20/07/2026
আমার বিয়ে ভাঙার শোকে বাবা মারা গিয়েছিলেন। আর বাবার মৃত্যুর শোকে মা আমার থেকে যে মুখ ফেরালেন, আজ বারোটি বছর আমি মায়ের মুখ দেখিনি তিনিও তা-ই।
প্রায় প্রায় চোখের সামনে মায়ের মুখটা ঝাপসা হয়ে ফুটে ওঠে। আমি মায়ের মুখটা মনে করতে পারি না। বাবার মুখটা যদিও মনে করতে পারি তবে সেটা মনে করতে চাই না। কারণ মৃত্যুর আগে বাবার মুখটা যেমন যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে গিয়েছিল! সেই মুখটি আমার কাছে দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
আপানারা হয়ত ভাবছেন- বিয়েটা ভাঙল কী করে? হয়ত আমার প্রেম ছিলো! আমি নিশ্চয় পালিয়ে গিয়েছিলাম কিংবা আমিই কোনো একটা অঘটন ঘটিয়েছিলাম। আপনাদের ভাবনা অর্ধ সত্য বটে। অঘটন আমিই ঘটিয়ে ছিলাম তবে পালিয়ে গিয়ে নয়। সেখানে উপস্থিত থেকেই। বলছি সে কথাই, শুনুন..
আমার একটি প্রেম ছিলো। উন্মুখ, খড়া জীবনে একবার বসন্ত আমার জন্যও এসেছিল।
বহুদিন আগে জানি না কেমন করে, কোন লগ্নে, কোন জাগতিক ইশারায় আমি একজন পুরুষের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার বয়স তখন মোহগ্রস্থ একুশ তার হয়ত আমারচে প্রায় দশ-পনেরো বেশি পরিপক্ব আটত্রিশ কিংবা চল্লিশ। বয়সের পার্থক্য শুনে নিশ্চয় অবাক হচ্ছেন? অবাকের কিছু নেই। প্রেম, ভালোবাসা, মায়া এসব কখনোই স্থান, কাল, বয়স, পাত্র অথবা যুক্তি মেনে হয় না। আমার ক্ষেত্রেও তাই। আমি তখন চঞ্চল পায়রা, কথায় কথায় হেসে মরি। রক্তে সে তীব্র এক দুঃসাহস! পৃথিবীকে মনে হতো এক খণ্ড উন্মাদ ভূমি। সেই উন্মাদ ভূমিতেই আমার বরষার জল হয়েছিলো সেই সুপুরষটি। সুপুরুষই বটে। নারীকে অমন আহ্লাদে, যত্নে, মায়ায় যে ফেলতে পারে তাকে সুপুরুষ না বললে মহা ভুল হবে।
প্রেমের আরম্ভ অতিরঞ্জিত ছিলো না। আমি জানতামও না আমি তার প্রেমে পড়ব। স্বাভাবিক, শান্ত পরিচয় কেমন করে যে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ হয়ে গেলো, কে জানে!
তার প্রেমে পড়েছিলাম আমি বহু বহু দিন লাগিয়ে। বিনা পরিকল্পনা, বিনা আকাঙ্ক্ষায়। সে বড়ো সুন্দর ভঙ্গিমায় কথা বলতো। এই যেমন ধরুন, একদিন শাড়ি পরেছিলাম। সেটা দেখে সে আমায় সুন্দর বলেনি, বলেছিলো— আকাশ আমার ভীষণ পছন্দ। আকাশের দিকে তাকালে সকল মন খারাপ ভালো হয়ে যায়। আপনি আমার আকাশ হবেন?
আবার কখনো সখনো অবুঝ আমি রাগে নাকের পাটা ফুলিয়ে নিলে বলতো— দেবী বলে যা ইচ্ছে করতে পারেন না। বড্ড জ্বালাতন করছেন।
এমন মায়াময় কথা ফেলে দেওয়া কি যায় বলুন? তার উপর আমার মুগ্ধ হওয়ার বয়স! আমিও ফেলতে পারিনি। তার আকাশ হওয়ার জন্য বুকের জমিন খুলে দিয়ে ছিলাম। সে বলেছিলো তার বাবার যে একটি বইয়ের আলমারি ছিলো সেটি কাউকে ধরতে দেওয়া হয় না কিন্তু সেই আলমারিটি তার বাড়িতে সংসার পাতলে আমার হবে। আমার মন খারাপ থাকলে সে এমন করে যত্ন করতো যেন আতুর ঘরে শিশুকে স্নেহে ঢেলে দিতে মাতা কাতর হয়ে আছেন।
আমাদের এমন মায়াময় প্রেমও টিকেনি। কেন টিকেনি সেসব বিস্তর আলাপে আর না যাই। তবে আমরা কেউ কারো সাথে প্রতারণা করিনি, কেউ কাউকে জোর করিনি ছেড়ে দিতে। কিন্তু তবুও অদৃষ্ট চেয়েছিলো আমাদের প্রেমের এক অন্য গন্তব্য হোক। হয়েছিল অন্য এক গন্তব্য; বিচ্ছেদ। হৃদয় ভেঙেচুরে একসার হওয়া বিচ্ছেদ হয়েছিলো আমাদের সেই সুখী প্রেমের গন্তব্য।
মানতে কষ্ট হয়েছিলো। প্রথম কিছুমাস তো বিশ্বাসই করতে পারিনি যে, এমন প্রেমও ভাঙে! এমন স্বপ্নও ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ধীরে ধীরে যখন মানতে শুরু করলাম তখন দেখলাম আমার মাটির মতো হৃদয়টায় বাগান করে দিয়ে মালি পালিয়েছে। আর মালির অভাবে বাগানের প্রতিটি ফুল শুকিয়েছে, মরেছে অবেলায়। আমার বহু সময় লেগেছিল সেই বিচ্ছেদ থেকে বের হতে। মা পাত্রের ছবি আনলে আমি চোখ তুলে তাকানোর আগ্রহ অব্দি পেতাম না। কীভাবে দেখতাম বলুন তো? বুক ভাঙতো না? যেই সংসার আমি সাজিয়েছিলাম কল্পনায় সেই সংসার অন্য কারো সাথে করার কথা ভাবা সম্ভব ছিলো সেই মুহূর্তে? আমার পুরো বর্তমানের সঙ্গে যেন ভবিষ্যতটাও ধ্বসে গিয়েছিলো।
আমার প্রেমের কথা যারা জানতো সেই সকলেই আমায় বহুবার, বহু ভাবে বুঝিয়েছে। প্রেমিকা হিসেবে মন্দ ছিলাম না আমি। একটা মানুষের ভেতর ঠিক যেমন করে ডুবতে হয় আমি তেমন করেই ডুবে ছিলাম। তাই আকুল পাথারে হাবুডুবু খেয়েছিলাম। তাকে হারানোর পর বহুদিন লেগেছিলো আমার নিজেকে বোঝাতে। একটা মানুষ, আমার এত মায়ার মানুষ আমার হলো না সেটা নিজের মনকে মানানো আমার জন্য এক জন্মের তপস্যার চেয়েও কষ্টের ছিলো।
একুশের আমি পরিপক্ব হলাম অবশেষে ছাব্বিশে। বাবা-মায়ের বহু অসন্তুষ্টি, বহু অভিযোগের পর আমি স্থির হলাম আবার নতুন করে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে। এভাবে তো সত্যিই আর জীবন যায় না। নিজেকে তো সুযোগ দিতে হবে পুনরায়। নয়তো অন্যকে ভালোবেসে নিজের সাথে অন্যায় করে যাওয়া হবে এটা।
আমার সম্মতিতে কাঁধের বোঝা নেমেছিলো বাবা-মায়ের। অবশেষে তাদের কন্যার সুবুদ্ধি উদয় হলো! অবশেষে…
বিয়ের দিন যত ধাবিত হতে লাগলো ততই চোখের সামনে ভাসতো আমার পুরোনো সেই মানুষটা। চোখ উপচে জল আসতো। সবাই ভাবতো নিজের জায়গা ছেড়ে যেতে হবে বলে কাঁদছি আমি।
সবাই যেই নিজের জায়গাটির কথা বুঝাতো, আমার নিজের জায়গাটা সেটি ছিলো না। আমার নিজস্ব জায়গা ছিলো সেই মানুষটার বুক, যেখানে রাতে আমার নিশ্চিন্তে ঘুমানোর কথা ছিলো। আর, সেই জায়গাটি আমায় ছেড়ে গিয়েছিলো বহু বছর আগেই। সত্যিই আমি নিজের জায়গার আফসোসেই কাঁদতাম।
বিয়ের দিন এলো মহা আড়ম্বরে। বাড়ি ভর্তি আলো, উঠোন ভর্তি আয়োজন, ঘর ভর্তি লোক। আত্মীয়, স্বজন, আনন্দ, হৈ-হল্লা… কী কম ছিলো সেখানে? বাবা আমার সবকিছু পরিপূর্ণ করে করেছিলেন। মেয়ের বিয়ের কোনো ত্রুটিই রাখেননি। মেয়েরা যা লাগবে সব দিয়েছিলেন। অথচ বাবা জানতোই না, মেয়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো যেই পুরুষটি, সেই পুরুষটিকেই আর তার কন্যা পাবে না কখনো।
আমার কপালে চন্দন দিয়ে সাজানো হয়েছিলো। লাল টুকটুকে বেনারসি, গা ভর্তি গহনা। পুরো শরীর ঠিকরে যেন উর্বশী নৃত্য করছিলো। যেই সাজ নিয়ে একুশ বছরের জীবনটায় আমার বহু জল্পনা-কল্পনা ছিলো, যেই বেনারসিটি পরে আমি সেই মানুষটার সাথে আজন্ম আটকে যেতে চেয়েছিলাম সেই পোশাকই সেই সাজ নিয়ে আমি বসেছিলাম অন্য একজনের অপেক্ষায়। অন্য একটি বর, অন্য একটি ঘর যার কথা আমি আমার দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি!
বধূ সাজের আমি সেদিন বিছানায় বসা ছিলাম। নিজেকে বহু কষ্টে যে মানিয়ে ছিলো নতুন একটি জীবনের জন্য। সেই প্রাপ্তবয়স্ক আমিটার সাথে কিছু একটা হলো। ভুল হলো কী সঠিক আজও জানি না। তবে হয়েছিলো কিছু একটা।
ঘরের আত্মীয়র কেউ একজন যখন বলেছিল, বরের গাড়ি প্রায় এসে পড়েছে তখনই সমগ্র বিশ্বের সমগ্র কলরব থেমে গিয়েছিলো। ঐ মুহূর্তে আমার স্মৃতি গুলো আমার ছাব্বিশ বছর থেকে আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো একুশে। আমার চোখের সামনে সব ভাসতে থাকলো। রাত জেগে আমার তীব্র কৌতূহলে করা সকল প্রশ্ন, সেই প্রশ্নের বিপরীতে ঐ মানুষটার হাস্যোজ্জ্বল উত্তর, তার বাড়িতে যেই কল্পনার সংসার সাজিয়েছিলাম- সেটি, ভাসতে লাগলো তার কণ্ঠের দেবী ডাক, ভাসতে লাগলো তার সাথে সাজানো আমার ভবিষ্যতের সকল স্মৃতি।
সেই মুহূর্তে আমি ধাক্কা খেলাম। শ্বাস নিতে লাগলাম অনবরত। সেই মুহূর্তে আমার সারা শরীর জ্বলছিলো। বুকটা তো কয়লা হয়ে গিয়েছিলো পুড়ে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিলো, আমি সব মেনে নিলেও, যেই ঘরের পুরোনো একটি বইয়ের আলমারি আমার হতো বলে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটার অভাব নিয়ে আমি অন্যকারো সাথে সংসার করতে পারব? আমি যখন নতুন সংসারে একটা ভাঙাচোরা বইয়ের আলমারি পাবো না তখন আমায় আর কিছু টানবে? তখন থেকে প্রতিনিয়ত আমার মনে হবে না, সেই সংসারটা আমার নয়? এমন সংসার কখনো সাজায়ইনি আমি? মনে হবে না?
সেই একটি ভাঙা আলমারির লোভ আমায় এমনই উন্মাদ করল যে আমি দিশে হারিযে ফেলেছিলাম। ঘরভর্তি লোকের সামনে তীব্র চিৎকার করে উন্মাদের মতো কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিলাম। আমার মা দিকশূন্যের মতো আমায় বোঝাতো থাকলো। ভেবেছিলো বিয়ে হবে বলে মেয়ে বুঝি তার কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। বিয়ে বাড়ির সবাইও তা-ই ভেবেছিলো হয়ত! কেবল সেখানে একজন আমার কান্না দেখে বুঝতে পারল, এটা পরিবার হারানোর কান্না নয়। এই কান্নাটি তারচেয়েও বড়ো কিছু হারিয়ে ফেলার কান্না। জীবিত পরিবারের জন্য কেউ এমন করে কাঁদতে পারে না। এমন করে কাঁদে মানুষ মৃত কিছুর জন্য কিংবা এমনকিছুর জন্য যা আর কখনোই ফিরে পাওয়া যাবে না। আর সেই বুঝদার মানুষটি ছিলো আমার বাবা। বাবা, বাবা, আমার বাবা।
সে ঘরভর্তি লোক বাহির করে কেবল আমাকে রাখল। খালি, বদ্ধ ঘরটায় কেবল আমি। বাহিরে তখন বাজনার শব্দ, সানাইয়ের সুর জানান দিচ্ছে একটু পর আমার একুশের সংসার ভেঙে খান খান হবে।
বাবা আমায় সেদিন সান্ত্বনা দেয়নি মাথায় হাত বুলিয়ে, আহ্লাদও করেনি। সে হয়ত বুঝতে পেরে গিয়েছিল আগাম হওয়া একটা কেলেঙ্কারির কথা। বুঝতে পেরে গিয়েছিলো, সে আজন্ম সমাজের আঁড়চোখের কৌতূহল হতে যাচ্ছে। তবুও কন্যার সুখের কথা, স্বস্তির কথা ভেবেই জিজ্ঞেস করেছিলো,
“তুমি কাউকে ভালোবাসো?”
আমার তখন কান্না সর্বোচ্চ। শরীর কাঁপছিলো থরথর করে। মাথা নাড়িয়ে জানিয়েছিলাম, বাসি।
“আগে কতবার জিজ্ঞেস করলাম বলোনি কেন? তার সঙ্গেই নয়ত তোমার বিয়েটা দিতাম।”
আমি বলতে পারছিলাম না কথা। তবুও বহুকষ্টে বলেছিলাম, তার সাথে আমার বহুদিন যোগাযোগ নেই। বহুদিন নয়, বহুবছর যোগাযোগ নেই৷ ভেবেছিলাম আমি হয়ত সংসার করতে পারব। কিন্তু এখন আমার বুক জ্বলে যাচ্ছে, বাবা। দম আটকে আসছে।
বাবা বহুক্ষণ নিশ্চুপ ছিলো এরপর। বাজনার শব্দ আমাদের সেই নিস্তব্ধ ঘরটাকে কী এক মুহূর্তে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিলো! আমি জানতাম না আমার ভবিষ্যত কী, হবে কী। কেবল কাঁদতে পারছিলাম বুক খুলে।
বাবা বহুক্ষণ স্থির থেকে কেবল বলেছিল, “চাও কী তবে?”
“আমি বিয়ে করতে পারব না, বাবা। মনে হচ্ছে মরে যাচ্ছি। জানি না যারা আ ত্ম হ ত্যা করে তারা মৃত্যুর সময় এমনই দমবন্ধকর অনুভব করে কি-না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি এখন মরে যাব। স্বেচ্ছায় মরছি হয়ত! আমি অন্যকারো সাথে সংসার করতে পারব না, বাবা। আমি যেই স্বপ্নের সংসার সাজিয়ে রেখেছিলাম তা তছনছ করে আমি আরেকটি সংসার আর সাজাতে পারব না।”
কথাগুলো বলার সময় আমার চোখের সামনে ভাসছিলো সেই স্বপ্নের সংসারের দৃশ্য। কত সুখী আমরা কল্পনাতেই! সেই সুখের সাথে বাস্তবের যখন ভিন্নতা ও সংঘর্ষ হবে তখন আমি মানব কীভাবে?
বাবা আমায় আর কিচ্ছু বলেননি। কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
এর ঘন্টাখানেক পরেই জেনেছিলাম আমার বিয়েটা ভেঙে গিয়েছে। বাবা ভেঙে দিয়েছেন। কারণ বলেননি, কৈফিয়ত দেননি কেবল ভেঙে দিয়েছেন। এবং সেজন্য বরপক্ষের কেউ একজন বাবার গায়ে নাকি জুতো মেরে গিয়েছে।
আমি যখন উঠোনে ছুটে যাই তখন লজ্জায় অপমানে আমার বাবার বুকে ব্যথা উঠেছিলো। কী তীব্র ব্যথায়! ব্যথায় না-কি অপমানে ঠিক জানি না, আমার বাবার চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছিলো। আমি ছুটে গিয়ে যখন বাবার হাতটা ধরতে চাইলাম বাবা অভিমানে হাত ফিরিয়ে নিলো। একটাবার তাকালো না অব্দি আমার দিকে। সেই অভিমানেই প্রাণ দিলেন। প্রাণ দিলেন, না আমি কেঁড়ে নিলাম তা-ও আমি জানি না। আমি দেখলাম, একটা মানুষ, একটা প্রেম, একটা বিচ্ছেদ আর একটা কাঠের ভাঙা আলমারির লোভে আমি সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছি। জাত, কুল, সমাজ ও বাবাকে। সব হারিয়ে ফেলেছি। সব…
মা এরপরই আমায় ত্যাগ করে। মা শুরু, শেষ যদিও কিছু জানতো না কিন্তু এতটুকু বুঝেছিল তার স্বামীর অপমানের দায় ছিলো কেবল আমার। একটি অযোগ্য কন্যার। তার গর্ভের কলঙ্কের।
এই যে আমি সব হারালাম, এরপর বিধাতা আমার জন্য আর কিছুই লিখলেন না। তিনিও বোধহয় বাবার মতোই অভিমান করলেন। নতুন করে জীবন সাজাতে চেয়েছিলেন কিনা! আমি হতে দিইনি বলে তিনিও অভিমানে বাবার মতো মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর আর আমায় কেউ ভালোবাসেনি, আমার জন্য কেউ আর অপমান মাথা পেতে নেয়নি। আমার প্রেমও হয়নি আরেকটি বার। পৃথিবীর বুকে আমি বিধাতার শাস্তি বয়ে বেঁচে রইলাম। তীব্র একা। মাঝ রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে যখন ঘুম ভেঙে যায়, জানেন? আমার মাথায় হাত বোলানোর কেউ নেই, কেউ না! উদ্ভ্রান্তের মতো কাঁদলে আজ আর কেউ জিজ্ঞেস করে না, তুমি কী চাও। আমি আমার সমস্ত জীবন, সমস্ত সুখ, সমস্ত আপন মানুষ হারালাম যার জন্য সে জানেও না প্রতিনিয়ত আমি বেঁচে আছি মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর ভাবে। সে জানে না একুশের মেয়েটির আজ চুলে পাক ধরলেও সে ছাড়তে পারেনি ঐ না হওয়া সংসারের লোভ। ঐ ভাঙা আলমারির লোভ, ঐ মায়ার মানুষটার লোভ। মানুষ ভালোবেসে উন্মাদ হয়, মৃত হয়, শূন্য হয়, নিঃস্ব হয়। আমি হয়েছি একা। উন্মাদের চেয়েও, মৃত্যুর চেয়েও এই একাকীত্ব ভয়ঙ্কর। পুরো ঘরজুড়ে আমার কেউ নাই, কিচ্ছু নাই। পুরো পৃথিবী জুড়েই আমার কেউ নাই। এরচেয়ে বিধ্বস্ত কিছু আছে একজন মানুষের জন্য?
বাহির থেকে যখন ঘরে ফিরি তখন ঘরটাকে লাগে যমদূত। একটু কথা বলার মতো কাউরে পাই না। খা খা, খালি ঘর। নিজে সুইচ চেপে আলো না জ্বালালে আলো জ্বালানোর কেহ নেই। কখনো মৃত্যু হলে হয়ত লাশটাও পচেগলে যাবে অথচ কেউ জানবে না। সংবাদপত্রে বহুদিন পর ছাপা হবে, একটি বেনামি লাশ পাওয়া গিয়েছে অথচ পাওয়া যায়নি তার কোনো আত্মীয়, পরিচয়, মানুষ। এই যে একটা মানুষের জন্য আমার লাশটার পরিচয়ও হবে বেনামি এরচেয়ে দুঃখের কিছু আছে?
অথচ একটা মানুষকে ভালোবেসে আমি সাদরে গ্রহণ করেছিলাম এই দুঃখ।
জীবন আমায় আজ পথের ভিখারির চেয়েও শূন্য করে দিয়েছে তা-ও কি-না না হওয়া সংসারের জন্য, একটি ভাঙা আলমারির জন্য।
যেই আলমারির ধূলো ঝারতাম আমি, বইগুলো হতো আমার, জীবনানন্দের বনলতা সেন রাখতাম যেই আলমারির প্রথম তাকে অথবা যেই আলমারি থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার বইটি খুলে আমার মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে আবৃতি করতাম,
"কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি!
ছেলেবেলায় এক বোষ্টমী তার একতারাটি বাজিয়ে শুনিয়েছিল,
আগমনীর গান—
বলেছিল, তোরে একটা গান শুনাবো, তারপর আর আসেনি।”
অথবা শোনাতাম জীবনানন্দের অমর কবিতাখানি,
❝এ পৃথিবী একবার পায় তারে,
পায় না-কো আর❞…
#ভাঙা_আলমারি
কলমে: মম সাহা