Abegi Onuvuti

Abegi Onuvuti ~সাত সাগর আর তেরো নদী 🩵
পার হয়ে তুমি আসতে যদি 🥹
রুপকথার রাজকুমার হয়ে🤵
আমায় তুমি ভালোবাসতে যদি.👩‍❤️‍👨❤️‍🩹🥀

03/11/2025

আমি চাই মানুষ আমাকে ভুলে যাক।
ভুলে যাক আমার হাসির আড়ালে লুকোনো ক্লান্তি,
ভুলে যাক সেইসব মুহূর্ত যেখানে আমি থেকেও ছিলাম না।
আমি আর কারও স্মৃতিতে বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।
যতটা সহজে আমি সবার হয়ে উঠেছিলাম, ততটাই নিঃশব্দে হারিয়ে যেতে চাই—
যেন কোনোদিন ছিলামই না।

02/11/2025

"মিনিস্টার তাকবীর দেওয়ান।"

'মাইকে ঘোষিত নামটি ভেসে উঠতেই জনসমাবেশে এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তেই সকলে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল। চারপাশ জুড়ে উচ্ছ্বসিত হাসি আর হাততালির ঢেউ। প্রত্যেকটি চোখ স্থির হয়ে রইল মঞ্চের দিকে। বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর এটাই তাকবীর দেওয়ানের প্রথম প্রকাশ্য আগমন। সব প্রেস কনফারেন্স বাতিল করে আজ সরাসরি সাধারণ জনগণের সাথে দেখা করতে এসেছে মানবতার ফেরিওয়ালা, গরিবের বন্ধু—তাকবীর দেওয়ান। তার এই উপস্থিতিতেই যেন বাতাসে এক অদৃশ্য উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে।

'সবশেষে ব্যাকুল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে, বিশাল মাঠের কেন্দ্রস্থ মঞ্চে পা রাখলেন শ্যামবর্ণের তাকবীর দেওয়ান। বরাবরের মতোই গায়ে সফেদ রঙা পাঞ্জাবি, গলায় কালো শাল আর ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা অমায়িক হাসি। তার দুই দেহরক্ষী বিয়ান ও রেয়ান ঢালের মতো পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার উপস্থিতিতে মুহূর্তেই সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠল একের পর এক। উত্তেজনার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল জনতার ভিড়ে। হাজারো চোখ একসাথে নিবদ্ধ হলো মঞ্চের দিকে। অতৃপ্ত হৃদয়গুলো যেন হঠাৎই এক পশলা শীতল বাতাসে ভরে উঠল, যখন মাইকে ভেসে এলো পেশাদার, বলিষ্ঠ কণ্ঠের স্বর,

"আসসালামু আলাইকুম। আপনারা ভালো আছেন তো?"

'সেই আহ্বান আর প্রাসঙ্গে যেন সকলের অন্তর ভিজে উঠল। অশান্ত মন শান্ত করা ঝিরঝিরে বাতাস ছুঁয়ে গেল ভিরের গা। সকলে দাঁড়িয়ে একমতভাবে জবাব দিলে সম্পূর্ণ স্থান কেঁপে উঠল। তা দেখে মৃদু হাসি এলো মিনিস্টার তাকবীর দেওয়ানের মুখে। তিনি বিজ্ঞ দৃষ্টিতে উপস্থিতদের একে একে দেখে কণ্ঠ খুললেন, বলতে শুরু করলেন,

"আমি আপনার ঘরের ছেলে নাও হতে পারি, তবে আমি মাটির ছেলে। আপনারা যেমন মাটির,তেমনি আমিও। রব্বুল আ’লামীন যেই কারণে আপনাদের সৃষ্টি করেছেন, ঠিক সেই একই কারণে আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমাদের সর্বোচ্চ পরিচয় হলো মানবতা; সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সত্তা মানুষ, আর মানুষের ধর্ম হলো মানুষের পাশে থাকা, জনগণের সেবা করা। আজ থেকে আমার শুধু একটাই লক্ষ্য—আপনাদের পাশে থাকা আর আপনাদের সেবা করা। আমি তাকবীর দেওয়ান আজ আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি: আপনাদের যখনই প্রয়োজন হবে, আমাকে পাশে পাবেন। আমার দায়িত্বে আমি সর্বদা তটস্থ থাকব এবং আমার জনগণের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।"

'মাইকে উচ্চারিত বজ্রকণ্ঠের ভাষণ রোদের তপ্ততার সাথে মিলিয়ে যেতেই চারদিক ভরে উঠল অশ্রুসিক্ত চোখ আর হাততালির সমবেত স্রোতে। প্রত্যেকের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত পূর্ণতার আভাস। তালির ঢেউ স্তিমিত হতেই পিছন থেকে একদল তরুণ বাংলাদেশের পতাকা উঁচিয়ে বজ্রস্বরে স্লোগান শুরু করল। কেউ কারও কাঁধে উঠে,কেউ কারও হাত উঁচুতে তুলে একই স্লোগানের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে দিল। চারদিক যেন রণক্ষেত্রের মতো কেঁপে উঠল জনতার উদ্দাম উল্লাসে।

'তাদের এই উচ্ছ্বাস দেখে তাকবীর দেওয়ান মাথা নাড়িয়ে হালকা হেসে নিলেন। তারপর রাজকীয় অভ্যর্থনার জন্য রাখা চেয়ারটিতে বসতেই পরিবেশ ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। শুরু হলো সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক আলাপচারিতা শেষে হঠাৎ এক সাংবাদিক সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,

"মিনিস্টার সাহেব, বয়স তো অনেক হলো, এবার বিয়ের সংবাদ নিশ্চয়ই আশা রাখা যায়?"

'জনসম্মুখে এহেন প্রশ্নে প্রথমে খানিকটা অপ্রস্তুত হলেও, খুব দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে তাকবীর দেওয়ান নির্বিকার কণ্ঠে বললেন,

"ইনশাআল্লাহ।"

'তার সংক্ষিপ্ত উত্তরে কৌতূহলের ঢেউ বয়ে গেল ভিড়ের মধ্যে। উৎসুক চোখগুলো একে-অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করছে, সাংবাদিকরাও যেন সুযোগ খুঁজে পেলেন। একজন সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,

"মানে কি মিনিস্টার তাকবীর দেওয়ানের জীবনে ইতিমধ্যেই কেউ আছেন?'

'তাকবীর দেওয়ান আসন সোজা করে বসলেন। তিনি উত্তর দেওয়ার আগেই আরেকজন তড়িঘড়ি করে বললেন,

"পছন্দের কেউ আছেন তাহলে?"

'তাকবীর নীরব। কিন্তু ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল চোরা হাসি। সাংবাদিকরা সেই নীরবতাকে সম্মতি ভেবে আরো এগিয়ে এলেন। আরেকজন জানতে চাইলেন,

“সে দেখতে কেমন?”

'এবারও তিনি চুপ রইলেন। তবে এবার হাসির ভাঁজে যেন অন্যরকম এক ঝিলিক। চোখ দুটো বন্ধ করতেই তার মানসপটে ভেসে উঠল এক পরিচিত অবয়ব। মুহূর্তেই অধরে দোলা দিল হালকা আলোড়ন। প্রায় আনমনা ভঙ্গিতেই হঠাৎ করে বলে উঠলেন

"সে দেখতে চাঁদের মতো সুন্দর, তবে দাগহীন।"

____

''তাজুয়ার দেওয়ান বসার ঘর জুড়ে অস্থিরচিত্তে পায়চারি করছেন। টিভিতে নিউজ লাইভে তাকবীরের বলা কথাগুলো শোনার পর থেকে স্থির হতে পারছেন না। বয়সের ভারে ঝুলে পড়া কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ। অপেক্ষা করছেন কখন তাকবীর ফিরবে। নানান প্রশ্ন শূলের মতো বির্দীণ করছে তাকে। তাকবীর বলেছে, কাউকে তার পছন্দ; এবার যদি তাজুয়ার দেওয়ানের ধারণা অনুযায়ী সেই পছন্দ মিলে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দারুণ কিছু হতে যাচ্ছে। ধন এবং ক্ষমতা একসাথে পাল্লা ধরে বৃদ্ধি পাবে।

'ভাবনার মধ্যে তাকবীর অন্দরে প্রবেশ করল। তাকবীরের পিছনে ছিল রেয়ান। তাজুয়ার দেওয়ান দ্রুত তাকবীরের কাছে ছুটে গিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে প্রশ্ন ছুড়লেন,

"তোমার কাকে পছন্দ বীর?"

'তাকবীর জানত, সে খুব শীঘ্রই তাজুয়ার দেওয়ানের কাছে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। কিন্তু,তাজুয়ার দেওয়ান যে এতোটা উত্তেজিত হয়ে পড়বে, তা হয়ত ভাবেনি তাকবীর, তাইতো অবয়বে এমন হতভম্ব ভাব। তাৎক্ষণিক প্রত্যুত্তরের বিপরীতে তাকবীরের মুখে বিস্ময়মিশ্রিত হতবাক ভাবভঙ্গি দেখে তাজুয়ার দেওয়ান ফের বললেন,

"তুমি কাকে পছন্দ কর বীর? তাহলে কী আমি যা ভাবছি সেটাই?"

'তাকবীরের মসৃণ কপোলে ভাঁজ পড়ল। কিন্তু পরক্ষণেই সেই ভাঁজ মিলিয়ে গিয়ে আশ্চর্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল তাজুয়ার দেওয়ানের কথায়,

"আমি জানতাম, আমার ছেলের রুচি সবসময় সেরা টা-ই হবে। আমি আজই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে কথা বলছি।"

'রেয়ান পিটপিট করে তাজুয়ার দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বিজ্ঞদৃষ্টি বলতে, সে কিছু একটা আচঁ করতে পারছে। তাকবীর বাবার দিকে প্রশ্নবিহ্বল চোখে তাকিয়ে বলল,

"আপনি কী বলছেন আব্বা? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।"

'তাজুয়ার দেওয়ান গাল ভরে হাসলেন। আড়ম্বরে হাসতে, হাসতে ছেলের কাঁধে হাত রেখে গর্ভের সাথে বললেন,

"আমি জানতাম , তুমিও একদিন ঠিকই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মেয়েকে পছন্দ করবে। মেয়েটা অনেকদিন ধরে তোমাকে পছন্দ করে। এবার তাহলে মন্ত্রী মসাইয়ের সাথে আলাপচারিতার পর্ব শেষ করে ফেলি, কেমন?"

'বলে হাস্যজ্বল মুখে তাজুয়ার দেওয়ান বসার ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু নিমিষেই তার উজ্জ্বল মুখশ্রী স্নান হয়ে যায় তাকবীরের দৃঢ় কণ্ঠে,

"আমার পছন্দ অন্য কেউ আব্বা।"

'তাজুয়ার দেওয়ান পিছন ঘুরলেন। কপাল কুঁচকে জানতে চাইলেন,

"কে সে? তাহলে কী আইডিপির মেয়ে?"

"না আব্বা।"

"রেলমন্ত্রীর ভাগিনী?"

"না।"

'তাজুয়ার দেওয়ানের কপোলে এবার চিন্তার ভাঁজ সুস্পষ্ট হয়ে উঠল। গম্ভীর হয় তার কণ্ঠস্বর,

"তাহলে কে? কী নাম মেয়ের?"

'নাম, সে-ই মেয়ে, সে-ই মানবী, এহেন ছোট, ছোট প্রশ্নগুলোর উত্তরে তাকবীরের অধরে দোলা দিল এক চিলতে আলোড়ন। হিমস্পর্শী শিহরণ বয়ে যায় কোমল হৃদয়ের অলিগলিতে। মিনিস্টার সাহেবের হৃদয়মঞ্জিলে স্বৈরাচারীর মতো জোরপূর্বক স্থন দখল করা মেয়েটির পদ্মকোমল মুখখানা চোখের পর্দার তুলে ধরে সে আনমনেই বলে উঠল,

"এলোকেশী, তার নাম দিয়েছি এলোকেশী।"

"মানে? কী পরিচয় তার?"

'তাজুয়ার দেওয়ানের বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে তাকবীর হুঁশ ফিরে পেল। তাকবীর এবার সরাসরি তাকাল তাজুয়ার দেওয়ানের মুখে। অতঃপর নির্ভীক, দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলল,

"ওর কোনো পরিচয় নেই। ও এতিম।"

"কোথায় থাকে?"

"কড়াইয় বস্তিতে।"

"কি-হহহহ?"

'তাজুয়ার দেওয়ানের ক্ষুব্ধ কণ্ঠের সুতীব্র চিৎকারে কেঁপে উঠল রেয়ান। অপ্রকৃতিস্থ আতঙ্কে রেয়ান কম্পিত চোখের পাতা তুলে তাকাল তাকবীরের দিকে। তাকবীর নির্ভীক কঠিন মুখে তাজুয়ার দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। তাজুয়ার দেওয়ান তেড়ে আসলেন তাকবীরের দিকে। রাগে গজগজ করতে করতে চিড়বিড়িয়ে উঠলেন,

"শেষপর্যন্ত কিনা একটা ছোট জাতের মেয়েকে পছন্দ করেছ? লোকে জানলে সমাজে মুখ দেখাতে পারবে—একজন মিনিস্টার হয়ে বস্তির মেয়ের প্রেমের পড়েছ?"

'তাকবীর অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,

"তাকবীর দেওয়ান ভালোবাসার ক্ষেত্রে মোটেও সমাজকে পরোয়া করে না, আব্বা।"

'তাজুয়ার দেওয়ার ফের চিৎকার করে উঠলেন,"তুমি না করলেও আমি করি।"

"আই ডোন্ট কেয়ার। আমার স্বীদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গিয়েছে আব্বা।"

'তাকবীরের এমন দৃঢ় কণ্ঠ এবং স্পষ্ট জবাবে বিমূঢ় হয়ে গেলেন তাজুয়ার দেওয়ান। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আশ্চর্যচিত্তে বললেন,

"একটা ছোট্ট জাতের মেয়েকে তুমি দেওয়ান মঞ্জিলে তুলতে চাইছ?"

'তাকবীর আর্দ্রস্বরে বলল,

"আমিও তো কালো আব্বা। চাঁদের গায়েও দাগ থাকে। ও ছোট ঘরের মেয়ে, এটা যদি ওর দাগ হয়ে থাকে, তাহলে আমারও তো দাগ আছে। কারণ, আমি ধনী হয়েও কালো।"

"গায়ের রঙের সাথে তুমি ছোট জাতের তুলনা কোরো না বীর। তুমি শ্যামবর্ণের হলেও হাজারো মেয়ে তোমার জন্য পাগল৷"

'তাকবীর হাসল। গলা থেকে শাল টা খুলে রেয়ারের হাতে দিয়ে ভেতরের দিকে যেতে, যেতে নির্ভারচিত্তে বলল,

"আমার জন্য হাজারো মেয়ে পাগল হলেও আমি ওই ছোট জাতের মেয়ের জন্য পাগল, আব্বা।"

"ওই মেয়ে এই ঘরে উঠবে না, এটাই আমার শেষ কথা৷"

'তাকবীর থেমে দাঁড়ায়। পিছন ঘুরে সরাসরি তাজুয়ার দেওয়ানের অগ্নিবৎ চোখে তাকিয়ে বলল,

"এই ঘরে না উঠলেও ওই মেয়ে আমারই হবে। এজন্য আমাকে ঘর ছাড়তে হলে ছাড়ব।"

'তাকবীরের জবাবে বিদ্যুৎস্পষ্টের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলেন তাজুয়ার দেওয়ান। কিয়ৎক্ষণ অবুঝ ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে টগবগে কণ্ঠে বলে উঠলেন,

"ওই মেয়ে কী কখনো তোমাকে ভালোবাসে বলেছে?"

'তাকবীর ফিচলে হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,

"ও তো জানেই না, তাকবীর দেওয়ান নামের কেউ ওকে পাগলের মতো ভালোবাসে। অথচ, এই পাগল প্রেমিক তার সাথে গোটা এক জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখে নিয়েছে।"

"তারমানে ওই মেয়ে তোমাকে ভালোবাসে না?"

'তাকবীর লম্বা শ্বাস টানল। পরপর কয়েকবার তপ্ত শ্বাস ফেলে দারুণভাবে হাসল। ঠৌঁটজুড়ে দিবালোকের ন্যায় বিস্তর হাসি ফুটিয়ে বলল,

"বাসবে ভবিষ্যতে। ও নিষ্পাপ একটা বাচ্চা, আব্বা। ভালোবাসা শব্দটা ওর জন্য ভীতিকর। আমি ওকে এখনই এই আতঙ্ক ফেলতে চাইছি না। হালাল ভাবে সরাসরি ওকে দেওয়ান মঞ্জিলের রাণী করে আনতে চাই।"

'তাজুয়ার দেওয়ানের চিবুক ক্রমশ শক্ত হচ্ছে। তিনি যথাসম্ভব নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণে রেখে বললেন,

"ও বস্তির মেয়ে।"

'তাকবীরের স্পষ্ট জবাব,"তবুও ভালোবাসি।"

"ওই মেয়ে এতিম।"

"তবুও ভালোবাসি।"

"আমাদের জাতের না ওই মেয়ে৷"

"জাতের বাইরে গিয়ে ওকে ভালোবাসি।"

"ও মেয়ের জাতধর্মের ঠিক নেই।"

'এবার চিৎকার করে বললেন তাজুয়ার দেওয়ান। তার গর্জনের বিপরীতে এবারও তাকবীর অমায়িক হেসে শান্ত গলায় প্রত্যুত্তর করল,

"ভালোবাসার একটাই ধর্ম, শুধু ভালোবাসো, আর আমি ভালোবাসি৷"

'তাজুয়ার দেওয়ানের ওষ্ঠপুটে তেজের বিচ্ছুরণ,

"পল্লী পাড়ার মেয়েরা কখনই ভালো হয়না।"

'তাকবীর মাথা নত আবারো হাসল বাবার কথায়। পল্লী পাড়ার আশেপাশে থাকলেই যে খারাপ হয়ে যায় না, তা এই অধমকে কে বোঝাবে! কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু ক্ষীণ ক্ষণিকের মধ্যেই উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত তাকবীরের কৃষ্ণকালো চোখের তারাই জ্বলজ্বল করে উঠল। নিরেট ঠান্ডা চিবুক কটমটে ক্রোধের ঝাঁঝালো বিচ্ছুরণে মটমট করে উঠল। আপাত ক্ষোভে বজ্রমুঠো হয়ে এলো সুবলিত পুরুষ্টু হাত দু'টো। শান্তস্বভাবের লোকটা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। অর্নথক গ্রীবা বাঁকিয়ে টগবগে বলিষ্ঠ কণ্ঠে চাপাস্বর টেনে আওড়ালো,

"আব্বা.. আব্বা, আব্বা...আমি কিন্তু মানুষ ভালো না। আমারে ক্ষেপাবেন না আব্বা। খোদার কসম, আমি ভুলে যাবো! সব ভুলে যাবো আমি—ভুলে যাবো রক্ত, ভুলে যাবো কে আমার বাপ।"

'তাকবীরের চাপা কণ্ঠের তুঙ্গস্পর্শী হুংকারে তাজুয়ার দেওয়ানের বিমূর্ত দৃষ্টিজোড়া বিস্ফোরিত হলো। তিনি অবাক কণ্ঠে বললেন,

"একটা বেশ্যার জন্য তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলছ?"

'ক্রোধ সংবরণে চোখবুঁজল তাকবীর। যথাসম্ভব নিজেকে সংযমে রেখে পরপর কয়েকবার ফোঁসফোঁস করে ভারি নিশ্বাস ছেড়ে বজ্রগম্ভীর স্বরে বলল,

"প্রথমত, ও বে-শ্যা না আব্বা । দ্বিতীয়ত, যদি হয়েও থাকত, তাহলে—আমি ভালোবাসার পর থেকে ও পবিত্র। বে-শ্যা বলুন আর যা-ই বলুন; তাকবীর দেওয়ান তার ভালোবাসার জন্য সবকিছু করতে পারে। মারতেও পারবে, মরতেও পারবে।"

'তাকবীরের কথায় স্তব্ধ হয়ে গেলেন তাজুয়ার দেওয়ান। তিনি আহত চোখে তাকান ছেলের দিকে। বাবার করুণ দৃষ্টি দেখে বুকে ধাক্কা খেল তাকবীর। একই মনে পড়ে গেল এই আহত দৃষ্টির আড়ালে থাকা নৃশংস রূপটার কথা। তাকবীর খুব ভালো করেই চিনে নিজের বাপকে। এই লোক নিজের ক্ষমতা এবং সম্মান ধরে রাখার জন্য যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারে, তা সম্পর্কে তার চেয়ে ভালো আর কেউ অবগত নয়। এমন মানুষের সাথে জড়িয়ে যাওয়া বোকামি। এতে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

'তাকবীর হঠাৎ করেই তাজুয়ার দেওয়ানের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। রেয়ান চমকে উঠল একজন ক্ষমতাধর মিনিস্টারকে এভাবে নত স্বীকার করে নিতে দেখে। তাকবীর বাবার পা ধরে ম্লানবদনে, আর্দ্রস্বরে বলল,

"আব্বা, আমার এলোকেশীকে যে করেই হোক, আমায় এনে দিন না, আব্বা।"

'তাজুয়ার দেওয়ান সরে দাঁড়ালেন। কাঠিন্য সদাতেজি মুখে বললেন,"অসম্ভব।"

'তাকবীর ওঠে দাঁড়াল। এবার আর সমঝোতায় যাওয়ার ধার ধারল না। সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলল,

"শেষ তাকবীর দেওয়ানের বোঝাপড়া। আপনার কাছে আমি চেয়েছিলাম আব্বা, কিন্তু আপনি শোনেননি। এবার আমি সেভাবেই এগোবো, যেভাবে আগালে আপনার প্রয়োজন পরবে না।"

"কী বলতে চাচ্ছো তুমি?"

'তাকবীর পিছন না ঘুরেই বলল,"এতিমের ও কিন্তু বিয়ে হয় আব্বা।"

"বীর।" চিৎকার করে উঠলেন তাজুয়ার দেওয়ান।

'তাকবীর থামল, পিছন ঘুরে সরাসরি তাজুয়ার দেওয়ানের চোখে চোখ রেখে রক্ত ছলকে ওঠা তীব্র বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলল,

"আমি জিদের ভাত কুত্তা দিয়া খাওয়াই আব্বা, তবুও মুখে তুলি না।"

'ক্রোধে চোয়াল কাঁপছে তাজুয়ার দেওয়ানের,"আবেগে এসব বলছ তুমি।"

'তাকবীর চোখের রুদ্রতেজী ছাঁচটা অটুট রেখে বলল,

"আবেগের বয়স অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি। এখন বিবেকের বয়স। বিবেক বলছে—বাঁচতে চাইলে মেয়েটাকে বিয়ে কর। তুই তাকবীর দেওয়ান হবি সবথেকে সুখী মানুষ।"

'বলে হনহনিয়ে উপরে চলে গেল তাকবীর। তাজুয়ার দেওয়ানের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। তিনিও আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না। ডগডগে পায়ে কোথায় যেন গেলেন।

'রেয়ান তাকবীরের পিছু, পিছু গেল। শঙ্কিত কণ্ঠে বলল,

"বস, আপনার এই স্বীদ্ধান্ত যদি আপনার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়? আপনি খুব ভালো করে বুঝতে পারছেন আমি কীসের কথা বলছি।"

'তাকবীর উত্তরটা প্রতিবারের মতো হেসেই দিল,

"আমার এই সিদ্ধান্তই যদি আমার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমি ধ্বংস হতে রাজি। কাল বিয়ে হচ্ছে, দ্যাটস ফাইনাল।"

'রেয়ান চুপ হয়ে গেল। এই মুহূর্তে কোনটা ঠিক হবে, তার ছোট্ট মস্তিষ্ক তা ধরতে পারছে না। রেয়ানকে চুপ করে যেতে দেখে তাকবীর আবারও হাসল। হেসে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কোঁকড়া চুলগুলো ঝাঁকিয়ে বলল,

"আমাদের সাক্ষাৎকার ছিল এক মিনিট চৌদ্দ সেকেন্ডের৷ দূর থেকে যখন তাকে হাসতে দেখলাম, তখন তার হাসিতে যেন আমি আমার মৃত্যুর রূপরেখা দেখেছিলাম৷"

'রেয়ান আর কিছু না চলে সেখান থেকে চলে গেল। সবটা সে জানে, আর এই লোকটার পাগলামি সম্পর্কেও জানে। দুমাস যাবতই এসব দেখে আসছে। রেয়ান চলে যেতেই তাকবীর গান ধরল,

❝পাগল আব্দুল করিম গায়
ভুলিতে পারি না, আমার মনে যারে চায়
কুলনাশা পিরিতের নেশায় কুলমান গেছে,
হায় গো, কুলনাশা পিরিতের নেশার কুলমান গেছে....

দেওয়ানা বানাইছে~
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে...
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে...
বন্ধে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে~
দেওয়ানা বানাইছে,~❞
----

'প্রেম এক বিস্ময়কর জিনিস। তার থেকেও রহস্যময় হলো মন। সে যে কখন, কার কাছে গিয়ে আশ্রয় নেবে তা কেউ জানে না। না হলে তাকবীর দেওয়ানের মতো প্রভাবশালী মানুষ কীভাবে বস্তির এক সাধারণ মেয়ের প্রেমে পড়ে? আসলে অনুভূতির ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। থাকলে নিশ্চিতই গত দুই মাসে তাকবীর নিজেকে সরিয়ে আনতে পারত। কিন্তু সে পারেনি।

'সে তো গিয়েছিল বিজ্র নির্মাণের কাজে, ভবিষ্যতের মন্ত্রী হয়ে দায়িত্বশীল দৃষ্টিতে সবকিছু তদারক করতে। কে জানত রোদের দহন এড়িয়ে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিতেই তার মনকে হারিয়ে ফেলতে হবে! কাশফুলে ঘেরা ঝোপের আড়ালে যে লুকিয়ে আছে এক রূপকুমারী, যার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পঁইত্রিশ বছরের তাকবীর দেওয়ানের কঠিন হৃদয় মুহূর্তেই কেঁপে উঠবে।

'সমাজে বুক ফুলিয়ে চলা তাকবীর দেওয়ান, যাকে সবাই শক্তিশালী আর অভেদ্য ভেবে জানে, সেই মানুষই প্রতি রাতে ছদ্মবেশে ছুটে যেতো বস্তিতে শুধু একবার, একনজর সেই মেয়েটিকে দেখার জন্য। দিনের পর দিন সভা, মিছিল, মিটিং শেষে তার ক্লান্ত শরীর নয় বরং তৃষ্ণার্ত মন শান্তি খুঁজত কেবল ওর চোখে। ছুটে যেতো তার কাছে, যার নাম সে দিয়েছিল— এলোকেশী।

'কিন্তু এই প্রেমের পথ সহজ হবে না। বয়সের ব্যবধান ছিল বিশাল, সামাজিক অবস্থান একেবারে বিপরীত, ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার ভেদাভেদ ছিল গভীর খাদ। এমন অমিলে কোনো মিলন হয় না। তাকবীর বারবার তার মনকে এ কথাই বোঝাতে চাইত। অথচ প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত সে হয়ে উঠত অস্থির, পিপাসার্ত। সেই অদৃশ্য তৃষ্ণায় যেন তার গলা ফেটে যেতো । আর তখন সমস্ত যুক্তি-তর্ক ছুঁড়ে ফেলে ছুটে যেতো সেই মেয়েটির কাছে। দূর থেকে দেখত কাশে ভেজা বাতাসে দাঁড়িয়ে আছে তার এলোকেশী।

'তারপর থেকে তাকবীর দেওয়ান আর দ্বিধাহীনতায় ভুগেনি। সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে সে তার ভালোবাসাকে স্থান দিয়েছে। পরিকল্পনা করেছে নির্বাচনের ব্যস্ততা শেষ হলেই বাবা তাজুয়ার দেওয়ানের কাছে জানাবে তার ইচ্ছে। সে বিয়ে করবে তার এলোকেশীকে। মেয়েটি হোক গরিব, সে অর্থ দিয়ে ভরিয়ে দেবে; মেয়েটি হোক এতিম, সে তার ভালোবাসায় মুড়িয়ে নেবে; থাকুক বস্তিতে, সে তাকে দেবে তার হৃদয়মন্দিরের সর্বোচ্চ স্থান। সমাজ যদি বাজে কথা বলে, দরকার হলে এই সমাজ ত্যাগ করবে সে। তবুও কোনোভাবে পারবে না তার এলোকেশীকে ছাড়তে।

'যদিও জানত তাজুয়ার দেওয়ান সহজে মানবেন না। তবু তাকবীর স্থির। ভালোবাসা তার, অন্যের মানা বা না মানা কি সেই ভালোবাসার কোনো বাঁধা হতে পারে? তাই বাপকে একেবারেই পাশ কাটিয়ে তাকবীর দেওয়ান আজ নিজের বিয়ের কিনা-কাটা নিজেই সারল। তাজুয়ার দেওয়ান কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কান্ড ঘটানোর আগেই সে তার এলোকেশীকে নিজের কাছে আনতে চাইছে। তাই আজই রওনা হবে তার প্রিয়তমাকে আনতে।

'শান্ত ভঙ্গিতে হাজির হবে এলোকেশীর দাদীর সামনে। খুব নম্রভাবে বলবে তার নাতনির কোমল হাতটা চাই সে। শুরুতে হয়তো দাদী রাজি হবেন না। আপত্তি তুলবেন। কিন্তু তাকবীর দেওয়ান ধৈর্য হারাবে না। অশেষ মমতা আর বিনয়ের সঙ্গে বোঝাবে। দরকার হলে পায়ে গিয়েও পড়বে। যতক্ষণ না দাদী মন গলান, ততক্ষণ অবিচল থাকবে। অবশেষে যখন সম্মতি মিলবে তখন সকলের অগোচরে, নিঃশব্দে, তিনবারের কবুলে সে তার এলোকেশীকে নিজের করে নেবে। চিরস্থায়ী বন্ধনে বাঁধবে।

'পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত এগারোটায় বস্তিতে পৌঁছালো তাকবীর। আজ গায়ে নতুন সাদা পাঞ্জাবি। গাড়িটা খানিক দূরে রেখে হাতে লাল বেনারসির ব্যাগ নিয়ে যখন ভেতরে পা রাখল, তখন বস্তি অদ্ভুতভাবে নীরব। প্রতিরাতে এই সময় ছদ্মবেশে সে এখানে এসেছে গত দুই মাস ধরে৷ কিন্তু কখনো এমন ভৌতিক নিস্তব্ধতা টের পায়নি। আজ কেমন গা ছমছমে শূন্যতা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। এতোকিছু না ভেবে এগোতে থাকল তাকবীর। ঠোঁটে অনাগত পূর্ণতার আভাস আর বিজয়ের ঝিলিক। কিন্তু মুহূর্তেই সব নিভে গেল। দূরে তাকিয়ে দেখল তার এলোকেশীর ছোট্ট ছনের ঘরটা দাউদাউ করে জ্বলছে। আগুনের আঁচে অন্ধকার লালচে হয়ে উঠেছে চারপাশ। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তাজুয়ার দেওয়ান আর চারদিকে তার গার্ডরা ঘিরে রেখেছে পুরো এলাকা।

'মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে গেল তাকবীরের কাছে যে কেন বস্তি ফাঁকা। বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এলো। পা যেন মাটিতে আটকে গিয়েছে। চোখ চলে গেল আগুনের সামনে—তাজুয়ার দেওয়ানের পায়ের নিচে পড়ে আছে তারই দুই বিশ্বস্ত বডিগার্ড, রেয়ান আর বিয়ান। ওদের হাত-পা বাঁধা।

'তাজুয়ার দেওয়ান পিছন ফিরে দাঁড়ালেন। তাকবীরের যন্ত্রণায় ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে বিদঘুটে হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বললেন,

"ব্রাহ্মণ হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়িয়েছিল।"

'তাজুয়ার দেওয়ানের শব্দে হঠাৎ যেন প্রাণ ফিরে এলো তাকবীরের দেহে। জ্বালা আর শোকে কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ তাকবীর চিৎকার উঠল,

“আব্বাাা রেরররর! তুই কী করলি রে আব্বা!”

'হাতে থাকা লাল বেনারসির ব্যাগটা মাটিতে ছুড়ে ফেলে এক দমে আগুনের দিকে ছুটল তাকবীর আর বুকফাটা আর্তনাদে ডাকল,

"আমার এলোকেশীইই!"

'তাজুয়ার দেওয়ান ঝাঁপিয়ে গিয়ে পাগলপ্রায় ছেলেকে জাপটে ধরলেন। তাকবীর বাবার পাঞ্জাবির কলার খামচে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল ভাঙা গলায়,

"আমি আপনার ইজ্জতে হাত দিয়েছি, আমাকেই মেরে ফেলতেন আব্বা! ও তো নিষ্পাপ ছিল। আরে বেচারি তো জানতও না আমি ওকে ভালোবাসি। কেন এভাবে শেষ করলেন ওকে? কেন এভাবে শেষ করলেন আমাকে?"

'তাজুয়ার দেওয়ান ছেলের কাঁধ শক্ত করে ধরে বললেন,

"সমাজ এটা কখনো মেনে নিত না, তাকবীর। তুমি এর চেয়ে ভালো ডির্জাভ কর।"

'তাকবীরের কণ্ঠ যেন অচেতন হয়ে ভেঙে পড়ল। বুকের ভেতর কেউ কাঁটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। নিশ্বাস টেনে উঠতেই কিছু ভেঙে যাচ্ছে। চোখের সাদা অংশে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। সে আবার চিৎকার করে বলল,

"আমি তাকবীর দেওয়ান মরে যাবো, তবুও এলোকেশী ছাড়া এই জীবনে আর কাউকে স্থান দিব না।"

"পাগলামো করবে না।"

'কিন্তু তাকবীর এবার সত্যি সত্যিই পাগলের মতো আচরণ শুরু করল। সে পাগলের মতো আগুনের দিকে ছুটে চলল। তাজুয়ার দেওয়ানের ইশারায় গার্ডরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকবীরকে জাপটে ধরল। ঘরের ভিতরে দাউদাউ করে আগুন লেগে আছে; লাল-কমলা আলো ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যেক মুখে। তাকবীর আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে, ওর কণ্ঠনালীর তল থেকে আর্তনাদ ফুঁটিয়ে তুলল,

"ইয়া আল্লাহহহহ! আমি মরে যাবো আল্লাহ , আমি মরে যাবো, আপনার কসম।"

'তাকবীর দেওয়ানের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, অথচ আকাশ একফোঁটাও বৃষ্টি বর্ষণ করছে না। আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব,পানির অভাব। ওদিকে আগুনের লেলিহান শিখা সবকিছু গ্রাস করে নিচ্ছে। এদিকে তাকবীরের নিজেরই মনে হচ্ছে সে যেন পাগল হয়ে যাচ্ছে। চারপাশের মানুষ তাকে থামাতে চাইছে, ধস্তাধস্তি করছে।কিন্তু এতোজন মিলে করেও কাউকে আটকানো যাচ্ছে না। তার ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি কুঁচকে গেছে। চোখ দুটো রক্তজ্বালা হয়ে যেন ছিঁড়ে মাটিতে ঝরে পড়ছে।

'তাকবীর দেওয়ান ছুটে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে, পাগলের মতো প্রলাপ করছে, আর্তনাদের মতো চিৎকার করে কাঁদছে ছোট্ট শিশুর মতো। অথচ সমাজের কিছু নারীরা বলে, পুরুষ মানুষ নাকি পাষাণ—তাদের ভালোবাসা নাকি মিথ্যা, তারা নাকি শুধু কাঁদাতে জানে। তারা কি কখনো তাকবীর দেওয়ানকে দেখেছে? যে লোকটা ভালোবাসা না পেয়েও এভাবে ভালোবেসে গেছে, এমন ভালোবাসায় ডুবে গেছে যে আজ সে মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করতে ছুটে যাচ্ছে।

'তাকবীর তাজুয়ারকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। তাজুয়ার সরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চোখে বিস্ময়ের অপ্রকাশ্য জোয়ার। তিনি ভাবতেই পারছেন না তার ছেলের একটা মেয়ের জন্য এতোটা পাগল। এত বড় ছেলে কী একটা মেয়ের জন্য এভাবে কাঁদে?

'তাকবীরের চোখের কাছে সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। কেবল একটা নাম বাজছে কানে! এলোকেশী। তাকবীর নিজেকে ছাড়াতে না পেরে অসহায়ের মতো আকাশের দিকে চেয়ে আহাজারি করে বলতে থাকে,

"ইয়া রব, যদি আমার জীবনে আমি একটাও পূর্ণের কাজ থেকে থাকে, তাহলে তার বিনিময়ে হলেও আজ আমার এলোকেশীকে বাঁচিয়ে দাও রব। আমি সারাজীবন তোমার গোলামী করমু খোদা। ইয়া খোদা! সাড়া দে রে খোদা। আমার ডাকে কি তোমার আরশ কেঁপে উঠছে না? আমার এলোকেশীকে বাঁচাও, খোদা, ওকে বাঁচাও। বৃষ্টি দাও, খোদা।"

'তাকবীর আকাশের দিকে তাকিয়ে বারবার চিৎকার করছে অসহায়ের মতো। গলায় হাত বেঁধে ওঠা কণ্ঠস্তব্ধ শোকে কাঁপছে, কাঁদছে, ছটফট করছে। প্রতিটি গগনবিহারী চিৎকারে কণ্ঠনালির রগগুলো ফুলে উঠেছে। তবুও সাহায্য আসে না। হাওয়ায় ভেসে আসে শুধু তার নিঃশ্বাস আর ভেঙে পড়া শব্দগুলো। তাকবীর কিছুই বুঝতে পারছে না যে সে কি করবে। সামনে আগুনের লেলিহান সবটাই গ্রাস করে ফেলছে। ভেতর তার এলোকেশী; এদিকে সে বন্দী। চারজন তার পা জোরে আঁকড়ে ধরে আছে, ছয়জন শক্ত করে হাত, শরীর চেপে ধরে রেখেছে।। সে কীভাবে বাঁচিয়ে আনবে তার এলোকেশী? তাদের সংসার তো হয়নি। এ কী নির্মম ভাগ্য!

'তাকবীর আবারও তাজুয়ার দেওয়ানের দিকে তাকাল। চোখে অশ্রু, কণ্ঠে ভাঙা অভিমানে কাঁদতে কাঁদতে সে বলল,

"আব্বা, আজকে আপনি আমাকে সারাজীবনের জন্য হারালেন। নিজের অহংকার রাখতে গিয়ে আপনি আপনারই ছেলেকে মরে ফেলার কাজ করলেন, আপনি সন্তানের খুনি, আব্বা। আপনি আমার খুনি।"

'তাজুয়ার দেওয়ান শুধুমাত্র শুকনো ঢেকুর গিললেন। চোখে নীরব বিস্ময়। তবু তাঁর মুখ থেকে ভাষা বের হলো না। শুধু গার্ডদের দিকে শক্ত কণ্ঠে বললেন, "ওকে আরও শক্তভাবে ধরে রাখো।"

"আমার জানের কসম আব্বা, আমাকে ছাড়ুন।"

'কিন্তু কেউ তাকে ছাড়ে না। তাকবীরের পায়ের নিচ থেকে ধীরে ধীরে শক্তি ছাড়ছিল। রক্ত চলাচল থমকে যাচ্ছিল। বুকের ভেতর অস্থিরভাবে ধুকপুক করছে। আগুন থেকে দূরে থাকলেও মনে হচ্ছে, তার মাংস নিজেই জ্বলে উঠছে। হঠাৎ সে দেখল তার হাতের উপর আগুন। তাকবীর সেই আগুনের দিকে চোখ রেখে চিৎকার করে অনবরত আহাজারির সুরে বলতে থাকে,

"মৃত্যু শরীর নিয়ে আপনি কিছুই করতে পারবেন না আব্বা। আমার এলোকেশীর গায়ে আগুন লেগে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আমার আত্মাও মরবে। আত্মাহীন মৃত্যু দিয়ে আপনি কিছুই করতে পারবেন না, আব্বা। আমাকে ছেড়ে দিন আমার রবের দোহাই লাগে।"

"আমি বাঁচতাম না, আব্বা। সত্যিই আমি বাঁচতাম না রে বাপ। আমার খোদার কসম, আমারে ছাইড়া দে। মেয়েটার কোমল শরীর জ্বলে যাচ্ছে, অথচ ওই শরীরের প্রতিটি কোণ আমার ভালোবাসার রঙে রঙিন হওয়ার কথা ছিল। এত পাষাণ হইস না রে বাপ। বাইচা থাকতে ছেলের খাঁটিয়া কাঁধে নেওয়া এতটা সহজ না। একটাই জনম, এই এক জনমে আমাকে এভাবে মারিস না। দেখ, বাপ, দেখ—আমার ভেতরটা ফাইট্টা যাচ্ছে। বাপ, হয়ে ক্যান বুঝতাছিস না রে? আমার খোদার দোহাই লাগে, এদের বল আমাকে ছেড়ে দিতে। এই এক জনমে, তাকবীর দেওয়ান হবে শুধু এলোকেশীরই। উপরে খোদা আর নিচে তোরে সাক্ষী রেখে কইতাছি, আমি তাকবীর দেওয়ান মইরা গেলেও, এলোকেশী ছাড়া বাঁচুম না। আমারে ছাইড়া দেন আব্বা।"

'তাজুয়ার দেওয়ানের চোখ অজান্তেই ভরে উঠল। এমন ছেলের বুঝি এমন পাগলামি মানায়? এই ছেলে এসব কী বলছে? আর এভাবে কাঁদছে কেন? দেশে কি মেয়ের অভাব? অভাব থাকলেও একটা মিনিস্টারের জন্য কখনোই মেয়ের অভাব হবে না। তাজুয়ার দেওয়ানের বুক ভারি হয়ে উঠল। সে ছেলের চোখে তাকাতে পারছিল না। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন তিনি।

"আব্বা, ওই ঘরে আমার স্বপ্ন পুড়ছে। ওই ঘরে আপনার ছেলের হায়াত এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। ওই ঘরে তাকবীর দেওয়ানের আত্মার মৃত্যু হচ্ছে।"

'বাবা হয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না তাজুয়ার দেওয়ান। তার চোখের লুকানো অশ্রু বেরিয়ে এল। সামনে ফিরে গার্ডদের ইশারা করলেন ছেড়ে দিতে। গার্ডরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তাজুয়ার দেওয়ান কাঁপা কণ্ঠে চিৎকার করলেন,

"কুত্তার বাচ্চারা ছাড়! আমার ছেলে বাঁচবে না!"

'গার্ডরা ছেড়ে দিলে তাকবীর আর কোনো দিকে তাকাল না। পাগলের মতো ছুটে গেল আগুনের দিকে। চারপাশ জ্বলে উঠছে। আগুনের গর্জন বুক এসে ধাক্কা দিচ্ছে। তবুও তাকবীর থামল না। যেতে যেতে একটাই কথা উচ্চারণ করল,

"আমার জন্য নিজেকে আর কিছুক্ষণ বাঁচিয়ে রাখো, এলোকেশী, আমি আসছি।"

'লোকটার চোখে অশ্রু, মুখে অচিন্ত্যিত অস্থিরতা। আগুনের মাঝখানেও তৃষার্ত হৃদয় একটাই লক্ষ্যকে খুঁজে যাচ্ছিল শুধুই তার এলোকেশীকে। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব ভয়, সব ব্যথা সবই তার জন্য অপ্রয়োজনীয়। এলোকেশীই শুধু তাকবীর দেওয়ানের জীবনের একমাত্র আলো।

'কোনো কিছুর পরোয়া না করে এক সাধারণ সপ্তদশীর জন্য মিনিস্টার তাকবীর দেওয়ান ঝাপিয়ে পড়ল আগুনে। দুই কক্ষের পুরো ঘরে ধ্বংসকারী আগুন ছড়িয়ে পড়েছে ইতিমধ্যে। তাপ এত প্রবল যে চামড়া ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। তাকবীরকে আগুনে ঝাপ দিতে দেখে তাজুয়ার দেওয়ান বুক চেপে ধরে মাটিতে ঢলে পড়ল।

'আগুনের তাপ ত্বক ছোঁতেই তাকবীরের চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই এলোকেশীর হাস্যজ্জ্বল মুখ ভেসে উঠল চোখের সামনে, মুহুর্তেই সকল যন্ত্রণা মুহূর্তের ভুলে গেল তাকবীর। সে ছুটে গেল ভেতরে। আগুনের ছুটে গেলে দেখতে পেল বয়স্ক মানুষটা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। আগুন ধীরে ধীরে তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাকবীর উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসল উনার সামনে। পার্লস চেক করে দেখল মৃত। তাকবীরের পুরো মাথা যেন আউলা হয়ে গেল এবার। পাগলের মতো সে খুঁজতে থাকে এলোকেশীকে। উন্মাদের মতো আগুনের মধ্যে ছুটছে আর ডাকছে। কিন্তু ধোঁয়ার কারণে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

'খুঁজতে খুঁজতে সে পৌঁছালো পাশের ঘরে। মেঝের দিকে তাকাতেই নিজেকে আবিষ্কার করল নির্জীব। শরীরে আর অস্থিরতা নেই, বুকের ভেতর আর কিছু ছিঁড়ে যাচ্ছে না। কারণ তার এলোকেশী তার সামনে। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে, মাথার কাছে থাকা হাত জ্বলছে আগুনে। তাকবীর স্তব্ধ হয়ে সেই ভয়ংকর দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার শরীর যেন মাটির দিকে টানছে। কিন্তু এবার আর কান্না নেই। সব কান্না, কষ্ট, ব্যথা হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেছে কোথাও। নৈঃশব্দ্যের মধ্যে তার চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ পাশের ঘরের চাল ভেঙে পড়ল।

'অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকবীরকে টেনে নিয়ে এল তার এলোকেশীর সামনে। রক্তশূণ্য মুখে সে নিথর শরীরটির কাছে বসে রইল কিছুক্ষণ চুপচাপ শান্তমূর্তির মতো। সে অস্থির ভাবে পা নাড়াচ্ছে, অনবরত ঢোক গিলছে, বড় বড় করে শ্বাস ফেলছে। আবার একা একাই গুনগুন করে কী যেন বলছে। কিন্তু হঠাৎ বুক ফেটে আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। মেয়েটার নিথর শরীরকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে গগনবিহারী চিৎকার তুলল তাকবীর দেওয়ান,

"সমাজ জিতে গেল, জিতে গেল পরিবার, শুধু হেরে গেল আমার ভালোবাসা। আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার ভালোবাসা। তুমি এলোকেশী কেন আমার হলে না? বল না! প্রেম কি অভিশাপ নাকি আমার ভালোবাসাটাই কি অভিশাপ? ও এলোকেশী, এলোকেশী গো, তোমার তো আমার হওয়ার কথা ছিল। কীভাবে পারলে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে? আমি কীভাবে বাঁচব তোমাকে ছাড়া? বলো না গো এলোকেশী! এটা তো কথা ছিল না। আমার সাজানো স্বপ্নে এমনটা ছিল না। দুঃস্বপ্নেও ছিল না। তাহলে এমনটা কেন? এসব কী? কেন? তুমি কেন চলে গেলে বল! চলেই যখন যাবে, তাহলে চলে যাওয়ার আগে শিখিয়ে দিয়ে গেলে না কেন আমাকে? কীভাবে বাঁচব আমি তোমাকে ছাড়া হুহ? কেন আমার আগে চলে গেলে?

তোমার লাশের খাঁটিয়া কাঁধে তোলার কোনো অধিকার তো আমার নেই। এই সমাজে এক পাক্ষিক প্রেমের কোনো স্বীকৃতি নেই। কোন পরিচয়ে আমি তোমার কবরের পাশে গিয়ে কাঁদব বলো না, এলোকেশী! দুনিয়ার মতো তুমিও পাষাণ হলে? আল্লাহ আর আমার আব্বার মতো তুমিও কি পাষাণ হয়ে গেলে? ওদের সাথে হাত মিলিয়েছ না?

আচ্ছা, অনেক হয়েছে। আর না। এবার তুমি নিশ্বাস নাও, এলোকেশী। দেখো, দেখো, আমি দম বন্ধ হয়ে আসছে, ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। প্লিজ, তুমি উঠো এলোকেশী। এখনই আমি মরতে চাইছি না। আমার ওপর অনেক দায়িত্ব আছে। জনগণের সেবা করতে হবে। অনেক মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে আছে সুখের আশায়। তুমি উঠো তো, এতোক্ষণ কী কেউ ঘুমায়? বেশি বাচ্চামি করছ কেন? উঠো। আর ঘুমাতে হবে না। আজকের রাত টা আমাদের জন্য খুব স্পেশাল। এই রাতে কেউ ঘুমায় না

23/10/2025
 # # 🌧️ ভালো থেকো প্রিয় (পর্ব – ৫)**সময় কেটে গেছে বারো বছর।**একটা ছোট্ট মেয়ের কোমল মুখে এখন কিশোরীর দীপ্তি।আরিশা ক্লাস ...
22/10/2025

# # 🌧️ ভালো থেকো প্রিয় (পর্ব – ৫)

**সময় কেটে গেছে বারো বছর।**
একটা ছোট্ট মেয়ের কোমল মুখে এখন কিশোরীর দীপ্তি।
আরিশা ক্লাস নাইনে পড়ে, স্কুলে সবার প্রিয়,
মায়ের মতোই শান্ত স্বভাবের,
কিন্তু চোখ দুটো রাহাতের মতো—
অদ্ভুত গভীর, প্রশ্নভরা, নিঃশব্দ।

তিশা এখন এক প্রতিষ্ঠিত নারী,
নিজের এনজিওর পাশাপাশি মেয়ের বড় হওয়া নিয়েও ব্যস্ত।
সব ঠিকই চলছে—
তবুও কিছু রাত আছে, যেগুলোতে তিশা আজও ঘুমাতে পারে না।
কিছু চিঠি আছে, যেগুলো আজও খোলা হয়নি।
আর কিছু প্রশ্ন আছে,
যেগুলোর উত্তর এখনো শুধু আকাশ জানে।

---

এক সন্ধ্যায়, হালকা বৃষ্টি পড়ছে বাইরে।
আরিশা জানালার পাশে বসে পুরনো একটা অ্যালবাম দেখছিল।
হঠাৎ একটা পুরনো ছবি হাতে নিল—
তাতে দেখা যায়, এক তরুণ ছেলেটা তিশার পাশে দাঁড়িয়ে আছে,
চোখে হাসি, হাতে গোলাপ।

আরিশা নিচু গলায় বলে উঠল,
“মা…”

তিশা রান্নাঘরে ছিল, ছুটে এল।
“কি হয়েছে মা?”

“এই ছবিটার মানুষটা কে?”
আরিশার কণ্ঠে কৌতূহল, কিন্তু চোখে একধরনের কাঁপুনি।
তিশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
বৃষ্টি তখন জানালায় ঝুপঝুপ করে পড়ছে,
হয়তো সেই বৃষ্টি বুঝতে পারছিল,
আজ কোনো এক পুরনো ব্যথা আবার ভিজে উঠবে।

---

তিশা ধীরে ধীরে সোফায় বসল।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“ও তোমার বাবা, মা।”

ঘরটা হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল।
বাইরে শুধু বৃষ্টি, আর ভেতরে দুটো চোখের ভেতর দিয়ে নেমে আসা জল।

আরিশা বলল,
“বাবা মারা গেছেন, তাই না?”

তিশা মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ মা, অনেক বছর আগে…”

“কেন মা? দুর্ঘটনা?”

তিশা এবার থেমে গেল।
বুকের ভেতর জমে থাকা বারো বছরের ব্যথা যেন একসাথে কাঁপতে শুরু করল।
চোখ বন্ধ করে বলল,
“না মা… তোমার বাবা মারা যাননি কোনো দুর্ঘটনায়।
তিনি চলে গিয়েছিলেন… আমাদের থেকে।”

আরিশা বিস্ময়ে তাকাল,
“মানে? আমাদের ছেড়ে?”

তিশা চুপ।
চুপ থাকাটাই কখনো কখনো সবচেয়ে কঠিন উত্তর হয়।

---

কিছুক্ষণ পরে তিশা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,
“তোমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিল মা।
আমার জীবনে প্রথম ভালোবাসা,
প্রথম স্বপ্ন, প্রথম কষ্ট—সবই সে।
কিন্তু কিছু ভুল হয়েছিল… আমারও, তারও।
ভালোবাসা ছিল, কিন্তু বোঝাপড়া ছিল না।”

আরিশা ফিসফিস করে বলল,
“তুমি এখনো তাকে ভালোবাসো, মা?”

তিশা হাসল… একদম নিঃশব্দে, ভাঙা হাসি।
“ভালোবাসা কি সময়ের সাথে মরে যায়, মা?
না, মরে না। শুধু রূপ বদলায়।
আজও আমি ওর জন্য দোয়া করি।
ও যেন ভালো থাকে… ঠিক যেমন আমি চেয়েছিলাম সবসময়।”

---

আরিশা চোখ মুছে মায়ের কোলের ওপর মাথা রাখল।
“তুমি কাঁদো না মা, আমি আছি না তোমার পাশে?”

তিশা মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
“তুমি শুধু আমার মেয়ে নও, তুমি আমার জীবনের উত্তর।
তুমি প্রমাণ, ভালোবাসা হারায় না,
ভালোবাসা নতুন রূপে ফিরে আসে।”

বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে।
জানালার কাচে জমে থাকা জলের ফোঁটা যেন নতুন ভোরের আলোয় ঝলমল করছে।
আরিশা চোখ বন্ধ করে বলল,
“মা, আমি একদিন বাবার কবরে যাবো…
তাকে বলবো, তোমার মেয়েও তোমাকে ভালোবাসে।”

তিশা কিছু বলল না, শুধু চোখের পানি মুছে দিলো,
কারণ কিছু ভালোবাসা আছে—
যেগুলো কবরের মাটির নিচেও বেঁচে থাকে,
চুপচাপ, নিঃশব্দে, চিরদিনের মতো…

---

🌿 **শেষে শুধু এই বাক্যটা রয়ে গেল—**

> “ভালো থেকো প্রিয়… তোমার দেওয়া কষ্টগুলোই আজ আমার শক্তি হয়ে গেছে।”

---চলবে __??

#অবশ্যই ভালো হোক খারাপ হোক একটা কমেন্ট করবেন 🥰

#

 # 💫 **ভালো থেকো প্রিয় (পর্ব – ৪)**এই পর্বে রাহাত নেই…রয়ে গেছে শুধু তার স্মৃতি, তার দেওয়া কষ্ট, আর সেই ভালোবাসার টুকরো ট...
21/10/2025

# 💫 **ভালো থেকো প্রিয় (পর্ব – ৪)**

এই পর্বে রাহাত নেই…
রয়ে গেছে শুধু তার স্মৃতি, তার দেওয়া কষ্ট, আর সেই ভালোবাসার টুকরো টুকরো ছায়া—
যেগুলো তিশার চোখের পানিতে আজও ভাসে।
কিন্তু এবার তিশা শুধু প্রেমিকা নয়, স্ত্রী নয় — **সে এখন এক মা**,
এক যোদ্ধা, এক নারী, যে ভাঙা জীবন থেকে আবার নিজেকে গড়ে তুলছে…

---

**দুই বছর পেরিয়ে গেছে রাহাতের চলে যাওয়া।**
তিশার ঘরে এখনো তার একটা ছবি টাঙানো —
ছবিটার নিচে শুকনো ফুল রাখা আছে, যেদিন সে শেষবার হাসপাতালে গিয়েছিলো,
সেদিন মেয়েটা নিজ হাতে তুলেছিলো একটা গোলাপ…
তারপর থেকে আরিশা প্রতিদিন ফুলটা বদলায়।

“মা, আজ আব্বুর জন্য লাল ফুল দেবো, ওর প্রিয় ছিলো লাল, তাই না?”
তিশা হাসে, চোখের কোণে জমে থাকা পানি গোপন করে বলে,
“হ্যাঁ মা, তোমার আব্বু লাল ফুলই পছন্দ করতো।”

তিশার হাসিটা এখন খুব শান্ত,
কিন্তু সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে থাকে শত কষ্ট, হাজারো অব্যক্ত কথা।

---

🌸 **আজকের তিশা আর আগের তিশা নয়।**
আগে যে মেয়ে ভালোবাসার জন্য ভেঙে পড়েছিলো,
আজ সেই মেয়ে ভালোবাসার অর্থ নতুন করে শিখেছে।

তিশা এখন নিজের একটা ছোট এনজিও চালায় —
যেখানে স্বামীহারা, পরিত্যক্ত নারী, একলা মা’রা কাজ করে।
তিশা বলে,

> “আমরা একা নই, আমরা শক্তি।
> আমাদের চোখের পানি দুর্বলতার নয়, বেঁচে থাকার প্রমাণ।”

আরিশা এখন স্কুলে পড়ে, সবার প্রিয় ছাত্রী।
স্কুলের অনুষ্ঠানে একদিন শিক্ষকরা বললেন,
“আজকে ‘সেরা মা’ পুরস্কার দেওয়া হবে।”
সবাই যখন ভাবছে কে পাবে, তখন মঞ্চে ডাক পড়লো—
**“তিশা রহমান, সেরা মা।”**

তিশা অবাক হয়ে তাকালো,
মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোন ধরলো,
আরিশা নিচে হাততালি দিচ্ছে, মুখে গর্বের হাসি।

তিশা বললো—
“আমি জানি, আমি একা।
কিন্তু একা হওয়া মানে দুর্বল হওয়া নয়।
যে নারীর গর্ভে একটা প্রাণ জন্ম নিতে পারে,
সে চাইলে নিজের ভেতর থেকেও নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে।
আমি আজ আমার মেয়ের চোখে পৃথিবী দেখি,
সেই চোখে আমি আমার রাহাতকেও দেখি…
কারণ সে যদি না থাকতো, আমি হয়তো আজকের আমিটাও হতে পারতাম না।”

মঞ্চে দাঁড়িয়ে সবার চোখ ভিজে গেলো।
কেউ মুখ মুছছে, কেউ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে—
এক নারীর জীবনের সবচেয়ে শক্ত অথচ কোমল গল্প শুনছে সবাই।

---

📖 **রাতে...**
আরিশা ঘুমিয়ে গেছে।
তিশা জানালার পাশে বসে, হাতে এক কাপ চা, চোখে আকাশ।
তারা ঝিকমিক করছে, যেন কারও চোখের ইশারা।

“রাহাত, তুমি জানো? তোমার মেয়ে আজ তোমার মতো হাসে।
ওর চোখে তোমার ছায়া দেখি প্রতিদিন।
তুমি ভালো থেকো প্রিয়…
তুমি যেখানে আছো, সেখানেই শান্তিতে থেকো।”

চোখের কোণে জল টলমল করলো,
হাসিমুখে তিশা বললো—
“আমি কাঁদি না এখন, আমি শুধু মনে করি—
ভালোবাসা হারায় না, সময়ের সাথে ঠিক পথ বদলায়…”

---

📅 **কয়েক মাস পর...**

তিশার এনজিও এখন বড় হয়েছে।
টিভি ইন্টারভিউতে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলো,
“মিসেস তিশা, আপনি কি কখনো আপনার জীবনের হারানো মানুষটাকে ভুলতে পেরেছেন?”

তিশা হালকা হাসলো—
“না, ভুলিনি।
কিন্তু ক্ষমা করেছি।
কারণ ভালোবাসা মানে কাউকে ধরে রাখা নয়,
ভালোবাসা মানে কাউকে মুক্ত করে দিয়ে নিজে শান্তি খোঁজা।”

সেই দিন রাতের নিউজ হেডলাইনে লেখা হলো —

> “ভালো থেকো প্রিয় – এক নারীর জীবনের যুদ্ধ আর ভালোবাসার গল্প।”

আর পরের দিন সকালেই ফেসবুকে হাজারো মানুষ শেয়ার করলো সেই ভিডিও—
কমেন্টে কেউ লিখলো,

> “তিশা, তুমি আমাদের চোখে এক অনুপ্রেরণা।”
> আর কেউ লিখলো,
> “এই গল্পটা পড়তে পড়তে চোখ ভিজে গেলো।”

---

🌹 **শেষ দৃশ্য:**

রাত গভীর, জানালা খোলা।
চাঁদের আলো ঘরে পড়েছে।
তিশা মেয়েকে বুকে নিয়ে ঘুমোচ্ছে।
ওর ঠোঁটে নরম হাসি, যেন রাহাতের নাম ফিসফিস করছে —
“ভালো থেকো প্রিয়…”

আর দূরে আকাশে কোনো এক তারা হয়তো জ্বলজ্বল করছে —
যেন সেখান থেকেও কেউ উত্তর দিচ্ছে,
“ভালো থেকো তুমি-ও, আমার ভালোবাসা…”

---

✨ **পরিশেষে:**
এই পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্ত ভালোবাসা হলো সেইটা,
যেটা হারিয়েও কাউকে ভালো চাওয়ার শক্তি রাখে।
তিশা হারিয়েছে রাহাতকে,
কিন্তু পেয়েছে একটা নতুন জীবন, একটা নতুন অর্থ—
নিজের নামের ভেতর লুকানো সেই সত্যিটা —
**তিশা মানেই “শান্তি”।**

---

#অবশ্যই ভালো হোক খারাপ হোক একটা কমেন্ট করবেন 🥰


Address

Rajshahi

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Abegi Onuvuti posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Abegi Onuvuti:

Share

Category