02/09/2026
যে রাজশাহীর রাস্তাগুলো একসময় হেঁটে যাওয়া মানুষদেরও চিনতো…
:
আজকের রাজশাহীর ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ যদি সময়টা পেছনে ঘুরে যায়—আপনি হয়তো বিশ্বাসই করবেন না, এ একই শহর।
যেখানে এখন রিকশা, মোটরসাইকেল আর গাড়ির স্রোতের মাঝে মানুষ রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ খোঁজে, একসময় সেখানে বিকেলের বাতাস প্রায় বাধাহীনভাবে বয়ে যেত।
দূরে একটি সাইকেলের ঘণ্টা শোনা যেত, ধীরে চলত দু-একটি রিকশা, আর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে দেখে মনে হতো—শহরটি কোথাও ছুটছে না। রাজশাহীর রাস্তারও তখন যেন শ্বাস নেওয়ার সময় ছিল। রাজশাহীর রাস্তাগুলো একসময় হেঁটে যাওয়া মানুষদেরও চিনতো…
আজকের রাজশাহীর ব্যস্ত কোনো মোড়ে দাঁড়িয়ে যদি চোখ বন্ধ করা যায়, হয়তো কয়েক দশক আগের শহরটাকে কল্পনা করা সম্ভব—একটি রাস্তা, যেখানে সারি সারি গাড়ির হর্ন নেই; ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা মানুষের ক্লান্ত মুখ নেই; রাস্তা পার হতে গিয়ে বুক ধড়ফড় করার ভয়ও নেই।
ছিল প্রশস্ত নীরবতা। ছিল ধীর গতি। আর ছিল এমন এক শহর, যেখানে রাস্তা যেন শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার পথ ছিল না—ছিল মানুষের জীবনযাপনের অংশ।
পুরোনো রাজশাহীর অনেক রাস্তা একসময় এত ভিড় দেখেনি, কারণ শহরটিও ছিল অন্যরকম। জনসংখ্যা কম ছিল, ব্যক্তিগত যানবাহন ছিল সীমিত, মানুষের চলাফেরার প্রয়োজনও ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট একটি শহরকেন্দ্রিক জীবনের মধ্যে।
অনেকেই হেঁটে যেতেন, সাইকেল ছিল দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম সঙ্গী, রিকশার গতি ছিল ধীর—আর সেই ধীরগতির মধ্যেই যেন শহরের একটি নিজস্ব ছন্দ ছিল।
ভাবা যায়, আজ যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটে যায়, একসময় সেখানে বিকেলের দিকে পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলে দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলার সময় ছিল! দোকানের সামনে মানুষ বসে গল্প করত। রাস্তার পাশের গাছগুলো শুধু সৌন্দর্যের অংশ ছিল না, পথচারীদের ছায়াও দিত। শহরে গন্তব্য ছিল, কিন্তু সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া আজকের মতো এত নির্মম ছিল না।
তবে পুরোনো রাজশাহীর কম ভিড়কে শুধু “সোনালি অতীত” বলে দেখলেও ভুল হবে। কম ভিড়ের পেছনে ছিল সীমিত নগরায়ন, ছোট অর্থনৈতিক পরিসর এবং তুলনামূলক কম সুযোগ।
আজ শহর বড় হয়েছে কারণ মানুষের প্রয়োজন বেড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি কর্মসংস্থান—সবকিছুর বিস্তারের সঙ্গে মানুষও এসেছে। নতুন মানুষ এসেছে, নতুন স্বপ্ন এসেছে, নতুন যানবাহন এসেছে।
সমস্যা হয়তো শহর বড় হওয়ার মধ্যে নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন শহরের রাস্তা পুরোনো থাকে কিন্তু মানুষের সংখ্যা ও চলাচল বদলে যায়। যখন আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু পরিকল্পিত চলাচল চাই না। যখন নতুন ভবন তৈরি হয়, কিন্তু পথচারীর জায়গা কমে যায়। তখন ভিড় শুধু রাস্তায় জমে না—মানুষের মনেও জমতে শুরু করে ক্লান্তি।
তবু পুরোনো রাজশাহীর রাস্তার কথা মনে পড়লে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নাড়া দেয়, তা হলো—একসময় শহরটি মানুষকে একটু সময় দিত। হাঁটার সময় দিত। চারপাশ দেখার সময় দিত। পরিচিত মুখকে চিনে হাসার সময় দিত।
আজ আমরা দ্রুত চলি, কিন্তু কোথায় পৌঁছাতে চাই—সেই প্রশ্নটি কি সবসময় করি?
হয়তো রাজশাহীর পুরোনো রাস্তাগুলো আমাদের অতীতে ফিরতে বলছে না। তারা শুধু মনে করিয়ে দেয়—একটি শহর সত্যিকার অর্থে আধুনিক তখনই, যখন সেখানে মানুষের চলাচল সহজ হয়, কিন্তু মানুষের জীবন হারিয়ে যায় না।
আপনার কি এমন কোনো রাজশাহীর রাস্তার কথা মনে আছে—যেখানে একসময় এত ভিড় ছিল না, অথচ আজ দাঁড়ালে মনে হয় শহরটা যেন চোখের সামনেই বদলে গেছে?
লেখক : সাংবাদিক