Abegi Onuvuti

Abegi Onuvuti ~সাত সাগর আর তেরো নদী 🩵
পার হয়ে তুমি আসতে যদি 🥹
রুপকথার রাজকুমার হয়ে🤵
আমায় তুমি ভালোবাসতে যদি.👩‍❤️‍👨❤️‍🩹🥀

22/08/2026

এখন অনেক রাত—
শহরের সমস্ত আলো নিভে গেছে,
খাঁটি অন্ধকারে বসে তোমার কথা ভাবছি, ভেবেই যাচ্ছি
সেই ছেলেটিও চলে গেলো—
যে কিনা বলেছিল, গা ছুঁয়ে কথা দাও পরাণ কখনো ছেড়ে যাবে না।

এখন অনেক রাত—
জীবন ঝাঁকিয়ে প্রেম চলে গেছে,
ক্লান্ত জীবন আমার—
কবরের বিশ্রাম চাইছে।

অনেকদিন পর আবার রাজশাহী শহরে এলাম। শহরটা আমার কাছে শুধু একটা শহর নয় এর প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মোড়, প্রতিটি নীরব রাতের...
19/08/2026

অনেকদিন পর আবার রাজশাহী শহরে এলাম। শহরটা আমার কাছে শুধু একটা শহর নয় এর প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মোড়, প্রতিটি নীরব রাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তোমার কিছু স্মৃতি।

মনে আছে, এক দিন তোমাকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছিলাম। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। তোমার হাতটা শক্ত করে ধরে আমি হাঁটছিলাম, আর চারপাশের মানুষগুলো কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল আমাদের। সেদিকে আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না।

প্রচণ্ড রোদ ছিল। সেই রোদের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে আমরা কলোনি থেকে সাতমাথার দিকে চলে এলাম। সাতমাথায় পৌঁছে নিজেরাই অবাক হয়ে হেসেছিলাম এতটা পথ আমরা হেঁটে চলে এসেছি!

হঠাৎ একটা হুটখোলা রিকশা দেখে উঠে পড়লাম। শহরের নিস্তব্ধ দুপুরে দুজন মিলে দেখতে দেখতে চলছিলাম। একসময় আমি তোমার কাঁধে মাথা রাখলাম। আর তুমি খুব যত্ন করে আমার কপালে একটা চুমু খেয়েছিলে। সেই মুহূর্তটুকু আজও আমার স্মৃতিতে অদ্ভুত রকমের জীবন্ত।

আজ এতদিন পর আবার সেই সাতমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ তুমি নেই।

আবারও রোদ হচ্ছে। সেই একই শহর, একই রাস্তা, একই আবহ শুধু পাশে নেই তোমার হাতটা। , নেই সেই মৃদু হাসি, নেই তোমাকে নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে শহর ঘুরে বেড়ানোর সেই মানুষটা।

আমি শুধু হাঁটছি।

কোথায় যাব, জানি না। কেন হাঁটছি, তাও জানি না। শুধু মনে হচ্ছে, শহরটা আজও আমাকে আমাদের সেই দুপুরের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বারবার।

রাত এখন গভীর, ছাদে বসে আছি। চারপাশে গভীর নিরবতা যেনো পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে,শুধু আমিই একা জেগে আছি আমার না বলা কথা গ...
13/08/2026

রাত এখন গভীর, ছাদে বসে আছি। চারপাশে গভীর নিরবতা যেনো পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে,শুধু আমিই একা জেগে আছি আমার না বলা কথা গুলোর ভিড়ে, নারিকেল গাছের পাতাগুলো নড়ছে, চারিদিকে শুনশান নীরবতা। আমি আকাশ দেখছি, সম্ভবত মানুষের বুক খালি হয়ে এলে তখন মানুষ ফ্যালফ্যাল করে আকাশে তাকিয়ে থাকে। আচ্ছা(s...) তুমি কি আমাকে মনে করো, মনে করে বালিশ ভিজাও, কোন কোন রাতে তোমারো কি ঘুম হয় না। কোন কোন রাতে তুমিও কি আমার মত আত্মহত্যার কথা ভাবো..

ইরা বলল তুমি বিয়ে করছো, খুবি আনন্দের সংবাদ। ইরাকে বলেছি, সুখী হোক ছেলেটি। ইরা কি মনে মনে আমাকে প্রতারক ভেবেছে কিনা কে জানে, প্রেমিক বিয়ে করছে এই সংবাদ শুনে যে মেয়ে শান্ত থাকে, তার আসলে প্রেমিককে হারানোই উচিত— সম্ভবত ইরা এটাই বলেছে মনে মনে।

রাত ঘড়ির কাটার সাথে সমোঝোতা করে হাঁটছে, অন্ধকার আরো গভীর হয়ে ওঠছে, নীরবতাও বাড়ছে সমান ভাবেই। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশ দেখেই যাচ্ছি। সত্যি বলতে ইরাকে কি বলা উচিত আমার জানা নেই আসলে। প্রিয় বৃহস্পতিবারের এই অন্ধকার ছাদে বসে, একজন প্রেমীকা তার প্রেমিকের উদ্দেশ্যে কোন কবিতা লিখবে, তুমিই বলো। যে সমস্ত হৃদয় চষে বেড়িয়েছে তাকে কি বলার আছে।

আত্মহত্যা চাইলে যাওয়ায় যায় কিন্তু আমার জন্য কাঁদবে কে, আত্মহত্যার মত একটা দারুণ ব্যপার ঘটে যাওয়ার পরেও দুঃখীত হওয়ার মত কেউ নেই এটা সত্যি খারাপ দেখায়। তুমি তো ব্যস্ত তোমার রঙিন জীবন নিয়ে, উল্লাস করছো, পার্কে ঘুরছো, সিনেমা দেখছো, আরো কত কি।

পৃথিবীর বৃহস্পতিবারগুলো আজকাল জঘন্য লাগে সত্যি, জঘন্য লাগে প্রেমিকের বাড়িতে রঙিন বাতির বিবাহ গেইট বাঁধা থাকা দেখতে। সারাবছর এখানে স্বপ্নে ভেসে, অন্যের বুকে মাথা রাখতে ব্যস্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিককে নিকৃষ্ট লাগে। নিকৃষ্ট লাগে আরো অনেককিছুই, সব লিখা যায় না।

প্রেমের নামে ইয়ার্কি করে গেলে। মাথামোটা আমি দাঁড়িয়ে সেই ইয়ার্কি দেখে গেলাম। তুমি কোনদিন বুঝনি, একটা মেয়ের দুঃখ কোথায়। কোনদিন টের পাওনি বিরহে মানুষকে কতটা পোড়ায়। এইতো ঘর হলো, বউ হলো, ভালোবাসাবাসি হবে, হয়ত এবার টের পাবে ভালোবাসা আসলে কি। বুঝবে সম্পর্ক দেখতে কেমন হয়, মানুষ কখন ঠোঁট কামড়ে কান্না করে। অবহেলা কেনো মানুষের হৃদয় দিয়ে নেওয়া যায় না।

আপাতত সুখ উদযাপন করো, ফরজ গোসলের নিয়মে আরো মনোযোগী হও। শরীরে সুগন্ধী মাখোঁ, কোমড়ে ঢেউ তুল কামনার। বেদনার সব রাতের সাথে আমি দীর্ঘশ্বাস টানি, যেহেতু জীবনের ইতি টানার বৈধতা নেই। বাধ্য হয়ে বেঁচে থাকি..

জীবন কখনো ইয়ার্কি করলে প্রায়শ্চিত্তের চিঠি লিইখো— বৃহস্পতিবারের রাত্রিতে নিঃসঙ্গ একদল নক্ষত্রের সাথে আমিও জেগে থাকি। একটা ছাদের এক কোণে, আর দীর্ঘশ্বাস টেনে আাকাশে নিজেকে দেখি।

আমি তখন ষোলো বছরের কিশোরী, আর তুমি একুশ বছরের যুবক।ভালোবাসা সম্পর্কে তেমন একটা জ্ঞান ছিলো  না। তোমার হাত ধরেই আমি প্রথম ...
12/08/2026

আমি তখন ষোলো বছরের কিশোরী, আর তুমি একুশ বছরের যুবক।ভালোবাসা সম্পর্কে তেমন একটা জ্ঞান ছিলো না। তোমার হাত ধরেই আমি প্রথম ভালোবাসা নামক সুন্দরতম অনুভূতির সাথে পরিচিত হই।

তখন ভালোবাসা বলতে বুঝতাম তোমার হাত টুকু ধরা,তোমার চোখের দিকে তাকানো, দিনের সব গল্প তোমায় বলা নিয়মিত ভালোবাসি শব্দটা উচ্চারণ করা ব্যাস এতটুকুই।
তোমার কাঁধে মাথা রাখার মতো সাহস আমার তখন ছিলো না, আর নাই বা ছিলো তোমায় জড়িয়ে ধরে বুকের স্পন্দন শুনা।

তোমার শাড়ি পরা পছন্দ বলে আয়না দাড়িয়ে রোজ রোজ শাড়ি পড়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতাম, শাড়ি পড়ে ধীরে পায়ে হাঁটতাম, যেন তোমার সামনে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে লজ্জায় না পড়তে হয়। তোমার আমাকে খোঁপা চুলে পছন্দ বলে আমি খোঁপাই করে তোমার সামনে যেতাম।

মনে আছে, তুমি খোঁপায় ফুল গুঁজবে বলে আমার কাছে আসলে আমি কেমন লজ্জায় নুইয়ে যেতাম তুমি তখন খিলখিলিয়ে হাসতে আর আমি বোকার মতোই তোমার হাসি না দেখে দৌড়ে বাড়ি চলে আসতাম।

কতশত শব্দ জমা করে তোমার জন্য অগোছালো চিঠি লিখতাম। মেলায় গিয়ে চুড়ি কিনে দেওয়ার বায়না ধরতাম। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তোমার জন্য রান্না করা শিখতাম।

কিশোরী মনেই তোমাকে জায়গা দিয়েছিলাম তোমায় নিয়ে কত রঙিন স্বপ্ন বুনেছিলাম টিনের ছোট্ট একটা ঘরে তোমায় নিয়ে সংসার সাজাবো। কাজ শেষে ক্লান্ত গায়ে সন্ধ্যায় তুমি বাড়ি ফিরলে কপালের ঘামটুকু আমার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দিবো।

এক রুটি দুজন ভাগ করে খাবো, বৃষ্টির দিনে তোমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজবো তারপর গায়ে জ্বর আসলে তোমার বুকেই গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে থাকবো। সংসারের খরচ থেকে বাঁচিয়ে খুচরা পয়াসা জমা করে তোমার জন্য শখের সাদা পাঞ্জাবী কিনবো আরও কত কি স্বপ্ন?

তারপর,তুমি হঠাৎ একদিন ছেড়ে গেলে আমিও বাঁচতে ভুলে গেলাম, স্বপ্ন বুনতে ভুলে গেলাম আমি সেই পুরনো সময়টাতেই আটকে রইলাম আজও।

_

03/08/2026

দীর্ঘ সাত বছর পর টিএসসির মোড়ে দুই প্রাক্তনের হঠাৎ দেখা -

- 'আমাকে দেখে অবাক হওনি?'

শামীম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মুচকি হেসে উত্তর দেয়,
- 'হয়েছি তবে তোমাকে দেখে নয়, তোমার লম্বা চুলগুলোকে দেখে।'

রুমকি হয়তো খানিকটা ইতস্ততবোধ করে বলে,
- 'আসলে ওর লম্বা চুলই পছন্দ। তাই এখন আর আগের মত তিনমাস অন্তর অন্তর নতুন নতুন হেয়ার কাট দিই না৷'

- 'আচ্ছা ভালো তো। তারপর বলো কেমন আছো?'

- 'যেরকম থাকার কথা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি, সেরকম আছি।'

রুমকি একটু থেমে আবার বলতে শুরু করে,
- 'বাবার কথামতো বিয়েতে রাজি হয়ে যাওয়ার পর মনে মনে ভীষণ ভয় পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো আমি সুখী হতে পারবো না। তোমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারবো না। কিন্তু বিয়ের পর আর এক মূহুর্তের জন্যেও এমন ভয় বা শঙ্কা কাজ করেনি কখনো।

কপালগুণে অসম্ভব ভালো একজন মানুষ পেয়েছি আমি। তার কথা বলতে গেলে সময় ফুরিয়ে যাবে কিন্তু কথা ফুরাবে না, বুঝলে?'

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে রুমকির ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে। শামীম স্থির দৃষ্টি নিয়ে সেই হাসির দিকে তাকিয়ে থাকে।

- 'কি হল? এভাবে কি দেখছো?'

- 'দেখছি তোমার সরলতাকে। এমন করে অবলীলায় কেউ তার প্রাক্তনের সামনে নিজের হাজবেন্ডের গুণগান করতে পারে বলে জানা ছিল না।'

- 'ওমা! এ আবার কেমন কথা! যা সত্যি তা বলবো না? এটা কি কোনো নাটক সিনেমা নাকি যে প্রাক্তনের সামনে সবসময় দুঃখী দুঃখী চেহারা নিয়ে উদাসী হয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে!'

- 'তা অবশ্য ঠিক বলেছো।'

- 'তুমি কেমন আছো?'

- 'যেমনটা আশা করেছিলাম তেমনই আছি।'

শামীমও একটু থেমে আবার বলতে শুরু করে,
- 'তুমি চলে যাওয়ার পর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম একজন সঠিক মানুষের জন্য। যে আমাকে তোমার দেয়া দুঃখগুলো ভুলিয়ে দেবে। আমার সকল দূর্বলতাকে মেনে নিয়ে শক্ত হাতে আমাকে সামলে নেবে।

আর আমাকে তোমার থেকেও অনেক অনেক বেশি ভালোবাসবে। ভাগ্যগুণে পেয়েও গেলাম সেই সঠিক মানুষটাকে। হ্যাঁ, সে খানিকটা দেরি করেই আমার জীবনে এসেছে কিন্তু তবুও এসেছে তো! অনেকে তো সময়ের আগে চলে এসে আবার সময়ের আগেই চলে যায়।'

শেষ কথাটা যে রুমকিকে উদ্দেশ্য করে বলা, তা রুমকি ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বরং কৌশলে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলে,

- 'তা এখানে কেন এসেছিলে? কোনো দরকারে নাকি এমনিই?'

- 'বেলী ফুলের মালা কিনতে এসেছিলাম। বউয়ের হুকুম প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার সময় তার জন্য একটা করে বেলীফুলের মালা নিয়ে যেতে হবে। বিয়ের পর থেকে এভাবেই চলছে আর কি।'

- 'ও আচ্ছা। কিনেছো বেলী ফুলের মালা?'

- 'না। যে বাচ্চা মেয়েটা মালা বিক্রি করে, আজ ওকে দেখতে পাচ্ছি না। দেখি অন্য কোথাও পাই কিনা। বাই দ্যা ওয়ে, তুমি কেন এসেছিলে?'

- 'মাল্টা চা খেতে এসেছিলাম।'

- 'একা একা?'

- 'আরে না। ভেবেছিলাম এখানে এসে ওকে কল করে বলবো অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসতে। প্রায়ই করি এমন। কিন্তু আজ তো তোমার সাথে কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেল।'

- 'হ্যাঁ আমারও দেরি হয়ে যাচ্ছে। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হলাম যেন জলদি বাসায় ফিরতে পারি। তা আর হল কই! আরো দেরি করলে জ্যামে পড়তে হবে নিশ্চিত৷'

খানিকক্ষণের মধ্যে একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যে যার পথে হাঁটা শুরু করলো।


বাসায় ফিরে ফ্রেশ না হয়েই শামীম দুটো বেলী ফুলের মালা তার বউয়ের দিকে এগিয়ে দিতেই চোখমুখ কুঁচকে বউ তার দিকে তাকালো,

- 'তোমাকে না কতদিন বলেছি এসব ঢং আমার ভালো লাগে না? তাও মানতাম যদি এই সস্তা মালার বদলে দামী কিছু আনতে।'

শামীম কোনো প্রতিউত্তর না করে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর ফ্রেশ হতে চলে যায়। ওয়াশরুম থেকে সে তার বউয়ের গলা শুনতে পায়। গলা উঁচিয়ে বউ তাকে উদ্দেশ্য করে বলছে,

- 'অনলাইনে একটা কমদামী শাড়ি অর্ডার করেছি। ৪০০০টাকা কাল অফিসে যাওয়ার আগে রেখে যেও। আমি মায়ের বাসায় যাচ্ছি। রাতে ওখানেই থাকবো। আর শুনো রান্না করার সময় একটু সাবধানে কাজ করো৷ গতবার রান্নাঘরের বারোটা বাজিয়ে রেখেছিলে। সেগুলো পরিষ্কার করানোর জন্য বুয়াকে বাড়তি ৫০০টাকা দিতে হয়েছে। মেকআপ কেনার বাজেটে টান পরেছিলো পরে।'

শামীম বেসিনের আয়নার দিকে তাকিয়ে অন্যান্য দিনের মত আজও রুমকির সাথে মনে মনে কথা বলা শুরু করে দেয়, ‘তুমি আমাকে আজও বুঝতে পারলে না রুমকি! চোখের মিথ্যে অভিনয় ধরতে পারলে না! টিএসসির মোড়ে আমি কখনো বেলী ফুলের মালা কিনতে যাই না, যাই তোমার স্মৃতিচারণ করতে।’


ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে বসে একমনে আয়নায় নিজেকে দেখছে রুমকি। পিঠ সমান চুলগুলো সামনে এনে কাঁধের একপাশে ছড়িয়ে রেখে ভাবছে, ‘নতুন নতুন হেয়ার কাট দেয়ার মতো মানসিক বা আর্থিক সুখ কোনোটাই যে নেই এখন আমার। অথচ তুমি বুঝতে পারলেই না আমি আসলে ঠিক কতখানি সুখী। সে আমার লম্বা চুল পছন্দ করে ঠিকই কিন্তু ভালোবেসে নয়, বরং প্রতিরাতে মাতাল হয়ে এসে যেন আমার চুলের মুঠিটা আয়েশ করে ধরতে পারে সেজন্য।

টিএসসির মোড়ে গিয়ে আমি কখনোই ওকে কল দিয়ে অফিস থেকে চলে আসতে বলি না একসাথে মাল্টা চা খাওয়ার জন্য। বরং মনে মনে প্রার্থনা করি, সে যেন ঘুণাক্ষরেও টের না পায় যে আমি আমার প্রাক্তনের স্মৃতিচারণ করতে এখানে আসি। বরাবরের মতো আজও আমাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে গেলে শামীম!’

-

গল্প:কথোপোকথন
shamim_vhai

কাঠগোলাপ বিয়ে করেছে— এই খবর পাই কাঠগোলাপের বিয়ের প্রায় এক সপ্তাহ পর। তাও অন্যজনের মাধ্যমে, কাঠগোলাপের কাজিন নিতু আমাকে জ...
30/07/2026

কাঠগোলাপ বিয়ে করেছে— এই খবর পাই কাঠগোলাপের বিয়ের প্রায় এক সপ্তাহ পর। তাও অন্যজনের মাধ্যমে, কাঠগোলাপের কাজিন নিতু আমাকে জানায়। খবর পাওয়া মাত্রই আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে, গলা শুকিয়ে ওঠে। সমস্ত পৃথিবী বিদঘুটে অন্ধকার হয়ে যায়, আমি অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করি— এই প্রথম বাড়ি ফিরতে আমার সামান্য রাস্তাটুকু এত দীর্ঘ লাগছে যে, মনে হয় শতাব্দী ধরে আমি কেবল হেঁটে যাচ্ছি।

অনেকদিন আগের কথা নিতু আমাকে সাবধান করেছিল, রাত দুটোর দিকে নিতুর এসএমএস— আমি প্রায় রাতে জেগে থাকি। কাগজে কলম ঘুরানোর অভ্যেস আছে, কাঠগোলাপের কাছে খুব শুনে আমার কথা। তারপর থেকেই আমার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে ছিলো নিতুর, নিতু লিখছে ভাইয়া আমি জানি আমাকে হয়ত বিশ্বাস করবেন না, এও জানি কাঠগোলাপের বিষয়ে এগুলো বলাও আমার ঠিক হচ্ছে না। তবুও কাঠগোলাপের প্রতি আপনার অসম্ভব পাগলামো দেখে আপনাকে বলতে আসছি, আশা করি কাঠগোলাপের কাছ থেকে গোপন করবেন।

কাঠগোলাপের আরো একটা সম্পর্কে আছে— ছেলে বাহিরে থাকে। বাড়ির অবস্থাও বেশ ভালো, শুনেছি শীঘ্রই দেশে ফিরবে। দুই পরিবার একসাথে বসবে এবং পাকা কথা হবে তাদের বিয়ে নিয়ে। আমি কাঠগোলাপকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সব ঠিক আছে কিন্তু উনার সাথে যেটা করছিস আমার মনে হয় ভুল করছিস, ছেলেটা তর প্রতি খুব দূর্বল। মানুষ হৃদয়ের দিক থেকে খুব নরম হয়, যদি সত্যিটা কখনো জানতে পারে ভীষণ কষ্ট পাবে। ছেলেটার পাগলামো দেখে আমার খুব ভয় হয়, যদি মেনে নিতে না পেরে কিছু একটা করে বসে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবি। একটা কথা বলি শোন— কাউকে ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ঠেলে দিয়ে কখনো সুখি হওয়া যায় না।

কাঠগোলাপের মাঝে তেমন কোন আগ্রহ দেখলাম না ভাইয়া— হাসি দিয়ে আমার কথাগুলো উড়িয়ে দিলো। আর বললো আপনাকে তার ভালোলাগে, ভালোবাসে কী-না জানে না। কোনভাবে যদি ওই ছেলেটার সাথে বনিবনা না হয়, তাহলে আপনাকে বেছে নিবে। আপনাকে এখনি হাতছাড়া করতে চাচ্ছে না, আপনাকে নাকি কাঠগোলাপ অপশনে রেখেছে। রাত ঘড়ির কাটা তিনটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে — নিতু লিখছে লিখেই যাচ্ছে।

আমি বিশ্বাস করিনি— ভেবেছি নিতুকে দিয়ে কাঠগোলাপ হয়ত আমাকে বাজিয়ে দেখছে। আমি নিতুকে প্রতিত্তোরে লিখলাম, দেখুন কাঠগোলাপ এমনটা করতেই পারে না, কাঠগোলাপকে আমি চিনি। আর কেউ না জানুক আমি জানি কাঠগোলাপ আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে। নিতু বললো ভালো থাকবেন ভাইয়া, এতটুকু বলার ছিলো। আপনার জন্য খুব মায়া হচ্ছে..

আড়াই বছর কেটে গেছে— আজ আবারো কাঠগোলাপকে মনে পড়লো। আজ কাঠগোলাপ নেই, কোথাও হয়ত দারুণ সংসার করছে, এতদিনে বাচ্চাকাচ্চা জন্ম দিয়ে নিশ্চয় সন্তানের জননী হয়ে উঠেছে। কাঠগোলােকে আমি পাইনি এটা আমাকে দুঃখ দেয় না, আমাকে দুঃখ দেয় আমার বিশ্বাস। আমার বিশ্বাসের কাছে আমি খুব লজ্জিত হয়ে পড়ি। যখন মনে পড়ে এমন একজন মানুষের পায়ের কাছে— খাঁটি প্রেমের জায়নামাজ বিছিয়ে দিয়েছিলাম, যে আমার বিশ্বাসের সাথে বিশ্বস্তভাবে প্রতারণা করে গেছে।

নিতুর সঙ্গে আরো একবার কথা হয় আমার— গতবছরের ডিসেম্বর মাসে। আকাশে অদ্ভুত বৃষ্টি— আমিই নক করি তাকে। জিজ্ঞেস করি কেমন আছে, উত্তরে ভালো বলেই একটা অন্যরকম কথা শোনায়। কথাটা শোনার প্রস্তুত ছিলাম না— নিতু বলছে জানেন ভাইয়া কাঠগোলাপ যে বিয়ে করেছে ছেলেটা কিন্তু ঔই ছেলেটা না, যে বাহিরে থাকত। কাঠগোলাপ আসলে আপনাদের দু'জনের সাথেই প্রতারণা করেছে, আপনাদের ইমোশন নিয়ে খেলেছে।

কাঠগোলাপের বিয়ে হয়েছে যে ভদ্রলোকের সাথে— কাঠগোলাপের থেকে বয়সে বেশ বড়। এলাকায় বেশ নাম-ডাক আছে ওনাদের, প্রচুর টাকা-পয়সাওয়ালা। শুনলে শক খাবেন, কাঠগোলাপের সম্মতিতেই কিন্তু বিয়েটা হয়েছে। আকাশের অদ্ভুত বৃষ্টিটা আরো বেড়ে ওঠলো। আমি নীরব দুটো চোখ দিয়ে কেবল আকাশ দেখে যাচ্ছি, সিগারেট এগিয়ে দিচ্ছি ঠোঁটের দিকে। তারপর— আর কখনো নিতুর সাথে কথা হয়নি আমার, ভয় হয় যদি আবারো অসম্ভব কিছু শোনায়, যার জন্য আমি প্রস্তুত না।

আজ বৃহস্পতিবার— আকাশে সেই অদ্ভুত বৃষ্টি
একটা ছারখার বাতাস বয়ে চলছে,
কাঠগোলাপ নয় নিতুর জন্য তুমুল ঘৃণা—
সত্যগুলো গোপন থাকলে আমার বেঁচে থাকা সহজ হত।
সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স—
হসপিটালের দিকে ছুঁটে যাচ্ছে, ভেতরে আমার মুমূর্ষু জীবন।

আমার বিয়ে ভাঙার শোকে বাবা মারা গিয়েছিলেন। আর বাবার মৃত্যুর শোকে মা আমার থেকে যে মুখ ফেরালেন, আজ বারোটি বছর আমি মায়ের মুখ...
20/07/2026

আমার বিয়ে ভাঙার শোকে বাবা মারা গিয়েছিলেন। আর বাবার মৃত্যুর শোকে মা আমার থেকে যে মুখ ফেরালেন, আজ বারোটি বছর আমি মায়ের মুখ দেখিনি তিনিও তা-ই।
প্রায় প্রায় চোখের সামনে মায়ের মুখটা ঝাপসা হয়ে ফুটে ওঠে। আমি মায়ের মুখটা মনে করতে পারি না। বাবার মুখটা যদিও মনে করতে পারি তবে সেটা মনে করতে চাই না। কারণ মৃত্যুর আগে বাবার মুখটা যেমন যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে গিয়েছিল! সেই মুখটি আমার কাছে দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
আপানারা হয়ত ভাবছেন- বিয়েটা ভাঙল কী করে? হয়ত আমার প্রেম ছিলো! আমি নিশ্চয় পালিয়ে গিয়েছিলাম কিংবা আমিই কোনো একটা অঘটন ঘটিয়েছিলাম। আপনাদের ভাবনা অর্ধ সত্য বটে। অঘটন আমিই ঘটিয়ে ছিলাম তবে পালিয়ে গিয়ে নয়। সেখানে উপস্থিত থেকেই। বলছি সে কথাই, শুনুন..

আমার একটি প্রেম ছিলো। উন্মুখ, খড়া জীবনে একবার বসন্ত আমার জন্যও এসেছিল।
বহুদিন আগে জানি না কেমন করে, কোন লগ্নে, কোন জাগতিক ইশারায় আমি একজন পুরুষের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার বয়স তখন মোহগ্রস্থ একুশ তার হয়ত আমারচে প্রায় দশ-পনেরো বেশি পরিপক্ব আটত্রিশ কিংবা চল্লিশ। বয়সের পার্থক্য শুনে নিশ্চয় অবাক হচ্ছেন? অবাকের কিছু নেই। প্রেম, ভালোবাসা, মায়া এসব কখনোই স্থান, কাল, বয়স, পাত্র অথবা যুক্তি মেনে হয় না। আমার ক্ষেত্রেও তাই। আমি তখন চঞ্চল পায়রা, কথায় কথায় হেসে মরি। রক্তে সে তীব্র এক দুঃসাহস! পৃথিবীকে মনে হতো এক খণ্ড উন্মাদ ভূমি। সেই উন্মাদ ভূমিতেই আমার বরষার জল হয়েছিলো সেই সুপুরষটি। সুপুরুষই বটে। নারীকে অমন আহ্লাদে, যত্নে, মায়ায় যে ফেলতে পারে তাকে সুপুরুষ না বললে মহা ভুল হবে।
প্রেমের আরম্ভ অতিরঞ্জিত ছিলো না। আমি জানতামও না আমি তার প্রেমে পড়ব। স্বাভাবিক, শান্ত পরিচয় কেমন করে যে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ হয়ে গেলো, কে জানে!

তার প্রেমে পড়েছিলাম আমি বহু বহু দিন লাগিয়ে। বিনা পরিকল্পনা, বিনা আকাঙ্ক্ষায়। সে বড়ো সুন্দর ভঙ্গিমায় কথা বলতো। এই যেমন ধরুন, একদিন শাড়ি পরেছিলাম। সেটা দেখে সে আমায় সুন্দর বলেনি, বলেছিলো— আকাশ আমার ভীষণ পছন্দ। আকাশের দিকে তাকালে সকল মন খারাপ ভালো হয়ে যায়। আপনি আমার আকাশ হবেন?
আবার কখনো সখনো অবুঝ আমি রাগে নাকের পাটা ফুলিয়ে নিলে বলতো— দেবী বলে যা ইচ্ছে করতে পারেন না। বড্ড জ্বালাতন করছেন।

এমন মায়াময় কথা ফেলে দেওয়া কি যায় বলুন? তার উপর আমার মুগ্ধ হওয়ার বয়স! আমিও ফেলতে পারিনি। তার আকাশ হওয়ার জন্য বুকের জমিন খুলে দিয়ে ছিলাম। সে বলেছিলো তার বাবার যে একটি বইয়ের আলমারি ছিলো সেটি কাউকে ধরতে দেওয়া হয় না কিন্তু সেই আলমারিটি তার বাড়িতে সংসার পাতলে আমার হবে। আমার মন খারাপ থাকলে সে এমন করে যত্ন করতো যেন আতুর ঘরে শিশুকে স্নেহে ঢেলে দিতে মাতা কাতর হয়ে আছেন।

আমাদের এমন মায়াময় প্রেমও টিকেনি। কেন টিকেনি সেসব বিস্তর আলাপে আর না যাই। তবে আমরা কেউ কারো সাথে প্রতারণা করিনি, কেউ কাউকে জোর করিনি ছেড়ে দিতে। কিন্তু তবুও অদৃষ্ট চেয়েছিলো আমাদের প্রেমের এক অন্য গন্তব্য হোক। হয়েছিল অন্য এক গন্তব্য; বিচ্ছেদ। হৃদয় ভেঙেচুরে একসার হওয়া বিচ্ছেদ হয়েছিলো আমাদের সেই সুখী প্রেমের গন্তব্য।

মানতে কষ্ট হয়েছিলো। প্রথম কিছুমাস তো বিশ্বাসই করতে পারিনি যে, এমন প্রেমও ভাঙে! এমন স্বপ্নও ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ধীরে ধীরে যখন মানতে শুরু করলাম তখন দেখলাম আমার মাটির মতো হৃদয়টায় বাগান করে দিয়ে মালি পালিয়েছে। আর মালির অভাবে বাগানের প্রতিটি ফুল শুকিয়েছে, মরেছে অবেলায়। আমার বহু সময় লেগেছিল সেই বিচ্ছেদ থেকে বের হতে। মা পাত্রের ছবি আনলে আমি চোখ তুলে তাকানোর আগ্রহ অব্দি পেতাম না। কীভাবে দেখতাম বলুন তো? বুক ভাঙতো না? যেই সংসার আমি সাজিয়েছিলাম কল্পনায় সেই সংসার অন্য কারো সাথে করার কথা ভাবা সম্ভব ছিলো সেই মুহূর্তে? আমার পুরো বর্তমানের সঙ্গে যেন ভবিষ্যতটাও ধ্বসে গিয়েছিলো।

আমার প্রেমের কথা যারা জানতো সেই সকলেই আমায় বহুবার, বহু ভাবে বুঝিয়েছে। প্রেমিকা হিসেবে মন্দ ছিলাম না আমি। একটা মানুষের ভেতর ঠিক যেমন করে ডুবতে হয় আমি তেমন করেই ডুবে ছিলাম। তাই আকুল পাথারে হাবুডুবু খেয়েছিলাম। তাকে হারানোর পর বহুদিন লেগেছিলো আমার নিজেকে বোঝাতে। একটা মানুষ, আমার এত মায়ার মানুষ আমার হলো না সেটা নিজের মনকে মানানো আমার জন্য এক জন্মের তপস্যার চেয়েও কষ্টের ছিলো।
একুশের আমি পরিপক্ব হলাম অবশেষে ছাব্বিশে। বাবা-মায়ের বহু অসন্তুষ্টি, বহু অভিযোগের পর আমি স্থির হলাম আবার নতুন করে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে। এভাবে তো সত্যিই আর জীবন যায় না। নিজেকে তো সুযোগ দিতে হবে পুনরায়। নয়তো অন্যকে ভালোবেসে নিজের সাথে অন্যায় করে যাওয়া হবে এটা।

আমার সম্মতিতে কাঁধের বোঝা নেমেছিলো বাবা-মায়ের। অবশেষে তাদের কন্যার সুবুদ্ধি উদয় হলো! অবশেষে…
বিয়ের দিন যত ধাবিত হতে লাগলো ততই চোখের সামনে ভাসতো আমার পুরোনো সেই মানুষটা। চোখ উপচে জল আসতো। সবাই ভাবতো নিজের জায়গা ছেড়ে যেতে হবে বলে কাঁদছি আমি।

সবাই যেই নিজের জায়গাটির কথা বুঝাতো, আমার নিজের জায়গাটা সেটি ছিলো না। আমার নিজস্ব জায়গা ছিলো সেই মানুষটার বুক, যেখানে রাতে আমার নিশ্চিন্তে ঘুমানোর কথা ছিলো। আর, সেই জায়গাটি আমায় ছেড়ে গিয়েছিলো বহু বছর আগেই। সত্যিই আমি নিজের জায়গার আফসোসেই কাঁদতাম।

বিয়ের দিন এলো মহা আড়ম্বরে। বাড়ি ভর্তি আলো, উঠোন ভর্তি আয়োজন, ঘর ভর্তি লোক। আত্মীয়, স্বজন, আনন্দ, হৈ-হল্লা… কী কম ছিলো সেখানে? বাবা আমার সবকিছু পরিপূর্ণ করে করেছিলেন। মেয়ের বিয়ের কোনো ত্রুটিই রাখেননি। মেয়েরা যা লাগবে সব দিয়েছিলেন। অথচ বাবা জানতোই না, মেয়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো যেই পুরুষটি, সেই পুরুষটিকেই আর তার কন্যা পাবে না কখনো।
আমার কপালে চন্দন দিয়ে সাজানো হয়েছিলো। লাল টুকটুকে বেনারসি, গা ভর্তি গহনা। পুরো শরীর ঠিকরে যেন উর্বশী নৃত্য করছিলো। যেই সাজ নিয়ে একুশ বছরের জীবনটায় আমার বহু জল্পনা-কল্পনা ছিলো, যেই বেনারসিটি পরে আমি সেই মানুষটার সাথে আজন্ম আটকে যেতে চেয়েছিলাম সেই পোশাকই সেই সাজ নিয়ে আমি বসেছিলাম অন্য একজনের অপেক্ষায়। অন্য একটি বর, অন্য একটি ঘর যার কথা আমি আমার দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি!

বধূ সাজের আমি সেদিন বিছানায় বসা ছিলাম। নিজেকে বহু কষ্টে যে মানিয়ে ছিলো নতুন একটি জীবনের জন্য। সেই প্রাপ্তবয়স্ক আমিটার সাথে কিছু একটা হলো। ভুল হলো কী সঠিক আজও জানি না। তবে হয়েছিলো কিছু একটা।
ঘরের আত্মীয়র কেউ একজন যখন বলেছিল, বরের গাড়ি প্রায় এসে পড়েছে তখনই সমগ্র বিশ্বের সমগ্র কলরব থেমে গিয়েছিলো। ঐ মুহূর্তে আমার স্মৃতি গুলো আমার ছাব্বিশ বছর থেকে আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো একুশে। আমার চোখের সামনে সব ভাসতে থাকলো। রাত জেগে আমার তীব্র কৌতূহলে করা সকল প্রশ্ন, সেই প্রশ্নের বিপরীতে ঐ মানুষটার হাস্যোজ্জ্বল উত্তর, তার বাড়িতে যেই কল্পনার সংসার সাজিয়েছিলাম- সেটি, ভাসতে লাগলো তার কণ্ঠের দেবী ডাক, ভাসতে লাগলো তার সাথে সাজানো আমার ভবিষ্যতের সকল স্মৃতি।
সেই মুহূর্তে আমি ধাক্কা খেলাম। শ্বাস নিতে লাগলাম অনবরত। সেই মুহূর্তে আমার সারা শরীর জ্বলছিলো। বুকটা তো কয়লা হয়ে গিয়েছিলো পুড়ে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিলো, আমি সব মেনে নিলেও, যেই ঘরের পুরোনো একটি বইয়ের আলমারি আমার হতো বলে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটার অভাব নিয়ে আমি অন্যকারো সাথে সংসার করতে পারব? আমি যখন নতুন সংসারে একটা ভাঙাচোরা বইয়ের আলমারি পাবো না তখন আমায় আর কিছু টানবে? তখন থেকে প্রতিনিয়ত আমার মনে হবে না, সেই সংসারটা আমার নয়? এমন সংসার কখনো সাজায়ইনি আমি? মনে হবে না?

সেই একটি ভাঙা আলমারির লোভ আমায় এমনই উন্মাদ করল যে আমি দিশে হারিযে ফেলেছিলাম। ঘরভর্তি লোকের সামনে তীব্র চিৎকার করে উন্মাদের মতো কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিলাম। আমার মা দিকশূন্যের মতো আমায় বোঝাতো থাকলো। ভেবেছিলো বিয়ে হবে বলে মেয়ে বুঝি তার কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। বিয়ে বাড়ির সবাইও তা-ই ভেবেছিলো হয়ত! কেবল সেখানে একজন আমার কান্না দেখে বুঝতে পারল, এটা পরিবার হারানোর কান্না নয়। এই কান্নাটি তারচেয়েও বড়ো কিছু হারিয়ে ফেলার কান্না। জীবিত পরিবারের জন্য কেউ এমন করে কাঁদতে পারে না। এমন করে কাঁদে মানুষ মৃত কিছুর জন্য কিংবা এমনকিছুর জন্য যা আর কখনোই ফিরে পাওয়া যাবে না। আর সেই বুঝদার মানুষটি ছিলো আমার বাবা। বাবা, বাবা, আমার বাবা।
সে ঘরভর্তি লোক বাহির করে কেবল আমাকে রাখল। খালি, বদ্ধ ঘরটায় কেবল আমি। বাহিরে তখন বাজনার শব্দ, সানাইয়ের সুর জানান দিচ্ছে একটু পর আমার একুশের সংসার ভেঙে খান খান হবে।

বাবা আমায় সেদিন সান্ত্বনা দেয়নি মাথায় হাত বুলিয়ে, আহ্লাদও করেনি। সে হয়ত বুঝতে পেরে গিয়েছিল আগাম হওয়া একটা কেলেঙ্কারির কথা। বুঝতে পেরে গিয়েছিলো, সে আজন্ম সমাজের আঁড়চোখের কৌতূহল হতে যাচ্ছে। তবুও কন্যার সুখের কথা, স্বস্তির কথা ভেবেই জিজ্ঞেস করেছিলো,
“তুমি কাউকে ভালোবাসো?”

আমার তখন কান্না সর্বোচ্চ। শরীর কাঁপছিলো থরথর করে। মাথা নাড়িয়ে জানিয়েছিলাম, বাসি।

“আগে কতবার জিজ্ঞেস করলাম বলোনি কেন? তার সঙ্গেই নয়ত তোমার বিয়েটা দিতাম।”

আমি বলতে পারছিলাম না কথা। তবুও বহুকষ্টে বলেছিলাম, তার সাথে আমার বহুদিন যোগাযোগ নেই। বহুদিন নয়, বহুবছর যোগাযোগ নেই৷ ভেবেছিলাম আমি হয়ত সংসার করতে পারব। কিন্তু এখন আমার বুক জ্বলে যাচ্ছে, বাবা। দম আটকে আসছে।

বাবা বহুক্ষণ নিশ্চুপ ছিলো এরপর। বাজনার শব্দ আমাদের সেই নিস্তব্ধ ঘরটাকে কী এক মুহূর্তে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিলো! আমি জানতাম না আমার ভবিষ্যত কী, হবে কী। কেবল কাঁদতে পারছিলাম বুক খুলে।
বাবা বহুক্ষণ স্থির থেকে কেবল বলেছিল, “চাও কী তবে?”

“আমি বিয়ে করতে পারব না, বাবা। মনে হচ্ছে মরে যাচ্ছি। জানি না যারা আ ত্ম হ ত্যা করে তারা মৃত্যুর সময় এমনই দমবন্ধকর অনুভব করে কি-না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি এখন মরে যাব। স্বেচ্ছায় মরছি হয়ত! আমি অন্যকারো সাথে সংসার করতে পারব না, বাবা। আমি যেই স্বপ্নের সংসার সাজিয়ে রেখেছিলাম তা তছনছ করে আমি আরেকটি সংসার আর সাজাতে পারব না।”
কথাগুলো বলার সময় আমার চোখের সামনে ভাসছিলো সেই স্বপ্নের সংসারের দৃশ্য। কত সুখী আমরা কল্পনাতেই! সেই সুখের সাথে বাস্তবের যখন ভিন্নতা ও সংঘর্ষ হবে তখন আমি মানব কীভাবে?

বাবা আমায় আর কিচ্ছু বলেননি। কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
এর ঘন্টাখানেক পরেই জেনেছিলাম আমার বিয়েটা ভেঙে গিয়েছে। বাবা ভেঙে দিয়েছেন। কারণ বলেননি, কৈফিয়ত দেননি কেবল ভেঙে দিয়েছেন। এবং সেজন্য বরপক্ষের কেউ একজন বাবার গায়ে নাকি জুতো মেরে গিয়েছে।

আমি যখন উঠোনে ছুটে যাই তখন লজ্জায় অপমানে আমার বাবার বুকে ব্যথা উঠেছিলো। কী তীব্র ব্যথায়! ব্যথায় না-কি অপমানে ঠিক জানি না, আমার বাবার চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছিলো। আমি ছুটে গিয়ে যখন বাবার হাতটা ধরতে চাইলাম বাবা অভিমানে হাত ফিরিয়ে নিলো। একটাবার তাকালো না অব্দি আমার দিকে। সেই অভিমানেই প্রাণ দিলেন। প্রাণ দিলেন, না আমি কেঁড়ে নিলাম তা-ও আমি জানি না। আমি দেখলাম, একটা মানুষ, একটা প্রেম, একটা বিচ্ছেদ আর একটা কাঠের ভাঙা আলমারির লোভে আমি সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছি। জাত, কুল, সমাজ ও বাবাকে। সব হারিয়ে ফেলেছি। সব…

মা এরপরই আমায় ত্যাগ করে। মা শুরু, শেষ যদিও কিছু জানতো না কিন্তু এতটুকু বুঝেছিল তার স্বামীর অপমানের দায় ছিলো কেবল আমার। একটি অযোগ্য কন্যার। তার গর্ভের কলঙ্কের।

এই যে আমি সব হারালাম, এরপর বিধাতা আমার জন্য আর কিছুই লিখলেন না। তিনিও বোধহয় বাবার মতোই অভিমান করলেন। নতুন করে জীবন সাজাতে চেয়েছিলেন কিনা! আমি হতে দিইনি বলে তিনিও অভিমানে বাবার মতো মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর আর আমায় কেউ ভালোবাসেনি, আমার জন্য কেউ আর অপমান মাথা পেতে নেয়নি। আমার প্রেমও হয়নি আরেকটি বার। পৃথিবীর বুকে আমি বিধাতার শাস্তি বয়ে বেঁচে রইলাম। তীব্র একা। মাঝ রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে যখন ঘুম ভেঙে যায়, জানেন? আমার মাথায় হাত বোলানোর কেউ নেই, কেউ না! উদ্ভ্রান্তের মতো কাঁদলে আজ আর কেউ জিজ্ঞেস করে না, তুমি কী চাও। আমি আমার সমস্ত জীবন, সমস্ত সুখ, সমস্ত আপন মানুষ হারালাম যার জন্য সে জানেও না প্রতিনিয়ত আমি বেঁচে আছি মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর ভাবে। সে জানে না একুশের মেয়েটির আজ চুলে পাক ধরলেও সে ছাড়তে পারেনি ঐ না হওয়া সংসারের লোভ। ঐ ভাঙা আলমারির লোভ, ঐ মায়ার মানুষটার লোভ। মানুষ ভালোবেসে উন্মাদ হয়, মৃত হয়, শূন্য হয়, নিঃস্ব হয়। আমি হয়েছি একা। উন্মাদের চেয়েও, মৃত্যুর চেয়েও এই একাকীত্ব ভয়ঙ্কর। পুরো ঘরজুড়ে আমার কেউ নাই, কিচ্ছু নাই। পুরো পৃথিবী জুড়েই আমার কেউ নাই। এরচেয়ে বিধ্বস্ত কিছু আছে একজন মানুষের জন্য?

বাহির থেকে যখন ঘরে ফিরি তখন ঘরটাকে লাগে যমদূত। একটু কথা বলার মতো কাউরে পাই না। খা খা, খালি ঘর। নিজে সুইচ চেপে আলো না জ্বালালে আলো জ্বালানোর কেহ নেই। কখনো মৃত্যু হলে হয়ত লাশটাও পচেগলে যাবে অথচ কেউ জানবে না। সংবাদপত্রে বহুদিন পর ছাপা হবে, একটি বেনামি লাশ পাওয়া গিয়েছে অথচ পাওয়া যায়নি তার কোনো আত্মীয়, পরিচয়, মানুষ। এই যে একটা মানুষের জন্য আমার লাশটার পরিচয়ও হবে বেনামি এরচেয়ে দুঃখের কিছু আছে?
অথচ একটা মানুষকে ভালোবেসে আমি সাদরে গ্রহণ করেছিলাম এই দুঃখ।

জীবন আমায় আজ পথের ভিখারির চেয়েও শূন্য করে দিয়েছে তা-ও কি-না না হওয়া সংসারের জন্য, একটি ভাঙা আলমারির জন্য।
যেই আলমারির ধূলো ঝারতাম আমি, বইগুলো হতো আমার, জীবনানন্দের বনলতা সেন রাখতাম যেই আলমারির প্রথম তাকে অথবা যেই আলমারি থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার বইটি খুলে আমার মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে আবৃতি করতাম,
"কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি!
ছেলেবেলায় এক বোষ্টমী তার একতারাটি বাজিয়ে শুনিয়েছিল,
আগমনীর গান—
বলেছিল, তোরে একটা গান শুনাবো, তারপর আর আসেনি।”
অথবা শোনাতাম জীবনানন্দের অমর কবিতাখানি,
❝এ পৃথিবী একবার পায় তারে,
পায় না-কো আর❞…

#ভাঙা_আলমারি
কলমে: মম সাহা

19/07/2026

অনেক জানিয়েছি অভিযোগ,
অনেক করেছি অনুরাগ,
অনেক পুষেছি ব্যাথা,
অনেক সয়েছি অপমান,
অনেক থেকেছি অপেক্ষায়,
অনেক নিয়েছি যত্ন সম্পর্কের,
অনেক হয়েছে সখ্যতা ধৈর্যের সাথে,
অনেক রেখেছি বেঁধে তারে মায়ার ডোরে।
অতঃপর ক্লান্ত প্রাণ আমার একটু শান্তি চায়,
সম্পর্কেও বোধ করি একটু বিরামচিহ্ন আবশ্যক।।

✍️সুবাসিনী

Address

Rajshahi

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Abegi Onuvuti posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Abegi Onuvuti:

Shortcuts

Share

Category