আর অরিত্রর বিয়ে হতে চলেছে।
জমিদার বাড়ির ভেতরে আবার নতুন করে ব্যস্ততা শুরু হয়েছে।‌ কিন্তু এই ব্যস্ততার ভেতরেও কোথাও একটা চাপা টান রয়ে গেছে।
অরিত্র নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে। সাদা পাঞ্জাবি পরিধান করে সে একে একে বোতাম লাগাচ্ছে। তার হাত আগের মতো কাঁপছে না, কিন্তু চোখে এখনো সেই গভীরতা এখনো রয়েছে। যেন এই চার দিনে সে আরও বদলে গেছে।
পিছনে পালঙ্কে বসে আছেন জাহানারা বেগম।
তিনি নিজ হাতে একটা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছেন,
-এইটা রাখো.... আর এটা নিতে ভুলো না,
বলতে বলতে তিনি কাপড়, টাকা, আর প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গুছিয়ে দিচ্ছেন।
অরিত্র আয়নায় তাকিয়েই বলল,
-আম্মা, এত কিছু লাগবে না...
জাহানারা বেগম হালকা কড়া গলায় বললেন,
-তিন দিনের জন্য যাচ্ছ। লাগবে না বললে চলে...
তার কণ্ঠে আগের সেই কঠোরতা থাকলেও,
আজ কোথাও একটা মায়া মিশে আছে।
অরিত্র ঘুরে তাকাল। দু’জনের চোখ একবারের জন্য মিলল। এই চার দিনে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু সম্পর্কের ভেতরের টানটা এখনো একই আছে।

জাহানারা বেগম ব্যাগটা তার হাতে দিয়ে বললেন,
-শহরে যাচ্ছো.. সাবধানে যেও।

অরিত্র মাথা নেড়ে বলল,
-জ্বি।
বাইরে উঠোনে তখন ঘোড়ার গাড়ি প্রস্তুত।
আজ তাকে শহরে যেতে হবে নিজের বিয়ের কেনাকাটা করতে। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে সে একবার থেমে গেল।
মনে মনে যেন কারও কথা ভাবল।
ইরা...
তার ঠোঁটের কোণে অল্প একটা হাসি ফুটল।
সব ঝড়ের পর, অবশেষে সে কি সত্যিই পেতে চলেছে তাকে?

এই চার দিন শুধু সময়ের হিসাব ছিল না, ছিল ভেতরে ভেতরে অনেক ভাঙাগড়া। অরিত্র বাইরে যতটা কঠিন দেখিয়েছে, ভেতরে ততটাই ভেঙে পড়েছিল। ইরাকে হারানোর ভয় তাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়েনি। রাতের পর রাত সে ঘুমাতে পারেনি। একাই নিজের ঘরে বসে থেকেছে, কখনো চুপচাপ, কখনো হঠাৎ করে ভেঙে পড়ে কেঁদেছে। তার চোখ লাল হয়ে থাকত, মুখে থাকত ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
বারবার শুধু একটা কথাই তার মাথায় ঘুরত,
“যদি ওকে হারাই?”
এই ভয়টাই তাকে পাগলের মতো করে তুলেছিল।
সালাউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে এই কয়েক দিনে তার একাধিকবার ঝামেলা হয়েছে।
কখনো উঁচু গলায় কথা, কখনো তর্ক, কখনো পুরো বৈঠকখানা কেঁপে উঠেছে তাদের বাকবিতণ্ডায়।

-আমি বলেছি, এই বিয়ে হবে না!
সালাউদ্দিন চৌধুরীর গলা কঠোর।

অরিত্র দাঁতে দাঁত চেপে বলত,
-হবে...আর ইরার সঙ্গেই হবে।

কোনো যুক্তি, কোনো বাধা কিছুই সে শুনতে রাজি ছিল না। জাহানারা বেগম বহুবার মাঝখানে এসে থামানোর চেষ্টা করেছেন,
কিন্তু অরিত্র চিৎকার করে বলেছে,
-আম্মা যদি আমাকে হারাতে না চান তবে ইরাকে আমার করে দিন।
নাজমা বেগম কেঁদেছেন তবুও অরিত্র থামেনি।
কারণ তার কাছে এটা শুধু একটা বিয়ে না
এটা তার ভালোবাসা, তার অস্তিত্ব,
তার সবকিছু। এই চার দিনে সে একটাই জিনিস প্রমাণ করেছে ইরাকে হারানোর মতো মানুষ সে নয়।

এই চার দিনের অস্থিরতার মাঝেও একটা সময় ছিল, যখন অরিত্র একেবারে নীরব হয়ে যেত। গভীর রাত...
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। চারদিক নিস্তব্ধ।
অরিত্র আস্তে করে উঠে দাঁড়াত, অজু করে চুপচাপ নামাজে দাঁড়িয়ে যেত। তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করত।
তার কণ্ঠ কাঁপত, সিজদায় গিয়ে সে অনেকক্ষণ পড়ে থাকত। কেউ দেখত না, কেউ জানত না কিন্তু সেই নীরব রাতগুলোতে সে একটাই জিনিস চেয়েছে। " ইরাকে "
তার চোখ বেয়ে পানি পড়ত, কণ্ঠ ভেঙে যেত
-আল্লাহ...
যদি সে আমার জন্যই হয়,
তাহলে তাকে আমার কাছেই রাখুন...
আবার কখনো পাগলের মতো‌ বলত,
-আমি তাকে হারাতে পারব না... তাকে আমার করে দিন…
তার দোয়ার ভেতর ছিল না কোনো অহংকার,
ছিল শুধু এক অসহায় ভালোবাসা। যে অরিত্র সবার সামনে এত শক্ত, এত রাগী সেই অরিত্রই গভীর রাতে একজন ভাঙা মানুষের মতো কেঁদে কেঁদে ইরাকে চেয়েছে।
হয়তো সেই দোয়া, সেই কান্না সবকিছুরই উত্তর এসেছে…
কারণ আজ ইরা তার হতে চলেছে।

এই বিয়ের সিদ্ধান্তটা যতটা হঠাৎ তার থেকেও বেশি অদ্ভুত একটা সত্য লুকিয়ে আছে এর ভেতরে। ইরা কিছুই জানে না। এই চার দিনে যখন বাইরে এত ঝড় বয়ে গেছে, ভেতরে ভেতরে সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে তবুও ইরাকে কেউ কিছু জানায়নি।
অন্দরমহলের দরজার আড়ালে সে এখনো আগের মতোই আছে। নিজের ভাবনায়, নিজের অজানা দুনিয়ায়। কিন্তু জমিদার বাড়ির প্রায় সবাই জানে এই বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
শুধু ইরা আর বাড়ির ছোটরা ছাড়া।
মিরা, ফুলি তারা কিছুটা আন্দাজ করছে,
কিন্তু পুরো সত্যটা তারাও জানে না।
বড়রা চুপচাপ নিজেদের মধ্যে সব ঠিক করে নিয়েছে তারিখ, আয়োজন, কেনাকাটা
সবকিছু চলছে নিঃশব্দে। কারও মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখে চোখে বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা হতে চলেছে। এই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক রহস্য ইরা যখন জানবে…
তখন তার প্রতিক্রিয়া কী হবে? সে কি খুশি হবে? নাকি আবার নতুন কোনো ঝড় উঠবে?
কারণ যে বিয়ের কথা কনে নিজেই জানে না,
সেই বিয়ে কখনোই এত সহজ হয় না।

অরিত্র প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
জাহানারা বেগম ব্যাগটা তার হাতে তুলে দিতেই সে ধীরে ধীরে নিচু হয়ে জাহানারা বেগমের পায়ে সালাম করল।
জাহানারা বেগম ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
-সাবধানে যেও...আর তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।

অরিত্র মাথা নিচু রেখেই বলল,
-দোয়া করবেন, আম্মা।
তার কণ্ঠে আজ এক অদ্ভুত শান্তি যেন এতদিনের ঝড়ের পর একটু থেমে গেছে সবকিছু। সে উঠে দাঁড়াল, ব্যাগটা হাতে নিল।
একবার চারপাশে তাকাল এই ঘর, এই দেয়াল, এই মানুষগুলো সবকিছুর সঙ্গে যেন তার গভীর একটা টান। তারপর আর কিছু না বলে
ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজার চৌকাঠ পেরোনোর সময়
তার চোখে এক ঝলক দৃঢ়তা ফুটে উঠল
আজ সে শুধু শহরে যাচ্ছে না, নিজের জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের দিকে পা বাড়াচ্ছে।

ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় পা রাখতেই
অরিত্র হঠাৎ থেমে গেল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন সালাউদ্দিন চৌধুরী। এক মুহূর্তের জন্য বাবা-ছেলের চোখে চোখ পড়ে গেল। কোনো কথা হলো না। কিন্তু সেই চোখের দৃষ্টিতেই যেন অনেক না বলা কথা ভেসে উঠল।
সালাউদ্দিন চৌধুরীর চোখে ছিল কঠোরতা,
কিন্তু তার ভেতরে কোথাও এক চাপা ক্লান্তি আর অস্বস্তিও লুকিয়ে ছিল। অরিত্রর চোখ স্থির। না সেখানে রাগ নেই, ভাঙন নেই শুধু আছে এক অন্যরকম দূরত্ব।
কিছুক্ষণ দু’জনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অরিত্র মাথা সরিয়ে নিল, কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল।
তার পায়ের শব্দ মেঝেতে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। পেছনে দাঁড়িয়ে রইলেন সালাউদ্দিন চৌধুরী। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি নিজের কক্ষের দিকে পা চালালেন। সেই নিশ্বাসে যেন জমে থাকা ক্লান্তি,
অভিমান, আর না বলা হাজারটা কথার ভার লুকিয়ে ছিল।

অরিত্র জমিদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
নাজমা বেগমের সাথে তার দেখা হলো। নাজমা বেগমের পা ছুঁয়ে সালাম করতে চাইলো অরিত্র কিন্তু নাজমা বেগম তা করতে দিলেন না। দুহাত দিয়ে অরিত্রর মুখমণ্ডলে হাত বুলিয়ে দিলেন। অরিত্র নাজমা বেগম কে বলল,
-চিন্তা করোনা ছোটমা, আমি তোমার মেয়েকে রাণীর মতোই রাখবো।

নাজমা বেগম বলতে পারবেন না অরিত্র খারাপ ছেলে। ছেলে হিসেবে ভাই হিসেবে অরিত্রর তুলনা নেই। সবার খেয়াল রাখে সে। সবার অসুস্থতায় পাশে থাকে অরিত্র। স্বামী হিসেবেও অরিত্র নিজের দায়িত্বে কখনো গাফিলতি করবে না তা জাহানারা বেগম ভালো করেই জানেন। কিন্তু জমিদার বাড়ির কালো রক্ত অরিত্রর শরীরেও বইছে। তাহলে একই প্রশ্ন ইরার বেলাতেও আসছে। সেও এই বাড়ির কণ্যা।

অরিত্র বাড়ির বাইরে পা রাখতেই সকালের ভেজা বায়ু, ফুলের গন্ধ আর ফোয়ারার ছিটে-ছিটে পানি তার মুখে লাগল। ধীরে ধীরে সে ফুলের বাগান অতিক্রম করে গেল।‌ ফুলেরা এখনও শিশিরে ভিজে, বাতাসে নরম সুবাস ছড়িয়ে দিচ্ছিল। শেষে সে পৌঁছালো ঘোরার গাড়ির কাছে। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে, সে গাড়ির ব্যাগপত্র এক এক করে তুলল। কিছু সময় থামে দাঁড়িয়ে নিজের সাদা পাঞ্জাবির বোতাম ঠিক করল, তারপর ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসল। অরিত্র গাড়ির জানালা দিয়ে এক নজর তাকাল। ইরার ঘরের বারান্দায় চোখে পড়ল।
সে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। গাড়ির চাকা ঘুরতে শুরু করল। অরিত্র আর একবার তাকাল দূরে,
ইরার ঘরের দিকে। অরিত্র অস্ফুটে বলল,
-আমি তোকে খুব তাড়াতাড়ি নিজের করে নিব। তুই অপেক্ষা করবি তো আমার জন্য...

গাড়ির চাকা ধীরে ঘুরতে শুরু করল। একসময়
জমিদার বাড়ি ছোট হতে ছোট হতে চোখের আড়াল হয়ে গেল। উঠোনের সরু পথ, বারান্দার রেখা সব এক এক করে দূরে সরে গেল। তার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি ঢুকল
যেমন সবকিছু এক মুহূর্তে হারিয়ে যাচ্ছে,
কিন্তু হৃদয়ে সেই স্মৃতি অমলিন থেকে যাচ্ছে।
গাড়ি এগোচ্ছে, ইরার সাথে তার দূরত্ব বাড়ছে,
এ যেন এক দীর্ঘশ্বাসের মতো, নতুন যাত্রার শুরু।

দিন যায়, রাত যায়‌কিন্তু লিমন আর বেলির কোনো খবর আসে না।‌ লিমনের মা প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেছেন। সকাল হলেই তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। হঠাৎ হঠাৎ তিনি চিৎকার করে উঠেন,
-লিমন! ও লিমন! আম নায়েন রে! বেলি কানা গেলি রে?
কখনো আবার বেলির কথা মনে পড়তেই কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
-বেলি মোরে, তোড় ছাড়া আম হাড়ে নাই… তুই ফেনা আই রে…
পাড়ার লোকজন এসে তাকে বোঝায়, কিন্তু তিনি কিছুই শোনেন না। কখনো লিমনের পুরোনো কাপড় বুকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকেন, কখনো মাটিতে বসে মাথায় হাত দিয়ে কাঁদেন।‌ লিমনের বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। তার চোখ লাল হয়ে থাকে, কিন্তু তিনি খুব কম কথা বলেন। একদিন ধীরে ধীরে স্ত্রীর পাশে বসে বললেন,
-চুপ হো… ওরা ফেনা আইবেক।
কিন্তু মায়ের কান্না থামে না।‌ রাতে তিনি বারবার দরজা খুলে বাইরে তাকান। হাওয়ার শব্দ হলেই ছুটে যান।
-লিমন?… বেলি?… তোরা আইলি নাকি?
কিন্তু বাইরে থাকে শুধু অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা।

দিন যত যাচ্ছে, তার অবস্থা তত খারাপ হচ্ছে। খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ, চুল এলোমেলো, চোখে এক ধরনের শূন্যতা।‌ পাড়ার লোকজন এখন চাপা গলায় বলে,
-ওর মা ত একদম হোরে গ্যালাক…
তবুও, মায়ের বুকের ভেতর একটুকরো আশা এখনও জ্বলছে একদিন… হঠাৎ করেই দরজার সামনে দাঁড়াবে লিমন আর বেলি আর সে দৌড়ে গিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরবে…

বেলির বাবা-মা কেউ ছিল না। বেলির পরিচয় ছিল লিমনের মায়ের বোনের মেয়ে হিসেবে। ছোটবেলা থেকেই বেলি লিমনের কাছে ছিল। বেলি আর সোহাগিনী মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে
উঠল। লিমনের সাথে সোহাগিনীর বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর লিমনের মা আর বাবা ভাবলেন, বেলি এবং লিমন একসাথে জীবন কাটানোর জন্য ভালো হতে পারে। বরাবরের মতই বেলী সোহাগিনীকে ঈর্ষা করত। লিমনকে অপ্রস্তুত ভাবে পেয়ে বেলী পাল্টে গেল। সোহাগিনীকে কষ্ট দিতে শুরু করল। বেলি এবং লিমনের বিয়ে সম্পন্নের পর প্রথমদিকে সবকিছু বেশ সুন্দর চলছিল। বেলি এবং লিমন একে অপরের প্রতি যত্নশীল, হাসি-মজা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠল। বেলি সন্তান সম্ভাবা হলো। কিন্তু হঠাৎ করেই অদ্ভুত কিছু ঘটতে লাগল। দু’জনের উপর যেন কোনো অদৃশ্য নজর পড়ল। যতই তারা একসাথে সময় কাটাত, সেই অদৃশ্য নজর আরও স্পষ্ট হতে লাগল।

লিমনের বাবা শহরে গিয়েছিলেন। তিনি শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরেছেন, হাসপাতালে গিয়েছেন, ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সব জায়গায় খুঁজেছেন কিন্তু কোনো ফল মেলেনি। হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল, বড় বড় ক্লিনিক থেকে ছোট ছোট ক্লিনিক প্রায় সমস্ত জায়গায় খুঁজেও কিছু পাওয়া যায়নি। কেউ জানে না, লিমন আর বেলি কোথায় আছে। শহরের ভিড়, যানবাহনের আওয়াজ, হঠাৎ হুইসেল সবই যেন লিমনের বাবার মনকে আরও অসহায় করে তুলছে। শহরের এ বিশালতা, জনতার ভিড় সবকিছু যেন লিমন আর বেলিকে আড়াল করে রেখেছে। এভাবে দিন যায়, রাত যায়। লিমনের বাবা হাল ছাড়েন না, কিন্তু ক্রমেই হালকা হতাশা তাকে ঘিরে ধরে।

লিমনের মা প্রায় প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল-বিকেল দুই বেলায় স্টেশনে যান। চোখে আশার ঝিলিক নিয়ে, বারবার চারপাশে তাকান, যেন কোনো মুহূর্তে লিমন আর বেলির মুখটা দেখতে পাবে। স্টেশনে বসে থাকাকালীন তিনি লোকদের সঙ্গে কথা বলেন। সবচেয়ে সাধারণ কথাও যেন তার চোখের আশাকে আরও দৃঢ় করে। তিনি বারবার ট্রেন আসার দিকে তাকিয়ে থাকেন। সবসময় মনে মনে বলেন,
-আইজ অবশ্যই হেরা ফিরবো।
লিমন আর বেলি শহরে থাকা অবস্থায়, যখন কোনো কারণে খবর পৌঁছায় না, তখনও মা তাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য বসে থাকতেন। মানুষজন তাকে দেখে অবাক হয় একই জায়গায় বসে, বারবার ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকা।

সন্ধে নামল। স্টেশনের ভিড় আর ট্রেনের হুইসেলের শব্দ দূরে পিছনে থেকে হারাতে লাগল। লিমনের মা একাই বাড়ির পথ ধরলেন। তিনি ক্লান্ত, কিন্তু চোখে এখনও আশা ও চিন্তার মিশ্রণ। কিন্তু হঠাৎ অন্ধকারে কিছু নড়াচড়া হলো। লিমনের মা চোখ বড় করে তাকালেন। এক মুহূর্তে যেন সব স্থির হয়ে গেল। অবাক হয়ে তাকিয়ে তিনি দেখলেন মায়াবী অরণ্যের দিকে। সেখানে সেই পরিচিত মানুষের মুখ, সেই পরিচিত উপস্থিতি। যার কথা গ্ৰামের সকলে জানে।
লিমনের মা শিউরে উঠলেন। মনে হল যেন তার হৃদয় হঠাৎ থেমে গেছে।
অরণ্যের এক পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে লিমনের মায়ের পরিচিত মুখটার মালিক। লিমনের মা দ্রুত দৌড়ে চলে গেলেন তার কাছে। তার চোখে আশা, মনে তীব্র উৎকণ্ঠা। কিন্তু যতই এগোতে চেষ্টা করলেন পথ যেন বাড়তে থাকল।
হঠাৎ করেই লিমনের মা বুঝল সে দূরের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ঘন অরণ্যের মধ্যে ঢুকে গেছে। যেন জঙ্গল তাকে গিলে খেয়েছে।
লিমনের মা একপাশে থমকে দাঁড়ালেন। তার বুক ধুকপুক করছে, চোখে অদ্ভুত আতঙ্কের ছাপ। চারপাশে শুধু গাছ, নীরবতা আর অন্ধকার।

লিমনের মা তাড়াহুড়ো করে বাড়ির দিকে ফিরে এলেন। ধুলো-মাখা রাস্তা পেরিয়ে দরজা খুলেই ভিতরে ঢুকলেন। চোখে অদ্ভুত উত্থান, কণ্ঠে কম্পমান আতঙ্ক তিনি ঠিক বুঝতে পারছিলেন, যা দেখেছেন তা ভ্রম নয়।
তিনি লিমনের বাবার দিকে দৌড়ে গেলেন। হাত কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
-আমি দেইখাছি তারে। সে… সে অরণ্যের মধ্যে হঠাৎ মিলাইয়া গেছে।
লিমনের বাবা প্রথমে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। চোখ বড় করে তাকালেন, মাথা নাড়ালেন, কিন্তুলিমনের মায়ের চোখে থাকা সত্যিকারের আতঙ্ক দেখেও তিনি অবিশ্বাসে বললেন,
-না বুটে, তুই ভুল দেখেছিস। এইডা কল্পনা

লিমনের মা চেষ্টা অনেক করলেন বোঝানোর কিন্তু লিমনের বাবা কেবল চুপ করে রইলেন।
পাড়ার প্রায় সকলেই জানে লিমনের মা এখন অর্ধ-পাগল। তার কথা এখন কেউ বিশ্বাস করে না। ঘরের মধ্যে তার চিৎকার, হাহাকার সবকিছু গ্রামের মানুষজন শুধুই পাগলের প্রলাপ মনে করে।
আর তাই সবাই বিশ্বাস করল না। কেউ পাত্তা দিল না।

অন্ধকার কক্ষের কোণে মোমবাতির আলো ঝলমল করছে। ইরা এবং সেই ছায়ার আড়ালে থাকা লোকটি দাবা খেলতে বসেছে। দু’জনের চোখে একরকম কঠোরতা। প্রতিটি ছক, প্রতিটি পাথরের দিকে নজর আছে। মোমবাতির নরম আলোতে দাবার পাথরের ছায়া ঘরের দেওয়ালে নাচছে। দু’জনই চুপচাপ, একে অপরের প্রতি লক্ষ্য রাখছে, যেন এই খেলাতেও কেউ কারও কাছে হাল ছাড়বে না।
ঘরটা পুরো অন্ধকার, শুধু মোমবাতির আলো তাদের হাত, পাথর আর চোখের দিকে কেন্দ্রীভূত। একেকটা পদক্ষেপ, একেকটা ধাপ দু’জনের কঠোরতার খেলা, এক অদ্ভুত রহস্যময় পরিবেশে গলে যাচ্ছে।

মোমবাতির নরম আলো ঘরে নেচে চলল।
ইরা মুখোশধারী লোকটার দিকে তাকালো, চোখে উদ্বিগ্নতা আর আগ্রহ মিশে আছে।
মুখোশধারী লোকটা ইরাকে বলল,
-তুমি... রুহানিয়ার সম্পর্কে কতটুকু জানতে পেরেছ?

ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার কণ্ঠ কাঁপছিল না, কিন্তু ছিল গভীর বুদ্ধিমত্তার ছাপ।
-খুবই… খুবই অল্প।
-ধীরে ধীরে বলল, যেন প্রতিটি শব্দ আলাদা করে ভেবে বলা হচ্ছে।
লোকটা কাঁধ সামান্য এগিয়ে নিয়ে আরও গভীরভাবে জিজ্ঞেস করল,
-অতীতের কোনো ঘটনা কি তার সাথে যুক্ত?
কেন কেউ তাকে ব্যবহার করতে চাইতে পারে?

ইরা চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তিনি সমস্ত উত্তরকে নিজের ভেতরে সংরক্ষণ করছেন।
-শুধু যারা খুব কাছের, তারা কিছুই জানে না।
আর যারা জানে... তারা খুব সাবধানে চলে।
ইরা মাথা হেলাল, চোখে নিশ্চয়তার ছাপ।
মোমবাতির আলো উভয়ের মুখে ছায়া ফেলছে,
দৃশ্যটা যেন একটি দাবার খেলার মতো। সাবধানতা, বুদ্ধি, এবং রহস্যে পূর্ণ।
দু’জন চুপচাপ বসে রইল। অন্ধকার ঘর, মোমবাতির আলো, এবং এই ধীর ও গভীর কথোপকথন কিন্তু রুহানিয়ার আসল পরিচয় এবং উদ্দেশ্য এখনও অজানা থাকল।
এই রহস্যের ভেতর এক গভীর ছলকৌশল লুকানো আছে...
ঘরের নীরবতা আরও গভীর হলো। শুধু মোমবাতির ঝলক আর দু’জনের চোখের দৃঢ়তার মধ্যে, রুহানিয়ার নামের মতো এক রহস্যময় ছায়া ঘরে ভেসে বেড়াচ্ছে।

ইরা জানতো সেই অচেনা আগুন্তক আবার আসবে। ইরা নিজেও তার অপেক্ষায় ছিল কটা রাত। নতুবা ইরা সেই মানচিত্র টায় দেখানো কক্ষটা খুঁজে পাবেনা। ইরার রহস্যময় মানুষটার বুদ্ধির তারিফ করল। কেননা লোকটা বারান্দায় এসে নেকি সুরে বলল,
-তিলত্তমা বুঝি আমার অপেক্ষায় আছে...

ইরা কিছুক্ষণ থ মেরে রইল। এই লোক কিভাবে জানলো সে তার অপেক্ষায় আছে। ইরা কোনো কথা ছাড়াই লোকটাকে বলল,
-মানচিত্র টা দেখুন, আর আমাকে সেই কক্ষের সন্ধান দিন।

লোকটা বোধহয় মুখোশের আড়ালে একটু হাসলো। তারপর বলল,
-শুনলাম বড় ঘর থেকে তোমার সম্বন্ধ এসেছিল।

ইরা অবাক হয়ে বলল,
-এইটাও আপনার অবগত?

লোকটা ইরার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
-আকাশী রঙ আমার খুব পছন্দের। তোমাকে এখন থেকে সেটাও অবগত রাগতে হবে

ইরার যেন আকাশ থেকে পড়ল। এই লোক তার বিষয়ে সব জানে। ইরা তার মুখোশ টা টেনে খুলে ফেলতে চাইল। কিন্তু মুখোশধারী লোকটা ইরার হাত চেপে ধরে বলল,
-বৃথা চেষ্টা চালিও না। তার চেয়ে বরং মানচিত্র টা দাও

ইরা বাধ্য মেয়ের মতো আলমারির দিকে গেল। লোকটা ধপ করে পালঙ্কে শুয়ে পড়ল। যেন এ তার পরিচিত কক্ষ, পরিচিত মানুষ।
লোকটার শুয়ে পড়া দেখে ইরা কপাল কুঁচকে বলল,
-উঠুন আমার পালঙ্ক থেকে...

লোকটা ক্যাট ক্যাট করে বলল,
-জমিদারের মেয়ে বলে এত দেমাগ ভালো না।
দেখবে কপালে টাকু বর জুটবে।

ইরা মুখ ঝামটা মেরে বলল,
-টাকু হলে হোক, কিন্তু আপনার মতো বেহায়া না হোক। প্রগাঢ় রাতে একটা মেয়ের ঘরে ঢুকতে আপনার লজ্জা করে না।

লোকটা বলল,
-এত রাতে একটা অচেনা অজানা লোকের জন্য অপেক্ষা করতে তোমার ভয় করে না।
যদি কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলি।

ইরা আমতা আমতা করে বলল,
-আমি শুধু মানচিত্র টা বোঝার জন্য আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।

-কেন আমি কি বিদ্যালয়ের মাষ্টার মশাই যে সব বুঝিয়ে দিব।
বলেই সে ইরার দিকে হাত বাড়াল।
ইরা ভয়ে দুপা পিছিয়ে গেল। লোকটা হেসে বলল,
-মানচিত্র টা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছি।

ইরা কাঁপা হাতে মানচিত্র টা এগিয়ে দিল।

-যদি কিছু করার হতো তাহলে তোমার ঘুমের ঘোরেই করে ফেলতাম। তোমার রক্তজবা ঠোঁটের উপরের তিলদুটো বড্ড টানে আমায়...
এই বলেই সে চোখ মারল।

কিন্তু ইরা নেতিয়ে গেল। যতই হোক একটা অচেনা অজানা পুরুষের সাথে সে একই কক্ষে আছে। সুযোগ পেলে কোনো পুরুষ বুঝি ছেড়ে দেয়।

লোকটা অনেকক্ষণ যাবৎ মানচিত্র টা উল্টে পাল্টে দেখার পর বলল,
-তুমি দাবা খেলতে পারো...

ইরা উপর নিচ মাথা নাড়ালো। দাবা খেলায় সে পারদর্শী। জমিদার বাড়ির সব মহিলাদের সাথে সে দাবা খেলায় বিজয়ী হয়েছে। আজ প্রথম বার কোনো পুরুষের সাথে সে দাবা খেলায় মেতে উঠেছে। না নিজের ইচ্ছায় নয়। খেলার জিততে পারলে তবেই মানচিত্র রহস্য সে বলে দিবে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে দাবার ঘুঁটি সাজাচ্ছে। লোকটা অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ইরা দিকে। এরপর ইরা বলল,
-নিন চালুন।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। মোমবাতির আলোয় দাবার বোর্ডটা যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র।
ইরা ধীর ভঙ্গিতে তার রাণীটাকে এক ঘর সামনে এগিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি রেখে বলল,
-রাণীরা কখনো সরাসরি যুদ্ধ করে না, তারা ছায়ার আড়াল থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করে।

লোকটা মৃদু হেসে ঘোড়াটা L আকারে লাফিয়ে সামনে আনল। তার চোখে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।
-ঠিকই বলেছো। কিন্তু মাঝে মাঝে একটা ঘোড়াই পুরো খেলা উল্টে দেয়। কারণ সে কখনো সোজা পথে চলে না।

ইরা এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর তার এক সৈন্যকে ধীরে ধীরে এগিয়ে দিল।
-সৈন্যদের কথা ভুলে যাচ্ছেন না তো? তারা ছোট...কিন্তু প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়েও রাণীকে বাঁচায়।

এরার লোকটা সামান্য ঝুঁকে বোর্ডের দিকে তাকাল। তার আঙুল ছুঁয়ে গেল হাতিটাকে। সোজা লাইনে এগিয়ে দিল।
-হাতি... সব সময় সোজা চলে। কিন্তু যখন সে আঘাত করে, তখন পথের সবকিছু সরিয়ে দেয়। ঠিক আমার মতো।

ইরার চাল দেওয়ার পর লোকটা হালকা হেসে তার রাজাটাকে এক ঘর সরাল। মুখোশের আড়াল থেকে বলল,
-রাজা কখনো তাড়াহুড়ো করে না। সে শুধু অপেক্ষা করে সঠিক মুহূর্তের জন্য।

ইরার চোখে তখন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। সে তার রাণীকে তির্যকভাবে এগিয়ে এনে রাজাকে ফাঁদে ফেলে বলল।
-কখনো কখনো, রাজাকে অপেক্ষা করতে দিলে… সে ফাঁদে পড়ে যায়। চেক

মুখোশধারী লোকটা বোর্ডের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে তার উটটা সরালো, আক্রমণ ঠেকাল। তারপর চোখ তুলে তাকাল ইরার দিকে।
-খেলা এখনো শেষ হয়নি, ইরা। তুমি শুধু আমার একটা চাল দেখেছো… পুরো খেলা না।

ইরার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। সে বলল,
-আমি জানি। তাই তো এই খেলাটা এত উপভোগ করছি।

মোমবাতির শিখা কেঁপে উঠল। বোর্ডে ঘুঁটিগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে কিন্তু তাদের প্রতিটা চাল যেন একটা করে গোপন যুদ্ধ।
ঘরের ভেতর তখন নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে উঠেছে। মোমবাতির আলো কাঁপছে, যেন সে-ও জানে শেষ চালটা আসতে যাচ্ছে।
ইরার চোখ বোর্ডে স্থির। তার ঠোঁটে সেই আগের আত্মবিশ্বাসী হাসি আর নেই, তবে সে এখনো হাল ছাড়েনি। সে তার রাণীটাকে একটু এগিয়ে দিল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
-আপনি ভাবছেন খেলা শেষ? না, এখনো আমার রাণী বেঁচে আছে।

লোকটা মাথা তুলল। তার চোখে অদ্ভুত শান্তি। অদ্ভুত কণ্ঠে বলল,
-রাণী বেঁচে থাকলেই খেলা জেতা যায় না... কখনো কখনো একটা ছোট সৈন্যই সব শেষ করে দেয়।

ইরার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে দ্রুত বোর্ডটা দেখল, কোথায় ফাঁদ? তার আগেই লোকটা তার সেই অবহেলিত সৈন্যটাকে এক ঘর এগিয়ে দিলেন।
এক মুহূর্ত…
দুই মুহূর্ত…
ইরারের চোখ বড় হয়ে গেল।
-না… এটা… এটা অসম্ভব…
সৈন্যটা সরাসরি সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। রূপান্তরের ঠিক আগে। আর সেই পথ খুলে দিয়েছে এমন এক আক্রমণ, যেটা ইরা খেয়ালই করেনি।

লোকটা মৃদু হেসে বলল,
-তুমি সব সময় বড় ঘুঁটিগুলোর দিকে নজর দিয়েছো… ছোটদের ভুলে গেছো।

ইরার কাঁপা হাতে তার রাণীটাকে সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু যেদিকেই তাকায় সব পথ বন্ধ। ঘোড়া আটকে রেখেছে এক দিক। উট কেটে রেখেছে আরেকটা। আর সেই সামান্য সৈন্য এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর বার্তা হয়ে।
লোকটা চক করে বলল,
-চেক…

ইরার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। সে শেষবারের মতো বোর্ডে চোখ বুলাল। কোনো পথ নেই।
কোনো রক্ষা নেই। তার কণ্ঠ ধীরে ভেঙে এল,
-…চেকমেট।

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। মোমবাতির আলোয় মুখোশধারী লোকটার চোখে স্পষ্ট শান্ত, স্থির, বিজয়ের হাসি।
আর ইরা…
সে স্থির হয়ে বসে আছে, যেন বুঝতে পারছে, সে হেরেছে শুধু খেলায় নয়, বুদ্ধির লড়াইয়েও।
লোকটা আস্তে করে বলল,
-সবচেয়ে বিপজ্জনক চালটা… সেটাই, যেটাকে তুমি গুরুত্বই দাও না।

সবসময় চোখ টান খোলা রেখে জীবন যুদ্ধে এগোতে হয়। একবার যুদ্ধের ময়দানে পা রাখলে ফিরে আসার কোনো পন্থা নেই। তবুও তুমি ভেবো না তিলোত্তমা, জীবন যুদ্ধে আমি তোমাকে আগলে রাখব, পথ দেখাব। কিন্তু লড়াই টা তোমাকেই করতে হবে। দাবায় রাজা তার রাণীকে পরাজিত করলেও জীবন যুদ্ধে রাজা সবসময় তোমার তার রাণীকে বিজয়ী করবে।

চলে যাবার আগে অচেনা লোকটা ইরাকে বলল,
-মানচিত্র টা উল্টো করে লণ্ঠনের আলোতে ধরো। নাচঘর থেকে দক্ষিণে ১৬ তম কক্ষ।

লোকটা চলে গেছে অনেক্ষণ আগে। ইরা এখনও ঘুমোয় নি। অচেনা এক কারনে তার হৃদয় ব্যথিত। এই নিস্তব্ধ রাত, সঙ্গিহীণ চন্দ্র‌ কোনোকিছুই ইরার মনকে শান্ত করতে পারছে না।

চলবে.....

পর্বটা কেমন‌ হয়েছে মতামত দিতে ভুলবে না কিন্তু 😇

Address

Nazipur

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Ayesha Siddika Asha-আয়েশা সিদ্দিকা আশা posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share