04/06/2026
কোন কোন মৃ*ত্যু আমাদেরকে কাঁদিয়ে দেয়। কোন কোন মৃ*ত্যু মানুষকে ভাবতে শেখায়—আমরা কি আসলেই শিক্ষিত হয়েছি, মানুষ হয়েছি?
একই বাড়িতে মা এবং মেয়ে বসবাস করছে। মা, ঈদের মধ্যে সাত দিন ধরে মরে বিছানায় পড়ে আছে। পিঠের যে অংশটি বিছানার সঙ্গে লেগেছিল, সেখানে রীতিমতো ঘা হয়ে পোকা হয়েছে। শরীরের আরেকটি অংশ প্রায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কিন্তু মা এই বিছানায় মরে পড়ে থাকলেও ওপরতলায় থাকা মেয়ে কিছুই জানে না, খোঁজও নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।
শুধু মেয়ে নয়, আরেক ছেলে—এই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের শীর্ষ যে প্রতিষ্ঠান, বুয়েটের শিক্ষক, তিনিও আসার সময় পাননি মাকে দেখবার ঈদের ছুটির মধ্যে। এখানেই শেষ নয়, আরেক ছেলে আছেন, যিনি সরকারের বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনিও মাকে ঈদের ছুটির মধ্যে একদিন দেখবার জন্য তো আসতেই পারেননি, একদিন ফোনও করে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেননি।
গল্পটা এখানেই শেষ নয়। করুন এই গল্পের আরেকটা অধ্যায় আছে দেশের বাইরে। সেখানেও কানাডায় বসবাস করছেন আরেক ছেলে। যে ছেলের কথা বলছি, কানাডাতে তিনিও হয়তো ওখানেই সুখেই বসবাস করছেন।
এই চার ছেলেমেয়ে যখন সারা দেশে ঈদের ছুটির মধ্যে অন্যদের মতো তাদের পরিবার নিয়ে তারাও আনন্দ আয়োজন করছে, তখন তাদের মা—বা তাদের মা, মরে পড়ে আছে, শরীরে পচন ধরেছে।
গল্প নয়। এটি কোনো কল্পকাহিনী নয়। এটি কোনো সিনেমার গল্প নয়। এটি গেল ক'দিন আগে ঘটেছে ঢাকা শহরের এই মিরপুরে। নূরজাহান বেগম নামে সেই ভদ্রমহিলা। তিনি মা*রা গেছেন। যে পরিবেশে—মৃ*ত্যু সবারই হবে, জন্ম হলেই মৃ*ত্যু হবে এটাই সঠিক। কিন্তু মৃ'ত্যু"রও কোথাও কোথাও একটুখানি হয়তোবা দেখবার বিষয় থাকে, কেন এমন মৃ*ত্যু হয়?
প্রতিদিনই আমাদের অসংখ্য মৃ//ত্যু ঘটছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়কে ২৫ থেকে ২৬ জন মানুষ মারা যান। আত্মহত্যা করে অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিদিন, গোটা পৃথিবীতেই কিন্তু এই ঘটনা চলছে। কিন্তু এর মাঝেও কোন কোন মৃ*ত্যু আমাদেরকে কাঁদিয়ে দেয়, কোন কোন মৃ*ত্যু মানুষকে ভাবতে শেখায়। আমরা কি আসলেই শিক্ষিত হয়েছি? মানুষ হয়েছি?
মানুষ হলে কি বুয়েটে যিনি পড়াশোনা করেছেন, দেশের সবচেয়ে কম্পিটিশন করে যাদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হয়, তার মধ্যে একটি হচ্ছে বুয়েট, সেই বুয়েটে পড়াশোনা করে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে যারা প্রথম দিকে থাকেন, তারাই বুয়েটের শিক্ষক হন। তাহলে সেই শিক্ষক তার মাকে এই বুয়েটের—অর্থাৎ আপনি বুয়েট থেকে মিরপুরের দূরত্ব হয়তো কয়েক কিলোমিটার, কিন্তু সেখানে খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।
আরেকটি ছেলে যিনি বিসিএস-এর ক্যাডার হয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তিনিও তো পড়াশোনা করে বিসিএসে পাস করেছেন। তার জন্য হয়তো মা কত না চেষ্টা করেছেন তার জন্য। সেই সন্তান বিসিএস পাস করার পরে চাকরি করে একজন যুগ্ম সচিব, সরকারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। তার পক্ষে কি তার মায়ের জন্য এতটুকু করার সুযোগ ছিল না?
বা যে মেয়ে একই বিল্ডিংয়ে থাকে, বাইরে থেকে খুবই সুন্দর যে বিল্ডিংটি দেখতে, ভেতরে পড়ে আছে যে ময়লা-আবর্জনার, একটা ডাস্টবিনের মতো জায়গায় সেই মেয়ে একটা কলেজের শিক্ষকতা করেন। ছেলে বুয়েটে পড়ান। তাহলে এই মা যাদেরকে বড় করে তুলেছেন, শিক্ষিত করে তুলেছেন, জীবনের সবটুকু দিয়ে—সেই সন্তানরা এত শিক্ষিত হয়ে, এত ভালো জায়গায় গিয়ে তাহলে তারা কেন তার মাকে দেখল না?
নাইও দেখতে পারেন, সেটাও হয়তো কারণ থাকতে পারে—তাদের অন্যান্য ব্যস্ততা থাকতে পারে, দেশের বাইরে কানাডায় ছেলে আছে, বা সরকারি চাকরির কারণে বাইরেই থাকতে পারে। কিন্তু খোঁজ নেবেন না? তারা তো সবাই সচ্ছল!
বুয়েটের যে শিক্ষক তিনি ক্লাসে পড়াবেন তার ছাত্রদেরকে—কী শিক্ষায়, নৈতিক শিক্ষা দেবেন? বা সরকারি যে কর্মকর্তা, যুগ্ম সচিব আছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয়তো তার দপ্তরে যেটা দেওয়া আছে তার ওপরে, তিনি কি দায়িত্ব পালন করবেন যিনি নিজের মাকে এইভাবে মরে পড়ে থাকা অবস্থায় খোঁজ নেন না, দেখতে আসেন না?
বা স্কুলের যে শিক্ষক মেয়ে ওপরতলায় বা নিজের পাশে বিল্ডিংয়ে—পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন, তিনি খোঁজ নিলেন না ঈদের দিন, মা মারা গেছে, মার কোনো খবর নেই, মা কেন কোনো সাড়াশব্দ করছে না? সেই শিক্ষিকা মেয়ে কি শেখাবেন তার ছাত্রদেরকে?
এই গল্পগুলো হয়তো একটি ধরা পড়েছে, করুন এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। কিন্তু এরকম প্রবীণদের জন্য বা বয়স্ক বাবা-মাদের জন্য গল্পগুলো হয়তো কম-বেশি অনেকটাই এরকমই হতে যাচ্ছে। কারণ একটাই, আমরা সবাই লোভী হয়ে উঠছি। আমরা সবাই নিজেরটুকু, নিজের ছেলেমেয়ে—যে বাবা আজকে তার সন্তানকে বড় করে তুলছেন, একদিন হয়তোবা—আজকে যে বাবা তার মাকে দেখল না বলে মা মরে পড়ে বসে থাকল, পচে থাকল, ঠিক এই সন্তানকে আপনি যেভাবে মানুষ করছেন, এই সন্তানও হয়তো আপনাকে একদিন দেখবে না।
ফলে এই লোভের যে বিত্ত তৈরি করা হচ্ছে, লোভের যে সংস্কৃতি তৈরি করছে, যেকোনো মূল্যে নিজেরটুকু নেওয়ার যে চেষ্টা করা হচ্ছে, তাতে করে সবাই লোভী হয়ে উঠছি। আর এই লোভের ফলাফলই হচ্ছে কখনো আমাদের ছোট্ট রামিশাকে মৃত্যুর মুখে যেতে হচ্ছে নিদারুণ পৈশাচিক নির্যাতনের মুখে। কতটা ভয়াবহ! প্রথমে তাদেরকে নির্যাতন করা হলো, তারপরে তার গলা কেটে একটা ছোট্ট বাচ্চা গলা কেটে আরেকটা জায়গায় আলাদা করে রাখা হলো।
এরকম পৈশাচিকতার যে গল্পগুলো সেগুলো কিন্তু আসলে প্রত্যেকটাই আমাদেরকে নতুন নতুন করে কাঁদায়। কিন্তু বাংলাদেশে সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা? একটা ঘটনার শেষ হতে না হতে আরেকটা ঘটনার কথা সামনে চলে আসে। আপনাদের আসিয়ার কথা মনে আছে? বা আপনাদের মুনিয়ার কথা মনে আছে? একটার পর একটা বাংলাদেশে ঘটনার যে একটার পর একটা আসতে থাকে, সেটা আসলে কোনটাকে ছাড়িয়ে কোনটা সামনে থাকবে সেটাই বড় প্রশ্ন। তাই সমস্যার গভীরে যদি আমরা যেতে না পারি—হতাশায় গত পরশুদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আ*ত্ম*হ*ত্যা করেছেন। খুবই অল্প বয়সী একটা ছেলে। কেন আত্মহত্যা করল? বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি হচ্ছে সবচেয়ে ভালো চাকরিগুলোর একটা। সেই চাকরি করা অবস্থায় একটা ছেলে কেন আত্মহত্যার মতো একটা পথ বেছে নেয়?
কিংবা ক'দিন আগে আমরা দেখলাম যে ঈদের আগে বসুন্ধরা শপিং মলে একজন তরুণ ছেলে, তার হয়তো স্ত্রীর সঙ্গে এসেছিলেন কেনাকাটা নিয়ে কোনো বনিবনার অভাবে বা তার স্ত্রীর বা তার পছন্দের জিনিস কিনে দিতে পারেনি অথবা কোনো একটা সামাজিক বা তার পারিবারিক সংকটের কারণে সে কিন্তু লাফিয়ে পড়ে আটতলা থেকে বসুন্ধরা শপিং মলে প্রাণ দিতে হয়েছে। গল্পগুলো এরকমই, শুধু স্থান-কাল-পাত্র আলাদা।
ফলে আমাদের যে লোভের সংস্কৃতি, আমাদের যে গোটা সমাজে খাই-খাইয়ের যে সংস্কৃতি, শুধু একটু নিজের জন্য অন্যের উপরে দায় চাপিয়ে মিথ্যা কথা বলা।
---