27/05/2026
কুরবানির এই বিষয় নিয়ে আমি ছোট থেকেই কোথাও লিখবো লিখবো বলে চিন্তাই ছিলাম আজ ভাবলাম আমার মনের এই বিষয়গুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করি।আগামীকাল অর্থাৎ ২৮ শে মে ২০২৬ তারিখে ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমরা যাকে সহজ ভাষায় কুরবানির ঈদ বলে থাকি। এই কুরবানি ঈদ যখনই আসে তখনই আমার মনে মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্ন জাগে যা শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বাস্তবে এটা আমার মনে হয় কার্যকর কিন্তু আপনাদের কাছে কি মনে হবে সেটা জানা নেই যদি ভালো লাগে তাহলে পড়ে নিজের জীবনের সাথে এটা মিলিয়ে দেখ
তে পারেন যে এটার বাস্তবতা কতটুকু বা আপনি ভুল জায়গায় আছেন নাকি সঠিক জায়গায় আছেন।
কুরবানি কেবল একটি উৎসব বা প্রথা নয়, এটি ত্যাগের এক অনন্য ইবাদত। কিন্তু আমাদের সমাজে কুরবানির মাংস বণ্টন নিয়ে এমন কিছু নিয়ম গড়ে উঠেছে, যা পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে। বিশেষ করে আমাদের সামাজিকভাবে মাংস একত্রিত করে বণ্টন করার যে নিয়মটি রয়েছে, তা দারুণ হলেও এর ভেতরের কিছু চর্চা আমাদের কুরবানির মূল চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
আমরা কোথায় ভুল করছি?
আত্মীয়-স্বজনের 'মন ভোলানো'র প্রতিযোগিতা:
আমরা অনেক সময় কুরবানির একটি বড় অংশ রেখে দিই লোকদেখানো উপহার বা আত্মীয়দের মন ভোলানোর জন্য। অথচ যারা নিজেরাও কুরবানি দিয়েছেন, তাদের বাড়িতেও আমরা বড় বড় মাংসের অংশ পাঠাচ্ছি।
হকের অপচয়:
যারা কুরবানি দিতে পেরেছেন, তাদের ঘরে মাংসের অভাব নেই। কিন্তু আমরা সামাজিকতার দোহাই দিয়ে তাদেরকেই বারবার মাংস দিচ্ছি, আর প্রকৃত অভাবী মানুষগুলো সামান্য একটু মাংসের জন্য এক দুয়ার থেকে অন্য দুয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সামাজিক বণ্টনের সীমাবদ্ধতা:
সমাজে যারা কুরবানি দিতে পারেননি, সমাজ থেকে তাদের যে অংশটুকু দেওয়া হয়, তা অনেক সময়ই একটি বড় পরিবারের জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল। অথচ আমরা ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতন হলে তাদের অভাব অনেকটাই দূর করা সম্ভব হতো।
কোরবানির মাংস মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
১. এক ভাগ নিজের জন্য।
২. এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর জন্য।
৩. এক ভাগ সম্পূর্ণ গরিব, দুস্থ ও মিসকিনদের জন্য।
এখানে মনে রাখা জরুরি, আত্মীয় ও প্রতিবেশী বলতেই শুধু ধনী বা সামর্থ্যবানদের বোঝায় না। যে প্রতিবেশী বা আত্মীয় কুরবানি দিতে পারেননি, তাদের হক সবার আগে। অথচ আমরা সমাজ ও লৌকিকতার ভয়ে এমন আত্মীয়দের দিচ্ছি যারা নিজেরাই কুরবানি দিয়েছেন, আর যারা অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন, তাদের এড়িয়ে যাচ্ছি।
সমাজকে সুশৃঙ্খল করতে আমাদের যা করা উচিত:
১. অভাবীদের অগ্রাধিকার দেওয়া: আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত পাড়া-মহল্লা বা আত্মীয়দের মধ্যে যারা সত্যিই কুরবানি দিতে পারেননি, তাদের ঘরে পর্যাপ্ত মাংস পৌঁছে দেওয়া।
২. লৌকিকতা পরিহার করা: যিনি নিজেই কুরবানি দিয়েছেন, তাকে মাংস উপহার দিয়ে মন ভোলানোর চেয়ে, সেই অংশটুকু কোনো এতিমখানা বা দরিদ্র পরিবারে দান করা অনেক বেশি সওয়াবের এবং যৌক্তিক।
৩. সামাজিক বণ্টনে ন্যায্যতা আনা: সমাজের দায়িত্বশীলদের উচিত যারা কুরবানি দিতে পারেনি, তাদের তালিকা করে বেশি পরিমাণে মাংস বণ্টন করা, যাতে ঈদের দিন কোনো পরিবার যেন বঞ্চিত না থাকে।
কুরবানির মাংস বণ্টন: আরও কিছু কঠিন ও তেতো বাস্তবতা।
১. ফ্রিজ ভর্তি করার আধুনিক 'কুরবানি' আমাদের অনেকের ঘরেই এখন কুরবানির মূল প্রস্তুতি শুরু হয় ডিপ ফ্রিজ পরিষ্কার করার মাধ্যমে। নিয়ত থাকে—কুরবানির মাংস দিয়ে আগামী ৪-৬ মাস ফ্রিজ লোড করে রাখা হবে। অথচ কুরবানি ছিল ত্যাগের উৎসব। আমরা ত্যাগের চেয়ে ‘সঞ্চয়’ আর ‘ভোগের’ হিসাবটা এত নিখুঁতভাবে করি যে, গরিবের হকের কথা ভুলেই যাই। ফ্রিজে মাংস জমিয়ে রেখে বছরের পর বছর খাওয়া কুরবানির মূল চেতনার পরিপন্থী।
২. 'মাংসের বদলে মাংস' পাওয়ার বিনিময় প্রথা
আজকাল কুরবানির মাংস বণ্টন একটা ব্যবসার মতো হয়ে গেছে। আমরা অমুকের বাড়ি ৫ কেজি মাংস পাঠাই, কারণ আমরা জানি ওখান থেকেও ৫ কেজি দামি মাংস ফেরত আসবে। যে বড়লোক আত্মীয় বা প্রতিবেশী আমাদের ভালো মাংস ফেরত দিতে পারবে না, বা যিনি নিজেই কুরবানি দিতে পারেননি—তার বাড়িতে মাংস পাঠানোর ব্যাপারে আমাদের হাত গুটিয়ে আসে। এটা কুরবানির মাংস বণ্টন নয়, এটা হলো 'মাংসের বিনিময় প্রথা'।
৩. গরিবের জন্য 'হাড়-চর্বি', আর ধনীদের জন্য 'ভালো টুকরো' সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো মাংস কাটার পরের দৃশ্য। আমরা যখন আত্মীয় বা প্রভাবশালীদের জন্য প্যাকেট করি, তখন বেছে বেছে সবচেয়ে ভালো সলিড মাংস, রান বা সিনার অংশ দিই। আর যখন দরজায় কোনো অভাবী মানুষ এসে দাঁড়ায়, তখন মাংসের স্তূপ থেকে খুঁজে খুঁজে হাড়, অতিরিক্ত চর্বি বা ছোট ছোট উচ্ছিষ্ট টুকরোগুলো তাদের প্যাকেটে চালান করে দিই।
৪. লাইনে দাঁড় করিয়ে আত্মসম্মানে আঘাত করা
সমাজ থেকে মাংস দেওয়ার নামে আমরা অনেক সময় অভাবী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখি। এরপর তাদের হাতে মাত্র আধা কেজি বা এক কেজি মাংস তুলে দিই। এতে তাদের অধিকার আদায় হয় না, বরং তাদের দারিদ্র্যকে উপহাস করা হয় এবং তাদের আত্মসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়। অথচ প্রকৃত নিয়ম ছিল, সামর্থ্যবানরা খুঁজে খুঁজে অভাবীদের ঘরে গিয়ে সসম্মানে মাংস পৌঁছে দিয়ে আসবে।
সমাজ কেন পরিবর্তনকে ভয় পায়?
অভ্যাসের দাসত্ব: আমাদের সমাজে একটা কথা খুব প্রচলিত—"বাপ-দাদারা যা করে গেছে, সেটাই নিয়ম।" আমরা নিয়মের পেছনের মূল উদ্দেশ্য বা মানবিক দিকটা ভুলে গিয়ে কেবল অন্ধের মতো নিয়মটাকেই ভালোবেসে যাই।
ভুলকে 'ঐতিহ্য' ভাবা: একটা ভুল কাজ যখন সমাজের ১০ জন মানুষ বছরের পর বছর ধরে করতে থাকে, তখন সেটা ভুল জেনেও মানুষ সেটাকে 'সামাজিক নিয়ম' বা ঐতিহ্য মনে করে ধরে রাখে। নতুন কেউ এসে সঠিক কথাটা বললে তাকেই উল্টো 'বেয়াদব' বা 'বেশি বোঝে' বলে তকমা দেওয়া হয়।
সমালোচনার ভয়: মানুষ মনে করে, সমাজের চেনা ছকের বাইরে গিয়ে যদি আমি গরিবের হক আগে দিতে যাই, তবে সমাজ বা আত্মীয়রা আমাকে (কৃপণ) বা 'অসামাজিক' বলবে। এই লোকলজ্জার ভয়েই সমাজটা বদলাচ্ছে না।
"আমি জানি, আমার এই কথাগুলো অনেকের কাছেই একটু নতুন বা প্রচলিত নিয়মের বাইরে মনে হতে পারে। আমাদের স্বভাবই হলো, আমরা চেনা নিয়মের বাইরে সহজে কিছু ভাবতে চাই না। কিন্তু সমাজকে সুন্দর করতে হলে কখনো কখনো প্রচলিত নিয়মের অন্ধত্ব ভেঙে সঠিক সত্যটা সামনে আনা জরুরি। আসুন, চোখ বন্ধ করে সমাজকে অন্ধ অনুকরণ না করে, একটু বিবেক দিয়ে ভাবি..."
আসলে বিশেষ করে এটি আমাদের অঞ্চলে বা সমাজের বিষয়ে আমি দেখি। যে যারা কুরবানী দিচ্ছে আর যারা দিচ্ছে না সবাই উভয়ই তারা মাংস পায় কিভাবে? এটা কিছুটা আমার মনের ভিতরে আঘাত করেছে। এই বিষয়টা আমার কাছে একদমি ভালো লাগে না। আসলে এই চিন্তা যদি শুধু আমি চিন্তা করি তাহলে কোনো সমস্যা সমাধান হবে না। আমাদের এই বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে তাহলে আমরা যে সমাজে বাস করি বা সমাজের মানুষজন যে ভাবে বসবাস করে তার চেয়ে আরো সুন্দর ভাবে জীবন যাপন করতে পাড়বে বলে আমি মনে করি।
এই উৎসব মাংস খাওয়ার কোনো প্রতিযোগিতা নয়, এটি নিজের ভেতরের স্বার্থপরতা ও লোভকে বিসর্জন দেওয়ার দিন। আসুন, লোকদেখানো সামাজিকতার দেয়াল ভেঙে এবার সত্যিই মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসি। সবচেয়ে ভালো অংশটা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাতে তুলে দিই। নিজের ফ্রিজ নয়, সমাজের ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরানোর দায়িত্ব নিই। তবেই সমাজ সুন্দর, সুশৃঙ্খল এবং মানবিক হয়ে উঠবে।
সবাই ধন্যবাদ!