04/05/2026
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমীপে এক সাধারণ নাগরিকের খোলা চিঠি
শ্রদ্ধেয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
নতুন বাংলাদেশের এক বুক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে আপনার নেতৃত্বাধীন সরকার তিন মাস পার করছে। এই তিন মাসে আপনার বিভিন্ন সাহসী পদক্ষেপ এবং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে আপনার ব্যক্তিগত আগ্রহ আমাদের মুগ্ধ করেছে। আপনি কোমলমতি শিশুদের জন্য স্কুল ব্যাগ, জুতা ও পোশাক দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন—যা অত্যন্ত সুন্দর ও মনমুগ্ধকর। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাঠ পর্যায়ের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি আপনাকে কিছু রূঢ় বাস্তবতার কথা জানাতে চাই, যা সম্ভবত আপনার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে দেওয়া হয় না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি শিশুদের হাতে নতুন ব্যাগ ও পোশাক তুলে দিতে চাইছেন, কিন্তু প্রশ্ন হলো—শিশুরা বসবে কোথায়? আজ দেশের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা অনেকটা ‘গোয়াল ঘরের’ মতো। অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত ফ্যান নেই, বাথরুমগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী এবং অস্বাস্থ্যকর। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বর্তমানে শূন্যের কোঠায়। যেখানে শিক্ষার পরিবেশ নেই, সেখানে ব্যাগ ও জুতা দিয়ে আমরা কী অর্জন করব?
এই দুরাবস্থার পেছনে রয়েছে এক গভীর ষড়যন্ত্র। যারা এই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, সেই আমলা ও প্রভাবশালীদের অনেকেরই নিজস্ব ‘কিন্ডারগার্টেন’ ব্যবসা রয়েছে। সরকারি স্কুলের পরিবেশ নষ্ট করে রাখলে তবেই তাদের প্রাইভেট স্কুলগুলো লাভবান হবে। একারণেই তারা পরিকল্পিতভাবে সরকারি শিক্ষাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের চিত্র আরও ভয়াবহ। সরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয় হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে তিল ধারণের জায়গা নেই। হাসপাতালের টয়লেটগুলো এতটাই নোংরা যে সেখানে সুস্থ মানুষ গেলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। বেডগুলোর বেহাল দশা, আর রোগীদের যে খাবার দেওয়া হয় তা অত্যন্ত নিম্নমানের।
হাসপাতালগুলোতে রাজত্ব করছে দালাল চক্র, যারা রোগীদের ভুলিয়ে ভালো চিকিৎসার নামে অসাধু কর্মকর্তাদের নিজস্ব প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যায়। হাসপাতালের নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের টাকা না দিলে সেবা পাওয়া যেন এক অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর ওপর রয়েছে কিছু অসাধু চিকিৎসকের ‘কমিশন বাণিজ্য’। তারা ওষুধ কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পার্সেন্টেজ পাওয়ার আশায় রোগীদের অপ্রয়োজনীয় টেস্ট এবং একগাদা ওষুধ লিখে দেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমার মনে একটিই বড় প্রশ্ন—যাঁরা এই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীতি নির্ধারণ করেন, তাঁদের সন্তানরা কেন এদেশের সরকারি স্কুলে পড়ে না? তাঁদের নিজেদের সামান্য সর্দি-কাশি হলেও কেন তাঁরা সিঙ্গাপুর বা বিদেশে চিকিৎসার জন্য ছোটেন? যাঁরা জনগণের টাকায় বেতন পান, তাঁরা কেন জনগণের প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করতে পারেন না?
আপনার কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ ও দাবি:
১. আগে পরিবেশ, পরে উপহার: উপহার সামগ্রী বিতরণের আগে প্রতিটি সরকারি স্কুলের বাথরুম ঠিক করা এবং পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। শিক্ষার পরিবেশ ফিরলে ছাত্র-ছাত্রী এমনিতেই বাড়বে।
২. স্বার্থের সংঘাত বন্ধ করা: যে সব সরকারি কর্মকর্তার নিজস্ব কিন্ডারগার্টেন বা ক্লিনিক ব্যবসা আছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিন।
৩. হাসপাতাল সংস্কার: সরকারি হাসপাতাল থেকে দালাল চক্র নির্মূল করুন এবং খাবারের মান ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করুন।
৪. বাধ্যতামূলক ব্যবহার: সরকারি কর্মকর্তা ও নীতি নির্ধারকদের সন্তানদের জন্য সরকারি স্কুলে পড়া এবং তাঁদের নিজেদের জন্য সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করুন। এটি সম্ভব হলে প্রতিষ্ঠানের মান রাতারাতি বদলে যেতে বাধ্য।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা একটি বৈষম্যহীন এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই। আপনার সদিচ্ছা আর আমাদের এই ছোট ছোট দাবিগুলো পূরণ হলে তবেই আপনার স্বপ্ন সফল হবে। আশা করি, তৃণমূলের এই আর্তনাদ
আপনার মন স্পর্শ করবে।
বিনীত,
আপনার একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক,
#বিএনপি
Tarique Rahman