20/06/2025
জালিম ও দুর্নীতিবাজদেরকে শাসক নির্বাচিত করা: ইসলাম কী বলে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা: ইসলামে জালিম ও দুর্নীতিবাজদের সমর্থন করা, ভোট দেওয়া হারাম।
যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে জালিম, খুনি, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত বা অসৎ কাউকে শাসক বানাতে ভোট দেয়, সে নিজেও ঐ জুলুমের শরিক হয়ে যায়। কোরআন ও হাদীস বারবার অন্যায় ও জুলুমের প্রতি পক্ষপাত বা সমর্থন করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।
কোরআনের দৃষ্টিতে জালিমদের সমর্থন
১. জালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না
وَلَا تَرْكَنُوۡۤا اِلَى الَّذِيۡنَ ظَلَمُوۡا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ ❤
“আর জালিমদের দিকে ঝুঁকে পড়ো না, তা না হলে আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে।”
(সূরা হুদ, ১১:১১৩)
এই আয়াতে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন—জালিমদের প্রতি সামান্যতম ঝোঁকও জাহান্নামের কারণ হতে পারে। ভোট দিয়ে তাদের ক্ষমতায় আনা তো সরাসরি সমর্থন, এতে গুনাহ আরো বড়।
২. সত্য ও ন্যায়ের সাথে দাঁড়াতে হবে
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ❤
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের উপর দৃঢ় থাকো, ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হও।”
(সূরা আল-মায়িদা, ৫:৮)
জালিমদের পক্ষে দাঁড়ানো ন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থান করা। এটি আল্লাহর বিধানের সম্পূর্ণ বিপরীত।
হাদীসের আলোকে জালিম শাসককে ভোট দেয়া
১. যুলুমকে সমর্থন করা নিজে যালিম হওয়া
রাসূল (সা.) বলেন:
"من أعان ظالماً سلطه الله عليه" ❤
“যে ব্যক্তি কোনো জালিমকে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে সেই জালিমের উপরই ছেড়ে দেন।”
(মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ৭০১০)
ভোট দেয়াও এক ধরনের সাহায্য। সে কারণে কেউ দুর্নীতিবাজ, খুনি, চাঁদাবাজ দলের পক্ষে ভোট দিলে, সে নিজেও জুলুমে শরিক।
২. যে দেখে, জানে, তবুও চুপ থাকে—সে অংশীদার
রাসূল (সা.) বলেন:
"من رأى منكم منكراً فليغيره بيده..." ❤
“তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে... না পারলে মুখে, না পারলে অন্তরে। কিন্তু অন্তরে ঘৃণা করা হচ্ছে দুর্বলতম ঈমান।”
_(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৪৯)**
ভোট হচ্ছে হাত দিয়ে জুলুমকে অনুমোদন। কেউ যদি চুপ থাকে বা ভোট দেয়, তাহলে সে অন্তরের ঘৃণাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। সেটা দুর্বলতম নয়, বরং বিপজ্জনক ঈমানহীনতা।
ভোট দেওয়া মানেই আমানত রক্ষা করা
ভোট হচ্ছে একটা আমানত।
إِنَّ اللَّهَ يَأۡمُرُكُمۡ أَن تُؤَدُّواْ ٱلۡأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهۡلِهَا ❤
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানত তাদেরই নিকট ফিরিয়ে দাও, যারা তা পাওয়ার যোগ্য।”
(সূরা নিসা, ৪:৫৮)
অসৎ মানুষকে ভোট দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া মানে আমানতের খেয়ানত করা। আল্লাহ ও রাসূল (সা.) আমানতের খেয়ানতকারীর সাথে চুক্তি রাখেন না।
জালিম শাসকের পক্ষে ভোট দিলে তার পাপেও শরিক হবেন
وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ
“তোমাদের কিতাবে তো নাযিল হয়েছে, যখনই তোমরা দেখো আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করা হচ্ছে বা তা নিয়ে ঠাট্টা করা হচ্ছে, তখন তাদের সঙ্গে বসো না...”
(সূরা আন-নিসা, ৪:১৪০)
ভোট দিয়ে বসানো মানে তাদের সাথেই বসে যাওয়া, এমনকি চুপ থেকে সায় দেয়াও শিরকম।
সরাসরি পাপের দায় বহন
وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمۡ وَأَثۡقَالٗا مَّعَ أَثۡقَالِهِمۡ ❤
“তারা নিজের পাপ তো বহন করবেই, অন্যদেরও পাপ বহন করবে, যাদের তারা পথভ্রষ্ট করেছে।”
(সূরা আনকাবূত, ২৯:১৩)
আপনি যদি ভোট দিয়ে একজন জালিমকে ক্ষমতায় আনেন, এবং সে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হত্যা, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ বা দুর্নীতি চালিয়ে যায়, তবে আপনি তা জেনে-বুঝে সমর্থন করায় তার পাপের হিসাবেও অংশ পাবেন।
শেষ কথা: ইসলামী আদর্শে নেতৃত্ব মানে দায়বদ্ধতা
নবীজি (সা.) বলেন:
"كلكم راعٍ وكلكم مسؤول عن رعيته" ❤
“তোমরা সবাই দায়িত্বশীল, আর সবাইকে তার অধীনস্তদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।”
(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
সুতরাং আপনি যদি দুর্নীতিবাজ বা খুনিদেরকে ভোট দিয়ে দেশ চালানোর দায়িত্ব দেন, তাহলে সে নেতৃত্বের ভয়াবহ পরিণতিতে আপনিও শামিল হবেন।
উপসংহার ও করণীয়
১. ভোট দিন তাকওয়াবান, দক্ষ ও সৎ প্রার্থীকে।
২. জালিম, দুর্নীতিবাজদের ভোট দেবেন না—even under pressure।
৩. নিজে জানুন, অন্যকে জানাতে সচেষ্ট হন।
৪. যেখানে ন্যায় নেই, সেখানে আপনার অবস্থান যেন না থাকে।
আবু রায়হান