29/04/2026
বাংলাদেশের জ্বালানি যাত্রায় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি (নিউক্লিয়ার ফুয়েল) লোডিং বা ভরা শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করল এবং বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করল।
১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উদ্যোগ। এই মাইলফলকটি প্রকল্পের নির্মাণ পর্যায় থেকে অপারেশনাল বা কার্যক্ষম হওয়ার প্রস্তুতির দিকে উত্তরণকে নির্দেশ করে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি জটিল ও বহু-স্তরীয় প্রক্রিয়া, যার মধ্যে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
# # # **প্রকল্পের প্রেক্ষাপট ও মাইলফলক**
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রায় এক দশক ধরে নির্মাণাধীন রয়েছে। উল্লেখযোগ্য মাইলফলকগুলোর মধ্যে রয়েছে:
* **২০১৬:** বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সাইট লাইসেন্স প্রদান।
* **নভেম্বর ২০১৭:** ইউনিট-১ এর প্রথম কংক্রিট ঢালাই।
* **জুলাই ২০১৮:** ইউনিট-২ এর নির্মাণ কাজ শুরু।
* **২০২৫:** সঞ্চালন অবকাঠামোর কাজ সম্পন্ন।
* **এপ্রিল ২০২৬:** জ্বালানি লোডিং শুরু।
* **২০২৬-২০২৭:** বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর প্রত্যাশা।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে কঠোর নিয়ন্ত্রক যাচাই-বাছাইয়ের পরই ফুয়েল লোডিংয়ের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি মূলত রাশিয়ান ফেডারেশনের অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় ঋণের মাধ্যমে মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০% প্রদান করছে। রোসাটম এখানে প্রযুক্তি সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে।
# # # **জ্বালানি লোডিং ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া**
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যায় হলো ফুয়েল লোডিং, যেখানে রিঅ্যাক্টর কোরে জ্বালানি অ্যাসেম্বলিগুলো স্থাপন করা হয়। রূপপুরের প্রতিটি **VVER-1200** রিঅ্যাক্টরে ১৬৩টি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি থাকবে এবং এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে। লোডিং শেষ হলে রিঅ্যাক্টরটি "ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি" বা নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু করার দিকে এগিয়ে যাবে।
ফসিল ফুয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে, এখানে নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ পানিকে বাষ্পে পরিণত করে, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। পারমাণবিক জ্বালানির উচ্চ শক্তি ঘনত্বের কারণে সামান্য পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
# # # **উৎপাদন সময়সীমা ও সঞ্চালন ব্যবস্থা**
বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনই শুরু হচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম জানান, সিস্টেমের কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে ৫% থেকে ১০% এর মতো স্বল্প সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হয়।
* **জুলাই-আগস্ট ২০২৬:** প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক লক্ষ্য।
* **২০২৭:** ইউনিট-১ থেকে পূর্ণ ১২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন।
* **ভবিষ্যৎ লক্ষ্য:** দুটি ইউনিট চালু হলে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা দেশের মোট চাহিদার ১০% থেকে ১২% পূরণ করবে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (PGCB) নিশ্চিত করেছে যে, রূপপুর-বাঘাবাড়ী, রূপপুর-বগুড়া এবং রূপপুর-গোপালগঞ্জ সঞ্চালন লাইনগুলো বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য প্রস্তুত।
# # # **নিরাপত্তা ও চ্যালেঞ্জ**
নিরাপত্তার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখানে বহুপাক্ষিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ফুকুশিমা দুর্ঘটনার শিক্ষা নিয়ে এতে **প্যাসিভ কুলিং সিস্টেম, কোর ক্যাচার এবং হাইড্রোজেন রিকম্বাইনারের** মতো উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান:
* **বর্জ্য ব্যবস্থাপনা:** তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি রয়েছে, যার মধ্যে ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়া বা পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ অন্তর্ভুক্ত।
* **আর্থিক চাপ:** উচ্চ ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এবং পরিচালনা ব্যয় একটি বড় বিবেচ্য বিষয়।
* **দক্ষ জনবল:** যদিও বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তবুও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমাতে কারিগরি শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ প্রয়োজন।
জলবায়ু ও জ্বালানি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে, রূপপুর প্রকল্পটি আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং শিল্পায়নে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে। তবে পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলো পদ্মার পানি ব্যবহার এবং বিকিরণ নিরাপত্তার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির গুরুত্বারোপ করেছে।