09/06/2026
রুয়েটে ন্যাশনাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জের প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত; উদ্ভাবনভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান
উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিনির্ভর সমস্যা সমাধান এবং উদ্যোক্তা তৈরির সংস্কৃতি জোরদারের লক্ষ্যে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) অনুষ্ঠিত হয়েছে UIHP National Innovation Challenge এর প্রথম পর্ব। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের আওতায় University Innovation Hub Program (UIHP) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ এবং তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন অতিথিরা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল ৯টায় রুয়েট অডিটোরিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ আয়োজনের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (IICT)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ সিদ্দীকুর রহমান, UIHP রুয়েটের ফোকাল পয়েন্ট মো: আবু ইসমাঈল সিদ্দিকী। এছাড়াও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন DEIED প্রজেক্টের ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট রাকিবুল ইসলাম ও সোস্যাল স্পেশালিস্ট খালেদা ইসলাম, রুয়েট প্রতিনিধি মোর্শেদ হোসাইন রাকিব এবং বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি জাকিরুল ইসলাম।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে সকাল ১১টা থেকে আইডিয়া ও প্রজেক্ট প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এতে রুয়েট ও বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোহোর্টে প্রি-সিড ফান্ডপ্রাপ্ত দলগুলো তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্প ও পরিমার্জিত আইডিয়া উপস্থাপনের সুযোগ পায়। পরে বিকেল ৪টায় সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট রাকিবুল ইসলাম বলেন,"বাংলাদেশ সরকার একটি কার্যকর ও টেকসই ইনোভেশন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে।" তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তরুণ উদ্ভাবকেরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। তিনি বলেন, উদ্ভাবনের সংস্কৃতি বিকাশে শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
উদ্যোক্তা উন্নয়নের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে সামাজিক বিশেষজ্ঞ খালেদা ইসলাম বলেন, তরুণদের মধ্যে অসংখ্য উদ্ভাবনী ধারণা থাকলেও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, মেন্টরশিপ ও সহায়তার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ পায় না। উদ্যোক্তাদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “উদ্যোক্তাদের মেন্টাল হেলথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভাবন ও উদ্যোগের পথে নানা ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হয়। তাই এ বিষয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম শিল্পখাত ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের সম্পদ সীমিত। তাই বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ শিল্প এখনো অ্যাসেম্বলি-নির্ভর। ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব শিল্পপরিবেশে কাজ শেখা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে উঠলে সেখান থেকেই প্রকৃত উদ্ভাবনের জন্ম হবে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রুয়েট ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের সহকারী পরিচালক এবং UIHP রুয়েটের ফোকাল পয়েন্ট মো: আবু ইসমাঈল সিদ্দিকী দলগত উদ্ভাবন ও সহযোগিতামূলক চিন্তার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “পারস্পরিক আলোচনা ও যোগাযোগের মাধ্যমে একটি ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর করা সম্ভব। একটি সমস্যার একাধিক সমাধান থাকতে পারে। সেখান থেকে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধানটি নির্বাচন করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে।”
তিনি তরুণদের চাকরিনির্ভর মানসিকতার বাইরে এসে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “শুধু চাকরির পেছনে ছুটলে হবে না, চাকরি সৃষ্টির জন্যও কাজ করতে হবে। নতুন উদ্যোগ, নতুন প্রতিষ্ঠান এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারলেই দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।”
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা উদ্ভাবন, গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর সমস্যা সমাধান, স্টার্টআপ সংস্কৃতি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। বক্তারা বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ যুগে উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, বরং উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। পরে কেক কাটার মাধ্যমে দিনব্যাপী আয়োজনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। তবে চূড়ান্ত বিজয়ীদের ফলাফল দেশব্যাপী অনুষ্ঠিতব্য আরো কয়েকটি পর্ব শেষে ঘোষণা হবে বলে জানা গেছে।
আয়োজকরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, সমস্যা সমাধান সক্ষমতা এবং উদ্যোক্তা দক্ষতা বিকাশে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব প্রোগ্রামের আওতায় নিয়মিতভাবে এ ধরনের কার্যক্রম আয়োজন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তরুণদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তবসম্মত, কার্যকর এবং টেকসই সমাধানে রূপ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।