Safe Motivation

Safe Motivation গ্রুপ : 🌺গল্পের সব গুলো পর্ব এক সাথে পেতে facebook.com/groups/1015336140416635 গ্রুপে জয়েন হয়ে থাকুন।❤️‍🩹

🌺 নতুন নতুন গল্প পেতে পেজটি ফলো করে রাখুন।🔔

🚫[প্রাপ্তমনস্ক ও মুক্তমানদের জন্য ]🚫]বুঝলাম না ভাই হঠাৎ এই বাইক রেসের চ্যালেঞ্জ কেনো করলেন। তাও যে সে লোক না। গ্রেট বাইক...
21/09/2026

🚫[প্রাপ্তমনস্ক ও মুক্তমানদের জন্য ]🚫]

বুঝলাম না ভাই হঠাৎ এই বাইক রেসের চ্যালেঞ্জ কেনো করলেন। তাও যে সে লোক না। গ্রেট বাইকার আরিব খানকে? নিবিড় তার সামনে থাকা সুদর্শন যুবককে প্রশ্নটি করতেই যুবকটি বলতে লাগলো।

--- হুশশশ! অনেক দিন ধরেই আমার শরীর টা কেমন ম্যাজম্যাজ করছিলো বাইক রেসের জন্য।
কথা টা বলেই কেমন রহস্য জনক হাসি হাসলো যুবকটি।

আবারও নিবিড় কে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো।

কিন্তু শালার একটাও ভালো কোনো বাইকার পেলাম না। শেষ বার যখন কতগুলোকে ধরে এনেছিলি ওগুলো কোনো বাইকার ছিল? সবগুলোর আমার বাইকার কম জোকার বেশি মনে হয়েছে।
এইবারের কথাটা খানিকটা বিরক্ত কন্ঠেই বলল অভ্রয় নামের সুদর্শন যুবকটি।

অভ্রয় এর এরুপ কথায় নিবিড় নামের ছেলেটি এবার আর কিছুই বলতে পারলো না, কারণ সে জানে ভাই তার উপর বেজায় বিরক্ত হয়েছেন। এখন কিছু বলা মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারা।

***********
অভ্রয় পুরো নাম অভ্রয় চৌধুরী। অভ্রনীল চৌধুরীর একমাত্র নাতি সে। অনেক বছর আগেই অভ্রয় এর বাবা মা মারা যায়। একটা কার এক্সিডেন্ট কেড়ে নেয় অভ্রয়ের বাবা মা কে তার কাছ থেকে। তবে মজার বিষয় হলো সেদিন কার এক্সিডেন্ট এ শুধু অভ্রয়ের বাবা-মাই মারা যায় না আরো একজনও তার বাবা মাকে হারায়। শুধুমাত্র অভ্রনীল চৌধুরী ছাড়া কেউ জানে না সেইদিন আসলে হয়েছিল কি।
অভ্রনীল তার নাতিকে খুবই ভালোবাসেন, তাইতো নিজের নামের সাথে মিল রেখে নাতির নামকরণ করেন অভ্রয় চৌধুরী। বাবা মা হারানো এই নাতিই তার সব, কখনো কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেননি। যখন যা চেয়েছে তাই পেয়েছে অভ্রয় । তাইতো এতো আদরে সে বাদর হয়েছে, ছন্নছাড়া জীবন তার। কারো কথা শুনে না, শুধু তার দাদুকে ছাড়া। কথায় বলে না বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া ছেলে সেইরকম আরকি। তবে অভ্রয় কিন্তু মোটেও খারাপ মানুষ নয়। মানুষ হিসেবে সে যথেষ্ট সুচরিত্রের খালি সমস্যা একটাই বাবা মা ছাড়া বড়ো হওয়ার কারণে বিগড়ে গেছে।
তার এই বিগড়ানো জীবনকে ঠিক করতে কেউ কি আসবে তাঁর জীবনে? যে তার জীবনকে গুছিয়ে দিবে সুন্দর করে।

************

অন্যদিকে~

--- Btw চ্যালেঞ্জ টা করলো কে? বাইকের দিকে যেতে যেতে রেহানকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নটা করলো আরিব।

আরিবের প্রশ্নের জবাবে ছোটো করে জবাব দিলো রেহান।

--- অভ্রয় চৌধুরী
--- ওয়াও! খেলা দেখছি জমে যাবেরে রেহান। কথাটা বলেই একটা বাকি হাসি দিয়ে বাইক স্টার্ট করলো আরিব।

শো শো করে চোখের পলকেই গায়েব হয়ে গেলো বাইকটি। যার দিকে রহস্য জনক চোখে তাকিয়ে রইলো রেহান। তার ভাব দেখে কিছু বুঝা গেল না তবে বুঝা গেলো কিছু তো একটা আছে।

**********
খান বাড়িতে~

মাত্রই চোখ মেলেছে রওশনী। নরম বিছানা, সাথে আলিনার মমতা সব মিলিয়ে ভালোই ঘুম হয়েছে তাঁর। শোয়া থেকে উঠে বসে আড়মোড়া ভেঙ্গে, যেই না ঘড়ির দিকে নজর যায় ওমনি লাফিয়ে উঠে। সময় দেখে চক্ষু চড়কগাছ। এতো সময় নিয়ে সে ঘুমিয়ে ছিলো। ৫.০০ টা বেজে গেছে, মাথা ব্যাথা এখন আর নেই। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে রওশনী।
নিজেকে ঠিক করে নিচে নেমে আসে।

নিচে নামতেই দেখে ড্রইং রুমের সোফায় বসে কিসব ফাইল দেখছে আলিনা। তাকে দেখেই রওশনী ডাক দিলো।

--- আমার নিউ আম্মাজান।

অফিসের কিছু ফাইল চেক করতে বসেছিলেন আলিনা। হঠাৎ এইরকম সম্বোধনে নিজের চোখের কালো ফ্রেমের চশমা টা ঠিক করে মাথা টা উপরে তুলে দৃষ্টিপাত করতেই দেখলেন একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে মিষ্টি একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে।

ঘুমের কারণে চোখ দুটো ফুলে আছে হালকা। দুই পাশের গাল দুটোতে হালকা লাল আভা দেখা যাচ্ছে। সারা মুখ জুড়ে এক অপরূপ মায়া। সাথে মিষ্টি এক হাসি দিয়ে দাড়িয়ে আছে। কি সুন্দর যে লাগছে আলিনার কাছে রওশনীকে।

রওশনীর হাসি মুখে বলা কথাটায় আলিনা ও হাসি দিয়ে বলল।

--- বাহ! খুব সুন্দর ডাক তো। আম্মাজান।

আলিনার কথায় আবারও হাসলো রওশনী তবে এবার আরো প্রশস্ত করে। ওর এইরকম হাসি দেয়ার কারণে প্রথম বারের মতো ওর দাঁত খেয়াল করলো আলিনা। ওর একটা গজ দাঁত আছে। যা ওর হাসিকে আরো সুন্দর করে তুলছে বলে মনে করেন আলিনা। বরাবরই আলিনার এই দাঁত গুলো পছন্দের, তাঁর খুব শখ ছিল এই দাঁতের কিন্তু তাঁর তো আর নেই। তবে এখন রওশনীর এইরকম দাঁত থাকায় সে বেজায় খুশি হয়।

তার এই ভাবনার মধ্যে রওশনী বলে উঠলো।

--- আচ্ছা তাহলে আম্মাজান আজকে আমি যাই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। সন্ধ্যার আগে আমাকে বাসায় ফিরতে হবে।

রওশনীর কথায় আলিনা বলল।
--- সেকি এখনই চলে যাবে?
--- হ্যাঁ, এখনই যেতে হবে আমাকে। আর আমাকে থাকতে বলবেন না। অনেক সময় ছিলাম। আবার পরে আসবো। আজকে যাই আমি।

রওশনীর এইরকম কথায় আর জোর করতে পারলেন না আলিনা। তাই সে বলল।

--- বেশ যাও আমি আর আটকাবো না আজকে তবে আবার আসতে হবে।
--- আচ্ছা আসবো।
--- দাড়াও আমি ড্রাইভারকে বলছি তোমাকে দিয়ে আসতে।
--- কিন্ত..
--- কোনো কিন্তু না। এখানেই দাড়াও ড্রাইভার গাড়ি বের করুক তারপর যাবে।
--- আচ্ছা।

আলিনা চলে গেলো সেখান থেকে। হঠাৎ রওশনীর মনে পড়লো কামিনী তো তার কাছ থেকে একটা থ্যাংকস পাবে। যাই কামিনীকে একটা থ্যাংকস বলে আসি। যেই ভাবা সেই কাজ। রওশনী চলে গেলো কামিনীর কাছে।
কামিনীর রুম কোনটা তা সে জানে। কামিনীই দেখিয়েছিল তাকে।

রুমের সামনে আসতেই যেইনা দরজায় টোকা দিবে তার আগেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলো কামিনী।

দরজা খুলতেই সামনে রওশনীকে দেখেই কিছুটা ঘাবড়িয়ে গেলো কামিনী।

কামিনীর দিকে তাকিয়ে রইলো রওশনী। হঠাৎ তার কি জানি মনে হলো। কামিনী কি চোখে লেন্স পড়েছে? হঠাৎ এরকম ভাবনার কারণে কিছুটা অবাক হলো রওশনী।

আর কিছু ভাবতে পারলো না তার আগেই কামিনী তাকে ডাক দিলো।

রওশনীকে এইভাবে তার দিকে তাঁকিয়ে থাকতে দেখে একটু ঘাবড়ে গেল কামিনী। তবে কি রওশনী কিছু বুঝে নিল? না না। এইরকম হতে পারে না। দেরি না করে রওশনীকে ডাক দিলো।

--- আপু কি হলো? এভাবে তাকিয়ে কি দেখছেন?আর আপনার কী কিছু লাগবে? না হলে হঠাৎ আমার রুমের সামনে।

কামিনীর কথায় ভাবনা থেকে ফিরে আসে রওশনী। আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো।

ধুর কিসব কথা ভাবছি আমি? এরকম কিছুই না।
রওশনীকে বিড়বিড় করতে দেখে কামিনী আবার তাকে জিজ্ঞেস করল।

--- কিছু কি হয়েছে আপু? আপনার কিছু লাগবে?
--- উম! হ্যাঁ.. না।
--- কি বলছেন আপু আমি বুঝতে পারছি না।
--- না না কিছু না। আসলে আমি তোমাকে থ্যাংকস বলতে এসেছি।
--- থ্যাংকস? কিন্তু কেনো?
--- তোমার এতো সুন্দর চা এর জন্য। আমার মাথা ব্যাথায় আমাকে এতো সুন্দর চা করে খাওয়ানোর জন্য থ্যাংকস।
সাথে একটা মিষ্টি হাসি দিলো রওশনী।

--- আরে কি যে বলেন না আপু এতে থ্যাংকস এর কি আছে।
মুখে এটা বললেও মনে মনে ভাবলো।
যাক বেঁচে গেছি কিছু বুঝেনি।

এরই মধ্যে আলিনা রওশনীর নাম ধরে ডাকলে তাদের কথার ইতি ওখানেই ঘটে।

--- রওশনী, রওশনী। কোথায় তুমি?
--- এইতো এইখানে।
--- আসো। ড্রাইভার অপেক্ষা করছে।

তারপর গাড়িতে উঠলে আলিনা ড্রাইভারের উদ্দেশ্য বলল।
--- শুনো, ওকে সেইফলি পৌঁছে দিবে।

তার কথার উত্তরে ড্রাইভার বলল।
--- আচ্ছা ম্যাডাম। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।

এবার তিনি রওশনীকে বললেন।
--- ঠিক মতো যেও। আর আবার কিন্তু আসবে।
--- আচ্ছা আম্মাজান।

তারপর গাড়িটি চলে গেলো। আর আলিনা ও ঘরে চলে আসলো।

***********
অন্যদিকে~

মুখোমুখি হয়ে দাড়িয়ে আছে দুজন যুবক। দুজনেরই দৃষ্টি ধারালো, বাজ পাখির মতো তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে তারা একে অপরকে দেখছে।

--- অনেক দিন পর দেখা হলো দ্যা গ্রেট বাইকার আরিব খান।
অভ্রয় আরিবকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলল।

--- এসব বাজে কথা বন্ধ রেখে আসল কথায় আয়।
--- আসল কথা আবার কি? ওহ! হ্যাঁ মনে পড়েছে।

ওর এইরকম কথায় বিরক্তির "চ" বর্গীয় শব্দ বের হয়ে আসলো আরিবের মুখ দিয়ে।

ওকে বিরক্ত হতে দেখে এবার জোরে জোরে হাসতে লাগলো অভ্রয়।
হঠাৎ হাসি থামিয়ে দিয়ে সিরিয়াস হয়ে বলতে লাগলো।

--- তাহলে রেডি তো চ্যালেঞ্জ এর জন্য।
--- আরিব সবসময়ই রেডি থাকে। বলেই একটা smirk করলো।
--- বাহ! Nice. I like your attitude bro.
....

কিছুক্ষণ পর~
মানুষ এর ভিড় যেন উপচে পড়ছে। আর পড়বেই না বা কেনো। দুইজন অসাধারণ বাইকারের রেস বলে কথা। কেউ আরিব আরিব বলে চিল্লাচ্ছে তো কেউ অভ্রয় অভ্রয় বলে। আর মেয়ে গুলোর অবস্থা তো পুরোই খারাপ। যেখানে একজনের দেখা পাওয়াই বহুত কিছু সেখানে আজকে দুইজন একসাথে। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল।

এরই মধ্যে দুইজন সুদর্শন যুবক এসে হাজির। নিজেদের নিজেদের বাইক এর দিকে যাচ্ছে। দুইজনেই কালো আবরণে আবৃত। একজন পড়েছে ব্ল্যাক টিশার্ট ,তার উপর ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট আর ব্ল্যাক লেদার প্যান্ট মাথায় হেলমেট। অপরজন পড়েছে ব্ল্যাক টিশার্ট তার উপর ব্ল্যাক ডেনিম জ্যাকেট ও প্যান্ট। তার মাথায়ও হেলমেট।

তারা গিয়ে তাদের বাইকে বসলো। একজন রেস স্টার্ট করার জন্য রেডি বলতেই শা করে দুটো বাইকই চলে গেলো।
হাই স্পিড এ চলছে দুটো বাইক। কেউ কারও কাছে হারবে না। কেউ কাওকে এক চুল পরিমাণ ও ছাড় দিতে নারাজ। এই আরিবের বাইক সামনে তো এই অভ্রয়ের বাইক সামনে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে কতটা এক্সপার্ট তারা দুইজনেই। এরকম ভাবেই চলতে লাগলো তাদের রেস। কেউ কারও থেকে কম নয়, তবে জিত তো একজনরেই হয়। আর এই একজনটাই আর কেউ না গ্রেট বাইকার আরিব। সামান্য ব্যবধানে জয়ী হলো সে। ফিনিশিং লাইন ক্রস করতেই দুইটা বাইককে তাদের ওনাররা সুনিপুণ ভাবে ব্রেক করে থামিয়ে দেয়।

হেলমেট খুলে হাতে নেয় দুজন। চুলগুলোকে হাত দিয়ে পিছনে ঠেলে দেয় আরিব। দুইজন একসাথে আবার মুখোমুখি হয়।

এবার আরিব সামান্য একটু হেসে অভ্রয়কে বলতে থাকে।
--- কেমন লাগলো হারার ফিলিংস?
--- এইবার তুই জিতেছিস পরের বার আমি জিতবো।
--- হা হা হা! সেটা তোর স্বপ্নেই হতে পারে। বলেই চলে যেতে নিলে অভ্রয় ওর কাধে হাত রাখে।

হঠাৎ অভ্রয়কে নিজের কাধে হাত রাখতে দেখে তাঁর দিকে শীতল চাহুনি নিক্ষেপ করে জিজ্ঞেস করল

--- কি হয়েছে?
--- Thanks.
--- But Why? ভ্রূ উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো আরিব।
--- আজকে তোর জন্য শুধুমাত্র বাইক রেসের মজা পেলাম। এতদিন অনেক রেস করেছি শালার একটাতেও রেস রেস ফিল আসলো না। কিন্তু আজকে আমাকে সেই ফিল দিলি তাই thanks. Next time আবারও ready থাকিস রেস এর জন্য।
--- আরিব always ready থাকে সব কিছুর জন্য।

এরপর তারা চলে গেলো নিজেদের নিজেদের গন্তব্যে।

**********
খান বাড়ি~

রেস শেষ করে সবে মাত্র বাড়ি ফিরলো আরিব। কলিংবেল বাজালে আলিনা এসে দরজা খুলে দেয়।

মা কে দেখেই জড়িয়ে ধরলো। তবে তাকে নিজের থেকে দূরে সরাতে সরাতে আলিনা বলল।

--- উফ! একদম আমাকে ধরবে না তুমি।
--- okay.
বলেই চলে যেতে নিলে আলিনা তার কান টেনে ধরে। এতে আরিব বলে উঠে।
--- what happened Mom? কান ধরে টানছো কেনো?
--- বেশ করেছি। কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
--- বাইক রেসে।

আলিনা এবার কিছু বলতে নিলে আরিব বলল।

--- উফ মা. আমি অনেক টায়ার্ড। এখন আর আমি কোনো কথা শুনতে চাই না।
বলেই হনহনিয়ে চলে গেলো সে। আর তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আলিনা।....

উপরে উঠে নিজের রুমে পা রাখতেই থমকে গেলো আরিব। তার কেনো জানি মনে হচ্ছে তার রুমে কেউ এসেছিল। কে এসেছিল?
চলবে....

আমার প্রিয় পাঠক পাঠিকারা তোমরা একটু বেশি বেশি রিয়াক্ট কইরো। ১০০ রিয়েক্ট ও হয় না। আর আজকে বড় করে পার্ট দিয়েছি সেই উপলক্ষ্যে হলেও একটু রিয়াক্ট কইরো।নেক্সট দিন আরো বড় পর্ব দেওয়ার চেষ্টা করবো।ধন্যবাদ ।

#কটম্যােৱেজ
#পর্ব_৭
#ইৱফা_মাহনাজ

[ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আর বেশি বেশি শেয়ার করবেন, ধন্যবাদ
নোট: আপনারা যদি নিজেদের গল্প / উপন্যাস পাঠাতে করতে চান। তাহলে যোগাযোগ করতে পারেন। যোগাযোগের মাধ্যম :মেসেঞ্জার & হোয়াটসঅ্যাপ। ধন্যবাদ 🌺

#রেমান্টিক #গল্প #নতুন

🌺গল্প কেমন লাগছে বলে যাবেন।💕পরবর্তী পর্ব চাইলে দ্রুত রেসপন্স করুন 🌺

🚫রোমান্টিক এলার্টসন্ধ্যা ঠিক সাতটা। শহরের বুকে নিয়ন বাতির আলো ঝলমল করছে। চারপাশ মোহময় রূপ ধারণ করেছে। আয়াতের কোনোদিকে ভ...
21/09/2026

🚫রোমান্টিক এলার্ট

সন্ধ্যা ঠিক সাতটা। শহরের বুকে নিয়ন বাতির আলো ঝলমল করছে। চারপাশ মোহময় রূপ ধারণ করেছে। আয়াতের কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। সারাদিনের অফিসের একটানা কাজের পর শরীর আর মন দুটোই ভীষণ ক্লান্ত। ডেস্কে বসে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে তার। সে চেয়েছিল সোজা ক্যাসেলে ফিরে যেতে। ঘরে গিয়ে একটু শান্তিতে বিশ্রাম নিতে। কিন্তু রোজার জেদের কাছে শেষমেশ তাকে হার মানতেই হলো। দুজনে একই অফিসে চাকরি করে, সম্পর্কটা শুধু সহকর্মীর নয়, বরং বেশ ভালো বন্ধুত্বেও তো। বন্ধুত্বের দোহাই দিয়েই রোজা আজ তাকে টেনে এনেছে শহরের অন্যতম অভিজাত এবং ব্যয়বহুল এক রেস্টুরেন্টে।
রেস্টুরেন্টের প্রকাণ্ড কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই আভিজাত্যের কড়া ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে আয়াতের। ফ্রেঞ্চ পারফিউম, রোস্টেড গার্লিক আর দামী এয়ার ফ্রেশনারের মিশ্র সুবাস পুরো জায়গাটাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ওপরের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ে এক সুদৃশ্য ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি, যেখান থেকে ঠিকরে পড়া সোনালি আলো পুরো রেস্টুরেন্টটাকে এক রাজকীয় রূপ দিয়েছে। চারপাশের পরিপাটি ডেকোরেশন, প্রতিটি টেবিলে রাখা তাজা অর্কিড, মৃদু লয়ে বাজতে থাকা ক্লাসিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক আর ওয়েটারদের অতি বিনয়ী ভঙ্গি বলে দিচ্ছে জায়গাটা সাধারণ মানুষের জন্য নয়।
আয়াতের অস্বস্তি হতে থাকে। তার পরনে থাকা সাদামাটা কালো বোরখা আর নিকাবটা এখানকার ঝলমলে পরিবেশের সাথে বড্ড বেমানান। রেস্টুরেন্টের অন্যান্য কাস্টমারদের দিকে আড়চোখে তাকায় সে। সবার পরনে নামীদামী ব্র্যান্ডের পোশাক, নারীদের মুখে নিখুঁত মেকআপ। আয়াত নিজের বোরখার প্রান্তটা একটু টেনে ধরে ইতস্তত করে বলে, "রোজা, জায়গাটা বেশিই এক্সপেন্সিভ মনে হচ্ছে রে। আমাদের কি এখানে আসাটা ঠিক হলো? চল না, অন্য কোথাও যাই। সাধারণ কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে নিই। এখানকার পরিবেশটা বড্ড ভারী।"
রোজা স্বভাবসুলভ চটপটে ভঙ্গিতে হাসে। সে আয়াতের হাত ধরে টেনে কাউন্টারের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলে, "আরে ধুর! সারাদিন গাধার মতো খাটি কি শুধু টাকা জমিয়ে রাখার জন্য নাকি? মাঝে মাঝে নিজেকে ট্রিট দিতে হয়। আজ আমরা এখানকার স্পেশাল বুফে ট্রাই করব। তুই জাস্ট চিল কর আয়াত। কেউ তোর দিকে তাকাচ্ছে না, তুই শুধু আজকের সন্ধ্যাটা এনজয় কর।"

দুজনে মিলে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়। সন্ধ্যা সাতটা হওয়ায় রেস্টুরেন্টে বেশ ভিড়। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে তারা বুফের মেন্যু দেখছে এবং অর্ডার কনফার্ম করার জন্য স্টাফের সাথে কথা বলছে। কাউন্টারের ওপাশে থাকা স্টাফ বেশ হাসিমুখেই তাদের অর্ডার নোট করছে। ঠিক এমন সময়ই রেস্টুরেন্টের মেইন গেট দিয়ে বেশ কয়েকজন যুবক হইচই করতে করতে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে সবার সামনে থাকা যুবকটির পরনে অত্যন্ত দামি লেদার জ্যাকেট আর পায়ে লিমিটেড এডিশনের স্নিকার্স। তার হাঁটার ভঙ্গি আর চোখের দৃষ্টিতে চূড়ান্ত ঔদ্ধত্য আর তাচ্ছিল্যের ছাপ। সে সোজা কাউন্টারের দিকে এগিয়ে আসে।
পেছন থেকে একটা অপ্রত্যাশিত ধাক্কা এসে লাগে রোজার গায়ে। ধাক্কাটা এতোটাই জোরালো আর আকস্মিক ছিল যে রোজা টাল সামলাতে না পেরে কয়েক পা ছিটকে যায়। তার হাতের পার্সটা ফ্লোরে পড়ে যায়। আয়াত হকচকিয়ে গিয়ে দ্রুত রোজাকে ধরে ফেলে। "রোজা! ঠিক আছিস তুই?"

দুজনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে সদ্য আসা উদ্ধত চেহারার যুবকটি দাঁড়িয়ে আছে। তার পেছনে চামচাগোছের আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। যুবকটি আয়াত কিংবা রোজার দিকে ফিরেও তাকায় না। কারো গায়ে ধাক্কা লাগার পর ন্যূনতম সৌজন্যবোধ দেখানোর প্রয়োজন হয়, তার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই তার মাঝে। সে সোজা কাউন্টারের স্টাফের দিকে আঙুল তুলে অপরিসীম অহংকারের সাথে নির্দেশ দেয়, "এই! আমার আর আমার ফ্রেন্ডদের জন্য ভিআইপি লাউঞ্জে একটা ডিনারের সেট রেডি করে দাও! কুইক! আমার হাতে একদম সময় নেই।"
বিনা কারণে ধাক্কা খেয়ে এবং লোকটার অভদ্র আচরণ দেখে রোজার মেজাজ মুহূর্তেই সপ্তমে চড়ে যায়। সে এমনিতেই একটু রগচটা স্বভাবের। ফ্লোর থেকে নিজের পার্সটা কুড়িয়ে নিয়ে সে রাগে গিজগিজ করতে করতে কড়া গলায় প্রতিবাদ করে ওঠে, "এক্সকিউজ মি মিস্টার! আপনি কেন আগে যাচ্ছেন? আপনার কি ভদ্রতা জ্ঞানটুকুও নেই? চোখে দেখতে পান না যে এখানে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে? এটা আমাদের জায়গা, আমরা আগে এসেছি আর আমরাই অর্ডার করছি। পেছনে গিয়ে লাইনে দাঁড়ান!"
রোজার তীক্ষ্ণ প্রতিবাদে রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে বসা স্টাফের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করে। সে কাঁচুমাচু হয়ে, ভয়ে ভয়ে রোজাকে উদ্দেশ্য করে বলে, "ম্যাম প্লিজ শান্ত হোন। একটু আস্তে কথা বলুন। উনি এই রেস্টুরেন্টের মালিকের ছেলে। উনাকে কিছু বলবেন না প্লিজ।"
স্টাফের কথা শুনে আয়াত এবার বেশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। রেস্টুরেন্টের মালিকের ছেলে তো কী হয়েছে? একজন কাস্টমারের সাথে গায়ে পড়ে অসভ্য আচরণ করার রাইট তো কেউ তাকে দেয়নি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হলে কি ভদ্রতার মাথা খেয়ে ফেলতে হয়? আয়াত শান্ত কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলে, "তো? উনি মালিকের ছেলে হয়েছেন বলে এমন অসভ্য বিহেভ করবেন? এটা কেমন কথা? আমরা এখানে কাস্টমার হিসেবে এসেছি। একজন কাস্টমারকে ধাক্কা দেওয়ার অধিকার উনাকে কে দিয়েছে? উনার উচিত রোজার কাছে মাফ চাওয়া।"
আয়াতের শান্ত অথচ ধারালো কথাগুলো আগুনে সরাসরি ঘি ঢেলে দেয়। যুবকটি এবার সরাসরি আয়াতের দিকে ঘোরে। নিকাবে ঢাকা আয়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে তার অহংকার আরও বেশি ফুঁসে ওঠে। তার ইগোতে জোর আঘাত লেগেছে। তার বাবার রেস্টুরেন্টে দাঁড়িয়ে একটা সামান্য মেয়ে তাকে জ্ঞান দিচ্ছে!
সে তাচ্ছিল্যের এক বিকৃত হাসি হেসে, আয়াতের মুখের ঠিক সামনে আঙুল উঁচিয়ে শাসিয়ে বলে, "এই বোরখাওয়ালি! একদম চুপ থাকবি। তোর কত বড় সাহস যে তুই আমাকে ম্যানারস শেখাচ্ছিস! আমার রেস্টুরেন্টে দাঁড়িয়ে আমাকেই কথা শোনাচ্ছিস? অতিরিক্ত কথা বলবি তো এই রেস্টুরেন্টের ভেতরেই সবার সামনে তোর বোরখা টেনে খুলে রেখে দেব! তখন বুঝবি কার সাথে কথা বলছিস। বুঝেছিস?"
কথাটা শোনার পর আয়াতের মস্তিষ্কে মনে হলো কেউ ভারী হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত করেছে। তার পুরো পৃথিবীটা মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। বোরখা তার কাছে শুধু এক টুকরো কাপড় নয়, এটা তার বিশ্বাস, তার পর্দা, তার অস্তিত্ব আর সম্মানের প্রতীক। সম্মান নিয়ে সবার সামনে, এতগুলো অপরিচিত মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এমন জঘন্য একটা কথা কেউ বলতে পারে, তা আয়াতের কল্পনার অতীত ছিল। অপমানে, ক্ষোভে আর লজ্জায় আয়াতের পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। তার চোখ দুটো মুহূর্তেই পানিতে ভরে আসে। সে কোনো কথাই বলতে পারে না, গলার কাছে একটা দলা পাকানো কান্না আটকে থাকে।
যুবকটি এখানেই থামে না, সে নিজের ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে রেস্টুরেন্টের সিকিউরিটি গার্ডদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, "এই সিকিউরিটি! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস তোরা? এই দুই বিচকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে এখনই এখান থেকে বের করে দে! আমার রেস্টুরেন্টে এসব ফালতু আর ছোটলোক মানুষের কোনো জায়গা নেই। জাস্ট গেট দেম আউট!"
জঘন্য আর অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে আয়াত আর রোজা দুজনেই একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে উপস্থিত অসংখ্য মানুষের চোখ এখন তাদের দিকে। পুরো রেস্টুরেন্টে নিশ্চুপ পরিবেশ। কেউ ফিসফিস করছে, কেউ কেউ করুণার দৃষ্টিতে দেখছে। কিন্তু কেউ টুঁ শব্দটিও করে প্রতিবাদ করছে না। ধনী আর ক্ষমতাশালীদের অন্যায়ের সামনে সাধারণ মানুষ এভাবেই নিশ্চুপ থাকে। সিকিউরিটি গার্ডরা তাদের দিকে কড়া দৃষ্টিতে এগিয়ে আসার আগেই অপমানে মাথা নিচু করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে তারা।
বাইরে আসার সাথে সাথে ভেতরে আটকে রাখা কান্নাটা আর বাঁধ মানতে চায় না আয়াতের। দুচোখ বেয়ে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। চোখের পানিতে নিকাবের ভেতরের অংশটুকু ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সবার সামনে, এতগুলো মানুষের উপস্থিতিতে হিউমিলিয়েট সে তার সতেরো বছরের জীবনে কখনোই হয়নি। রোজা অনুতপ্ত হয়ে বারবার আয়াতের হাত ধরে বলছে, "সরি আয়াত আমাকে মাফ করে দে। আমার জন্যই তোর আজ এত বড় অপমান হলো। আমি বুঝতে পারিনি রেস্টুরেন্টের মালিকের ছেলে এমন একটা অমানুষ হতে পারে। আমাকে ক্ষমা করে দে ভাই।"
আয়াত কিছুই বলতে পারছে না। তার চোখ জলে এত বেশি ঘোলাটে হয়ে আছে যে সামনের রাস্তাও সে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না। এন্ট্রি গেট দিয়ে ঘোরলাগা মানুষের মতো বের হওয়ার সময় হঠাৎ করেই সামনের দিক থেকে আসা বেশ দীর্ঘদেহী একজনের সাথে সজোরে ধাক্কা লাগে তার। লোকটার প্রশস্ত আর পাথরের মতো শক্ত বুকের সাথে ধাক্কা খেয়ে আয়াত প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু লোকটা দ্রুত তার এক হাত শক্ত করে ধরে ফেলে পতন ঠেকায়।
চোখের পানি মুছতে মুছতে কোনোমতে মাথা নিচু করেই "সরি, সরি" বলে মুখ তোলে আয়াত। মুখ তুলেই আয়াতের শরীরের রক্ত জমে বরফ হয়ে যায়। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আর কেউ নয়, জেইদান!
এটা পুরোপুরি অভাবনীয় ছিল। জেইদান এখানে? এই মুহূর্তে? আয়াতের বিশ্বাসই হতে চায় না। সে কি স্বপ্ন দেখছে? জেইদান তার দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আয়াতের ভেজা চোখ, ফোঁপানো নিঃশ্বাস আর ভয়ে কাঁপতে থাকা শরীর জেইদানের তীক্ষ্ণ নজর এড়ায় না। জেইদানের মতো একজন প্রভাবশালী মানুষের আশেপাশে সবসময় মিডিয়া আর সিকিউরিটির কড়া নজর থাকে। একটু এদিক ওদিক হলেই কাল খবরের কাগজের হেডলাইন হয়ে যাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে জেইদান কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছে না। তার চোখের সামনে তার ইফফাত কাঁদছে, তার নীলচে চোখে পানি জমেছে এর চেয়ে বড় সত্যি আর কিছু নেই। সে আয়াতের হাতটা আরও শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে।

জেইদানের কপালের রগগুলো ফুলে ওঠে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সে অতি উদ্বিগ্ন কিন্তু ভারী গলায় জিজ্ঞেস করে, "ইফফাত, আর ইউ ওকে? তোমার চোখে পানি কেন? কে কাঁদিয়েছে তোমাকে? ভেতরে কিছু হয়েছে?"
রোজা ওদের গোপন বিয়ের ব্যাপারটা আগে থেকেই জানে। সে জানে জেইদান জেইস নামক এই মানুষটা আয়াতের জীবনে ঠিক কতটা জুড়ে আছে। আয়াত ঘাবড়ে যায়। এখানে জেইদানের এমন প্রকাশ্য উপস্থিতি তার অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। সে তড়িঘড়ি করে জেইদানের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে কাঁপা গলায় বলে, "না, না, আমি কাঁদব কেন! এমনি বাতাসে কিছু পড়েছে চোখে। আপনি প্লিজ হাত ছাড়ুন, কেউ দেখে ফেলবে। আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি।"
কিন্তু জেইদান হাত ছাড়ে না। তার আশেপাশেই বেশ কয়েকজন সুঠামদেহী বডিগার্ড অ্যালার্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জেইদানের তীক্ষ্ণ চোখ আয়াতের মিথ্যে অজুহাত নিমেষেই ধরে ফেলে। সে খুব ভালো করেই জানে আয়াতের চোখে বাতাস লাগেনি, কেউ তার মনে আঘাত করেছে। সে বুঝতে পারে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে যার কারণে আয়াত এভাবে কাঁপছে।
পরিস্থিতি দেখে রোজা আর চুপ থাকতে পারে না। ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ আর অপরাধবোধটা তার এবার আগ্নেয়গিরির মতো বেরিয়ে আসে। সে জেইদানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, "কিছু হয়নি মানে? অনেক কিছুই হয়েছে স্যার! আমরা ওখানে বুফের অর্ডার দিতে গিয়েছিলাম। তখন এই রেস্টুরেন্টের ওনারের ছেলে নিজে এসে কাউন্টারে আমাকে ধাক্কা দেয়। আমরা এর প্রতিবাদ করায় সে আয়াতকে সবার সামনে ইনসাল্ট করে। সে আঙুল তুলে বলে যে, আয়াতের বোরখা টেনে সবার সামনে খুলে রেখে দেবে! আর সিকিউরিটি ডেকে আমাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছিল।"
রোজার মুখের কথা এখনও শেষ হয়নি। 'বোরখা টেনে খুলে নেবে' বাক্যটা জেইদানের কানে পৌঁছাতেই তার মস্তিষ্কের সমস্ত শিরা উপশিরায় গরম সীসা বইতে শুরু করে। জেইদান জেইস, যে কিনা পুরো বিজনেস ওয়ার্ল্ডে এক নামে পরিচিত, যার চোখের ইশারায় বড় বড় সাম্রাজ্য কেঁপে ওঠে, যার একটা সাইনে কোটি টাকার ডিল হয়, তার স্ত্রীর বোরখা খুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে একটা সামান্য রেস্টুরেন্ট মালিকের বখাটে ছেলে?
জেইদানের চেহারার রং বদলে যায়। তার চোখের দৃষ্টি হয়ে ওঠে এক হিংস্র, ক্ষুধার্ত বাঘের মতো। তার ভেতরের সুপ্ত শয়তানটা এক নিমিষেই জেগে ওঠে। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে শক্ত হাতে আয়াতের হাত চেপে ধরে রেস্টুরেন্টের ভেতরের দিকে পা বাড়ায়।
আয়াত ভয় পেয়ে যায়। জেইদানের ভয়ংকর রূপ তার অচেনা নয়। সে জানে জেইদান রেগে গেলে কতটা ভয়ংকর, কতটা বেপরোয়া হতে পারে। আয়াত জেইদানকে আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যাকুল স্বরে বলে, "প্লিজ! জেইদান প্লিজ, কোনো সিন ক্রিয়েট করবেন না! আমি আর সবার সামনে অসম্মানিত হতে চাই না। ভুলটা আমাদেরই ছিল, আমাদের এই হাই-ক্লাস জায়গায় যাওয়াই উচিত হয়নি। প্লিজ চলুন এখান থেকে! আমি আপনার পায়ে পড়ছি।"
কিন্তু জেইদান কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তার মাথায় ততক্ষণে খুন চেপে গেছে। সে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলে, "প্রমিজ করছি, কোনো সিন ক্রিয়েট করব না ইফফাত। জাস্ট কথা বলব।"
এই বলে সে আয়াতের হাত ধরেই সোজা রেস্টুরেন্টের ভেতরে গিয়ে দাঁড়ায়। জেইদানের প্রবেশের সাথে সাথেই রেস্টুরেন্টের পরিবেশ হঠাৎ করেই ভারী হয়ে ওঠে। তার উপস্থিতি এমনই যে পুরো জায়গার বাতাস থমকে যায়। তার বডিগার্ডরা মুহূর্তের মধ্যে মেইন গেট ব্লক করে দেয়, যাতে কেউ বাইরে যেতে না পারে কিংবা ভেতর থেকে কেউ ভিডিও করতে না পারে। জেইদান রোজার দিকে তাকিয়ে গাম্ভীর্যের সাথে শুধু একটি বাক্য উচ্চারণ করে, "কে সে? দেখিয়ে দাও আমাকে।"
রোজা কাঁপা কাঁপা হাতে ভিআইপি সেকশনের সামনের টেবিলে বসে থাকা অহংকারী ছেলেটাকে দেখিয়ে দেয়। ছেলেটা তখন বন্ধুদের সাথে বসে আয়েশ করে ড্রিংকস খাচ্ছে আর হাসাহাসি করছে। জেইদান আয়াতের হাত ছেড়ে দেয়। তারপর ধীর, মাপা পায়ে ছেলেটার দিকে এগিয়ে যায়। জেইদানের হাঁটার ভঙ্গিতে এমন একটা আক্রোশ আর রাজকীয় দম্ভ ছিল যে উপস্থিত সবার দৃষ্টি সেদিকে আটকে যায়।
কিছু বোঝার আগেই জেইদান ছেলেটার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। ছেলেটা ঘাড় ঘুরিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই জেইদান তার পেছনের চুলগুলো এক হাতে শক্ত মুঠোয় খামচে ধরে। কোনো কথা না বলে, একটা কুকুরের মতো টেনেহিঁচড়ে তাকে চেয়ার থেকে ফ্লোরে ফেলে দেয় জেইদাম।
আচমকা আক্রমণে ছেলেটা ব্যথায় আর আতঙ্কে আর্তচিৎকার করে ওঠে। তার হাতের ড্রিংকসের গ্লাসটা ফ্লোরে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। উপস্থিত কাস্টমাররা ভয়ে আঁতকে ওঠেন। কেউ কেউ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। রেস্টুরেন্টের ভেতরে একটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। কিন্তু জেইদানের বডিগার্ডরা সাথে সাথে পুরো জায়গাটা ঘিরে ফেলে এবং অত্যন্ত কড়া ভাষায় নির্দেশ দেয় কেউ যেন ফোন বের না করে কিংবা কোনো ভিডিও না করে।
জেইদান ছেলেটাকে ফ্লোর দিয়ে হিঁচড়ে টেনে এনে সোজা আয়াতের পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলে। তারপর তার বুকের ওপর নিজের ভারী জুতোর পা তুলে দিয়ে পুরো রেস্টুরেন্ট কাঁপিয়ে গর্জে উঠে বলে, "তোর এত বড় সাহস! তুই আমার ওয়াইফকে থ্রেট দিস ওর বোরখা খুলে নিবি? তোর বাপের রেস্টুরেন্ট বলে তুই কাস্টমারের সাথে এমন বিহেভ করবি! আজ আমি তোর চামড়া খুলে নেব জানোয়ার!"
কথাগুলো শেষ করেই জেইদান নিজের কোমরের দামি চামড়ার বেল্টটা এক ঝটকায় খুলে ফেলে। তারপর কোনো কিছু চিন্তা না করেই ছেলেটাকে বেধড়ক মারতে শুরু করে। বেল্টের এক একটা বাড়িতে ছেলেটার পিঠের জামা ছিঁড়ে যেতে থাকে। সে ভয়ে, ব্যথায় আর রাগে চিৎকার করতে থাকে। জেইদানের একেকটা আঘাত তার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ছেলেটা এবার বুঝতে পারছে যে সে কার গায়ে হাত দেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছে। জেইদান জেইস কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটা সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ছেলেটার বন্ধুরা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে, কারো সাহস নেই জেইদানের সামনে আসার।
মারামারির শব্দে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার তার কেবিন থেকে দৌড়ে আসে। পরিস্থিতি দেখে তার হাত পা কাঁপতে শুরু করে। সে আমতা আমতা করে জেইদানকে থামানোর চেষ্টা করে বলে, "স্যার প্লিজ! কী হয়েছে আমাকে বলুন। উনি মালিকের ছেলে, উনাকে এভাবে মারবেন না স্যার, আমি সলভ করছি!"
জেইদান এক মুহূর্তের জন্য থামে। তারপর বেল্টটা এক হাতে ধরে রেখে অন্য হাতে ম্যানেজারের গালে সপাটে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। থাপ্পড়ের জোরে ম্যানেজার ছিটকে ফ্লোরে পড়ে যায়। জেইদান তার কলার চেপে ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, "রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার হয়েছিস, আর তোর স্টাফরা কাস্টমারের সাথে কেমন বিহেভ করছে, কাকে ইনসাল্ট করে বের করে দিচ্ছে সেদিকে তোর কোনো খেয়াল নেই! তুই সলভ করবি? তোর পার্মানেন্ট সলিউশন আমি আজ বের করছি দাঁড়া!"
পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। জেইদান আজ কাউকেই ছাড়বে না। আয়াত ভয়ে কাঁপছে। এত মানুষের সামনে রক্তারক্তি কাণ্ড দেখে তার শ্বাস আটকে আসছে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে পেছন থেকে জেইদানের কোটের হাতা টেনে ধরে।
ভাঙা আর কান্নায় রুদ্ধ হওয়া গলায় আয়াত বলে ওঠে, "জেইদান প্লিজ, বন্ধ করুন এসব। আমি আর নিতে পারছি না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। প্লিজ চলুন এখান থেকে। আমি আর এখানে থাকতে চাই না।"
আয়াতের করুণ, কম্পিত কণ্ঠস্বর জেইদানের কানে পৌঁছাতেই তার হাতের বেল্ট থেমে যায়। সে এক ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে আসে। ম্যানেজারের কলার ছেড়ে দিয়ে সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় আয়াতের দিকে। তার চোখের হিংস্রতা নিমেষেই উধাও হয়ে যায়, সেখানে জায়গা করে নেয় এক বিচিত্র মায়া আর উদ্বেগ।
জেইদান আয়াতের একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায়। নিজের দুই হাত দিয়ে আয়াতের মুখটা আলতো করে ছুঁয়ে, নিকাবের ওপর দিয়েই নিবিড় যত্নে তার চোখের পানি মুছে দেয়। তারপর একদম শান্ত, কোমল অথচ দৃঢ় স্বরে বলে, "তুমি কাঁদছো কেন ইফফাত? ফল্ট তো ওদের, তোমার নয়। একদম কাঁদবে না। ইটস মাই ওয়ার্নিং, তুমি আর এক ফোঁটাও পানি ফেলবে না চোখ থেকে। কেউ তোমাকে কাঁদাবে আর আমি সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব, তোমার স্বামী এতটা উইক নয়।"
আয়াত দুদিকে মাথা নেড়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, "আমি জানতাম না এমন কিছু হবে। জানলে এখানে কখনোই আসতাম না জেইদান। আমাকে মাফ করে দিন, আমার জন্য আপনাকে এত নিচে নামতে হলো। আপনার সম্মান নষ্ট হলো।"
জেইদান আর কোনো কথা শোনে না। সে সবার সামনেই, এতগুলো মানুষের উপস্থিতির তোয়াক্কা না করেই আয়াতকে আলতো করে নিজের শক্ত বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে। আয়াতের মাথায়, নিকাবের ওপর গাঢ় আদরে একটা দীর্ঘ চুমু খায় সে। তারপর আয়াতের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, "শোনো, তুমি আমার ওয়াইফ। জেইদান জেইসের ওয়াইফ! তোমার জন্য পৃথিবীর কোনো কিছুই অসুবিধার নয়। তুমি যেখানে ইচ্ছে যাবে, যা ইচ্ছে করবে। কেউ তোমাকে একটা কথা বলার সাহস পাবে না। আর তোমার পথে যা অবস্টাকল আসবে, যা কিছু তোমাকে কষ্ট দেবে, তা আমি এভাবেই হ্যান্ডেল করব। সবসময়।"
আয়াত স্তব্ধ হয়ে থাকে জেইদানের বুকে মাথা রেখে। সে ঘুণাক্ষরেও কোনোদিন ভাবেনি জেইদান তাকে এভাবে সবার সামনে সাপোর্ট করবে! কখনোই না। তাদের সম্পর্কটা অনেক জটিলতার মধ্য দিয়ে শুরু হলেও, আজ এই মুহূর্তে জেইদানের এই রূপ আয়াতের ভেতরের অনেক ভুল ধারণা ভেঙে চুরমার করে দেয়। সে অনুভব করে, এই কঠিন আবরণধারী মানুষটার বুকে তার জন্য কতটা সুরক্ষিত একটা আশ্রয় রয়েছে।

কিছুক্ষণ পর।
রেস্টুরেন্টের ভেতরের ভিআইপি সেকশনের সবচেয়ে বড় আর বিলাসবহুল টেবিলটায় জেইদান, আয়াত আর রোজা বসে আছে। পুরো রেস্টুরেন্ট এখন স্পিকটি নট। সাধারণ কাস্টমারদের বডিগার্ডরা অত্যন্ত ভদ্রভাবে বিল পে না করেই চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
টেবিলের ঠিক সামনে রেস্টুরেন্টের মালিক যিনি খবর পেয়ে দশ মিনিটের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছেন আর তার বখাটে ছেলে হাঁটু গেড়ে, হাত জোড় করে বসে আছে। ছেলের সারা শরীরে বেল্টের দাগ, মুখটা ফুলে আছে। মালিকের চোখেমুখে চূড়ান্ত আতঙ্ক। সে খুব ভালো করেই জানে জেইদান জেইস চাইলে এক রাতেই তার এই ব্যবসা পথে বসিয়ে দিতে পারে, তাকে নিঃস্ব করে দিতে পারে।

জেইদান অত্যন্ত শান্তভাবে, একটা ওয়েট টিস্যু দিয়ে নিজের হাত মুছতে মুছতে আয়াত আর রোজার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে, "তোমরা কি ওদের মাফ করেছ?"
আয়াত আর রোজা এতক্ষণ ধরে চলা এই তাণ্ডবে এমনিতেই জমে আছে। তারা আর কোনো ঝামেলা চায় না। দুজনে তাড়াতাড়ি একসাথে বলে ওঠে, "হ্যাঁ।"
এটা শুনে জেইদান একটা বাঁকা হাসি দেয়। সে নিজের গার্ডের থেকে একটা লিগ্যাল পেপার বের করে রেস্টুরেন্টের মালিকের দিকে ছুড়ে দেয়। তারপর তীক্ষ্ণ কিন্তু ধারালো গলায় বলে, "এই পেপারে সাইন করে কাল সকালে শার্প দশটায় আমার অফিসে পাঠিয়ে দিও। সাথে তোমার সব ব্যাংক ডিটেইলস। আর হ্যাঁ, তোমার ছেলেকে বলে দিও, ফিউচারে কোনো মেয়ের দিকে আঙুল তোলার আগে সে যেনো জেইদান জেইসের কথা একবার মনে করে।"
মালিক পেপারটা হাতে নিয়ে দেখে তার চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। জেইদান জেইস তার এই রেস্টুরেন্ট কিনে নেওয়ার পেপার রেডি করে নিয়েছে এই একটু সময়ের মধ্যে। মালিক কাঁপা কাঁপা গলায় কিছু একটা বলতে যায়, "স্যার এটা আমার সারাজীবনের ইনভেস্টমেন্ট প্লিজ স্যার।" কিন্তু জেইদানের এক ইশারায় তার বডিগার্ডরা মালিককে চুপ করিয়ে দেয়।
জেইদান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না। সে উঠে দাঁড়িয়ে আয়াতের হাত শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় আটকে নেয়। তারপর তাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টের মেইন গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করে। হ্যাঁ, জেইদান শুধু বখাটে ছেলেটাকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি, সে এই আস্ত রেস্টুরেন্টটাই কিনে ফেলেছে! আগামীকাল সকালে কাগজ পেলেই এই অহংকারের জায়গাটা পুরোপুরি তার হয়ে যাবে।
আয়াত হতবাক হয়ে জেইদানের পাশে পাশে হাঁটছে। জেইদানের হাতের শক্ত স্পর্শ তার হাত বেয়ে পুরো শরীরে এক অচেনা শিহরণ জাগাচ্ছে। সে মনে মনে ভাবছে, "এই লোকটা কি সত্যিই পাগল হয়ে গেল? শুধু আমাকে একটা অপমানজনক কথা বলার জন্য সে এত বড় একটা রেস্টুরেন্ট কিনে ফেলল? এমন করছে কেন সে!"
রাতের হিমেল হাওয়া আয়াতের মুখে এসে লাগে। আর এর সাথে তার মনের ভেতরে জেইদানকে নিয়ে তৈরি হওয়া এক নতুন, অজানা অনুভূতির বাতাসও প্রবাহিত হতে শুরু করে। শহরের নিয়ন আলোগুলো এখন আর তার কাছে ক্লান্তিকর মনে হচ্ছে না, বরং জেইদানের হাতের উষ্ণতায় চারপাশটা অন্যরকম সুন্দর আর নিরাপদ মনে হচ্ছে তার কাছে।

রাত ঠিক দশটা বাজে।
ইতালির মিলান শহরটা এখন এক অপার্থিব রূপ ধারণ করেছে। দিনের বেলার তুমুল ব্যস্ততা, ফ্যাশন আর কোলাহল রাতের অন্ধকারে কোথাও হারিয়ে গেছে। প্রাচীন গথিক আর্কিটেকচারের মাঝে শহরের হলুদ সোডিয়াম আলোর আভা আর দূর থেকে ভেসে আসা ট্রামের অস্পষ্ট শব্দ এক আভিজাত্যপূর্ণ স্তব্ধতা তৈরি করেছে। প্রাসাদের মতো প্রকাণ্ড বাড়ির রুমের কাঁচের দরজা পার হয়ে জেইদান বেলকনির কারুকাজ করা রেলিং এ হাত রেখে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মিলানের রাতের কনকনে বাতাস তার অবাধ্য রুক্ষ চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সুদূরের কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারের দিকে নিবদ্ধ থাকলেও, তার মাথায় এখন খেলছে কতশত এলোমেলো চিন্তা।
চিন্তার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দুতে একটিই নাম, আয়াত! জেইদান যখন অতীতের দিকে তাকায়, তখন তার নিজেরই সবকিছু কেমন অবিশ্বাস্য মনে হয়। তার জীবনে মায়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। মায়ের আদরহীন শূন্যতা আর রুক্ষ পরিবেশে বড় হওয়া জেইদান ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের প্রতি একধরনের অনীহা আর কঠোরতা নিয়েই নিজেকে গড়ে তুলেছিল। আর তার জীবনের অভাবনীয় পরিস্থিতিরই সুযোগ নিয়েছিল জেইদানের সৎ মা আর ফুফু। তারা জেইদানের নাকচ থাকা সত্ত্বেও তার ঘাড়ে আয়াতকে চাপিয়ে দেয়, বিয়ে নামক এক নির্মম ফাঁদে ফেলে।
প্রথমদিকে জেইদান পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল যে আয়াত একজন নিছক সম্পদলোভী কিংবা গোল্ড ডিগার। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত যে আয়াতও তার লোভী সৎ মা আর ফুফুর দলেরই লোক, তাদেরই সাজানো কোনো চাল, যে কি না জেইদানের সম্পত্তি হাতাতে অথবা তার ক্ষতি করতে এই বাড়িতে এসেছে। আয়াতের প্রতি তার মনে তখন একমাত্র ছিল তীব্র ঘৃণা, সন্দেহ আর অবিশ্বাস।
কিন্তু ধীরে ধীরে জেইদানের ধারণা একেবারে শেকড় থেকে পাল্টে গেছে। আয়াতের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত জেইদানকে বাধ্য করেছে নিজের ভুল ভাঙতে। মেয়েটার মোহময় আর সরল নীলচে চোখ, কথায় কথায় ভয় পেয়ে গুটিয়ে যাওয়া, রাতের বেলা নিঃশব্দে বালিশ ভেজানো আর ওর ছোট ছোট নির্দোষ কাজগুলো প্রমাণ করেছে যে আয়াত ওদের লোক তো নয়ই, বরং সে নিজেই লোভী মানুষগুলোর নির্মম ষড়যন্ত্রের এক অসহায় শিকার।
কিন্তু জেইদান এখন নিজের পরিবর্তিত রূপের কাছেই হেরে যাচ্ছে। যে মেয়েটাকে সে ঘৃণা করবে বলে ভেবেছিল, যাকে সে ছুড়ে ফেলার কথা ভেবেছিল, কেন আজ তার জন্যই বুকটা এমন ব্যাকুল হয়ে ওঠে? চারপাশের প্রচ্ছন্ন শত্রুদের নোংরা জাল থেকে সে কীভাবে আয়াতকে রক্ষা করবে, জেইদান একমনে সেটাই ভাবছে। আয়াতের মতো একটা সরল, সাধারণ মেয়েকে এই কঠিন পৃথিবীর রূঢ়তা থেকে বাঁচিয়ে নিজের আশ্রয়ে আজীবন আগলে রাখার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার ভেতরে কাজ করছে। জেইদান চায় না কারো মায়ায় পড়তে৷ কারণ সে কারো মায়ায় পড়লে সেটা অভিশাপ বেশি হয় মায়ার চেয়ে।
এসব ভেবে জেইদান যখন নিজের ভেতরেই এক প্রলয়ংকারী ঝড়ের সাথে লড়াই করছে, ঠিক তখনি তার মস্তিষ্কের সব স্নায়ু সজাগ হয়ে ওঠে। একটা খুব পরিচিত, মিষ্টি আর মাতাল করা সুবাস বাতাসে ভেসে আসে। জেইদান ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়, আর ঠিক পরমুহূর্তেই তার শ্বাস গলার কাছে এসে আটকে যায়।
বেলকনির অনুজ্জ্বল চাঁদের আলোতে আয়াত এসে দাঁড়িয়েছে। আয়াতের পরনে আজ একটা গাঢ় নীল রঙের ঢিলেঢালা টপস, আর তার সাথে একদম সাদামাটা একটা সাদা রঙের পায়জামা। কিন্তু এই সাধারণ পোশাকেও তাকে অসাধারণ লাগছে। গাঢ় নীল রঙের কাপড়ের কন্ট্রাস্টে আয়াতের ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ রাতের অন্ধকারেও এক অপার্থিব আভা ছড়াচ্ছে। মিলানের রাতের মাতাল বাতাসে ওর লালচে জিনজার রঙের রেশমি চুলগুলো অবাধ্যভাবে উড়ছে, জেইদানের চারপাশে এক মোহনীয় জালের সৃষ্টি করছে। চাঁদের আলো ফর্সা চেহারায় পড়তেই জেইদানের মনে হলো, কোনো অপ্সরী বুঝি ভুল করে পৃথিবীতে নেমে এসেছে।
আয়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে জেইদান আরও একবার থমকে যায়। তার নীলচে চোখ দুটোতে আজ এক অন্যরকম সতেজতা আছে। ওর জাদুকরী নীলচে চোখে যখন মিলান শহরের দূরবর্তী আলো ঠিকরে পড়ছে, জেইদান গাঢ় নীলে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। শীতের বাতাসে ওর ছোট্ট, প্রাকৃতিকভাবেই গোলাপি ঠোঁট দুটো হালকা কাঁপছে। সব মিলিয়ে লালচে জিনজার চুল, নীলচে চোখ আর ধবধবে ফর্সা ত্বকের এই আকর্ষণীয় সংমিশ্রণ জেইদানের ভেতরের সমস্ত কাঠিন্যকে নিমিষেই চুরমার করে দেয়। জেইদানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই খুব জোরে স্পন্দিত হতে শুরু করে।

চলবে,,
—10


সবাই বেশি বেশি শেয়ার করবেন।

Address

Rajshahi

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Safe Motivation posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Safe Motivation:

Shortcuts

Share