10/08/2026
স্কুল নিয়ে সমালোচনা কখনোই করতে চাই না। সত্যি বলতে গেলে সমালোচনা করার ইচ্ছা আমার নেই কারণ এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আমার শৈশব, কৈশোর, অসংখ্য স্মৃতি এবং জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মিশে আছে। একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করা কখনোই আমার জন্য আনন্দের কোনো বিষয় নয়।
কিন্তু কিছু কিছু পরিস্থিতি এমন হয়- যেখানে নীরব থাকাটাও এক ধরনের অন্যায় মনে হয়। তাই,আজকের ফলাফল দেখার পর তাই কিছু কথা না বলে পারলাম না।
“মাত্র ২টা A+? How funny!”
এটা কি সেই ম্যাকস স্কুলের Legacy?
এতটা “অধঃপতন” কি সত্যিই এই প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য ছিল?
✅ চলুন, একটু পেছনে ফিরে তাকাই... একটু সমালোচনা করি....
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে বলতেছি- স্কুলের বর্তমান অবস্থার অবনতি এখন থেকে না বরং করোনা-পরবর্তী সময় থেকেই স্পষ্টভাবে শুরু হয়েছে। করোনার সময় যারা শিক্ষার্থী ছিল, তাদের অনেকেই স্কুল থেকে হয়তো ৩০%, Private Tutor থেকে ৫০% এবং বাকিটুকু নিজেদের প্রচেষ্টা, পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করে স্কুলকে ভালো ফলাফল এনে দিয়েছে।
কিন্তু করোনা-পরবর্তী সময়ে এসে সেই চিত্রটা ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে।
এর অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায় “শিক্ষক সংকট”।
এখানে “শিক্ষক সংকট” বলতে আমি মোটেও বোঝাতে চাচ্ছি না যে স্কুলে শিক্ষক নেই। শিক্ষক আছেন। বর্তমানে যারা শিক্ষকতা করছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব যোগ্যতা, মেধা ও দক্ষতা রয়েছে এবং তাঁদের প্রতি ব্যক্তিগত কোনো অসম্মান বা অভিযোগও নেই আমার।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়...!
কি সেই প্রশ্ন? চলেন উত্তর খুঁজি....
“ম্যাকস স্কুলের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের SSC পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য যে ধরনের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, প্রস্তুতি ও একাডেমিক নেতৃত্ব প্রয়োজন—সেটা কি বর্তমান শিক্ষকদের মধ্যে যথেষ্ট আছে?”
আমার উত্তর—“না, যথেষ্ট নয়।”
একজন ভালো শিক্ষক হওয়া এবং একটি প্রতিষ্ঠানের SSC পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিকভাবে বোর্ড পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা—দুটি এক জিনিস নয়। এর জন্য দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সঠিক পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বোঝার সক্ষমতা এবং পুরো সিলেবাসকে কাভার করার মতো একটি সুসংগঠিত একাডেমিক পদ্ধতি প্রয়োজন। শুধু পড়াতে পারলেই সেই শিক্ষক ভালো রেজাল্ট এনে দিতে পারে না।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় ঘাটতিটা তৈরি হয়েছে..!!
✅ সত্যি বলতে গেলে, “পিয়াল স্যার, সাদ্দাম স্যার,ইউসুফ স্যার, মেহেদী স্যার এবং আমিরুল স্যার” চলে যাওয়ার পর তাঁদের জায়গাটা স্কুল কর্তৃপক্ষ আর আগের মতো করে পূরণ করতে পারেনি। আগের মতো বললে ভুল হবে, পূরণ ই করতে পারে নাই।
তাঁদের প্রত্যেকের পড়ানোর ধরন আলাদা ছিল, কিন্তু একটা জায়গায় মিল ছিল—তাঁরা শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার জন্য পড়াতেন না; বরং পরীক্ষার বাইরেও একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক ভিত্তি তৈরি করার চেষ্টা করতেন। তারা যেগুলো শিখায় গেছে, সেগুলো এখনো আমি ব্যবহার করি -বাহ্যিক জীবনে।
তাঁদের চলে যাওয়ার পর সেই জায়গায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটি সময়ের সঙ্গে পূরণ হওয়ার বদলে আরও শূন্যস্থান তৈরী হয়েছে।
আর একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন অভিজ্ঞ মানুষের চলে যাওয়ার পর তাঁদের জায়গা পূরণ করার মতো একটি শক্তিশালী “Academic Backup System” থাকে না।
ম্যাকস স্কুলের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।।।
এর পাশাপাশি স্কুলের ভেতরে বিভিন্ন পরিবর্তন আনতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মূল একাডেমিক অবকাঠামোর কিছু জায়গা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি, প্রশাসন—সবকিছুতেই পরিবর্তন আসবে। কিন্তু পরিবর্তনের নামে যদি শিক্ষার্থীদের “মূল শিক্ষাব্যবস্থা” দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সেই পরিবর্তন আর উন্নয়ন থাকে না। সেটাকে তখন অবমূল্যায়ন বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি বলা হয়। এবং সেটাই একসময় অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
✅ আরেকটি বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ-
ম্যাকস স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকের কাছে Private বা Coaching করার প্রবণতা বরাবরই বেশি ছিল। এর পেছনে কেন এমনটা হয়েছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন আমি মনে করতেছি না। কেন তারা সেসকল নির্দিষ্ট টিচার কে খুঁজে , কেন তারা নিজের প্রতি আত্মনির্ভরশীলতা পায় না? - সেটি নিয়ে কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা দরকার।
“একজন শিক্ষার্থী যদি স্কুলের ক্লাসের পরিবর্তে বাইরের একজন শিক্ষকের ওপর তার একাডেমিক ভবিষ্যতের জন্য বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রশ্নটা শিক্ষার্থীর নয়; প্রশ্নটা শিক্ষা ব্যবস্থার।”
অতএব; স্কুল থেকে সে তার প্রাপ্যটুকু টায় না বলেই অতিরিক্ত টিউটর তার দরকার হয়।
✅এবার আসি ক্লাস নেওয়ার পদ্ধতির বিষয়ে-
অনেক জুনিয়রের কাছ থেকেই শুনেছি, ক্লাসে অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু টপিকের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় অর্থাৎ ক্লাসে যাস্ট কয়েকটা টপিক পড়ানো হয় এবং স্কুল পরীক্ষাতেও মূলত সেসব থেকেই প্রশ্ন করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা অল্প পড়াশোনা করেই স্কুল পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারছে কিংবা কোনোভাবে পাস করে যাচ্ছে।
কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে ভয়ংকর সমস্যাটি।
“স্কুল পরীক্ষা পাস করা আর SSC পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হওয়া এক বিষয় নয়।”
একজন শিক্ষার্থী যদি শুধু পরীক্ষায় আসার সম্ভাবনা আছে এমন কিছু নির্দিষ্ট টপিক পড়ে, তাহলে সে হয়তো স্কুলের পরীক্ষায় ভালো করতে পারবে। কিন্তু এতে পুরো সিলেবাসের ওপর তার পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি হবে না।
আর SSC পরীক্ষা তো কোনো নির্বাচিত কয়েকটি টপিকের পরীক্ষা না যে শুধু ক্লাসে পাস করলেই খেলা শেষ!!!
সেখানে পুরো সিলেবাস থেকেই প্রশ্ন আসতে পারে। ফলে বছরের পর বছর যদি শিক্ষার্থীদের “Selective Study” বা বাছাই করা কিছু বিষয়নির্ভর পড়াশোনার অভ্যাস তৈরি হয়, তাহলে বোর্ড পরীক্ষার সময় গিয়ে সেই ঘাটতিটা খুব স্বাভাবিকভাবেই হবে।
তাই , আজকের ফলাফলকে আমি শুধু “২টা A+” দিয়ে বিচার করতেছি না। কারণ একটি ফলাফল হঠাৎ করে তৈরি হয় না। অবশ্যই এর পেছনে কিছু আছে।।
একটি ফলাফলের পেছনে থাকে কয়েক বছরের ক্লাস, শিক্ষকতা, একাডেমিক পরিকল্পনা, পরীক্ষা পদ্ধতি, সিলেবাস কাভারেজ, শিক্ষার্থীদের মানসিকতা এবং সর্বোপরি একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা।
আজকের ফলাফল আসলে গত কয়েক বছরের সেই পুরো প্রক্রিয়ার একটি প্রতিফলন।
✅ জালালপুরের মানুষ যেখানে একসময় “ম্যাকস স্কুল” ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কল্পনাই করতো না, সেখানে আজ এই অবস্থাটা সত্যিই কষ্টদায়ক।
একসময় ম্যাকস স্কুলের নাম শুনলেই মানুষের মধ্যে একটা আলাদা বিশ্বাস তৈরি হতো। “ম্যাকসের ছাত্র”—এই পরিচয়ের মধ্যেই একটা আত্মবিশ্বাস ছিল। একজন শিক্ষার্থী ম্যাকস স্কুলে পড়লে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের একটা নিশ্চয়তা কাজ করত।
সেই জায়গাটা কি এখন আছে?
নাকি আমরা ধীরে ধীরে সেই জায়গাটা হারিয়ে ফেলছি?
প্রশ্নটা শুধু আজকের ফলাফল নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আগামী পাঁচ বছর নিয়ে। প্রশ্নটা আগামী দশ বছর নিয়ে।
প্রশ্নটা সেইসব শিক্ষার্থী নিয়ে, যারা আজ স্কুলের বেঞ্চে বসে নিজেদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে।
(“এটা কি শুধুই একটি প্রতিষ্ঠানের অধঃপতন? নাকি এর সঙ্গে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা? তাদের লাইফ, ক্যারিয়ার -সবকিছু? ") - প্রশ্ন রইল কর্তৃপক্ষের কাছে।।
কারণ একটি স্কুলের অবনতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অবনতি নয়। একটি ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব পড়ে পুড়ো সেই এলাকার ওপর।
তাই আজকের এই লেখাকে কেউ যেন কোনো শিক্ষক বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে না দেখেন।
এটা একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর-অভিমান
এটা একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর-কষ্ট
আর সবচেয়ে বড় কথা—এটা সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর “দায়বদ্ধতা”।
কারণ যার কাছ থেকে আমরা এত কিছু পেয়েছি, তার খারাপ সময়ে প্রশ্ন তোলা মানে তাকে ছোট করা নয়; বরং তাকে আবার ভালো অবস্থানে দেখতে চাওয়া।
আমি চাই, ম্যাকস স্কুল আবার তার সেই পুরোনো অবস্থানে ফিরে যাক। আবার যেন শিক্ষার্থীরা স্কুলের শিক্ষকদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারে। আবার যেন একজন শিক্ষার্থীকে পুরো সিলেবাস শেষ করার জন্য বাইরে ছুটতে না হয়।
আবার যেন “ম্যাকস স্কুল” নামটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নাম না হয়ে জালালপুরের শিক্ষাব্যবস্থার একটি “বিশ্বাসের নাম” হয়ে ওঠে।
আমি চাই, স্কুল কর্তৃপক্ষ বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র একটি ফলাফল হিসেবে না দেখে এটিকে একটি “Warning Sign” হিসেবে দেখুক।
কারণ আজ ২টি A+ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে...
আগামীকাল যেন প্রশ্নটা আরও বড় না হয়!!
👉 শেষে শুধু একটা কথাই বলতে চাই—
“একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন যত বড়ই হোক, তার প্রকৃত উচ্চতা নির্ধারিত হয় সেই প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দিয়ে।” আর যদি সেই ভবিষ্যৎ গড়ার জায়গাটাই দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে যত সুন্দর অবকাঠামোই তৈরি করা হোক না কেন, একটি সময় পর সেই প্রতিষ্ঠান নিজের অস্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটাই হারিয়ে ফেলবে।
খুবই কষ্ট লাগলো আজকের রেজাল্ট দেখে। আমি সহ সকল প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী চাই— “ম্যাকস স্কুল তার অতীতে ফিরে যাক।”
শুধু ফলাফলে নয়, শিক্ষার মানে ফিরে আসুক। শুধু পরীক্ষায় নয়, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে ফিরে আসুক। আর আমরা যেন আবার গর্ব করে বলতে পারি— “হ্যাঁ, আমি ম্যাকস স্কুলের ছাত্র ছিলাম।”
ছোট বেলায় "নুরুল স্যার" যে স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, সেটি যেন সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে আবার দেখতে পারি- এই কামনা করছি।
ধন্যবাদ,
শাহরিয়ার শাফি,
প্রাক্তন শিক্ষার্থী- Ssc 23
প্রাক্তন শিক্ষার্থী - ঢাকা কলেজ Hsc 25
বর্তমান - Unity Environmental University, USA
।
।।
।