15/07/2026
ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয়; ইতিহাস হলো অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা। তাই একটি সরকার, একটি নেতৃত্ব বা একটি রাজনৈতিক শক্তিকে মূল্যায়ন করতে হলে একটি-দুটি ঘটনা নয়, বরং তাদের পুরো সময়ের কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত, সাফল্য, সীমাবদ্ধতা এবং জনগণের ওপর তার প্রভাব—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
রাজনীতিতে সময়ই সবচেয়ে বড় বিচারক। কোনো সময়ের অর্জন, উন্নয়ন কিংবা সংকট—সবই ইতিহাসের অংশ। তাই ইতিহাসকে খণ্ডিতভাবে নয়, পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপটে বিচার করলেই একটি জাতি সঠিক শিক্ষা নিতে পারে এবং ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করতে পারে।
২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনার সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে বছরের প্রথম দিন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে নতুন পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করে। যে দেশে অতীতে অনেক শিক্ষার্থী বছরের শুরুতে বই পেত না, সেখানে এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থী সময়মতো নতুন বই পাওয়ার সুযোগ লাভ করে।
২০১০ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী 'জাতীয় পাঠ্যপুস্তক উৎসব' উদযাপিত হয়। এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোটি কোটি বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়, যা শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তীতে ২০১১ সালে মাধ্যমিক স্তরে ধাপে ধাপে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বিশ্লেষণ, অনুধাবন, প্রয়োগ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানো। এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০১৩ সালে দেশজুড়ে হরতাল-অবরোধ, পেট্রোল বোমা ও অগ্নিসন্ত্রাসের ঘটনায় জনজীবন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে লক্ষ্যেই পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হরতালের কারণে নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলে, সাপ্তাহিক ছুটির দিন—শুক্র ও শনিবারেও পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করে পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়েনি এবং নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব হয়।
২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে পরীক্ষা শুরুর ২৫–৩০ মিনিট আগে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে বাধ্যতামূলকভাবে প্রবেশের নিয়ম চালু করা এবং একাধিক সেটের প্রশ্নপত্র ব্যবহারের ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া ২০১৫ সালে সরকার দেশের প্রায় ৩ কোটি ৪৪ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে প্রায় সাড়ে ৩২ কোটি পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করে, যা দেশের বৃহৎ পরিসরের বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে পরিচিত।
২০১৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। ‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপবৃত্তি’ কার্যক্রম চালু করে উপবৃত্তির অর্থ সরাসরি শিক্ষার্থীর মায়ের মোবাইল অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়, ভোগান্তি কমে এবং দ্রুততার সঙ্গে উপবৃত্তির অর্থ উপকারভোগীদের হাতে পৌঁছাতে শুরু করে।
২০১৭ সালে দেশের হাওরাঞ্চলে আকস্মিক আগাম বন্যায় লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেখ হাসিনা সরকার বন্যাকবলিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উপবৃত্তি, পরীক্ষার ফি মওকুফসহ বিভিন্ন সহায়তামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে। দুর্যোগের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে সরকারি চাকরির বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
২০১৯ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে ডিজিটাল সেবা আরও সম্প্রসারিত হয়। পরীক্ষার্থীরা অনলাইন, এসএমএস এবং অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত ও সহজে ঘরে বসেই ফলাফল জানতে পারার সুযোগ পান।
২০২০ সালের মার্চ মাসে যখন কোভিড-১৯ নামক অদৃশ্য শত্রু বাংলাদেশের দরজায় কড়া নাড়ল, তখন শেখ হাসিনা সরকার ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠচর্চা চালিয়ে রাখতে সংসদ টেলিভিশনে "আমার ঘরে আমার স্কুল" কার্যক্রমের মাধ্যমে পাঠদান শুরু হয়।
কোভিড পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালের জেএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাও প্রচলিত নিয়মে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সে সময় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় পরীক্ষা বাতিল করা হয় এবং নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
২০২১ সালেও করোনা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের টিকাদান কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে খুলে দেওয়া হয়। পরে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এবং সীমিত সংখ্যক বিষয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
২০২২ সালের জুন মাসে সিলেট ও সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যার কারণে ১৯ জুন নির্ধারিত এসএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ১৫ সেপ্টেম্বর এসএসসি এবং পরে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৩ সালে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে বন্যার কারণে ওই তিন শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়, যাতে দুর্গত এলাকার শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা যদি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, যাতে শিক্ষার্থীদের জীবন, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাজীবন—সবকিছুর মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য বজায় থাকে।
আজ দেশের নানা বাস্তবতা দেখে অনেক সাধারণ মানুষ বলছেন— শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সময় যে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ছিল, তার অভাব এখন অনুভূত হচ্ছে। সময়ই প্রমাণ করে কে দেশের জন্য কী অবদান রেখেছেন। আমার বিশ্বাস, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আর সেই কারণেই আজ অনেক মানুষ তাঁর অনুপস্থিতি অনুভব করছেন।"