12/08/2026
গল্প ১।
বৃষ্টির দিনগুলো সবসময়ই একটু অদ্ভুত। জানালায় ফোঁটা পড়ার শব্দে যেমন এক ধরনের প্রশান্তি থাকে, তেমনি বুকের ভেতরের পুরনো কোনো ক্ষতও যেন অলক্ষে জেগে ওঠে। আয়ান বারান্দার চেয়ারটায় বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। ঠিক দুই বছর আগে, এইরকমই এক বর্ষার বিকেলে অরণীর সাথে তার শেষবার দেখা হয়েছিল।
আয়ান আর অরণীর সম্পর্কের বয়স ছিল চার বছর। খুব বেশি উপহার বা বড় কোনো আয়োজন তাদের প্রেমে ছিল না। তাদের প্রেমটা মেপে রাখা হতো ছোট ছোট মুহূর্ত দিয়ে—অরণীর হঠাৎ করে টিফিন বক্স থেকে ডিম ভাজি আয়ানের পাতে তুলে দেওয়া, আর আয়ানের না চাওয়া সত্ত্বেও বৃষ্টিতে ভিজে অরণীর প্রিয় কদম ফুল নিয়ে আসা।
কিন্তু মানুষের জীবনের গল্পগুলো তো সবসময় সহজ রেখায় চলে না। আয়ানের বাবার অকস্মাৎ অসুস্থতা আর পরিবারের বিশাল ঋণের বোঝা এক লহমায় বদলে দিয়েছিল দৃশ্যপট। আয়ান নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেছিল। সে ভাবত, তার এই অনিশ্চিত আর বিষণ্ণ জীবনের অংশ বানিয়ে অরণীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করার কোনো অধিকার তার নেই।
একদিন অরণীকে ডেকে আয়ান খুব ঠান্ডা গলায় বলেছিল, "আমাদের আর সামনে এগোনো সম্ভব নয়, অরণী। আমার অগ্রাধিকার এখন বদলে গেছে।"
অরণী কেঁদেছিল, অনুনয় করেছিল। আয়ানের চোখে চোখ রেখে বলেছিল, "তুমি কি সত্যি আমাকে চাও না, নাকি তুমি আমাকে বোঝা মনে করছ?"
আয়ান সেদিন অরণীর দিকে তাকায়নি। কারণ, তাকালে সে হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পারত না। অরণীকে ভালো রাখার জন্যই সে মিথ্যা বলে দূরে সরে গিয়েছিল।
আজ দুই বছর পর, হঠাৎ আয়ানের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল—
"কদম ফুলগুলো শুকিয়ে গেছে আয়ান, কিন্তু ছাতাটা এখনো আমার কাছেই আছে। আজ বিকেলে ক্যাফে বুকমার্কে আসবে?"
মেসেজটা দেখে আয়ানের হাত কেঁপে উঠল। বুকমার্কেও সে ছাতা ফেলে এসেছিল, যেদিন শেষবার বৃষ্টিতে দুজনে ভিজেছিল।
বিকেলে ক্যাফেতে পৌঁছে আয়ান দেখল অরণী বসে আছে জানালার পাশের টেবিলটায়। দুই বছরে অরণী অনেকটাই বদলে গেছে। চুলগুলো আগের চেয়ে ছোট, চোখে চশমা, আর মুখটায় এক ধরনের শান্ত ভাব।
আয়ান অরণীর মুখোমুখি বসল। কিছুক্ষণ দুজনেই নীরব। নীরবতা ভেঙে অরণী একটা পুরনো ডায়েরি আয়ানের সামনে এগিয়ে দিল।
"এটা তোমার ডায়েরি না?" অরণী শুধাল।
আয়ান চমকে উঠল। ডায়েরিটা তো সে দুই বছর আগেই হারিয়ে ফেলেছিল।
অরণী মৃদু হেসে বলল, "তোমার বন্ধু তানভীর গত সপ্তাহে আমাকে এটা দিয়েছে। সে আর সহ্য করতে পারছিল না। সে বলল, 'তুমি অরণীকে ভালো রাখার জন্য যে অভিনয়টা করেছিলে, তা অরণীর সাথে অন্যায় ছাড়া আর কিছু নয়।'"
অরণী একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ দুটি জলে ছলছল করছিল, কিন্তু সে হাসার চেষ্টা করল। "তুমি ভেবেছিলে আমার পাশে একটা আর্থিক বা মানসিক সংকট এলে আমি পালিয়ে যাব? তুমি ভাবলে আমি শুধু তোমার ভালো সময়টার সঙ্গী হতে চেয়েছিলাম? তুমি আমাকে অতটা স্বার্থপর মনে করলে কীভাবে, আয়ান?"
আয়ানের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে শুধু নিচু স্বরে বলল, "আমি তোমাকে কষ্টে দেখতে চাইনি, অরণী।"
"তাহলে এই দুই বছর ধরে আমাকে যে অনিশ্চয়তা আর অবহেলার কষ্ট দিলে, সেটা কী ছিল?" অরণীর গলা ধরে এল। "ভালোবাসা মানে শুধু একসাথে হাসা নয়, আয়ান। ভালোবাসা মানে একজনের ঝড়ে অন্যজনের শক্ত করে হাত ধরে রাখা। তুমি আমাকে সেই হাতটা ধরার সুযোগই দাওনি।"
আয়ান ডায়েরিটার দিকে তাকাল। সেখানে প্রতিটা পাতায় লেখা ছিল অরণীকে হারানোর যন্ত্রণা আর তার প্রতি আয়ানের অন্তহীন ভালোবাসার কথা।
আয়ান মুখ তুলে অরণীর হাত দুটো চেপে ধরল। তার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। "আমাকে ক্ষমা করে দাও, অরণী। আমি ভেবেছিলাম আমি খুব মহান কাজ করছি। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, তোমাকে রক্ষা করতে গিয়ে আমি আমাদের দুজনের জীবনটাকেই শূন্য করে দিয়েছি।"
অরণী তার হাত ছাড়িয়ে নিল না। বরং আয়ানের হাত শক্ত করে ধরে বলল, "তোমার ঋণের বোঝা কিংবা তোমার পরিবারের দায়িত্ব—এগুলো কোনোটাই তোমার একার নয়। আমরা যদি আবার শুরু করি, আমরা কি সব সামলে নিতে পারব না?"
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নামছিল। ক্যাফের কাচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছিল। তবে দুই বছর পর এই প্রথম আয়ানের মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত মেঘ কেটে গিয়ে আবার একটু রোদের আলো ফুটছে। ভালোবাসার মানুষটা পাশে থাকলে যেকোনো ঝড়ের মুখোমুখি হওয়া যায়, এই সত্যটা বুঝতে তাদের অনেকটা সময় লেগে গেল সত্যি, কিন্তু তারা আবার একসাথে পথচলা শুরু করল।
#গল্প Saiful Islam Rohan