17/07/2020
তাকওয়া এবং একজন পিতার দুআ
—————————————
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল বাকের (রাহি.) ছিলেন একজন ত্বলেবুল ইলম । জ্ঞান অন্বেষণে এ শহর ও শহর ঘুরে বেড়াতেন । একবার মক্কায় আসেন একটা হাদীস সম্পর্কে জানতে । এমনই একদিনে তিনি ক্ষুধার যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে খাবারের খোঁজে নিজ কামরা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন । হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ উনার চোখ পড়ে রাস্তার উপর পড়ে থাকা ঝলমলে কাপড়ের একটা থলির উপর । আশে পাশে খোঁজ করে কাউকে দেখতে না পেয়ে তিনি থলিটি নিয়ে নিজ কামরায় ফিরে আসেন । থলির মুখ খুলে ভেতরে দেখার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি থমকে যান । থলির ভেতর বেশ উজ্জ্বল দামী মুক্তা বসানো একটা গলার হার দেখে তিনি যেন অভিভূত হয়ে পড়েন । এত সুন্দর আর এত দামী মুক্তোর হার তিনি জীবনেও দেখেন নি ।
ভাবতে ভাবতে এমন সময় কামরার বাইরে থেকে একজন বৃদ্ধ লোকের আওয়াজ আসতে থাকে । বৃদ্ধ লোকটি উচ্চ স্বরে বলছিলেন তার একটি কাপড়ের থলি হারানো গিয়েছে । যদি কেউ থলিটি কোথাও পেয়ে থাকে এবং তা এনে ফেরত দেয় তবে বৃদ্ধ লোকটি তাকে ৫০০ দিরহাম পুরস্কার দিবেন । মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল বাকের (রাহি.) ভাবলেন এটাই হয়তো সেই থলি যার কথা বৃদ্ধ বলছেন । তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন এটাই সুযোগ, থলিটি ফেরত দিয়ে পাঁচশো দিরহাম নিলে উনার চলমান আর্থিক কষ্ট ঘুচে যাবে । অন্তত খাবার কেনার মত যথেষ্ট পয়সা তার কাছে বাকি দিন থাকবে । এই ভেবে শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল বাকের বৃদ্ধ লোকটিকে ডেকে নিজ কামরায় নিয়ে আসলেন । রাসুলের সুন্নাহ অনুযায়ী থলিটি বৃদ্ধ লোকটিকে বুঝিয়ে দেবার আগে থলির বিবরণ এবং ভেতরে কি আছে তা জিজ্ঞাসা করে নিশ্চিত হন । বৃদ্ধ লোকটি সঠিক তথ্য দেবার পর শায়খ তাকে থলিটি ফেরত দেন । বৃদ্ধ লোকটি তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শায়খ মুহাম্মদকে পাঁচশো দিরহাম পুরস্কৃত করতে চান । ঠিক এমন সময় শায়খের মনে এক ধরণের ভয় কাজ করে উঠে এবং তিনি দিরহামগুলো নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন । বৃদ্ধ লোকটি বেশ কয়েকবার সাধছিলেন কিন্তু তিনি তার কথাতেই অনড় রইলেন । তিনি বলেছিলেন, হে বুজুর্গ ! এই থলিটির ভেতরে যা আছে তার মালিক তো আপনি । আমি আপনাকে আপনারই জিনিস ফেরত দিয়ে কেন অর্থ নিবো ? এটাতো অন্যায়, আপনি আমাকে মাফ করে দিন ।
এর কিছু বছর পরের কথা ....শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল বাকের (রাহি.) জ্ঞানের খোঁজে সফরত ছিলেন । একটি বড় নৌকায় চেপে সাগর পাড়ি দিচ্ছিলেন অন্য একটি শহরের উদ্দেশ্যে । হঠাৎ নৌকাটি সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায় । শায়খ একটা কাঠের টুকরা ধরে ভাসতে ভাসতে তীরে পৌঁছায়। হাঁটতে হাঁটতে একটা গ্রাম চোখে পড়ে যেখানে প্রবেশের পর একটা মাসজিদ দেখতে পান । মাসজিদে সালাত আদায়ের জন্য ঢুকেন । এমতাবস্থায় সেখানকার লোকজন উনাকে আগুন্তুক হিসেবে আবিষ্কার করে জানতে চান তিনি কে আর এখানে কিভাবে এলেন । সব শুনে লোকেরা তাকে সালাতে ইমামতি করার জন্য অনুরোধ করেন । সালাতে শায়খের অসাধারণ তিলওয়াত লোকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায় । তারা উনাকে তাদের গ্রামে থেকে যেতে এবং তাদের ছেলেমেয়দের কুরআন শেখানোর অনুরোধ করেন । বিনিময়ে শায়খের থাকা খাওয়া তাদের দায়িত্ব । শায়খ মুহাম্মদ ছিলেন তখন সহায় সম্বলহীন বিপর্যস্ত একজন মানুষ । তিনি রাজি হয়ে গেলেন ।
এভাবে কিছুদিন যাবার পর গ্রামের লোকেরা এসে শায়খকে বলেন, জনাব আমরা ঠিক করেছি আপনাকে আর কোথাও যেতে দিবোনা । আপনার উসিলায় আমাদের সন্তানরা কুরআন শিখছে, ইলম অর্জন করতে পারছে । আমরা চাই আপনি এখানে থেকে যান । আর যেহেতু আপনি একজন যুবক, আমরা চাই আপনি আমাদের মধ্য হতে সম্মানিত একটি ইয়াতীম মেয়ের দায়িত্ব নেন । মেয়েটি ইয়াতীম হলো কিছু মাস হয় । তার বাবা ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচাইতে সম্মানিত । তিনি মারা যাবার আগে মেয়ের জন্য অনেক সম্পদ রেখে যান । এখন মেয়েটিকে আমরা একজন উত্তম চরিত্রের যোগ্য লোকের হাতে সোপর্দ করতে পারলে নিশ্চিত হতাম আর আপনার চেয়ে উত্তম এবং যোগ্য এ গ্রামে আর কেউ নেই এ মুহূর্তে । সব শুনে শায়খ মুহাম্মদ রাজি হলেন এবং যথাক্রমে দিন ক্ষণ দেখে ইয়াতীম মেয়েটিকে বিয়ে করে নেন ।
বাসর রাতে নিজ স্ত্রীকে প্রথম দেখতে মেয়েটির ঘোমটা তুলে নেন । হঠাৎই মেয়েটির গলার উপর শায়খের চোখ স্থির হয় যায় । তিনি একমনে মেয়েটির গলার হারটি দেখতে থাকেন । বিয়ের প্রথম রাতে স্বামীর এমন আচরণে মেয়েটি বেশ অসন্তুষ্ট হয় এবং সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে গ্রামের লোকজনদের ডেকে অভিযোগ করতে থাকে । মেয়েটি বলতে লাগলেন, আপনারা আমাকে এ কার সাথে বিয়ে দিলেন ? লোকটার তো আমাকে নিয়ে কোনও মাথা ব্যথা নেই বরং সে তো আমার সম্পদের জন্য ললায়িত মনে হচ্ছে । আমার গলার এ দামী হারটির উপর যেন তার নজরই সরছেনা ।
সব শুনে লোকেরা গেলেন শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল বাকেরের কাছে । জানতে চাইলেন এর কারণ । জবাবে তিনি মক্কায় সে বৃদ্ধ লোকটির এই হারের হারিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত সব ঘটনা খুলে বলেন । তিনি আরও বলেন, আমি বুঝতে পারছিনা এ হার তার স্ত্রীর কাছে কিভাবে এলো । সব শুনে লোকেরা একযোগে এত জোরে আল্লাহু আকবার ! আল্লাহু আকবার ! বলে যাচ্ছিলো যে পুরো গ্রামের লোকজন এক জায়গায় জড়ো হয়ে গিয়েছিলো । শায়খ মুহাম্মদ তাদের আচমকা তাকবীর দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে লোকেরা বলেন এই ইয়াতীম মেয়েটা যাকে তিনি বিয়ে করেছেন সে-ই মক্কার সে বৃদ্ধ লোকের কন্যা । লোকটি ব্যবসা শেষে মক্কা থেকে ফিরে আসার পর মাসজিদে প্রত্যেক সালাতে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দুআ করতো সেই তাকওয়াবান উত্তম চরিত্রের লোকটিকে ফিরিয়ে দেবার জন্য যাতে তিনি তার কন্যার সাথে লোকটিকে বিয়ে দিয়ে যেতে পারেন । তিনি এত দুআ করতেন, এত দুআ করতেন যে আমরা সবাই তা জেনে গেলাম এক পর্যায়ে । কিন্তু আফসোস তিনি মেয়েটিকে বিয়ে দেওয়ার আগেই মারা গেলেন । আমরা তো প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম কিন্তু আল্লাহ তো আছেন । তিনি তো সব দেখেন, শোনেন । বান্দার একনিষ্ঠ চাওয়াগুলো তো তিনি ফিরিয়ে দেননা । তাই আজ দেখুন আপনার সাথেই তার কন্যার বিয়ে হলো যেমনটা তিনি চেয়েছিলেন । সাগরে ঝড়ে নৌকাটা ভেঙ্গে দিয়ে তিনিই তো আপনাকে আমাদের কাছে এনে পৌঁছে দিয়েছেন, আল্লাহু আকবার !
আর শায়খের মনের অবস্থা কেমন ? রাব্বের করীমের পরম দয়ার কথা ভেবে তিনি শিহরিত হচ্ছিলেন বারবার । যে দামী মুক্তোর হার তিনি শুধু মাত্র তার রাব্ব কে ভয় করে হারের মালিক কে ফেরত দিয়েছিলেন এমন কি যে সময়ে অর্থ তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো সে সময়েও তিনি পুরস্কার স্বরুপ ঘোষনাকৃত অর্থ বে-ইনসাফের ভয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন । অথচ আজ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকেই পরোক্ষ ভাবে সেই মুক্তোর হারের মালিক বানিয়ে দিলেন ...
“ مَن يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
- নিশ্চয়ই যে তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, আল্লাহ এহেন সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।”
[ সুরা ইউসুফ, ৯০ ]
আল্লাহু আকবার !