Rumi korim

Rumi korim গল্প শুধু গল্পেই হইনা। গল্পেই একসময় সঠিক পথে চলার মনোবল হয়ে দারায়।ফ্যাক্ট, গল্প পড়ার একটা নেশা।

19/08/2026

হঠাৎ চাকরিটা চলে যায় হৃদয়ের। চাকরি চলে যাবার পর থেকে তার স্ত্রী মুনার ব্যবহারও কেমন বদলে যেতে শুরু করেছে। গত দুই মাস ধরে বেকার হৃদয়। এই দুই মাসে মুনা সবকিছুতে বিরক্ত হয়ে গেছে যেন। বিশেষ করে হৃদয় নামক মানুষটার সবকিছু তার বিরক্ত লাগে। মনে হয়, তার ছায়াটা সহ্য করতেও কষ্ট হচ্ছে।

মুনার এমন আচরণে বেশ কষ্ট পায় হৃদয়। গত দুই মাসে কম চেষ্টা করেনি নতুন চাকরির। হচ্ছে না। এখানে তার দোষ নেই। তবুও দোষ। বেকার ছেলে আর অবিবাহিত মেয়ে দুটোই সমাজের বোঝা। ঘরের বোঝা। তবে মাত্র দুই মাসেই যে হৃদয় মুনার জন্য বোঝা হয়ে যাবে তা ভাবতে পারেনি হৃদয়। এতটাও পর মুনাকে ভাবেনি। হ্যাঁ এটা ঠিক গত দুই মাস ধরে মুনা সংসার চালাচ্ছে। কিন্তু সব টাকা তো তার নয়? মুনা যে টাকায় সংসার চালাচ্ছে, সেগুলো তো হৃদয়েরই টাকা। সে সারা মাসের সংসার খরচ শেষে যতটা টাকা বাঁচতো তার থেকে নির্দিষ্ট একটা অংশ মুনাকে জমাতে দিতো। কোন মাসে সেটা পাঁচ হাজার ছিলো, কোন মাসে দুই হাজার। গত দুই বছরের বিবাহিত জীবনে এমনই চলে আসছে। এখন বিপদের দিনে মুনা সেই টাকায় সংসার চালাচ্ছে। এ হিসাবে তো টাকা হৃদয়ের। অথচ মুনা এমন ভাব নিচ্ছে যেন তার নিজের কষ্ট করে উপার্জন করা টাকায় সংসার চালাচ্ছে। হৃদয়কে এমনই অনুভব করাচ্ছে। হৃদয় মুনার এমন তিক্ত আচরণে খুব মনকষ্ট পাচ্ছে। পাবে না কেন? মুনা তার সামান্য থেকে সামান্য ভুলটাও সহ্য করতে পারছে না। তার কোন আবদার তো কানেই নিতে চায় না। মাস খানেক হলো রাতে কাছেও যেতে দিচ্ছে না।

হৃদয় প্রথম প্রথম মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ভেবেছে, সে বেকার। আশেপাশের মানুষ নানান কথা বলে। তাছাড়া গত দুই মাসে বাবা, মায়ের কাছে কোন টাকা পাঠাতে পারেনি। হয়তো তারাও মুনাকে ফোন করে কথা শুনিয়েছে। সব মিলিয়ে সে বিরক্ত। সংসার সামলে হাঁপিয়ে গেছে মুনা। তবে এখন আর এসব ভাবতে পারছে না হৃদয়। মানছে, মুনার সবকিছু সামলাতে চাপ হয়ে যাচ্ছে। নিজের জমা টাকা খরচ করতে কষ্টও হচ্ছে। হয়তো ভবিষ্যত নিয়ে সংশয় হচ্ছে। তাই বলে এমন আচরণ করবে? এই তো মাত্রই যে আচরণ করলো, এটা কি স্বাভাবিক? রোজ সন্ধ্যায় হৃদয়ের চা খাওয়ার অভ্যাস। এক কাপ চা তার লাগেই। তবে বহুদিন হলো খাওয়া হচ্ছে না। মুনা দিচ্ছে না। নিজে করে খেতে গেলেও মুনার সে কি মুখ ঝামটা? চিনির যা দাম। এটা সম্পর্কে হৃদয়ের আইডিয়া আছে? নাই। থাকবে কিভাবে, এখন তো সংসার খরচ মুনা দেয়। তাই টাকার মূল্য হৃদয় বুঝছে না। তাই সকাল সন্ধ্যা চা খাচ্ছে। কোন হিসাব নেই হৃদয়ের। প্রানপ্রিয় বউয়ের মুখে এমন কথা শুনে আহত হয় হৃদয়। আর চা খায় না। সেদিনের পর থেকে আর সন্ধ্যায় তার চা লাগে না। তবে আজ মাথাটা একটু বেশিই ধরেছে। ব্যথা করছিলো। তাই বাধ্য হয়ে মুনাকে বলে,“এক কাপ চা বানিয়ে দিবে মুনা? প্লীজ?”

হৃদয় খুব অনুরোধ করে বলে। ভাবছিলো তার এমন নমনীয় কন্ঠে মুনা বুঝবে সে অসুস্থ। তার অনুরোধটা রাখবে মুনা। কিন্তু না। মুনা তাকে বুঝলো না। বরং সে রেগে গেলো। রাগের মাথায় বলে বসলো,“হ্যাঁ ঘরে বসে খাওয়া আর ঘুম ছাড়া তো কোন কাজ নাই তোমার। শুধু খাবা আর ঘুমাবা, আর অর্ডার দিয়ে যাবা আমাকে। বিনা পয়সার কাজের লোক পেয়েছো। তাকে অর্ডার করবা, বান্দীর মতো খাটাবা। আর নিজে শুয়ে বসে খাবা। এই তো সারাদিনের কাজ তোমার।”

মুনার এত কঠিন কথা শুনেও হৃদয় আবার অনুরোধ করে বলে,“মাথাটা ব্যথা করছে। প্লীজ আজকের জন্য এক কাপ চা বানিয়ে দাও।”

“পারবো না। মাথা ব্যথা না ছাই। ঘরে বসে বসে অজুহাত দিয়েই যাবা। কাজ বাজের ঠিক নাই। ঘরে বসে শুধু হুকুম করা। পারবো না আমি চা বানাতে। আমি তোমার হুকুমের দাস নই। কাজের লোক নই আমি, যে ঘন্টায় ঘন্টায় অর্ডার দিবা।”
সেই শুরু হলো মুনার রেডিও। সেটা ঘন্টা দুই চললো। যার সারমর্ম, এই সংসারের জন্য মুনা খেঁটে মরছে। কত কষ্ট করে সংসার খরচ চালাচ্ছে। নিজের কষ্টের টাকা,বাবা মায়ের কাছ থেকে ধার করে। এসবের কিছুই হৃদয় বোঝে না। শুধু বোঝে শুয়ে বসে খাওয়া। মুনার সব কথা মানতে পারলেও হৃদয় এটা মানতে পারে না সে তার বাবা, মায়ের থেকে টাকা ধার করে সংসার চালাচ্ছে। গত দুই মাসের খরচ এতটাও বেশি ছিলো না যে সেটার টাকাটা থাকবে না। তবুও হৃদয় কিছু বলে না। চুপচাপ শুনে যায়। তবে এখন আর ভালো লাগে না। মুনার খিটখিটে স্বভাবটা এখন তার মাথার যন্ত্রণা হয়ে গেছে। যেটাকে সে সহ্য করতে পারছে না। এদিকে চাকরি যে পাবে সেই সেদিকেও মনোযোগী হতে পারছে না। কোন চাকরির ইন্টারভিউ ভালো হচ্ছে না। ঘরে এমন অশান্তি থাকলে কি ভালো হয়? তবুও হৃদয় একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়ে যায়।

অবশেষে দীর্ঘ চার মাস বেকার থাকার পর বিশ হাজার টাকা বেতনের একটা চাকরি জুটিয়ে নেয় হৃদয়। তবে এই বেতনের চাকরিতে মুনা খুশি হয় না। এত অল্পে সব চলবে কিভাবে? গত চার মাসে মুনা তার অনেক শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছে। সেগুলো সারাজীবন তো বিসর্জন দিতে পারবে না। হৃদয়ের এই স্বল্প বেতনের চাকরিতে তার সেই শখ পূরণ হবে না। তাই তার মাথা খারাপ। সে খুশি হতে পারে না। তার মলিনতা, তার অখুশি দেখেও হৃদয় কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। এর সবচেয়ে বড় কারণ মুনা। গত চার মাসে মুনা হৃদয়ের সঙ্গে এত খারাপ ব্যবহার করেছে যে এখন সে তার মন থেকেই উঠে গেছে। হৃদয় আর মুনাকে মন দিতে পারছে না। কিছুতেই পারছে না। তাই তার মন খারাপ হৃদয়কে ছুঁতে পারে না। ছুঁবে কিভাবে? গত মাসে মুনা রাগ করে বাবার বাড়ি চলে যায়। তার জমানো সব টাকা শেষ। হৃদয় তাকে সংসার খরচ দিতে না পারলে সে আসবে না। হৃদয় তাকে পরপর কয়েকদিন নিয়ে আসতে গিয়েছে, কিন্তু না সে আসবে না। তার তখনই পনেরো হাজার টাকা দরকার। নয়তো সে অন্য পথ দেখবে। হৃদয় প্রথমে অন্য পথ বুঝতে না পারলেও পরে বুঝতে পারে অন্য পথ মানে ডিভোর্স।

হৃদয় মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তার বংশে কোন ডিভোর্স নেই। সেও চায় না এমনটা হোক। তাছাড়া তার হৃদয়ে স্ত্রী হিসাবেই মুনাই রয়েছে। নিজের স্ত্রীকে সে ছাড়তে চায় না। তাই তখনই নিজের শখের ফোনটা বিক্রি করে দিয়ে বারো হাজার টাকা এনে মুনার হাতে দেয়। তার চাহিদার তিন হাজার টাকা কম ছিলো, সেজন্য মুনা একা নয় সেদিন তার মাও অনেক কথা শুনিয়েছে। মুনার কথা সহ্য করে নিতে পারলেও তার শাশুড়ীর অপমানটা হৃদয় কখনোই ভুলতে পারবে না। সেটা তার জন্য অনেক অপমানের ছিলো। আর ঐ এক ঘটনায় মুনাও তার হৃদয় থেকে মুছে গেছে বলতে গেলে। তাই তার মন খারাপ এখন তার তার হৃদয় ছুঁতে পারছে না। মুনা একা একা রাগ দেখাচ্ছে, বকে যাচ্ছে। হৃদয় তাতে গুরুত্ব দেয় না। তবে এখন কিছু না বললে মুনা যে সারারাত এমনে বকে যাবে বুঝতে পেরে হৃদয় বলে,“মাস শেষে আঠারো হাজার টাকা তোমার হাতে দিবো। এটা দিয়ে তোমার শখ আহ্লাদ পূরণ হয়ে যাবে। আর সংসারটা নাহয় গত চার মাসের মতো একটু টেনেই চালালে। এর মাঝে আমি ভালো জব ম্যানেজ করে নিবো।”

অতঃপর মুনা থামে। এভাবে চলে যায় আরও চার মাস। হৃদয় এখন পয়ত্রিশ হাজার টাকার একটি জব করে। সংসার বেশ ভালোই চলছে। তবে মুনা এবং হৃদয়ের সম্পর্ক আগের মতো নেই। হৃদয় কেমন গম্ভীর হয়ে গেছে। মুনাকে অনেকটা এড়িয়ে চলে। যেটা এখন মুনার চোখে লাগে। আগে কিসের জন্য জানি চোখে পড়েনি? এক সময় হৃদয় তাকে খুব ভালোবাসতো। খুব যত্ন করতো। হঠাৎ তার চাকরি চলে যায়। মুনা বিষয়টা তার মায়ের সঙ্গে শেয়ার করতেই সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। হৃদয় এবং মুনার প্রেমের বিয়ে ছিলো। তাই আজও তার বাবা, মা হৃদয়কে মন থেকে মানতে পারেনি। তারা শুধু মুনার জেদটা মেনে নিয়েছে। তাই হয়তো সুযোগ পেয়েই মুনার মা হৃদয়ের বদনাম করতে শুরু করে দেয়। এমনি কোনরকম সংসার চালায়। এখন চাকরি নাই। এখন তো মুনার জমানো টাকা, তার গহনা সব বিক্রি করে হৃদয় খাবে। মুনাকে অত্যাচার করে বাবার থেকে টাকা পয়সা নিতে বাধ্য করবে। বেকার ছেলেদের আর কাজ কি? এটাই তো কাজ। মুনার পুরো জীবনটা শেষ, এই ছেলের সঙ্গে থেকে। এই সেই কত কথা! মুনারও মনে হয় এটাই হয়তো ঠিক। তাছাড়া তার মা তার অন্য দুই বোনের বরদের এত সুনাম করতো যে তার মাঝে হৃদয় খুব নগণ্য ছিলো। সঙ্গে তাদের বোনরা তো ফোন করে তাদের দামি দামি গিফট, উপহারের শো-অফ করতো। সব মিলিয়ে মুনা কোথাও গিয়ে তার বোনদের হিংসা করেই হৃদয়ের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে ফেলে। তার বারবার মনে হচ্ছে, তার বোনরা এত ভালো জায়গায় আছে সেখানে তো তারও থাকার কথা ছিলো। তা নাহয়ে তার অবস্থান এই বেকার জামাইয়ের সংসারের হাল ধরতে শেষ হচ্ছে। সব মিলিয়ে মুনা অনেক খিটখিটে হয়ে গিয়েছে। তবে এখন চাকরি পেয়ে হৃদয় দুই হাজার টাকা নিজের কাছে রেখে বাকিটা তাকে দিয়ে দেয়। এর অর্ধেক টাকায় দুজনের সংসার খরচ হয়ে যায়। বাকি টাকা দিয়ে মুনা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। এখন তার অন্যকিছুর চাহিদাটা নেই। তার মনে এখন হৃদয়ের ভালোবাসার চাহিদাটা জন্ম নিয়েছে। সেটার অভাব বোধ হচ্ছে তার।

কিন্তু হৃদয় যেনও তাকে দেখেও দেখছে না। মুনা হৃদয়ের মনমতো সেজে, তার পছন্দের কাজ করেও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না। এসবে মুনা বিরক্ত হয়ে যায়। একদিন হৃদয়কে চেপে ধরে। তাকে হৃদয় আগের মতো ভালোবাসছে না কেন? এটা মুনা মানতেই পারছে না। মুনা হৃদয়ের ভালোবাসা না পেয়ে এবার রাগ দেখায়। যা দেখে হৃদয় ম্লান হাসে। আর সেদিনই প্রথম হৃদয় তার মনের মধ্যে থাকা সব কথা মুনাকে খুলে বলে। অনেক আগে চেষ্টা করছিলো মুনাকে ঠান্ডা মাথা বোঝাতে, কিন্তু মুনা বুঝতে চায়নি। যার ফলস্বরূপ এখন তাদের সম্পর্কটা এমন হয়ে গেছে। হৃদয় খুব সুন্দরভাবে বলে,“এই জগতে আমি একা নই যার হঠাৎ চাকরি চলে গিয়েছে। সংসারে অভাব দেখা দিয়েছে। এমন অনেকে আছে। তবে গিয়ে দেখো তাদের স্ত্রীরা তাদের সঙ্গে কু কুরের মতো আচরণ করে না বা করেনি। এমন মেয়ে হাজারে একটা পাবে যে তার স্বামীর দু:সময়ে তাকে সাহস, ভরসা না দিয়ে বরং অবহেলা করেছে। নারীরা মায়ের জাত। তারা অন্যদের কষ্ট খুব কম দেয়। বিশেষ করে স্বামীকে কষ্ট দেয় না বললেই চলে। একবার তুমি ভাবো তো, তুমি কি সেই নারীদের মধ্যে পড়ো? পড়ো না। তাদের এবং তোমার মাঝে অনেক অনেক পার্থক্য। এই পার্থক্যটা কেন তৈরি হলো মুনা? আমার হঠাৎ চাকরি চলে গেছে, সংসারে একটু টানাপোড়েন দেখা গিয়েছে। তার মানে তো এটা নয় যে আমি জীবনে উঠে দাঁড়াতে পারবো না। ঐ অবস্থা থেকে ফিরতে পারবো না। এমন তো ছিলো না বিষয়টা। একটু সময় দিলে সব ঠিক হয়ে যেতো। অথচ তুমি সেই সময়টা দিতে পারলে না। এখন হয়তো তুমি বলবে তুমি অন্যের প্ররোচনায় বিপথে গিয়েছো, কিন্তু বিশ্বাস করো এটা সত্য নয়। কেউ নিজে থেকে খারাপ হতে না চাইলে কেউ তাকে বানাতে পারে না খারাপ। কখনোই পারে না। তোমার মধ্যে আমাকে নিয়ে হয়তো শুরু থেকেই হীনমন্যতা ছিলো। এখনও আছে। তাই তো আমার ভালোবাসা, যত্নের চেয়ে আমার টাকাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তোমার কাছে। তুমি চিন্তা করো না, আমি চেষ্টা করছি এরচেয়েও ভালো জব পাওয়ার। তখনও সব টাকা তোমাকেই দিবো। তবে ভালোবাসার কথা বললে সেটার কথা আমি জানি না। এটা মনের ব্যপার, মন থেকে একবার উঠে গেলে সেই মনে কিভাবে জায়গা দিতে হয় তা আমার জানা নেই।” ব্যস। এতটুকু বলে হৃদয় চলে যায়। মুনা খুব আহত হয়। হৃদয় তাকে খুব ভালোবাসতো। তার জন্য পাগল ছিলো বলে কথা। সেই ছেলে এখন বলছে তার মনে তার জায়গা নাই? এটাও সম্ভব। হয়তো সম্ভব। এজন্যই হয়তো গুনিজনরা বলে, সম্পর্কটা এমন তিক্ততায় নিয়ে যেও না যেখান থেকে মিষ্টান্নের দেখা পাওয়া কঠিন। তবে কি মুনা এতই তিক্ত বানিয়ে ফেলেছে, তার সংসার জীবনটা? হয়তো তাই।

পরিশেষে, এভাবে চলছে মুনা এবং হৃদয়ের সংসার। এতদিনে তাদের সংসারে একটি সন্তানও এসেছে। যে সন্তানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মুনা এবং হৃদয়ের দূরত্ব কমছে। তবে পুরোপুরি কমছে কি-না জানা নেই মুনার। হৃদয় তাকে আগেই জানিয়েছে, সে তাকে ছাড়বে না। তার সঙ্গে সে সারাজীবন থাকতে চায়। তবে হয়তো সম্পর্ক আগের মতো করতে পারবে না। এটা তার হাতে নেই। এটা মনের ব্যপার। সেটা মনের উপর ছেড়ে দিয়ে মুনা থাকতে পারলে থাকুক। নয়তো চলে যেতে পারে। তবে মুনা যায়নি৷ সে থেকে গেছে। সে তো সংসার করতে চায়। তবে সেই সময়ে তার মাথায় কি চলছিলো তার জানা নেই। কেন যে এত খারাপ হয়ে গেলো? এজন্য সে বেশিরভাগ তার মা বোনদের দ্বায়ী করে। সেজন্য তাদের থেকে দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছে। মায়ের পরামর্শে এখন আর সে চলে না। এখন তার সংসারে সে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়। তাই তো ইতিমধ্যে তার সংসারে একটা ছোট শিশুর আগমন হয়েছে। তার মা তো আরও কয়েক বছর পর নিতে বলছিলো। হৃদয়ের ভাবগতি দেখে। তবে মুনা তার পরামর্শ নেয়নি। তার মনে হয়েছে, সন্তানটা এলে হয়তো ঠিক হবে সব। হচ্ছেও তাই। অনেকটা ঠিক হচ্ছে তাদের সম্পর্ক। আশা করা যায় খুব শীঘ্রই সম্পর্কটা পূর্বের মতোই মধুর হবে। এজন্য অবশ্য মুনাকে সতর্ক থাকতে হবে। একই ভুল করা যাবে না। কোনমতেই না। মুনা এটা করবেও না। সে এক ভুলেই যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছে। তাই তো ভুল শুধরে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সংসারটা তার এবং হৃদয়ের। দু'জনার এই সংসারের সুখ, দুঃখ সব দু'জনার৷ এখানে তৃতীয় ব্যক্তির জায়গা নাই। স্বামী, স্ত্রীর সংসারে সবাই তৃতীয় ব্যক্তি। এটা মেনে মুনা এগিয়ে যাচ্ছে।

[গল্পের মুনা তো ভুল বুঝলো তবে বাস্তবের মুনারা কখনো ভুল অনুভব করে না। যাই হোক সবসময় মেয়ে দিক চিন্তা করে গল্প লিখি তাই এবার একটু ছেলের দিক চিন্তা করে লিখলাম। সবাই এক নয়। বেশিরভাগ মেয়েরা স্বামীর পাশে থাকে তবে ব্যতিক্রম দুই একজন রয়েছে। তাদের নিয়ে এই গল্প]

(সমাপ্ত)

#সংসার_দু'জনার
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
#ছোটগল্প

10/08/2026

বিয়ের আগে অনেকবার ফারিয়া ওর হবু শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছে। ফারিয়াকে সবচেয়ে বেশি আদর আর স্নেহ করতো ওর হবু শাশুড়ি লতিফা আহমেদ। দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়েটা হয়েছিল। কিন্তু এখন শ্বশুর বাড়িতে ফারিয়ার প্রতি মুহূর্তে ওর শাশুড়ির সাথে স্নায়ুযুদ্ধ করে চলতে হচ্ছে।

শুধু শাশুড়িই নয় আতিকের বড় ভাবি অর্থাৎ ফারিয়ার জা নাদিরা ফারিয়াকে আপন ছোট বোনের মত আদর করত বিয়ের আগে, তারও ৩৬০ ডিগ্রি পরিবর্তন।

বিয়ের আগে ফারিয়ার শাশুড়ি নিজে ফারিয়ার মাকে ফোন করে বলতো ফারিয়াকে পাঠাতে যে কোন অনুষ্ঠানে বা সবাই একসাথে কোথাও বেড়াতে গেলে। ফারিয়াকে ছাড়া ওর হবু শাশুড়ির চলতো না। ফারিয়া শুশ্রী আর তার সাথে বেশ মেধাবীও। কিন্তু বিয়ের পর ফারিয়ার মনে হয় স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে।

~ মা একটু বাইরে যাচ্ছি, আমার বান্ধবী মিতা বলেছে আমাকে সাথে নিয়ে মার্কেটে যাবে

~ এই সময় মার্কেটে!! সে একা মার্কেট করতে পারেনা, তোমাকে কেন নিতে হবে?

অথচ ওর শাশুড়ি কিন্তু ভালোভাবেই মিতাকে চেনে ফারিয়ার সাথে অনেকবার এসেছে এ বাড়িতে। আবার বিয়েতেও ফারিয়ার সাজগোজ, শপিং সবকিছুতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এখন বিষয়টা এমন মিতার সাথে সম্পর্কটা শেষ করে দিতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে তো আর বাচ্চাদের মত জেদ করা যাবে না যে ফারিয়ার যেতেই হবে।

রুমে এসে ফারিয়া কল দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে অনেক মেহমান এসেছে এই কথা বলে দেয়। মিতার মনটা অনেক খারাপ হয়ে যায় ওর কন্ঠ শুনে বোঝা যাচ্ছিল।

~ মা দেখেন ফারিয়া তো মাথায় কাপড় দেওয়ার কথা ভুলেই যায়। মেহমান আসলে কিন্তু আমি সব সময় মাথায় কাপড় রাখি।

~ হ্যাঁ ফারিয়া, নাদিরা বউমা তো ঠিকই বলেছে এভাবে খোলা চুলে মেহমানদের সামনে আর আসবেনা।

ফারিয়া আকাশ থেকে পড়ে। যাদেরকে মেহমান বলছে তারা ফারিয়াকে এ বাসায় বিয়ের আগে অনেক দেখেছে। তখন মাথায় কাপড় দেওয়া নিয়ে কোন সমস্যা হয়নি। সবাই কত আদর আদর ভাব নিয়ে ওর সাথে কথা বলতো।

ফারিয়ার এমনিতেই মনটা খারাপ ঘনিষ্ঠ বান্ধবী অনুরোধ করেছিল শপিংয়ে যেতে কিন্তু যেতে দেয়নি আর বিকেলেই আবার মাথায় কাপড় নিয়ে সমস্যা। ফারিয়া হঠাৎ উত্তর দিয়ে ফেলে,

~ মা আমি তো যখন আপনাদের বাসায় আগে এসেছি তখন মাথায় কখনো কাপড় দিয়ে আসি নি?

~ সেটা বিয়ের আগের বিষয় এখন বিয়ের পরে। সব কি আগের মত থাকবে নাকি?

~ আমারই ভুল হয়েছে মা, আমার জেনে নেয়া উচিত ছিল বিয়ের পরে কি কি আর আগের মত থাকবে না

~ তোমার তো সাহস কম না তর্ক করছো আমার সাথে!! মাথায় কাপড় দেওয়া কি খারাপ? বড় বৌমা দিচ্ছে না?

~ বড় ভাবীর এটা অভ্যাস আছে বিয়ের আগে থেকেই, উনিতো হিজাবও পড়তেন । আমার এটার অভ্যাস নেই। আমিতো মাথায় কাপড় দেয়া খারাপ এটা বলিনি।

এ ঘটনার পর থেকে ফারিয়ার শাশুড়ি ফারিয়ার কাছে পরবর্তীতে যে রূপ ধারণ করল সেটা ফারিয়া স্বপ্নেও ভাবে নি। সব সময় চোখ মুখ কুঁচকে কথা বলে ওর শাশুড়ি আর ফারিয়া কোন দরকারী কথা বলতে আসলে তখন গুরুত্বহীন একটা ভাব নিয়ে থাকে।

এসব কারণে ইদানিং আতিকের সাথেও সম্পর্কটা আর মধুর থাকছে না। আতিকের কথা হলো,

~ বড় ভাবি মাকে ভুলিয়ে রাখতে পারলে তুমি কেন পারবে না? তুমিও সেভাবে খুশি করো।

~ বড় ভাবি সারাদিন যেটা করে সেটা হল আশেপাশের ফ্ল্যাটের একে ওকে নিয়ে বদনাম করা, কার ছেলে বা মেয়ে কার সাথে প্রেম করছে এটা নিয়ে মাতামাতি, হেল্পিং হ্যান্ড এর কাজে কারণে অকারনে নাক গলানো আর কটু কথা শোনানো। আমি এসব করতে পারবো না।

~ এখন আমি কি করবো বলো? তুমি চাকরিতে ঢুকে পড়ো। কয়েকটা ইন্টারভিউ তো দিলে, কি অবস্থা?

~ আশা করছি চাকরি একটা না একটা হবেই। আমি রিসেন্টলি যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে আবেদন করেছি সেটার চান্স সবচেয়ে বেশি।

যাক আতিক ফারিয়ার অবস্থাটা একটু হলেও বুঝতে পেরেছে। ফারিয়ার একটু শান্তি লাগছিল।

কয়েকদিন পর ফারিয়ার মা আর ছোট বোন আসে ফারিয়ার শ্বশুরবাড়িতে। আপ্যায়ন মোটামুটি ভালই পায়।

~ বেয়াইন মেয়েকে একটু বোঝাবেন। শ্বশুরবাড়ির দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে একদম উদাসীন।

~ কি হয়েছে বেয়াইন একটু বলেন?

~ অনেক কিছুই আছে, বলতে গেলে সারাদিন লাগবে।

~ দুই একটা তো বলেন।

~ দেখেন আপনাকে আমার কষ্ট দেয়ার ইচ্ছে নেই। মুখে এসব বলতে পারি না বুঝলেন। আমারও দুইটা মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। শ্বশুরবাড়ি থাকে ওদের প্রশংসা শুনলে পরে বুকটা ফুলে যায়।

ফারিয়া ভালো করেই জানে দোষ আসলে সেভাবে কিছু বলতে পারবে না তাই ওর শাশুড়ি কথাটা কাটিয়ে গেল। এদিকে ফারিয়ার মায়ের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।

~ মা তুমি চিন্তা করো না আমাকে নিয়ে। আমি সব বুঝে শুনে চলবো।

ফারিয়ার চাকরি হয়ে গেছে একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হিসেবে। আতিক খুব খুশি। ওর মাকে খবরটা জানায়।

~ ভালো। চাকরি করলে তো ভালই হবে। আমাদের আর কি বউরা তো সারাদিন বসে বসে শাশুড়ির সেবা করবে না। তোর বউয়ের চাকরি তুই বলছিস কেন? ফারিয়ার নিজে এসে এই খুশির খবরটা দেওয়া উচিত ছিল।

ফারিয়া বলতে চেয়েছিল কিন্তু আতিক না করেছে। এটা শুনে না জানি আবার কোন ধরনের প্যাচের মধ্যে ফেলবে ফারিয়াকে। ফারিয়া হয়তো ক্ষেপে যেতে পারে।

~ মা আমি জানানো যে কথা ফারিয়া জানানো তো একই কথা।

ফারিয়া চাকরি হওয়ার পর আবার নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হতে থাকে। ফারিয়া কাপড় রেখে গেলে সেগুলো হেল্পিং হ্যান্ডকে পরিষ্কার করতে দেওয়া হয় না। বারান্দায় কাপড় শুকাতে দিলে সেটাকে কুচি করে ভেজা অবস্থায় রাখা হয়। আর ফারিয়া কোন রান্নাবান্না বা চা বানালেও শাশুড়ি সরাসরি না করে দেয় খাবে না, পেট ভরা, গ্যাস ইত্যাদি বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে।

এত কিছুর মধ্যেও ফারিয়া তার কর্মজীবনে সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করে। আজকে ফারিয়ার শ্বশুর-শ্বাশুড়ির বিবাহ বার্ষিকী। ফারিয়া ঠিক করে শ্বশুরকে পাঞ্জাবি আর শ্বাশুড়িকে শাড়ি গিফট করবে নিজের টাকায়।

~ মা এটা আপনার আর বাবা এটা আপনার

~ কি এটা

~ আপনার শাড়ি আর বাবার পাঞ্জাবি। আপনাদের না আজকে বিবাহ বার্ষিকী!!

এদিকে ফারিয়াকে গিফট দিতে দেখে আতিকের বড় ভাবির মুখ অন্ধকার হয়ে যায়

~ মা গিফট দিয়ে অনেকে মন পেতে চায়

ফারিয়া রুম থেকে চলে গেলে ওর শাশুড়ি শাড়িটা আর পাঞ্জাবিটা খুলে। ফারিয়ার শাশুড়ি বলেই ফেলে,

~ খুবই সুন্দর শাড়িটা আর পাঞ্জাবিটা আর বেশ দামীও মনে হচ্ছে।

~ মা দেখি কেমন শাড়ি। এটা কোন শাড়ি হল!!! কাপড়ের বুননটা ভালো না আর পাড়টাও যেন কেমন?

এইবার ফারিয়ার শাশুড়ি কোন কথাই বলল না। শাড়িটা তার এতই পছন্দ হয়েছে যে মনে হয় খুশিতে নাচছে। এবার বড় বউ আর কোন সুবিধা করতে পারল না।

ফারিয়া ডাইনিং স্পেস থেকে বেশিরভাগ কথাই শুনতে পেল। ফারিয়ার এখন একটু স্বস্তি লাগছে। আতিক এর মাকে কিন্তু ফারিয়া কখনোই প্রতিযোগী ভাবেনি এমনকি ওর বড় ভাবিকেও না। তারপরেও কেন যে সম্পর্কটা ছাড়া ছাড়া হলো, ফারিয়া বুঝতে পারছে না???

ফারিয়া হঠাৎ ওর শাশুড়ির ঘরে কথা বলার ছলে ঢুকতে যায়, পর্দার আড়াল থেকে দেখে শাশুড়ি আয়নায় নিজের শাড়িটা শরীরে ধরে দেখছেন আর মুখটা খুশি খুশি!!

~ মা ব্লাউজ পিসও শাড়িটার সাথে আছে, আমাকে দিবেন ভালো কোন টেইলার্স এ বানাতে দিব।

~ আচ্ছা ঠিক আছে

অনেকদিন পর আচ্ছা ঠিক আছে কথাটা শুনলো ফারিয়া। যদিও আতিক ওকে অনেক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছে। ফারিয়াকে বিশ্বাস করেছে। আতিক আজ বাসায় এসে দেখে ফারিয়ার মন খুশি খুশি।

~ কি ব্যাপার আমার লক্ষী বউটা আজ এত খুশি খুশি

~ মার শাড়িটা অনেক পছন্দ হয়েছে

~ ওরে বাবা! শাড়ি দিয়েছো, বাবার জন্য কি?

~ পাঞ্জাবি। তোমার মনে নেই একবার বিয়ের আগে তোমরা বিবাহ বার্ষিকী করলে বাবা মায়ের তাই তারিখটা মনে ছিল

~ এইতো আমার উপযুক্ত আর বুদ্ধিমতী বউ

মাকে এভাবে পটিয়ে রাখবে।

~ দেখো এটা পটানো বা তেল দেওয়ার জন্য দেইনি। আমার দিতে ইচ্ছে হয়েছে তাই দিয়েছি। আমার ধারনাই ছিল না শাড়িটা পেয়ে মা এত খুশি হবে। আর এখন তো আমি চাকরি করি।

শুক্রবার ছুটির দিনে ঘটল অভাবনীয় একটা ঘটনা।

~ ফারিয়া তোমার হাতের চা তো অনেকদিন খাইনা, একটু চা বানাও তো

কথাটা শোনা মাত্র মনে হয় ফারিয়ার চোখে পানি চলে আসবে।

~ আচ্ছা দিচ্ছি মা

~ তুমি একটু আমার ঘরে এসো তো

ফারিয়া চা নিয়ে যায়। ফারিয়ার শাশুড়ি কথা বলা শুরু করে।

~ আমি খুব টানাপোড়নের সংসারে বড় হয়েছি। বাবা ছোটখাটো চাকরি করতেন। কিন্তু আমার বড় দুই ভাইকে পড়াশোনা করাতে তারা সর্বস্ব ঢেলে দেন। আমার ভাবি দুজনেই বিয়ের আগে আমাদের বাসায়ও আসতো। বাসায় আসার সময় কখনো খালি হাতে আসে নাই। বাবা-মা আর আমাদের কত স্বপ্ন দেখাতো ভাইরা আর তারা চাকরি পেলে কি কি করবে বাবা-মা আর আমার জন্য। কিন্তু এরপর কি হয়েছে জানো।

~ যখন চাকরি বাকরি হয় তখন সবার আগে আমার বাবা মার ব্যাপারে উদাসীন হওয়া শুরু করে। বাবা-মাকে ঈদেও ভালো মানের কাপড় দিত না। ভাবীরা এসেই কম বয়সে আমার বিয়ে দিয়ে দেয়। তোমার শ্বশুর তখন বেকার ছিল। আমি তখন অনেক কান্নাকাটি করেছিলাম কিন্তু মা ই আমাকে বুঝিয়ে ছিল এদের কাছ থেকে দূরে চলে যা ভালো থাকবি। এরপর তোমার শ্বশুরের যখন চাকরি হয় তখন উনার বেতন ছিল খুবই সামান্য। যার কারণে ইচ্ছা থাকলেও বাবা মার জন্য তেমন কিছুই করতে পারিনি। যখন সংগতি আসে তখন আমার বাবা-মা পৃথিবীতে বেঁচে নেই। মা কান্না মাখা কন্ঠে তার মৃত স্বপ্নগুলোর কথা বলতো তখন আমার শোনা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। আমার মা ভালো চিকিৎসা পেলে হয়তো আরো বেশি দিন বাঁচতো। অথচ ভাই ভাবীরা সবাই চাকরিজীবী ছিল।

ফারিয়া শাশুড়ির কথা শুনতে শুনতে কেঁদে কেটে একাকার।

~ আরে পাগলী তুমি কাঁদছো কেন। আমি বুঝতে পেরেছি বৌমা তুমি একটু রাগী হলেও তোমার মনটা নরম আর সরল। আমার মায়ের শেষ জীবনের দুঃখ আর যন্ত্রণার কথা মনে হলে আমি নিজের মধ্যে আর থাকতাম না। মনে হতো বউদের আমার মাও তো কত আদর করত কিন্তু শেষ বয়সে বিনা চিকিৎসায় মরতে হয়েছে।

ফারিয়ার চোখ মুছে দেয় ওর শাশুড়ি।

~ মা আপনি আমাকে আর কখনো ভুল বুঝবেন না। কোন কিছু নিয়ে খারাপ লাগলে সরাসরি বলবেন। আর মা আমি ঘোমটা দিয়ে থাকতে পারি না, বিশ্বাস করেন এটা জেদ না। ছোটবেলা থেকেই আমার মাথা খুব বেশি ঘামে এখনো।

~ আরে বাদ দাও ঘোমটা টুমটা, আজকে তিন জন মিলে মজার সব রেসিপি রান্না করবো চলো।

শাশুড়ি বড় ভাবিকে ডাক দেয়।

ফারিয়ার সবকিছু স্বপ্নের মত লাগছিল। ওর ধারণা ছিল না এত তাড়াতাড়ি শাশুড়ির সাথে সম্পর্কটা আবার আগের মত হয়ে যাবে আর স্নায়ু যুদ্ধের এত তাড়াতাড়ি অবসান হবে।

সমাপ্ত

ছোট গল্প : #স্নায়ুযুদ্ধ
ইশরাত জাহান এনি

08/08/2026

সাবরিনার স্বামীর সাবরিনার কোন কাজই পছন্দ হয় না। সবকিছুতেই খুত ধরা স্বভাব। গতরাতে দুজনের তুমুল কথা কাটাকাটি হয়। আশেপাশের ফ্ল্যাটে যারা আছে তারাও শুনতে পারে বা বুঝতে পারে ঝগড়া হচ্ছে।

~ ভাবি দরজাটা খুলেন আমি রুমানা।

সাবরিনা দরজা খুলে দেয়। ওর সামনাসামনি থাকা ফ্ল্যাটের রুমানা ভাবি এসেছে।

~ ভাবি কাল রাত বারোটার পর কি যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি! আমার বাসায় আমার কিছু আত্মীয় বেড়াতে এসেছিল। আমি জোর করে গতরাতে ওদের থাকতে বলি। কিন্তু আমি যদি জানতাম আপনার আসিফ ভাইয়ের সাথে কথা কাটাকাটি হবে, আমি ওদের থাকতেই বলতাম না। ওরা তো যাওয়ার সময় বললো এই ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়ে যেন ভালো কোন পরিবেশে চলে যাই। বাচ্চাকাচ্চারা নাকি এসব শিখবে!!

~ কি করব ভাবি বলেন, একটা কথাও ওকে বোঝানো যায় না। উত্তর বললে দক্ষিণ করে।

~ আসলেই আসিফ ভাই আমার স্বামীর মত না। আমার স্বামীর মত এত কেয়ারিং হলে আপনার ভাগ্যটাই বদলে যেত।

রুমানা সাবরিনাকে দাওয়াত দিয়ে যায়, আগামীকাল ওদের ১৬তম বিবাহ বার্ষিকী।

কিন্তু সাবরিনার জীবনে ১৫টি বছর কেটে গেছে বিবাহ বার্ষিকী বা জন্মদিন কি বুঝে নি। এখন তো ওর নিজেরই তারিখ মনে থাকে না। কেননা এই দুটো বিশেষ দিনেও আসিফ কখনও সারপ্রাইজ দেয়নি। রুমানার কথা শুনে সাবরিনার নিজেকে আরো রিক্ত আর শূন্য মনে হয়।

বাচ্চাকে স্কুল থেকে আনার সময় হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি বের হয় সাবরিনা। প্রচন্ড বৃষ্টি, রাস্তা পানিতে ডুবে গেছে। দুই ছেলে মেয়ে সাবরিনার। বড় মেয়েটা ক্লাস ফাইভ আর ছোট ছেলেটা ক্লাস ওয়ানে পড়ে। ছেলেকে নিয়ে বাসায় আসে সাবরিনা দুই ঘন্টা পর আবার মেয়েকে আনতে যেতে হবে। এর মধ্যে আসিফের ফোন।

~ মেহমান আসবে বাসায়। শিমু আর ওর স্বামী।

~ না করে দাও আমার এখন মন মানসিকতা এমন নেই যে অশান্তি বুকে নিয়ে হাসিমুখে আপ্যায়ন করব। অতীতে অনেক করেছি, এখন আর ইচ্ছে করে না।

শিমু আসিফের বড়বোনের মেয়ে। দু বছর আগে বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর অনেকবার সাবরিনা শিমুর শাশুড়ি, ননদসহ শিমুদের আপ্যায়ন করেছে।

কিন্তু গতকালের ঝগড়ায় আসিফ সাবরিনার যত ত্যাগ, পরিশ্রম ওর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় স্বজনের প্রতি করেছে, সব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।

~ দেখো, বোঝার চেষ্টা করো, ওরা চলে আসবে বিকেলের মধ্যে।

সাবরিনা এবার সিদ্ধান্তে অটল। অনেক করেছে কিন্তু স্বামীর কাছেই যেহেতু কোন নাম নাই আর করবে কি জন্য। রান্নাবান্না সাধারণভাবে যা করা হয় তাই করে সাবরিনা।

কলিং বেল বেজে ওঠে। আসিফ তার ভাগ্নি আর ভাগ্নি জামাই নিয়ে উপস্থিত। সাবরিনার প্রচণ্ড যন্ত্রণা হতে থাকে। একদিন আগে যে ঝগড়া হয়েছে এটার রেশ এখনো যায়নি। এর মধ্যে আবার রান্নাবান্না করা নতুন করে। মনটা যা না চায়, তাই করাতে এভাবে বাধ্য করে আসিফ। ১৫ বছর একই আচরণ দেখেছে সাবরিনা।

~ শিমু তোমার মামাকে আজ তোমরা যেন না আসো বলে দিয়েছিলাম। কাল রাতে তোমার মামার সাথে প্রচন্ড ঝগড়া হয়েছে রাত তিনটা পর্যন্ত। কিছু মনে করো না এখন আমার এক কাপ চা করে খাওয়ানোর মন মানসিকতাও নেই। এতে তোমাদের কোন দোষ নেই যদিও।

আসিফ ভাগ্নি আর ওর স্বামীর সামনে এসব কথা বলতে দেখে রাগে ভেতরে ভেতরে লাল হয়ে যায়। ১৫বছরের মধ্যে এই প্রথম সাবরিনা বিদ্রোহ করল। তাও আবার সরাসরি। শিমু আর কি বলবে কিছুক্ষণ মামাতো ভাই বোনদের সাথে কথা বলে স্বামীকে নিয়ে চলে যায়।

ওরা চলে যাওয়ার পর আবার কথা আরম্ভ করে আসিফ। কিন্তু এবার সাবরিনা শান্ত।

~ শিমু একা আসলে একটা কথা ছিল। ওর স্বামীও ছিল আর এমন অপমান করলে আমাকে ছি:!! আত্মীয়-স্বজনের সামনে কি করে মুখ দেখাবো? আপাকেই বা কি জবাব দিব?

~ যে রান্নাবান্না করবে, হাসিমুখে কথা বলে আপ্যায়ন করবে সে যদি রাত তিনটা পর্যন্ত ঝগড়া করে ক্লান্ত থাকে আর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত থাকে তারপরও কেন তাকে সব ভুলে সবকিছু করতে হবে? এটা কি ধরনের নিয়ম?এসব নিয়ম আমি মানি না। ভবিষ্যতে আর এসব করাতে পারবে না তুমি চাইলেও।

আসিফ এ ধরনের কথা এর আগে কখনোই সাবরিনার কাছ থেকে শুনেনি। সাবরিনা আবার কথা শুরু করে,

~ তুমি ফিক্সড ডিপোজিটের টাকা ভেঙ্গে গ্রামে জায়গা কেন কিনবে তাও আমাকে না জানিয়ে? এটা জিজ্ঞেস করাটা কি আমার অন্যায়? গ্রামে তোমাদের যা আছে তাই দিয়ে আমাদের চলবে। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য জমানো হচ্ছিল তা কেন হঠাৎ করে ভাঙতে হবে। ঝগড়া হয়, চিল্লাচিল্লি হয় এজন্য সামনের ফ্ল্যাটের রোমানা ভাবিও কথা শোনায়। শোনাবেই তো, উনার হাজবেন্ড তো আর তোমার মত না। ওদের কাল বিবাহ বার্ষিকী। আমি কি কোনদিন বুঝেছি বিবাহ বার্ষিকী কি? আমাদের এসব ঝগড়াঝাঁটির জন্য বাচ্চাদের উপরে কি কোন প্রভাব পড়বে না? ওরা তো এখন বড় হচ্ছে।

আসিফ হঠাৎ চুপসে যায়। সাবরিনা অনেক কিছুই শিখে গেছে। আসিফ বুঝে গেছে এখন ওকে বোকা বানিয়ে, অবহেলায় রেখে সবকিছু হাসিলের দিন শেষ। এর মধ্যে আসিফের বড় বোন কল দেয়,

~ কিরে আমার মেয়ে জামাইয়ের সামনে আমার মান সম্মানটা কিছু রাখলি!! তোর বউ তো ওদের অপমান করে তাড়িয়ে দিল। বেশি মাথায় তুলেছিস এজন্য এই অবস্থা। আমার মেয়ে আর মেয়ে জামাইয়ের কি ভাতের অভাব হয়েছিল?

সাবরিনা জানত আসিফের এগুলো শুনতে হবে। এখন মজা বুঝুক। সাবরিনার নিজেকে হালকা লাগছিল। বাড়ির বউ হয়েছে তাতে কি। মানসিক সুস্থতা না থাকলে এটাও ওদেরকে বুঝতে হবে। সব সময় পরিস্থিতি একরকম থাকে না।

সেই যে বিয়ে হয়ে এসেছে সেদিন থেকেই শুধু নিয়মকানুনের বেড়াজাল। এটা এভাবে করতে হবে, ওটা ওভাবে বলতে হবে, এটা করতেই হবে, এটা করা যাবে না, এভাবে চলা যাবে না কত কিছু। কিন্তু সাবরিনার স্বামী কি কখনো সাবরিনার বিষয়ে এভাবে ভেবেছে?

এমন না সাবরিনাকে যৌথ পরিবারে থাকতে হয়েছে। কিন্তু আসিফের স্বভাবটাই কেমন যেন প্রভু প্রভু ভাব। ভাবখানা এমন সাবরিনার অসংখ্য ত্রুটি, সেগুলো দূর করতে সব সময় আসিফের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।

স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক থাকবে খোলামেলা। কথাবার্তা, হাসিঠাট্টা, টুকটাক মান অভিমান এসব। কিন্তু আসিফের সমস্যাটা এখন সাবরিনা ধরতে পেরেছে। আসিফ হচ্ছে সেই ক্যাটাগরির পুরুষ যাদের কাজই বউকে কথাবার্তায় কাজকর্মে বুঝিয়ে দেওয়া যে বউ পারফেক্ট না, পারফেক্ট হতেই হবে এটাই আইন।

এবার এসব কথা বলার সময় সাবরিনা আস্তে আস্তে ঠান্ডা মাথায় বলেছে। চেঁচামেচি করেনি। আসিফ এবার তেমন সুবিধা করতে পারল না। হঠাৎ আসিফের বড় মেয়ে সামিয়া ওর বাবাকে বলে,

~ বাবা তুমি মাকে ভালোবাসো না। অনেক বেশি রাগাও।

এই সেরেছে মেয়েও দেখি বুঝতে শিখেছে। আসলে চোরের দশ দিন আর সাধুর একদিন এই কথাটা বোঝার সময় চলে এসেছে আসিফের। তারপরও যদি না শোধরায় কি আর করার আছে।

এইবার বৃহস্পতিবার আসিফ বাসায় না এসে সরাসরি বড় বোনের বাসায় গিয়ে ওঠে। বিষয়টা এমন স্ত্রীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে বোনের বাসায় আশ্রয় নেওয়া। এই কাজটা আসিফ গত ১৫ বছরে কমপক্ষে ২০-২৫ বার করেছে। তখন সাবরিনা ফোন করে সরি বলে বাচ্চাদের কথা বলে নিয়ে আসতো। সাবরিনার মধ্যে এই ভয়টা ছিল আত্মীয়-স্বজন কি ভাববে স্বামীর সাথে সম্পর্ক এমন জানলে।

কিন্তু এইবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। একদিন হয়ে গেছে সাবরিনা একটা ফোনও দেয়নি। শুক্রবারে একাই দুই বাচ্চাকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছে। বোনের বাসায় শুক্র শনিবার কাটিয়ে রবিবারে অফিস করে বাসায় ফিরে আসে আসিফ।

কিছুক্ষণ পর আসিফের বড় বোন সাবরিনাকে কল দেয়।

~ সাবরিনা আমার ভাইটার মানসিক অবস্থা ভালো না। চেহারাটা দেখেছ কেমন বিষন্ন আর মলিন!! ওর দিকে একটু খেয়াল রেখো।

~ আপা আপনারা তো আছেনই। এভাবে মন খারাপ হলে আপনার বাসায় যাবে, ছোট ভাইয়ের বাসায় যাবে। ও আপনার বাসায় দুদিন কাটিয়ে এসেছে এটাতে আমি একটু রিলাক্সড থাকতে পেরেছি। শুক্রবারে নিয়ম করে তো এক দুইজন বন্ধু-বান্ধব উপস্থিত করে। এই শুক্রবার টা খারাপ কাটে নাই।

বউয়ের মুখে এসব কথা শুনে আসিফ আশ্চর্য হয়ে গেল। কোথায় আসিফকে গদগদ ভাষায় ওয়েলকাম করবে, কেন এরকম করলে জিজ্ঞেস করবে তা না করে উল্টো বলছে আসিফ না থাকাতে আরো রিলাক্সড থেকেছে নিজের মতো থেকেছে।

~ তুমি কি আমার সাথে এভাবেই চলবে সারা জীবন?

~ ও মা কিভাবে চললাম? আমি কি তোমাকে কোন কিছু নিয়ে জেরা করেছি? তোমার মত তুমি চলো। কিন্তু আমাকেও শিখাতে আসবে না কি করতে হবে। আর কোন কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার ইচ্ছাটা মাথায় আনবে না। ব্যাস এতটুকু হলেই চলবে।

আসিফ রাতে শোবার ঘরে যায়। সাবরিনা মোবাইলে কিছু একটা দেখে হেসে কুটিকুটি। আসিফ ভাবে হয়তো নতুন করে কারো প্রেমে পড়েছে সাবরিনা। এরকম কিছু না থাকলে এত পরিবর্তন কেন ওর মধ্যে? আসিফ অপেক্ষা করতে থাকে সাবরিনা কখন কথা বলবে ওর সাথে। কিন্তু প্রায় আধা ঘন্টা হয়ে যায় সাবরিনা মোবাইলই দেখে যাচ্ছে। আসিফের এখন অস্বস্তি লাগছে।

~ কি হলো ঘুমাবে না?

~ না তুমি ঘুমাও আমি টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে নিচ্ছি।

আসিফের সন্দেহটা আরো তীব্র হয়। এতদিন সাবরিনা শোবার সময় সাধারণত কত কথা বলতো, কত প্রশ্ন করত, কথা না বলে মোবাইল দেখলে মোবাইল রেখে কথা বলতে বলতো। কিন্তু এসব কিছুই আর সাবরিনা চাচ্ছে না। সাবরিনা ঘুমিয়ে পড়লে চুরি করে মেসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপ চেক করতে থাকে আসিফ।

~ কি ব্যাপার আমার মোবাইলে কি দেখছো?

অপ্রস্তুত হয়ে যায় আসিফ।

~ না মানে দেখতে চেয়েছিলাম কি দেখে তুমি এত হাসছিলে?

~ ও আচ্ছা

আজকে আর আসিফের ঘুম আসে না। এত অল্প অল্প কথা বলে শেষ করে সাবরিনা। কথা বাড়াতেই চায় না। কিন্তু আসিফ এটাই তো চেয়েছিল। কথা কম বলবে, কম প্রশ্ন করবে, যাই করুক আসিফ, সেটাতে মাথা ব্যাথা থাকবে না।

কিন্তু এত কাঙ্খিত জীবনটা সাবরিনা যখন স্বেচ্ছায় আসিফকে উপহার দিয়েছে তারপরও আসিফের শান্তি আসছে না। সকালে অফিসে যাওয়ার সময় আসিফ নিজেই বলে,

~ কিছু লাগবে? অফিস থেকে আসার সময় নিয়ে আসবো।

~ না কিছু লাগবে না।

এবারও সংক্ষিপ্ত উত্তর। অন্য সময় আসিফের বাসায় আসার সময় কতবার ফোন করে এটা সেটা প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে বলত আর আসিফ অনেক সময় ভুলে যেত অথবা নিয়ে আসলেও দুই একটা জিনিস বাদ পড়ে যেত।

এভাবে আরও কিছুদিন কেটে যায়। আজ শুক্রবার জুম্মার নামাজ পড়ে সরাসরি বাসায় চলে আসে আসিফ!

~ কি ব্যাপার তোমার তো আরো একঘন্টা পরে আসার কথা

~ আগে আসলেও সমস্যা?

~ ছি ছি আমি সেটা বলছি না। তোমার তো নামাজ শেষ করে কমপক্ষে এক ঘন্টা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার অভ্যাস ছিল।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করেছে সবাই। বিকেল হয়ে গেছে। আসিফ রেডি হয়ে বাইরে যায়। কিছুক্ষণ পর ব্যাগভর্তি ফল, বাচ্চা আর সাবরিনার পছন্দের ফাস্টফুড আইটেম নিয়ে আসে।

দরজা খুলে দিয়ে সাবরিনা দরজার এপাশ-ওপাশ উঁকি দেয়।

~ কি হল তোমার, বন্ধু দেখছি না একটাও!! আমি তো চা নাস্তা করার কথা ভাবছিলাম।

আসিফ আর কথা বলে না। বাচ্চাদের ডেকে খাবার গুলো দেয়। সাবরিনার হাতেও একটা প্যাকেট দেয়। কথাবার্তা ভাবভঙ্গি একদম শান্ত।

~ সাবরিনা তুমি আগের মত হয়ে যাও প্লিজ। আমার কিছু ভালো লাগছে না।

~ ওমা এখন তো স্বাধীনতা পেয়েছ!! যেটার জন্য কত কথা শুনতে হয়েছে আমাকে।

হঠাৎ সাবরিনার হাত ধরে আসিফ বলে,

~ আমি আসলে এতগুলো বছর তোমার ওপর এক রকম জুলুমই করেছি। হাতে মারলেই শুধু অত্যাচার হয় না। অনেক বেশি উপেক্ষা করেছি তোমাকে। তুমি কথা বলতে, বকা দিতে, রাগারাগি করতে সেটাই ভালো ছিল। এ সবই ছিল তোমার ভালোবাসা আর মায়া। গত কয়েকদিনে আমি সেগুলো মিস করেছি।

~ তাই!!! মানে তুমি বলতে চাইছো আমি তোমার জীবনের অংশ বা কিছু একটা। কিন্তু এই কয়েক দিনে আমি যে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি সেটা কিন্তু মন্দ না।

~ আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি আর কষ্ট দিতে চাই না।

কথা শেষ করেই এক রকম জোর করেই সাবরিনাকে জড়িয়ে ধরে আসিফ।

অন্যের মূল্যায়ন আর গুরুত্ব পাওয়ার আশায় সাবরিনার জীবনের পনেরোটি বছর কেটে গেছে। এখন সে নিজের একটা জগৎ তৈরি করে নিয়েছে। সে জগতে শুধু সন্তানদের পড়াশোনা, যত্ন আর নিজের জন্য সময় অন্তর্ভুক্ত। ভবিষ্যতে আসিফ যদি তার কথা না রাখে তাতেও সাবরিনার কিছু যাবে আসবে না।

সমাপ্ত......

ছোট গল্প: #সাবরিনার_জগৎ
ইশরাত জাহান এনি

06/08/2026

অহনার আজ কিছু ভালো লাগছে না। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুরা একটা বিষয় নিয়ে খুব হাসাহাসি করছিল। কিন্তু অহনা আনমনা। আসলে ওর বন্ধু-বান্ধবদের মত ওর জীবনটা এত আনন্দময় নয়। অহনা আর ওর ভাই অলির মা নেই। ১১ বছর আগে ওর মা রোড এক্সিডেন্ট এ মারা যায়।

এক বছর পর ওর বাবা মোশারফ হোসেন আবার বিয়ে করেন। সৎ মা আসার পর ওদের জীবনটা মুদ্রার এপিঠ থেকে ওপিঠে উল্টে যায়। আজ ক্লাস নাইনে পড়া ভাই ওলিকে শাহানা বেগম কষে একটা থাপ্পড় দিয়েছে। থাপ্পড়টা মনে হয় অলির গালে লাগেনি অহনার কলিজায় লেগেছে। অলি যে ঘটনায় থাপ্পড় খেলো সেটা অতি সামান্য।

~ আমার আরো কিছু টাকা লাগবে, ক্রিকেট ব্যাটটা ভেঙে গেছে কিনতে হবে।

~ ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে কি মারামারি করো নাকি, ভেঙ্গে যায় কেন?

~ অনেক দিনের পুরনো, তাছাড়া ছোট হয়ে গেছে আরেকটু বড় ব্যাট কিনব।

~ এখন ব্যাট টেট হবেনা। টাকা নেই বাজে ব্যাপারে নষ্ট করার।

~ আপনি আজকে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কতগুলো জিনিস নিলেন সেগুলোর অনেক কিছুই তেমন দরকারী ছিল না। এজন্য কি কেনা বন্ধ রেখেছেন?

~ কি এত বড় খোটা। আমি তোমার বাবার স্ত্রী কথাটা ভুলে যেও না।

~ ভুলি নি তবে আপনি যে আমাদের মা না এটা বিগত ১০ বছরে ভালোভাবে মাথায় ঢুকিয়েছেন।

সাথে সাথেই থাপ্পড় খায় অলি। বাথরুম থেকে গোসল করে বের হয়ে ছোট ভাইকে মার খেতে দেখে অহনা। ছোট ভাই চোখ মুছতে মছতে বেরিয়ে যায়। অহনা বুঝতেও পারে নি কি হয়েছিল। পরে অনেকবার ফোন করার পর অলি জানায়।

~ কিরে অহনা, মিলি এত হাসির ঘটনা বলল আর তুই হাসলি না, কি এত ভাবছিস?

~ না কিছুনা।

~ বাসায় আবার আন্টির সাথে সমস্যা।

~ হ্যাঁ

~ আর দেড় বছর আছে পড়াশোনা শেষ হতে তারপর তোরা ভাই বোন স্বাধীন।

~ চাকরি পেতে হবে, সেটা তো এত সহজ না।তোরা থাক আজকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।

অহনা যেখানে টিউশনি করায়, সেই আন্টির কাছ থেকে অগ্রিম কিছু টাকা নেয়।

~ অলি এই অলি টাকাটা রাখ। দেখ তো এটা দিয়ে ব্যাট কেনা হবে, নাকি আরো লাগবে?

~ না আপু এটাতেই হবে।

কি যে একটা হাসি দিলো অলি, অহনার প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। ছোটবেলা থেকেই অহনা বাসায় থাকলে অনেকভাবে ভাইকে আগলে রাখত। কিন্তু না থাকলে ওর ভাইকে সৎ মা কোন না কোন বিষয়ে ধরে মারতো। অলির অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু অহনার চিন্তা এখন অলি একটা কিছু করে ফেলতে পারে, ও বড় হয়েছে। এটা সৎ মা মানতে চাচ্ছেন না। বাহিরে যখন থাকে অহনা এই বিষয়টা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে সবসময়।

ছুটির দিন অহনার বাবা বাসায় আছেন। অহনা বাবার কাছে যায় কথা বলার জন্য। ওর বাবা অহনার জমজ ভাই বোনের সাথে খেলছিল।

~ বাবা আমি কোচিং এ ভর্তি হব।

~ কিসের কোচিং?

~ বিসিএস।

~ এখনই ভর্তি হতে হবে?

হঠাৎ ওর সৎ মা এগিয়ে এসে বলে,

~ এখন কিসের কোচিং আগে পড়াশোনা শেষ হোক।

~ বাবা সবাই ভর্তি হচ্ছে। প্রস্তুতি ভালো যেন হয় এজন্য।

~ আর ৬ মাস পর ভর্তি হ।

বাবার এই স্বভাবটার জন্য ওর সৎ মা নিরবে নিভৃতে লক্ষে অলক্ষে অলি আর অহনার উপর হুকুম চালায়। অনেক বাড়াবাড়ি করে। কিন্তু এটা ক্যারিয়ারের প্রশ্ন অহনার জোরাজুরিতে ওর বাবা রাজি হয়। তখন ওর সৎমার যে কি অবস্থা সেটা আর নাই বলি।

এই ছুটির দুই দিন মোশারফ হোসেনের খুবই জঘন্য কাটলো। অহনাকে বিসিএস কোচিং এ ভর্তির টাকা দেওয়াটাই এর একমাত্র কারণ।

~ চলো বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে থেকে ঘুরে আসি।

~ কে তোমার বাচ্চা? তোমার বাচ্চা তো শুধু তোমার প্রথম স্ত্রীর গুলো।

~ এসব কি বলছো?

~ ঠিকই বলছি। চাকরি হলে বাবাকে কেমন দেখে দেখব।

মোশারফ আর কথা বাড়ান না। অহনা কোচিং, ভার্সিটি ক্লাস ও টিউশনি সব মনোযোগ দিয়ে করতে থাকে।

ভার্সিটিতে এক ইয়ার সিনিয়র সাব্বির অহনাকে খুব পছন্দ করে। অফারও দিয়েছে কিন্তু অহনা এখনো কিছু বলেনি। অহনার মাথায় সবসময় একটা জিনিস ঘুরে কখন নিজের পায়ে দাঁড়াবে।

~ অহনা কোথায় যাচ্ছ?

~ বাসায়।

~ একটু কথা বলি। পরে যাও আরও তো দুইটা বাস আছে।

~ কি কথা বলব, আমার আসলে ভাইয়া এসব নিয়ে ভাবার মত সময় নেই। প্রেম, দেখা করা, ঘোরাফেরা করা এসব আমার রুটিনে নেই।

~ কে বলল আমার সাথে প্রেম করলে তোমাকে এসব করতে হবে? আমরা কেউ প্রথম বর্ষের না। তুমি অনেক ভালো একটা মেয়ে। তোমার প্রতি মায়াটা আমি ছাড়তে পারছিনা।

~ দেখেন ভাইয়া আপনি অযোগ্য না। আমাদের ডিপার্টমেন্টেই আপনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। আমি তো তা না, আপনি চাইলেই টিচার হিসেবে ঢুকতে পারবেন। আমাকে কিন্তু চাকরির যুদ্ধে নামতে হবে।

~ তা ঠিক। কিন্তু আমার টিচার হওয়ার ইচ্ছে নেই। তুমি হ্যাঁ করবে এটা শোনার ইচ্ছায় অপেক্ষা করব।

~ আমি আরেকটু ভাবি তারপর।

~ ওকে চলো তোমাকে বাসে তুলে দেই।

~ এইতো ভাইয়া এভাবে আমার ছায়া হলে আমার নির্ভরশীলতা বাড়বে, অভ্যাসটা বাজে হয়ে যাবে আমার। আমার কিন্তু মা নেই।

~ আমি সব জানি। আচ্ছা যাও গেলাম না, তুমি চলে যাও।

আজকে অহনার সাব্বিরের কথাগুলো শুনে একটু মায়া লাগছিল। আর ভাবনা আগায় না। বাসায় এসে দেখে ওর ছোট দুই ভাই-বোন অলির এসাইনমেন্টের ওপর কিভাবে যেন পানি ফেলে দিয়েছে। শশী আর শিপলু বলছে ওরা কিছুই করেনি।

~ আপা দেখো সম্পূর্ণ এসাইনমেন্ট শেষ। কাল জমা দিতে হবে, এখন কি করব?

~ আপু আমরা করিনি, আমরা ভাইয়ার ঘরে আসি নাই।

এর মধ্যে ওদের মা চলে এলো,

~ এই চল তোরা, ছোট ভাইবোনদের সাথে এমন ব্যবহার। আগে আসুক তোদের বাবা।

~ আপনি এভাবে বলছেন কেন। আমি তো ওদের বকা দেই নি। জিজ্ঞেস করেছি শুধু।

~ থাক, আর ভালো সাজতে হবে না।

এক ঘন্টা পর দৌড়ে শিপলু অহনার ঘরে এসে আস্তে আস্তে বলে :

~ আপু মা করেছে, আমি দেখেছি।

~ কখন?

~ ভাইয়া স্কুল থেকে এসে বাইরে গেলেই মা টেবিলে থাকা কাগজের উপর পানি ঢালে।

এবার অহনার চিন্তা আরও বাড়ে, এরকম করলে তো ভাই এস এস সি ভালোভাবে দিতে পারবে না। আর ছয় মাস পর ফাইনাল। এই ঘটনা জানলে অলি উত্তেজিত হয়ে যাবে। কিছু একটা করতে হবে।

পরদিন ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে একটা সেলফ কিনে অলীর জন্য। সবগুলো ড্রয়ার তালা সিস্টেম।

~ আপু এটা আমার?

~ হ্যাঁ, সব দরকারি কাগজ নোট সব এটাতে রাখবি। বাইরে গেলে শিপলুরা না বুঝে নষ্ট করতে পারে। ভালোভাবে পড়বি কিন্তু।

~ আপু তুই তো এ মাসের সব টাকাই আমার পেছনেই খরচ করে ফেললি?

~ হলে হোক। তুই শুধু পড়বি আর মায়ের সাথে লাগতে যাবি না।

~ উনাকে মা বলবে না আপু।

~ আচ্ছা বলবো না। এবার পড়।

অহনার বাবা আজ বাসায় এসেই অনেক গম্ভীর। তার ব্যাচের অনেকের প্রমোশন হয়েছে কিন্তু তারটা হয়নি। এরমধ্যে স্ত্রী এসে অহনাকে বিয়ে দিয়ে দেয়ার কথা তুলল :



~ অহনার তো বিয়ের বয়স শেষ হয়ে যাবে

~ কে বলেছে এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি

~ চাকরি পেতে পেতে বুড়ি হয়ে যাবে

~ এসব বাদ দাও আজ মনটা খারাপ

~ বিয়ে দিয়ে চাপ কমাও, আরো তো তোমার দুই সন্তান আছে।

মোশারফ সাহেব শার্টটা পরে কোন কথা না বাড়িয়ে সোজা বাহিরে চলে যান। আজ অলি বাবার পিছে পিছে বের হয়।

~ বাবা তোমার মন খারাপ।

ওর বাবা অনেকদিন ছেলের কাছ থেকে এমন কথা শুনে না। বাসায় সব সময় মোশারফ এর একটা পর্দা টেনেই থাকতে হয়।

~ হ্যাঁরে বাবা আমার প্রমোশনটা হওয়ার কথা ছিল সবার আগে কিন্তু ব্যাচমেটরা অনেকেই সিনিয়র হয়ে গেল।

~ বাবা তুমি প্রমোশন নিয়ে এত ভেবোনা। আপু খুব ভালো করছে বিসিএস কোচিং-এ। তাছাড়া আমিও বড় হচ্ছি।

ওর বাবার চোখে পানি চলে এলো। গত ১০ বছর যাবত তেমন ভাবে কাছে নেওয়াই হয়নি। হঠাৎ আজকে ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

~ বাবা রে তোদের আমি অপদার্থ বাবা।

~ বাবা আজ আপুর জন্য যেভাবে বললে, একটু মাঝে মাঝে এভাবে বলবে। আমাকে বকা দিও তবুও আপুর ক্যারিয়ারের যেন সমস্যা না হয়।

~ বাবারে একটা সত্য কথা বলি। আমি ভয় পাই শিপলু আর শশী ছোট থাকতে একদিন তোকে মেরেছিল দেখে তোর মাকে একটা থাপ্পড় মেরেছিলাম। তখন আমাকে থ্রেট দিয়েছিল নিজের সন্তানদের মেরে তোদেরকে ফাঁসাবে। আমার কপালে একটা বদ মহিলা জুটেছে।

~ বাবা তুমি এখন থেকে মাকে খুশি রাখো। তুমি আমাকে অভিনয় করে বেশি বেশি বকবে। এই ফাঁকে আপুর আর আমার পড়াশোনাটাও হবে। কি হল কথা দাও।

বাবা ছেলে দুজনে দুজনের হাত শক্ত করে ধরে। মোশারফ অলির মার বিষয়ে অনেক কথা বলে অলিকে। ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময় ওলির মা মারা গিয়েছিল। অলি মার আদর থেকে তাই অনেকাংশে বঞ্চিত। দুজনে দুই সময় বাসায় ফিরে যেন সৎ মা সন্দেহ করতে না পারে।

অলি এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে ভালো একটা কলেজে ভর্তি হয়।

আজকে বিসিএস পরীক্ষার রেজাল্ট। মোশারফ সাহেব খুবই উদ্বিগ্ন কিন্তু ওনার স্ত্রীকে সেটা বোঝাচ্ছে না। হঠাৎ অহনার ফোন।

~ বাবা আমার প্রশাসন ক্যাডারে হয়েছে। তুমি দোয়া কর।

ফোনটা রেখেই মোশারফ সাহেব কাঁদছেন। কোন কথাই বলতে পারছেন না খুশির চোটে।

~ কি হলো কাঁদছো কেন?

~ এমনি।

~ প্রথম স্ত্রীর কথা মনে হয়েছে তাই না।

~ না।

~ তাহলে কাঁদছো কেন। প্রমোশন হয়নি বলে অনেকে কি খোঁচা মারে? তুমি সবার মত না চললে তোমার প্রমোশন হবে?

মোশারফ আর কথা বাড়ান না। আনন্দে তার এসব কথা কানেই যাচ্ছে না। এভাবে মা মরা দুই সন্তানকে অনেক কারসাজি করে সৎ মায়ের প্রতিহিংসা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। আর শশী আর শিপলুও তার সন্তান, ওদের তো আর কোন অন্যায় নেই। মোশারফ সাহেব চেষ্টা করেছেন ছোট দুই সন্তানের সাথে যেন বড় ভাইবোনের বন্ডিংটা ভালো থাকে।

অহনা অলিকে ফোন করে।

~ অলি কোথায় তুই?

~ কেন আপা বাসায়।

~ বের হয়ে চলে আয়। আর বাবাকেও ডাকছি।

তিনজন বসে আছে একটা বড় রেস্তোরায়।

~ মা রে এত কিছুর মধ্যেও তোর বিসিএসটা হলো। সেইভাবে তোদের জন্য কিছু করতে পারিনি, কেন আমাকে ডেকেছিস (কেঁদে দেন)।

~ বাবা তুমি কত পরিশ্রম করে আমাদের সাহায্য করেছ। যদি সৎ মায়ের কথা সব বিশ্বাস করতে আমরা এ পর্যন্ত আসতে পারতাম না।

~ আপু বলছিলাম না তোর বিসিএস প্রথমবারেই হবে।

বাবা ছেলে মেয়ে অনেক ছবি তুলে, গল্প করে আর খাবার খায়। বাসায় সবার জন্যই খাবার নিয়ে যায়। কিন্তু বাসায় ঢোকার সময় বাবা আলাদা আর অলি অহনা একসাথে ঢুকে।

~ শুনেছো শাহানা, অহনার প্রশাসন ক্যাডারে বিসিএস হয়েছে। ট্রেনিংয়ে যেতে হবে কিছুদিন পর।

~ খুবই আনন্দের কথা।

শাহানার কাছে এটা যে কোন আনন্দের কথা না এটা যে কেউ তার চেহারা আর উত্তর শুনেই বুঝে যাবে। একটু পর অলি আর অহনা খাবার নিয়ে আসে।

~ আন্টি আপু তো বিসিএস পেয়েছে, এইজন্য ট্রিট।

~ ও আচ্ছা কি এগুলো?

~ শশী আর শিপলুর পছন্দের খাবার, আপু এনেছে।

আজকে ওর সৎ মায়ের নরম সুর জীবনের প্রথম অলি শুনতে পেল। এই দিনটার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম দুই ভাই বোনের বিশেষ করে অহনার। ওর বাবাও কম সহ্য করেননি। বাবার উপর সৎ মায়ের অত্যাচার দেখে এক সময় অহনা আর অলিই এই বুদ্ধিটা বাবাকে শিখিয়ে দেয়। যেটা খুব ভালো কাজে দেয়। উপরে সৎ মায়ের সাথে হ্যা হ্যা করবে কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেটা উচিত সেটাই করবে ওদের বাবা।

অহনা সহকারী কমিশনার হিসেবে জয়েন করেছে। অলি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে। এদিকে সাব্বিরও গত বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে জয়েন করেছিল। সাব্বির অহনাদের বাসায় তার মা আর ভাইকে নিয়ে আসে।

~ আঙ্কেল আমি সাব্বির। অহনা আর আমি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম।

~ ও আচ্ছা। উনারা কে?

~ আমার মা আর বড় ভাই।

উনারা সবকিছু খুলে বললেন। অহনাকে প্রথম বর্ষ থেকে সাব্বির পছন্দ করত। এখন বিয়ে করতে চায়। অহনা তখন রাজি হয়নি ক্যারিয়ারের জন্য। এখন অহনার মতামত শুধু বাকি। অহনাও রাজি হয়ে যায়।

অলির সৎ মা এখন মাটির মানুষ। ভালো কিছু রান্না করলে সবার আগে অলিকে দেন। শিপলু আর শশীকে শেখান কিভাবে বড় ভাই বোনকে শ্রদ্ধা করতে হয়। অলির খুব হাসি পায়। তবে যদি বোনের বিসিএস না হতো বা চাকরি না হতো তাহলে হিসাব উল্টো হতো। অহনার ফোন আসে।

~ হ্যালো অলি তুই কিন্তু বিদেশেই যাবি। অন্য কোন কিছু চিন্তা করার দরকার নেই। তোর স্বপ্নটা শুধু যেন স্বপ্নই না থাকে। তুই সব ব্যবস্থা কর আমি আছি।

~ আচ্ছা রে আপু তুই চিন্তা করিস না। তুই এখন প্রেগনেন্ট আগে নিজের খেয়াল রাখ। ভাগ্নে-ভাগ্নিকে না দেখে আমি বিদেশ যাচ্ছি না।

ফোন রাখার আগে অহনার কাজ হচ্ছে কাঁদা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয় না।

মোশারফ সাহেব রিটায়ার্ড করেছেন। তার ছোট দুই সন্তানের জন্য এখন তেমন চিন্তা করতে হয় না ওদের বোন অহনা আর ভাই অলি আছে তো।

~ কি ভাবছো

~ কিছু না

~ শিপলু আর শশির প্রাইভেট টিউটরের বেতন লাগবে। আমার হাতে টাকা নেই। এক টিচারের শুধু বেতন দেয়া হয়েছে।

~ অহনা টাকা পাঠাবে তো কালকে।

~ আচ্ছা।

~ শাহানা তুমি তো বলেছিলে দেখবে, মেয়ে দেখে কিনা। আজকে আমিও যদি তোমার মত করতাম তাহলে আমাদের কি অবস্থা হতো ভেবে দেখো। যদিও আমি লাভের আশায় করিনি। আমি যেটা ন্যায় সেটাই করেছি। এখন শুধু অলি না, আমাদের সবার জন্যই অহনা আছে। তুমি যদি একটু সদয় হতে তাহলে এখন কত সম্মান পেতে। এখনতো অহনা আসলে চুপসে থাকো। কত কত মিথ্যা কথা বলে আমাকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করতে। আমার শশী আর শিপলুও মাশাল্লাহ বড় দুই ভাই বোনের মতই হয়েছে। ওরা আমাকে চুপি চুপি সব সত্য জানিয়ে দিত।

~ এখন আমাকে আর কত কথা শোনাবে?

~ আজই না প্রথম বললাম। তবে বিয়ের প্রথম প্রথম তোমার অনেক কিছু শুনে ওদের বকেছি এজন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চাই সব সময় কিন্তু মন থেকে বকিনি।

~ তো এখন কি সমস্যা?

~ সমস্যা তো এখন আমার না তোমার। এতকিছু করেছ, তাই এখন আনন্দটা নিতে পারছ না।

অহনার মেয়ে হয়েছে। সবাই এসেছে। মোশারফ হোসেন নাতনিকে কোলে নিয়ে কেঁদে দেন। পুরোপুরি প্রথম স্ত্রী অবন্তীর মত দেখতে হয়েছে। থুতনির নিচে তিলটাও পেয়েছে নানুর।নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন :

~ নানুমণি সবার প্রথম দোয়া করি যেন বাবা-মার আদরে বড় হতে পারো। মাতৃহারা বা পিতৃহারা যেন না হও।

আজকে মোশাররফ হোসেনের কান্না আর থামছেই না। এভাবে মোশারফরা আনন্দে কাঁদতে থাকুক। আমরা তাদেরকে না থামাই।

সমাপ্ত.........

ছোট গল্প: মেলবন্ধন
ইশরাত জাহান এনি

Address

Panchagarh
Rājshāhi

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Rumi korim posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Rumi korim:

Shortcuts

Share