14/05/2021
সূরা আল বাকারা।(আয়াত নংঃ৩৬)
فَاَزَلَّہُمَا الشَّیۡطٰنُ عَنۡہَا فَاَخۡرَجَہُمَا مِمَّا کَانَا فِیۡہِ ۪ وَ قُلۡنَا اہۡبِطُوۡا بَعۡضُکُمۡ لِبَعۡضٍ عَدُوٌّ ۚ وَ لَکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ مُسۡتَقَرٌّ وَّ مَتَاعٌ اِلٰی حِیۡنٍ ﴿۳۶﴾
অনুবাদ:
অতঃপর শয়তান তাদেরকে জান্নাত থেকে স্খলিত করল। এবং তারা যাতে ছিল তা থেকে তাদেরকে বের করে দিল, আর আমি বললাম, ‘তোমরা নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু। আর তোমাদের জন্য যমীনে রয়েছে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আবাস ও ভোগ উপকরন।
তাফসির : ইবনে কাছির
আদম (আঃ)-কে পুনরায় সম্মানিত করা হয়।
আদম (আঃ)-এর (আঃ) এটি অন্যান্য মর্যাদা ও সম্মানের বর্ণনা। ফিরিশতাগণ কর্তৃক সাজদাহ করানোর পর মহান আল্লাহ তাঁদের স্বামী-স্ত্রী উভয়কে জান্নাতে স্থান দিলেন এবং সব জিনিসের ওপর অধিকার দিয়ে দিলেন। তাফসীর ইবনু মিরদুওয়াই এ বর্ণিত একটি হাদীসে রয়েছে যে, আবূ যার (রাঃ) একবার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘হে মহান আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আদম (আঃ) কি নবী ছিলেন?’ তিনি বলেনঃ ‘তিনি নবীও ছিলেন এবং রাসূলও ছিলেন। এমন কি মহান আল্লাহ তাঁর সামনে কথাবার্তা বলেছেন এবং তাঁকে বলেছেন, ‘তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে অবস্থান করো।’ অধিকাংশ মুফাস্সিরগণের ধারণা এই যে, যে জান্নাতে আদম ও তাঁর স্ত্রীকে থাকার নির্দেশ দেয়া হয় তা আসমানের ওপরের জান্নাতে ছিলো। আর কারো কারো মতে উক্ত জান্নাতটি যমীনেই ছিলো। বিস্তারিত আলোচনা সূরাহ আল আ‘রাফে আসবে ইনশা’আল্লাহ।
আদম (আঃ)-এর জান্নাতে প্রবেশের পূর্বেই হাওয়াকে (আঃ) সৃষ্টি করা হয়
কুর’আনুল হাকীমের বাক্যরীতি দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, জান্নাতে অবস্থানের পূর্বে হাওয়াকে (আঃ) সৃষ্টি করা হয়েছিলো। মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক (রহঃ) বলেন যে, আহলে কিতাব ইত্যাদি ‘আলিমগণ হতে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনা অনুসারে জানা যাচ্ছে যে, ইবলীসকে ধমক ও ভীতি প্রদর্শনের পর আদম (আঃ)-এর (আঃ) জ্ঞান প্রকাশ করে তাঁর ওপর তন্দ্রা চাপিয়ে দেন। অতঃপর তাঁর বাম পাঁজর হতে হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন। চোখ খোলামাত্র আদম (আঃ) তাঁকে দেখতে পান এবং রক্ত ও গোশতের কারণে অন্তরে তাঁর প্রতি প্রেম ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। অতঃপর বিশ্বপ্রভু উভয়কে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন এবং জান্নাতে বাস করার নির্দেশ দেন।
কেউ বলেন, আদম (আঃ) জান্নাতে প্রবেশের পর তাঁর স্ত্রী হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ), ইবনু মাস‘উদ (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবায়ি কিরাম (রাঃ) হতে বর্ণিত রয়েছে যে, ইবলীসকে জান্নাত হতে বের করে দেয়ার পর আদম (আঃ)-কে সেখানে আশ্রয় দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু সে সময় তিনি একা ছিলেন। ফলে তাঁর ঘুমের অবস্থায় হাওয়া (আঃ)-কে তাঁর পাজর হতে সৃষ্টি করা হয়। আদম (আঃ) জেগে উঠার পর তাঁকে সামনে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? তুমি কেনই বা সৃষ্টি হলে? হাওয়া (আঃ) উত্তরে বললেন, আমি একজন নারী, আপনার প্রশান্তির জন্যই আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ ফিরিশতা আদম (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, বলুন তাঁর নাম কি? আদম (আঃ) বললেন, তার নাম হলো হাওয়া। তাঁরা বললেন এ দ্বারা নাম করণের কারণ কি? তিনি বলেন তাঁকে এক জীবন্ত প্রাণী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে। একপর্যায়ে মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে ডাক দিয়ে বললেনঃ
یٰۤاٰدَمُ اسْكُنْ اَنْتَ وَ زَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَیْثُ شِئْتُمَا١۪ وَ لَا تَقْرَبَا هٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُوْنَا مِنَ الظّٰلِمِیْنَ
‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে অবস্থান করো এবং তা হতে যা ইচ্ছা স্বচ্ছন্দে আহার করো; কিন্তু ঐ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়োনা, তাহলে তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’ (তাফসীর তাবারী ১/৫১৪)
মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে পরীক্ষা করলেন
মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে বললেনঃ ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতের মধ্যে সুখে স্বাচ্ছন্দে অবস্থান করো এবং মনে যা ইচ্ছা তা খাও ও পান করো, আর এই বৃক্ষের নিকটে যেয়ো না।”
এই বিশেষ বৃক্ষ হতে নিষেধাজ্ঞা মহান আল্লাহ কর্তৃক আদম (আঃ)-এর ওপর একটা পরীক্ষা ছিলো। কেউ কেউ বলেন যে, বৃক্ষটি ছিলো একটি আঙ্গুর গাছ। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এটা ছিলো গমের গাছ। (য‘ঈফ,তাফসীর তাবারী ১/৫১৪) কেউ বলেছেন শীষ। (য‘ঈফ,তাফসীর তাবারী ১/৫১৪) কেউ বলেছেন খেজুর এবং কেউ কেউ ডুমুরও বলেছেন। ঐ গাছের ফল খেয়ে মানবীয় প্রয়োজন অর্থাৎ পায়খানা-প্রস্রাব দেখা দিতো এবং এটা জান্নাতের যোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, ঐ গাছের ফল খেয়ে ফিরিশতা চিরজীবন লাভ করতেন। ইমাম ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন যে, এটা কোন একটি গাছ ছিলো যা থেকে খেতে মহান আল্লাহ নিষেধ করেছিলেন। এটা যেন কোন নির্দিষ্ট গাছ ছিলো তা কুর’আনুল কারীম বা কোন সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয় না। তাছাড়া এ ব্যাপারে মুফাস্সিরগণের মধ্যে খুবই মতভেদ রয়েছে। এটা জানার মাঝেও আমাদের কোন লাভ নেই এবং না জানলেও কোন ক্ষতি নেই। সুতরাং এ জন্য মাথা ঘামানোর প্রয়োজনই বা কি? মহান আল্লাহই এটা খুব ভালো জানেন। (তাফসীর তাবারী ১/৫২০) ইমাম রাযী (রহঃ)-ও এই ফায়সালাই দিয়েছেন। আর সঠিক কথাও এটাই বটে।
عَنْهَا-এর هَا সর্বনামটি কেউ কেউ جَنَّت-এর দিকে ফিরিয়েছেন, আবার কেউ কেউ شَجَرَ-এর দিকে ফিরিয়েছেন। একটি কিরা’আতে فَاَزَلَّهُمَّا-এরূপও রয়েছে। তবে অর্থ হবেঃ ‘শায়তান তাদের দু’জনকে জান্নাত থেকে পৃথক করে দেয়।’ আর দ্বিতীয়টির অর্থ হবেঃ ‘ঐ গাছের কারণেই শায়তান দু’জনকে ভুলিয়ে দেয়।’ عَنْ শব্দটি سَبَب-এর কারণেও এসে থাকে। যেমন بُؤْفَكُ عَنْهُ-এর মধ্যে এসেছে। ঐ অবাধ্যতার কারণে তাঁদের জান্নাতী পোশাক, সেই পবিত্র স্থান, ঐ উত্তম আহার্য ইত্যাদি সব কিছুই ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তাদের বলা হয়ঃ ‘এখন পৃথিবীতেই তোমাদের আহার্য ইত্যাদি রয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত তোমরা সেখানেই পড়ে থাকবে এবং সেখানে উপকার লাভ করবে।’ সাপ ও ইবলীসের গল্প, ইবলীস কিভাবে জান্নাতে প্রবেশ করে, কোন পন্থায় সে কুমন্ত্রণা দেয় ইত্যাদি লম্বা লম্বা কাহিনী মুফাস্সিরগণ এখানে এনেছেন। কিন্তু সে সবই ইসরাঈলী বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত। সূরাহ আল আ‘রাফে বিস্তারিত আলোচনা আসবে।
আদম (আঃ) ছিলেন অনেক লম্বা
ইবনু আবী হাতিম (রহঃ) উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
"إن الله خلق آدم رجلا طُوَالا كثير شعر الرأس، كأنه نخلة سَحُوق، فلما ذاق الشجرة سقط عنه لباسه، فأول ما بدا منه عورته، فلما نظر إلى عورته جعل يَشْتَد في الجنة، فأخذت شَعْرَه شجرةٌ، فنازعها، فناداه الرحمن: يا آدم، مني تَفِرُّ! فلما سمع كلام الرحمن قال: يا رب، لا ولكن استحياء"
আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে অনেক লম্বা করে সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর চুল ছিলো ঝাকরা ঘন যেন খেঁজুর গাছের ছড়ানো শাখা। আদম (আঃ) যখন নিষিদ্ধ গাছ থেকে আহার করলেন তখন তাঁর শরীর বস্ত্রমুক্ত হয়ে যায় এবং শরীরের আবৃত অংশ দৃষ্টিগোচর হয়ে পড়ে। তিনি তা লক্ষ্য করে জান্নাতের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর চুল একটি গাছের সাথে আটকে যায়। তিনি তা থেকে মুক্ত হতে চেষ্টা করেন। তখন মহান আল্লাহ আর-রাহমান তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ ওহে আদম! তুমি কি আমার থেকে পালিয়ে যাচ্ছো? আর-রাহমানের (মহান আল্লাহ) বাণী শুনে আদম (আঃ) বললেনঃ হে আমার রাব্ব! তা নয়, বরং আমি লজ্জিত। (তাফসীর ইবনু আবী হাতিম ১/১২৯। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১/৮৭, তবে সনদে কিছুটা বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। তবে বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ১/৮৮-তে যে সনদটি আছে তা অধিক বিশুদ্ধ)
আদম (আঃ) মাত্র এক ঘন্টা জান্নাতে ছিলেন
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আদম (আঃ) ‘আসরের পর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জান্নাতে ছিলেন। (মুসতাদরাক হাকিম ২/৫৪২) হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন, এই ঘন্টা ছিলো একশ’ ত্রিশ বছরের সমান। রাবী‘ ইবন আনাস (রহঃ) বলেন, নবম অথবা দশম ঘন্টায় আদম (আঃ) জান্নাত হতে বহিস্কৃত হোন। তাঁর সাথে জান্নাতের একটি গাছের শাখা বা ডাল ছিলো। আর মাথায় ছিলো জান্নাতের একটি মুকুট। সুদ্দী (রহঃ) বলেন, আদম (আঃ) ভারতে অবতরণ করেন। তাঁর সাথে হাজরে আসওয়াদ ছিলো। আর জান্নাতী বৃক্ষের কিছু পাতা ছিলো যা তিনি ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেন। যা থেকে ভারতে সুগগন্ধময় গাছের উৎপত্তি ঘটে। ইবনু আবী হাতিম (রহঃ)-ও বর্ণনা করেছেন যে, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন মাক্কা এবং তায়েফের মধ্যবর্তী স্থান ‘দাহনা’ নামক জায়গায়। (তাফসীর ইবনু আবী হাতিম ১/১৩১) হাসান বাসরী (রহঃ) বলেছেনঃ আদম (আঃ)-কে প্রেরণ করা হয়েছিলো ভারতে এবং তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে (আঃ) প্রেরণ করা হয়েছিলো জিদ্দা নগরীতে। ইবলীসকে পাঠানো হয়েছিলো ‘দাস্তামিসান’ নামক স্থানে যা বাসরা থেকে কয়েক মাইল দূরে। এ ছাড়া সাপকে পাঠানো হয়েছিলো ‘আসবাহানে।’ (তাফসীর ইবনু আবী হাতিম ১/১৩২) সহীহ মুসলিম ও সুনান নাসাঈতে আছে যে, সমস্ত দিনের মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমু‘আবার। ঐ দিনই আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়, ঐ দিনই জান্নাতে প্রবেশ করোনো হয় এবং ঐ দিনই জান্নাত হতে বের করে দেয়া হয়। (হাদীসটি সহীহ। সহীহ মুসলিম ২/৫৮৫, সুনান নাসাঈ ৩/৯০)
একটি সন্দেহের নিরসন
যদি কেউ প্রশ্ন করেন যে, আদম (আঃ) যখন আসমানী জান্নাতে ছিলেন, তখন শায়তান মহান আল্লাহর দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছিলো। তাহলে আবার সেখানে কিভাবে পৌঁছলো? এর প্রথম উত্তর তো এই হবে যে, ঐ জান্নাত যমীনে ছিলো না। এ ছাড়া অধিকাংশ ‘আলিমের মতামত এই যে, সম্মানিত অবস্থায়ও শায়তানের জান্নাতে প্রবেশ করায় নিষেধ ছিলো। কিন্তু কখনো কখনো সে চুরি করে জান্নাতে প্রবেশ করতো, যেহেতু তাওরাতে আছে যে, সে সাপের মুখে আড়াল করে বসে জান্নাতে গিয়েছিলো। এও একটি উত্তর যে, সে জান্নাতে যায়নি, বরং চলতি পথে জান্নাতের বাহির থেকেই কুমন্ত্রণা দিয়েছিলো। কুরতুবী (রহঃ) এখানে সর্প সম্পর্কীয় এবং তাকে মেরে ফেলার হুকুমের হাদীসগুলোও এনেছেন, যা খুবই উত্তম ও উপকারী হয়েছে।