23/06/2026
একটা রাষ্ট্রের চরিত্র বুঝতে চাইলে দেখেন— সে কাদের পুরস্কৃত করে আর কাদের শাস্তি দেয়।
এ, এস এম নিয়াজ মোর্শেদরে আমি ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের সময় থেইকা চিনি। তখন চিন্তা পাঠচক্রের অর্গানাইজার ছিলাম। লেখালেখির সূত্র ধইরাই পরিচয়, তারপর নিয়মিত আলাপ, তর্ক, মতবিনিময়। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষটার মধ্যে যেইটা সবচেয়ে বেশি দেখছি, সেইটা হইলো সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা আর দেশপ্রেম। আর যেইডা বিশ্বাস করতেন সেইডাই করতেন। এই বাংলাদেশের প্রতি তার ভালবাসা নিছক মুখের বুলি না, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রমাণ করা সত্য।
তিনি খুব ভাল লিখতেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ভয়ংকর সময়ে সরকারি চাকরি কইরাও কলম থামায় নাই। আমি বহুবার কইছি— লেইখেন না, বিপদ আছে। কিন্তু সে একটাই কথা কইত, দায়িত্ব থেইকা সইরা যাইতে পারি না। চাকরি গেলে যাক, আল্লাহ না খাওয়ায়ে মারবো না। কিন্তু দায়িত্ব পালন না করলে আল্লাহরে কী জবাব দিমু? এই এক লাইনের মইধ্যেই মানুষটার চরিত্র লুকায়া আছে।
বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সে শুধু কথায় না, কাজে পাশে আছিল। কারো থাকার জায়গা না থাকলে নিজের ফ্ল্যাট ছাইড়া দিছে, আত্মগোপনের জায়গা বানাইয়া দিছে। মোহাম্মদপুরের সেই ফ্ল্যাটটা আড়াই বছর আমাদের নিরাপদ আশ্রয় আছিল। আমাদের ভাড়া না থাকলে ভাড়া দিছে, খাওনের টাকা দিছে, যাতায়াতের খরচ দিছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় প্রতিদিন খোঁজ নিছে খাইছি কি না, বাঁচতেছি কি না, গুলি খাইলাম কি না। এইরকম মানুষ আজ শাস্তিমূলক বদলির শিকার।
আমি সব সময় আতঙ্কে থাকতাম তার লেখালেখি আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের লাইগা সে গুম না হইয়া যায়। আল্লাহ আসলেই মহান, সেইডা হয় নাই।
রূপালী ব্যাংকে তার এই তাৎক্ষণিক বদলির পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখি—বর্তমান এমডি কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম নিজেই জুলাই গণহত্যা মামলার আসামি, আবার আওয়ামী ঘরানার পুরনো লোক। সে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি। তার মানে ফ্যাসিবাদের দালালরা এখনও রাষ্ট্রযন্ত্রের মাথায় বইসা। আর যারা আওয়ামী ভাবাপন্ন না, যারা প্রতিরোধ করছে, তাদের উপরই চলছে শাস্তিমূলক খড়গ। প্রশ্ন হইলো, জুলাই অভ্যুত্থানটা তাহলে কার বিরুদ্ধে আছিল?
আর বিএনপি? এই অন্যায় চোখের সামনে হইতেছে, কিন্তু তারা চুপ। এই নীরবতা কি কাকতালীয়? নাকি কোনো গোপন সমঝোতা আছে? টাকার চুক্তি, ক্ষমতার চুক্তি, নাকি আত্মীয়তার চুক্তি? যে মানুষ ২০২২ আর ২০২৩ সালে নিজের চাকরির ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনে নামছে, ২০২৫ সালে বিএনপি করার কারণে তৎকালীন আওয়ামী সমর্থিত সিবিএ সংগঠনের সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা কইরা তাঁকে আহত করে।
আজ তারে যখন শাস্তি দেওয়া হইতেছে তখন বিএনপির এই নীরবতা রাজনৈতিকভাবে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
নিয়াজ মোর্শেদের সাথে আমার চিন্তার পার্থক্য আছে, সে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে, আমি মানুষের অধিকারে। এই নিয়া আমাদের বহু তর্ক হইছে।
তিনি কইতেন দেশটারে আমি ভালবাসি, পাশাপাশি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আর খালেদা জিয়ারেও প্রচণ্ড ভালবাসি। আমি তার ভালবাসারে সম্মান করি। কিন্তু আমার তর্ক জারি রাখতাম এই বইলা আগে রাষ্ট্রের স্বার্থ, পরে দলের। তিনি কইতেন বিএনপি না থাকলে এদেশে মানুষের অধিকার আদায় হবে না। এইখানে আমার দ্বিমত।
কিন্তু একটা জায়গায় আমি নির্দ্বিধায় সাক্ষ্য দিমু—লোকটা সৎ, সাহসী, আর নিরেট ভাল মানুষ। এই রাষ্ট্রে আজকাল ভাল মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ। আর ফ্যাসিস্টের দালালদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো—সেটা তো আরও বড় অপরাধ।
কপি_ মুঈন উদ্দিন ভাই